হান কাং এর হিউম্যান অ্যাক্টস- বাংলা তরজমা - ৯
- 07 March, 2026
- লেখক: রৌহিন
দ্বিতীয় চড়
প্রকাশকের ভাইঝি ওদের নানান টুকুটাকি কাজ করে দেয় প্রায়ই, দুপুরের দিকে সে এল দেখা করতে।
“আরে এই যে!” তার কাকা বেশ উষ্ণভাবেই বললেন বটে, কিন্তু ইউন সুক যখন যে কাগজটা পড়ছিল সেটা থেকে মুখ তুলে তাকাল তখন উনিও চট করে একবার ওর দিকে তাকিয়ে নিলেন।
“বাঁধাই প্রুফগুলো এসে গেছে?” একটু আড়ষ্ট হেসে জানতে চায় ইউন সুক। প্রকাশকের ভাইঝি ওর মুখের দিকে অপলক চেয়ে থাকতে থাকতেই নিজের ব্রিফকেসটা ঘেঁটে একটা প্রুফ টেনে বার করে আনে।
“তোমার মুখে কী হল?” কোনো উত্তর না পেয়ে বাচ্চা মেয়েটি এবার প্রোডাকশনের উন কে ধরে একই কথা জানতে চায়, “ইউন সুকের মুখে কী হয়েছে?” উন সামান্য মাথা নাড়ে শুধু; খুব অবাক হয়ে মেয়েটি এবার প্রকাশকের দিকে ঘোরে।
“আরে, ইউন সুক কে আমি বলেছিলাম কাল তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে যেতে – কিন্তু কী বলি বল তো – ও বড্ড গোঁইয়ার, কথাই শোনে না” তিনি বলে ওঠেন।
নিজের পকেট থাবড়ে একটা সিগারেট বের করে ঠোঁটে গুঁজে আগুন ধরান তিনি। নিজের চেয়ারের পিছনের জানলাটা খুলে সিগারেটটায় এত জোরে একটা টান দিলেন যে ওর গালদুটো প্রায় ঢুকে যাচ্ছিল। তারপর হুশ করে ধোঁয়াটা ছেড়ে বসলেন আবার। মানুষটা মধ্যবয়স্ক – এক ধরণের লোক থাকেন যারা যত কায়দার জামাকাপড়ই পরুন না কেন, অবিন্যস্তই দেখায়, ইনিও তেমনই একজন। নিজের সন্তানসম ছেলেমেয়েদের সঙ্গেও যাঁরা সম্মান দিয়ে বিনীতভাবে কথা বলেন, ইনি সেরকম একজন। এত বড় একটা প্রকাশনা সংস্থার মাথা হলেও “বস” শব্দটা তিনি একটুও শুনতে ভালোবাসেন না, বরং প্রত্যেককেই বলেন তাঁর সামনে তাঁকে যেন শুধু “প্রকাশক” ছাড়া অন্য কোনো নামেই না ডাকা হয়। ওই অনুবাদক, পুলিশ ওর কাছে যাঁর সম্বন্ধে জানতে চাইছিল, এঁর হাইস্কুলের সহপাঠি ছিলেন।
ইউন-সুকের সাথে কাজের কথা সেরে প্রকাশকের ভাইঝি চলে যাবার পরে অফিসের সবাই যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। প্রকাশক তাঁর সিগারেটটা চেপে নিভিয়ে ফেললেন।
“লাঞ্চে একটু বারবিকিউ খাবে নাকি, মিস কিম? আমি খাওয়াব – ওই জাংশন স্টেশনের কাছের দোকানটায় দারুণ বীফ করে”
হঠাৎ করে এই সামাজিকতা দেখানোটা একটু অদ্ভুতই লাগলো ইউন-সুক এর। এতক্ষণ মনে হয়নি কিন্তু এবার একটা সন্দেহ জাগছিল ওর মনে। গতকাল বিকালে ওর একটু আগেই বসেরও ডাক পড়েছিল সিওডেমান থানায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। ওঁকে ওরা ছেড়ে দিল কেন? ওদের কী বুঝিয়েছিলেন উনি?
“বলার জন্য ধন্যবাদ, কিন্তু আমি নিজেই ব্রং কিছু খেয়ে নেব” উত্তরটা একটু অস্পষ্ট শোনালেও ওর কিছু করার ছিল না – এই ফোলা মুখ নিয়ে হাসতেও বেশ কষ্ট হচ্ছিল ওর,” জানেনই তো আমি মাংস বেশী খাই না।“
“হ্যাঁ ঠিক তো, তুমি তো আবার মাংসের ভক্ত নও” বস নিজেই মাথা নাড়েন।
মাংসটা খেতে যে ইউন-সুক খুব একটা অপছন্দ করে, তা নয় – কিন্তু হট প্লেটের উপর ওটা রান্না হতে দেখলেই ওর পেটটা গুলিয়ে ওঠে আসলে। রক্ত আর রসগুলো যখন বাইরে বেরিয়ে আসে, ও মুখ ঘুরিয়ে নিতে বাধ্য হয়। একটা গোটা মাথাশুদ্ধ মাছ যখন ভাজা হয়। প্যানে নাড়তে নাড়তে যখন সেটার চোখগুলোর উপরে বাষ্প জমে ওঠে, হাঁ করা মুখ থেকে একটা রসের মত কিছু বেরিয়ে আসে, প্রতিবারেই ওর মনে হয় তখন যেন ওই মরা মাছটা আসলে কিছু বলতে চাইছে। প্রতিবারেই চোখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয় ও।
“তাহলে? কী খেতে ভালোবাসো তুমি বলো দেখি, মিস কিম?”
উন এই সময়ে না গলায়, “যদি আমরা খুব দামী জায়গায় গিয়ে একগাদা বিল করি তাহলে তুমি পরে আমাদের কান ধরে উশুল করবে সেসব” সে বলে ওঠে, “তার চেয়ে আগেরবার যেখানে গেছিলাম, ওই ক্যাফেটাতেই যাই, চলো”
তারা তিনজনেই চলে যাওয়া মানে অফিসে তখন কেউই থাকবে না, তাই তারা অফিসে তালা ঝুলিয়ে জাংশনের কাছে সেই ক্যাফেটায় গেল। বস যে বারবিকিউ এর দোকানটার কথা শুরুতে বলেছিল, এটা ঠিক তার পাশেই। একটু জরাজীর্ণ চেহারার এই দোকানটার মালিক মহিলা একটা চপ্পল পরে বসে আছেন, তাঁর সামনে ঘরোয়া কায়দায় রান্না করা ভাতের থালা সাজানো। চপ্পলের ফাঁক দিয়ে ওর নীল হয়ে যাওয়া পায়ের বুড়ো আঙুলটা দেখা যাচ্ছিল, শীতকালে ওটা মোজায় ঢাকা থাকে, আর তার উপর দিয়ে উনি একটা পুরনো তাপ্পি মারা স্নো বুট পরেন।
খাওয়া যখন প্রায় শেষের দিকে, বস ইউন-সুককে বললেন, “কাল কি আমি তাহলে সেন্সর অফিসটা হয়ে আসব?”
“সে তো সবসময়ে আমিই যাই” ---
“আরে কাল এত কাণ্ড সব হল, তোমাকে এসবের মধ্যে পড়তে হল, কী যে খারাপ লাগছে আমার”
বসের দিকে একবার তেরচা চোখে তাকাল সে। ওখান থেকে অক্ষত অবস্থায় ফিরল কিকরে লোকটা? শুধু ওই যাকে বলে সত্যি কথা বলে? কিম ইউন-সুক হল ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক। ওরা দুইজন ওই চোঙ্গি নদীর ধারে দেখা করে পাণ্ডুলিপিটা পরীক্ষা করেছে। এর বেশী আমি আর কিছুই জানিনা। সত্যিটা ও বলে দিতেই পারে, তাতে দোষের কিছু নেই; কিন্তু এখন কি ওর মনের ভিতর কোথাও সেজন্য বিবেকের খোঁচা লাগছে?
“এটা আমারই কাজ, চিরদিনই তাই ছিল” এবারে আরও দৃঢ়ভাবে বলে সে। একটু হাসারও চেষ্টা করে সে – কিন্তু তাতে যা তা কাণ্ড হয়, ব্যথায় মুখটা আরও কুঁচকে যায় ওর। ও তাড়াতাড়ি মুখটা ফিরিয়ে নেয় যাতে ওই ফোলা মুখ নিয়ে বসকে আবার অস্বস্তিতে না পড়তে হয়।
বাকিরা অফিস সেরে বাড়ির দিকে রওনা হবার পর নিজের ঘন কালো স্কার্ফটা দিয়ে ভালো করে নিজের মুখটা পেঁচিয়ে নিল ইউন-সুক, যাতে চোখের নীচটা অবধি ঢাকা পড়ে যায়। কেরোসিন স্টোভটা জ্বলছে কি না দেখে নিয়ে ঘরের সমস্ত সুইচ অফ করে দিল ও, এমনকি ফিউজগুলোও নীচের দিকে নামিয়ে দিল। অন্ধকার অফিসের কাচের দরজায় নিজের অস্পষ্ট ছায়াটার সামনে দাঁড়িয়ে এক মুহুর্তের জন্য চোখটা বন্ধ করে নিল ও – যেন বাইরে বেরোনোর আগে নিজের কাছেই নিজেকে লুকিয়ে ফেলতে চায়।
এই সন্ধেবেলা বেশ ঠান্ডা একটা শনশনে হাওয়া দিচ্ছে। ওর চোখ আর তার আশপাশের যেটুকু জায়গা স্কার্ফ জড়ানো নেই, সেখানটা ঠান্ডা হয়ে গেছে। কিন্তু তাও বাসে উঠতে ইচ্ছে হল না ওর। সারাদিন ডেস্কে বসে কাজ করার পর এখন কোনো তাড়াহুড়ো না করে এই নিশ্চিন্তে হেঁটে বাড়ি যেতেই ওর ভালো লাগছিল বরং। রাস্তা দিয়ে আপনমনে হেঁটে যাবার এই সময়টুকুই একমাত্র ও ওর মনের গভীরে থাকা ভাবনাগুলোকে আবার নেড়েঘেঁটে দেখছিল।
লোকটা নিজের বাঁ হাত দিয়ে আমার ডান গালে চড়গুলো মারল – তার মানে কি ও ল্যাটা?
কিন্তু… যখন টেবিলের উপর প্রুফগুলো হাতড়াচ্ছিল, কিংবা বাইরো কলমটা আমার হাতে দিল, তখন তো ও ডানহাতটাই কাজে লাগাল…
তাহলে কি যখন কেউ মারমুখী হয়ে ওঠে, তখন সেই আবেগটা আগে তার ডানহাতে নয়, বাঁ হাতেই আসে?
মুখের ভিতর যে তিতকুটে স্বাদটা উঠে আসছে, সেটা গাড়িতে যাবার সময়ে বমি পেলে যেমন হয়, তেমনই – সাধারণতঃ নিজের থুতু গিলে ফেললেই সেটা আস্তে আস্তে কমে যায়। মুখের ভিতরে, গলায় আর পেটে একই সাথে এই গা গোলানোটা আসলে তখনই শুরু হয় যখন তোমার কথা ওর মনে পড়ে। কিন্তু এখন শুধু থুতু গেলায় কাজ হচ্ছে না, ও তাই নিজের কোটের পকেট থেকে একটা গাম বের করে দাঁতে নিয়ে চিবাতে থাকে।
ওর হাতগুলো সাধারণ লোকেদের তুলনায় একটু ছোট ছোট না?
একরঙা ব্লেজার পরা মানুষজন, সাদা সার্জিকাল মাস্ক পরা স্কুলের মেয়েরা, এই ঠান্ডাতেও হাঁটু অবধি পা খোলা স্কার্ট পরা মেয়েরা, সবার মাঝখান দিয়ে নিজের মাথাটা নীচু করে ও এগিয়ে চলল।
হাতটা তো অন্য আর পাঁচজনের মতই, আলাদা করে খুব কর্কশ বা শক্ত না, বিরাট বড়োও না, তাই না?
ও হাঁটতেই থাকে, স্কার্ফটা মুখের ফোলা জায়গাটায় চেপে বসছে, টের পায় ও। হাঁটতেই থাকে, ওর মুখের বাঁ দিকে চেপে রাখা গামটার থেকে আসা অ্যাকাসিয়ার তীব্র গন্ধ ওকে ঘিরে থাকে। ওর মনে পড়ে ওখানে কেমন করে ও বসেছিল, পালাবার চেষ্টা করেনি, মৃদুতম প্রতিবাদটুকুও করেনি। শুধু নিশ্বাস চেপে অপেক্ষা করছিল, দ্বিতীয় চড়টা এসে ওর মুখে কখন পড়বে। হাঁটতেই থাকে সে।
তৃতীয় চড়
দেওকসু প্যালেসের সামনে বাস থেকে নেমে পড়ে সে। আগের দিনের মতই ওর মুখটা চীখের নীচ অবধি স্কার্ফ জড়িয়ে রেখেছে। ফোলাটা কমেছে এখন, তার জায়গায় একটা লাল দাগড়া হয়ে থাকা হাতের ছাপ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।
“এক্সকিউজ মী”, সিটি হলের সামনে একজন শক্তপোক্ত চেহারার পুলিশ অফিসার তাকে দাঁড় করায়, “ব্যাগটা খুলে দেখান প্লিজ”।
ও জানে, এরকম সময়ে একটু নির্লিপ্ত থাকতে হয়। চেতনার একটা স্তরকে অভ্যস্ত কাগজ ভাঁজ করার মতন কিম্বা পাতা উলাটানোর মতন সরিয়ে নেওয়া। ব্যাগটা খুলে কোনোরকম জড়তা না দেখিয়েই একে একে জিনিষগুলো মেলে ধরে ও – একটা হাত মোছার তোয়ালে, অ্যাকাসিয়া গাম, পেনসিল বাক্স, গতকাল প্রকাশকের ভাইঝির আনা বাঁধানো প্রুফটা, ঠোঁটে লাগানোর ভেসলিন, একটা নোটবুক, নিজের টাকার ব্যাগ ---
“এখানে কেন এসেছেন?”
“সেন্সর অফিসে আমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে। আমি একটা প্রকাশনা সংস্থায় কাজ করি” পুলিশটার চোখের দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে বলে সে।
পুলিশটা ওকে ওর রেসিডেন্ট কার্ডটা দেখতে চাইলে সেটা বার করে দেখায় ও। লোকটা ওর স্যানিটারি ন্যাপকিনের প্যাকেটটা যখন ঘাঁটছিল, ও নির্লিপ্ত মুখে তাকিয়ে থাকে। ঠিক পরশুদিন থানায় ইন্টারোগেশনের সময়ে যেমন তাকিয়েছিল, তেমনই। ঠিক চার বছর আগের সেই বৃষ্টি আর ঝিরিঝিরি বরফপাতের এপ্রিলের মত, যখন সেই গাদাগাদি ঘর থেকে ইউনিভার্সিটির দ্বিতীয় পরীক্ষাটাও পাশ করে ও গোয়াংজু থেকে সিওলে চলে এসেছিল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কাফেটেরিয়ায় বসে ও লাঞ্চ সারছিল সেদিন, এমন সময়ে কাচের দরজাটা ঠেলে একদল ছাত্রছাত্রী ভিতরে ঢুকে এল। ওদের পিছনে লাঠি আর ঢাল হাতে ওদের ঠেলা দিতে আর বকাবকি করতে থাকা সাদা পোশাকের পুলিশগুলোকে দেখে ওর খাওয়া মাঝপথেই থামিয়ে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল ও। লোকগুলোর মধ্যে অতি সক্রিয় একজন একটা মোটাসোটা ছেলের টেবিলের সামনে ঝট করে দাঁড়িয়ে পড়ল। ছেলেটা তখন সবে তরকারি মাখা ভাতটা খাবে বলে মুখে তুলতে যাচ্ছে। লোকটা একটা চেয়ার টেনে নিয়ে সোজা টেবিলের উপর আছাড় মারল। ছেলেটার মাথাটা ফেটে রক্তের ধারা ওর নাক মুখের উপর দিয়ে গড়িয়ে পড়ছিল। ইউন-সুক এর হাত থেকে চামচটা পড়ে গেছিল। কিছু না ভেবেই ওটা কুড়াতে নীচু হল সে, আর তখনই সেই ফ্লায়ারটা মাটিতে পড়ে থাকতে দেখল। মোটা মোটা অক্ষরে “কসাই চান ডু হুয়ান নিপাত যাক” কথাগুলো ওর চোখের উপর ভেসে উঠল। ঠিক তখনই কেউ খুব শক্ত করে ওর চুলটা টেনে ধরল পিছন থেকে। ওর হাত থেকে ওই কাগজের টুকরোটা টেনে ছিঁড়ে ফেলে ওকে চেয়ার থেকে টেনে নিয়ে গেল লোকটা।
“কসাই চান ডু হুয়াং নিপাত যাক”
এখন এই প্লাস্টার করা দেওয়ালের উপর সাঁটানো রাষ্ট্রপতির ছবিটা দেখতে দেখতে শব্দগুলো ওর বুকের ভিতর যেন বিঁধছিল। মানুষের মুখ কিভাবে আসল সত্যিটাকে দিব্যি আড়াল করে রাখতে পারে, সে কিছুটা অবাক হয়েই ভাবল। এই মুখটায় তো সেই নৃশংসতা, খুনী মানসিকতা, বদমাইশির কোনো চিহ্নই নেই? জানলার নীচে একটা টুলের উপর কোনমতে বসে একটা পেরেকের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে সে। এই ঘরটায় বেশ গরম, কিন্তু তার স্কার্ফটা খোলার উপায় নেই; এই গরমে তার গালটা আরও লাল হয়ে দাগগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠছে ক্রমশঃ।
কাউন্টারের পিছনে বসা লোকটি প্রতিরক্ষা নিরাপত্তা কমান্ডের ইউনিফর্ম পরা। সে তার প্রকাশকের নাম ধরে ডাকতে ইউন-সুক কাউন্টারে গিয়ে বইটার প্রুফটা সেখানে জমা করে দেয়। তারপর দুই সপ্তাহ আগে পরীক্ষা করতে দেওয়া বইটার পাণ্ডুলিপিটা ফেরত চায়।
“আপনি একটু অপেক্ষা করুন”
খুনীটার বাঁধানো ছবিটার নীচে একটা আবছা কাচের দরজা। ও জানে, ওই দরজার পিছনে সেন্সরেরা তাদে কাজে ব্যস্ত। ভিতরের দৃশ্যটা কল্পনা করার চেষ্টা করে ও – গম্ভীর মুখে সামরিক পোশাক পরা কয়েকটা মধ্যবয়স্ক লোক টেবিলে ডাঁই হয়ে থাকা বইগুলো পড়ে চলেছে। কাউন্টারে বসা লোকটা দ্রুত আর অভ্যস্ত ভঙ্গীতে দরজাটা ঠিক ততটাই খোলে যতটা হলে সে তার শরীরটা কোনোমতে ওখানে গলিয়ে দিতে পারে।
বড়জোর মিনিট তিনেক, তারপরেই আবার নিজের জায়গায় ফিরে আসে লোকটা।
“এখানে সই করুন”, কাউন্টারের ভিতর থেকে জাবদা খাতাটা তা দিকে ঠেলে দেয় লোকটা। এক ঝলক দেখেই ইউন-সুক বোঝে, ও যে প্রুফটা এক্ষুণি কাউন্টারে রাখল, সেটার কিছু অদ্ভুত ব্যাপার আছে। ওকে ইতস্তত করতে দেখে লোকটা আবার বলে, “সইটা করুন”।
নিজের নামটা সই করার পর ওর হাতে আগের পাণ্ডুলিপিটা দিয়ে দেয় লোকটা।
আর কথা বাড়ানোর কোনো অর্থ নেই। সেন্সরেরা তাদের কাজ করে দিয়েছে, তার ফলাফল এখন ইউন-সুকের হাতে।
দ্বিধাগ্রস্ত ধীর পায়ে কাউন্টার ছেড়ে বেরিয়ে আসে ও। কয়েকটা বেঞ্চ পাতা রয়েছে একধারে, তার একটার উপর বসে পাণ্ডুলিপিটার পাতা উল্টাতে থাকে ও। প্রায় এক মাস ধরে এটাকে টাইপ করার পর মূল লেখাটার সাথে মেলানো, তারপরে আবার প্রুফ চেকিং, এসবের কারণে এটার প্রতিটা লাইন ওর মনে গেঁথে আছে ইতিমধ্যেই। চূড়ান্ত প্রকাশের আগে আর একটাই কাজ বাকি এখন – শুধু এটাকে ঠিকঠাক ছাপানোটুকু।
প্রথম দেখাতেই ওর মনে হল, কাগজগুলো পোড়া। ওটা কি ওরা আগুনে ফেলে কালো করে ছাই বানিয়ে ফেলেছে নাকি?
যবে থেকে প্রকাশকের ওখানে কাজ করছে, সেন্সর অফিসে পাণ্ডুলিপি জমা দেওয়া আর নির্দিষ্ট দিনে এসে সেটা ফেরত নিয়ে যাওয়া প্রতি মাসে ওর রুটিন হয়ে গেছে। নিয়ে এসে ও একবার দেখে নেয় কোন লাইনগুলো বাদ গেল – সাধারণতঃ ইন থেকে চার লাইন ওরা পেন দিয়ে কেটে রাখে – যদিও কখনো কখনো দশ বারো লাইনও কাটা যায় – অফিসে ফিরে গজগজ করতে করতে সেই সব বাদছাদ দিয়ে চূড়ান্ত প্রুফ প্রিন্টারের কাছে পাঠিয়ে দেয় ও।
কিন্তু এবারে ব্যাপারটা সেরকম নয়। ভূমিকার দশ পাতার প্রায় আর্ধেক বাক্যই লাইন টেনে কাটা। তারপরের প্রথম তিরিশ পাতা অবধি এই কাটার পরিমাণ আরও অনেক বেশী – বেশীরভাগ বাক্যই কেটে দেওয়া হয়েছে। তারপর পঞ্চাশ পাতার একটু আগে থেকে বোধ হয় লাইন টানার খাটনিটা বেশীই হয়ে যাচ্ছিল, পুরো পাতা ধরে কালো রঙ করে দিয়েছে, সম্ভবত কালির রোলার ব্যবহার করেছে। সেই কালি শুষে নিয়ে পাতাগুলো ফুলে গিয়ে পুরো পাণ্ডুলিপিটাই সমুদ্র-সৈকতে ময়লার স্তুপে জল ঢুকে জমে গেলে যেমন লাগে, সেরকম দেখতে লাগছে।
একটা সত্যিকারের পোড়া কয়লার মত করেই ওটাকে এক হাতে ধরে, যেন এক্ষুনি হাত পুড়ে যাবে কিম্বা ওটা ঝুরঝুরে হয়ে ভেঙে পড়ে যাবে এরকমভাবে ওটাকে নিজের ব্যাগের মধ্যে কোনোমতে পুরে ফেলল ও। বাইরে থেকে নেহাতই কিছু কাগজের টুকরো মনে হলেও এটার ওজন আসলে অনেক বেশী। ওটা নিয়ে কিভাবে ও কেমন একটা ঘোরের মধ্যে বাইরে বেরিয়ে এল, করিডোরটা দিয়ে হেঁটে একজন সাদা পোশাকের প্রহরীর সামনে দিয়ে সদর দরজাটা পার করে, সেটা ওর খেয়ালই নেই।
এই নাটকের সঙ্কলনটা এখন আর প্রকাশ করার কোনো উপায়ই নেই। আগাগোড়া সবটুকু পরিশ্রমই জলে গেল।
ভূমিকার যে সামান্য কটা ইতঃস্তত ছড়িয়ে থাকা লাইনকে ওরা ছাড় দিয়েছে, সেগুলো মনে করার চেষ্টা করছিল ও।
আমাদের হাতে তোমাদের পরাজয়ের পর সর্বক্ষণের সন্ধ্যা নেমে এসেছে।
আমাদের রাস্তায় সন্ধ্যা, গৃহকোনে সন্ধ্যা।
এই আধো আলো, যা আর বেশী অন্ধকার হয় না, উজ্জ্বলও হয় না, এর মধ্যেই আমরা খাই দাই, হাঁটি-চলি, ঘুমাই।
কেটে দেওয়া লাইনগুলোর মধ্যে থেকে যে সব শব্দগুলো কিছুটা কিছুটা উদ্ধার করা যাচ্ছে, সেগুলোর কথাও মনে করছিল ও। তুমি। আমি। সেটা। হয়তো। একদম ঠিক। সবকিছু। তুমি। কেন। দেখো। তোমার চোখগুলো। কাছে এবং দূরে। সেটা। তীব্রভাবে। এখন। আরেকটু। অস্পষ্টভাবে। কেন করলে তুমি। মনে আছে? একটুখানি ফাঁক পেয়ে হাঁফ ছাড়তে ছাড়তে, হারিয়ে যাওয়া ভাষার মধ্যে ছোট ছোট দ্বীপের মতন অস্তিত্ব। ফোয়ারাটা থেকে জল বেরোচ্ছে কেমন করে? আমরা ঠিক কী উদযাপন করছি তাহলে?
তরোয়ালধারী জেনারেলের কালো ব্রোঞ্জের মুর্তিটাকে পিছনে রেখে একটুও না থেমে হাঁটা লাগালো সে। স্কার্ফের মধ্যে গরম নিশ্বাস, তার ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে পড়া লাল হয়ে থাকা গালের যন্ত্রণা উপেক্ষা করে সে হাঁটতে থাকে।