হান কাং এর হিউম্যান অ্যাক্টস- বাংলা তরজমা - ১৬

অদ্ভুতভাবে ওর সেই ক্লান্তি যেন আমাদের বাকি সকলের মধ্যেও ছড়িয়ে যাচ্ছিল তখন। এক এক করে সবাই কাছাকাছি কোনো দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে পড়ল – মাথাটা এলিয়ে দিয়ে। আমার অবস্থাও তাইই হল – আমিও ওই সোফাটায় জিন-সু র পাশে গুটিশুটি মেরে শুয়ে পড়লাম। এটার কোনো ব্যাখ্যা নেই আমার কাছে – ঠিক যখন নাকি আমাদের সকলের সবচেয়ে সতর্ক থাকার কথা, সেই সময়টাতেই আমরা সবাই ঢুলছিলাম – চোখ-কান বন্ধ রেখে ঝিমুনির কোলে নিজেদের সঁপে দিয়েছিলাম।

কোনোভাবে আমার অচেতনতার মধ্যেও আমি টের পেলাম ঘরের দরজাটা আস্তে আস্তে খুলে গেল। আমি ঘুমজড়ানো চোখেই দেখলাম একটা বাচ্চা ছেলে, সম্ভবতঃ মিডল স্কুলে পড়ে – আস্তে করে ঘরটার মধ্যে ঢুকে পড়ল। ছেলেটা চুপিসাড়ে সোফাটার কাছে এসে আস্তে করে বসে পড়ল।

“তুই কে রে?” ঘুম জড়ানো ঘর্ঘরে গলায় আমি জানতে চাইলাম। “তুই কে, কোথা থেকে এলি?” ছেলেটা ইতিমধ্যেই নিজের চোখগুলো বুজে ফেলেছিল, সেগুলো না খুলেই ও উত্তর দিল –

“আমি ভীষণ ক্লান্ত, আমি এখানে এই জিন-সু র পাশে দুয়েক মিনিট শুধু একটু ঘুমিয়ে নেব।“

জিন-সু এতক্ষণ মড়ার মত ঘুমাচ্ছিল, কিন্তু ছেলেটার গলা পেয়েই চমকে জেগে উঠল যেন।

“ডং হো?” অর্ধস্ফুট জড়ানো গলায় ছেলেটার হাত ধরে ও বলে উঠল। “তোকে বাড়ি যেতে বললাম না আমি? তুই কথা দিলি যে তুই চলে যাবি?” ওর গলার স্বর ক্রমশঃ চড়ছিল, “এখানে কী করতে এসেছিস তুই? তুই কি রাইফেল চালাতে জানিস?”

“রাগ কোরো না জিন-সু” ছেলেটা বলে ওঠে। ওদের গলার স্বরে ঘরের অন্য কয়েকজন জেগে উঠে খসখস শব্দ করে আবার তাদের জায়গায় দাঁড়িয়ে যায়।

“প্রথম সুযোগেই আত্মসমর্পন করবি তুই” জিন-সু জোর করে। তখনো সে ছেলেটার হাতটা ছাড়েনি। “আত্মসমর্পন, মাথায় ঢুকল? দুই হাত মাথার উপর তুলে বাইরে বেরোবি। হাত তুলে একটা বাচ্চা ছেলে বেরোলে তাকে ওরা মোটেই গুলি করবে না।“

সেই ১৯৮০ সালে আমার তখন বাইশ বছর বয়স, সেনাবাহিনীতে বাধ্যতামূলক কাজ শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরেছি ততদিনে। আমার পরিকল্পনা ছিল, স্নাতক হবার পরে আমি কোনো প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা করব। আমি ওদের মধ্যে বয়সে সবচেয়ে বড় আর মাথাটা ঠান্ডা, সম্ভবতঃ সেই কারণেই ওরা আমাকে ওদের নেতা বেছেছিল সেইদিন। বাকি সেদিন ওই আঞ্চলিক অফিসে যারা ছিল তাদের যুদ্ধ টুদ্ধের কোনো অভিজ্ঞতাই ছিল না – সামরিক শৃঙ্খলা নিয়েও কোনো ধারণা ছিল না। ওরা আদৌ কোনো সংগঠিত জঙ্গীদল ছিল না – একটা ভীড় বলা যেতে পারে বড়জোর।

ওদের মধ্যে অধিকাংশই তখনো আঠেরো উনিশের গণ্ডী টপকায়নি। একটা ছেলে তো তখনও দিনের কাজের শেষে সান্ধ্য ক্লাসে যেত পড়াশোনা করতে। ও বিশ্বাসই করত না যে ওর বন্দুকটায় গুলি ভরে ট্রিগার টিপলে সত্যি সত্যিই গুলি বেরোয়। সেটা পরীক্ষা করে দেখার জন্য ও বাইরে খোলা আকাশে একটা গুলি চালিয়ে দেখেছিল। এরকম যারা তখনো স্কুলছাত্র, তাদেরই বুঝিয়ে শুনিয়ে বাড়ি পাঠানো হয়েছিল শেষ অবধি। ছেলেগুলো খুবই গোঁয়ার ছিল সব – বহু কষ্টে বুঝিয়ে শুনিয়ে ওদের রাজি করানো গেছিল শেষ পর্যন্ত।

জঙ্গীদলের অধিনায়ক বারবার জোর দিচ্ছিলেন আমি যেন ওঁর সাথে “কৌশল” নিয়ে আলোচনায় বসি। কিন্তু সে পরিকল্পনা আদতে এতটাই অস্পষ্ট যে তাকে আদৌ কৌশল বলা যায় কি না সন্দেহ। মোটামুটি দুটো নাগাদ সেনাবাহিনী শহরে ঢুকতে পারে আন্দাজ করে ঠিক করা হল রাত দেড়টা থেকে আমরা বারান্দাটা পাহারা দেওয়া শুরু করব। প্রতিটা জানলায় একজন প্রাপ্তবয়স্ক যোদ্ধাকে পাহারায় রাখা হল আর অল্পবয়সীরা পেটের উপর ভর দিয়ে শুয়ে তৈরি থাকল, তার পাশের লোকটা গুলি খেলে সে যেন তার জায়গাটা নিতে পারে। আমাদের অন্য দলগুলোর কার কী পরিকল্পনা, এই কৌশলে আদৌ সফল হবার কোনো সম্ভাবনা আছে কি না, এসব কিছুই আমার জানার কোনো উপায় ছিল না। অধিনায়ক বারবার একটা ব্যাপারেই জোর দিচ্ছিলেন, আমাদের লক্ষ্য হল যে কোনোভাবে ভোর হওয়া অবধি প্রতিরোধটা চালিয়ে যাওয়া। ভোর হলেই লক্ষ লক্ষ গুয়াংজুবাসী রাস্তায় বেরিয়ে এসে ফোয়ারাটার সামনে জড়ো হবেন।

এখন খুবই বোকাবোকা মনে হয়, কিন্তু সে সময়ে আমরা এসব কথা একরকম বিশ্বাসই করে নিয়েছিলাম বলা যায়। হ্যাঁ, আমরা মরে যেতে পারি, এরকম সম্ভাবনার কথাও আমাদের জানা ছিল, কিন্তু আমরা ভেবেছিলাম, তাতে সমস্যা নেই। পরাজয়ের আশঙ্কা তো ছিলই, কিন্তু তখনও মনে হচ্ছিল, কোনো না কোনোভাবে ঠিক পার পেয়ে যাব শেষ পর্যন্ত। শুধু আমি বলে না, আমাদের প্রায় সকলেই, বিশেষ করে অল্পবয়সীরা সবাই আশায় বুক বেঁধেই ভয়কে জয় করছিল সেদিন। আমরা জানতেও পারিনি তখন যে আগেরদিনই আমাদের জঙ্গীদলের এক মুখপাত্র বিদেশী সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে আমাদের পরাজয় নিশ্চিত। উনি বলেছিলেন, আমরা সবাই জানতাম যে আমরা মরতে চলেছি, কিন্তু আমরা মৃত্যুকে ভয় পাইনি। কী মহৎ প্রতিজ্ঞা, সব ভয়কে জয় করার। কিন্তু আসল কথাটা হল, আমার নিজের অন্ততঃ এরকম কিছুই মনে হচ্ছিল না।

কিম জিন-সুর কথা যদি বলেন, ও কী ভাবছিল তা বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। মেয়েদের নিরাপদ আশ্রয়ে পাঠিয়ে দিয়ে ও যখন আবার ফিরে এল, ও কি নিজের মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও ফিরে এসেছিল নাকি আমার মত ও ও ভেবেছিল, মৃত্যু একদম অবশ্যম্ভাবী না-ও হতে পারে – হয়তো আমরা কোনমতে রাতটা ঠেকিয়ে রাখতে পারব ওদের। আর পারলে, বাকি জীবনটা মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারব।

সেনাবাহিনী আমাদের থেকে সংখ্যায় অনেক বেশী, সেটা আমরা জানতাম না এমনটা নয়। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপারটা হল, তাতে আমার কিছু যায় আসেনি। যবে থেকে বিদ্রোহ শুরু হয়েছে, আমার ভিতর থেকে যেন কিছু একটা জেগে উঠছে বলে মনে হয়েছে আমার – যে কোনো সেনাবাহিনীর থেকেও শক্তিশালী কিছু।

বিবেক।

এই দুনিয়ার সবচেয়ে ভয়াবহ বস্তু।

যেদিন আমার লক্ষ লক্ষ সহনাগরিকের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আমি সেনাদের বন্দুকের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম, যেদিন ওরা প্রথম দুটো খুন করার পর তাদের দেহগুলো একটা হাতে টানা গাড়িতে ফেলে আমাদের সামনে ঠেলে এনে রেখেছিল, সেদিন থেকে আমি চমকে গিয়ে আবিস্কার করলাম, আমার মধ্যে কিছু একটা যেন অনুপস্থিত। ভয়। স্পষ্ট মনে আছে, তখন মনে হচ্ছিল, মরে যাওয়াটাই সঠিক কাজ এখন। অনুভব করেছিলাম, লক্ষ লক্ষ হৃদয় একই ধ্বনিতে স্পন্দিত হচ্ছে, আমাদের সকলের শরীরের সব রক্ত একটাই মহাধমনীর মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে যেন – পবিত্র, তাজা রক্ত। সেই এক হৃদয়ের পবিত্র বিশালতা আমাদের প্রত্যেকের শিরায়-উপশিরায় ছড়িয়ে দিচ্ছে সেই রক্তের ধারা। আমি নিজেকে সেই বিশালতার অংশ বলেই ভেবে নিয়েছিলাম সেদিন।

দুপুর একটা নাগাদ যখন আঞ্চলিক অফিসের সামনের স্পীকারটায় জাতীয় সঙ্গীত বাজছিল, সেই সময়ে সেনাবাহিনী গুলি চালাতে শুরু করল। আমি বিপ্লবী দলটার মাঝামাঝি ছিলাম, গুলি চলতে শুরু করলে আমি একপাশে দৌড়ে পালাতে শুরু করলাম। সেই বিশাল পবিত্র হৃদয়, সেই এক ধমনী, এক রক্ত টক্ত সব ভাবনা কোথায় ছিন্নভিন্ন হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ল। শুধু যে ওই ফোয়ারা চত্বরেই গুলি চলছিল, তা-ই নয়। লক্ষ্যভেদী সৈনিকেরা অনেকে চারপাশের বিভিন্ন বাড়ির ছাদ থেকেও আমাদের লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়ছিল। আমার সামনে, পিছনে, চতুর্দিকে দলে দলে লোক গুলি খেয়ে লুটিয়ে পড়ছিল, কিন্তু আমি থামলাম না। চত্বরটা ছেড়ে অনেকটা দূর চলে আসার পর আমি কোনোমতে হাঁফাতে হাঁফাতে থেমেছিলাম। এতটাই হাঁফিয়ে গেছিলাম, সত্যি সত্যিই মনে হচ্ছিল এবার আমার ফুসফুসটা ফেটে যাবে যেন। কান্না আর ঘামে আমার সারা মুখ তখন ভেসে যাচ্ছে। কোনোমতে একটা বন্ধ দোকানের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লাম আমি। রাস্তায় আরও একটা ছোট দল জমায়েত হয়েছিল তখন, ওরা থানা আর ছাউনিগুলো থেকে বন্দুক জোগাড় করার কথা বলাবলি করছিল শুনতে পেলাম। সন্দেহ নেই, আমার থেকে ওরা অনেক বেশী শক্ত মনের লোক ছিল। ওরা বলাবলি করছিল, আমরা এভাবে ইঁদুরের মত গর্তে ঢুকে বসে আছি। ওরা আমাদের সবাইকে গুলি করে মারবে – সব্বাইকে। আমাদের পাড়ায় এর মধ্যেই ছত্রীসেনা নেমে বাড়ি বাড়ি ঢুকে তল্লাশি করেছে। আমি এত ভয় পেয়েছিলাম যে রান্নাঘরের ছুরিটা রাতে বালিশের পাশে রেখে শুয়েছিলাম। এভাবে প্রকাশ্য দিবালোকে শ’য়ে শ’য়ে রাউন্ড গুলি চালাচ্ছে সাধারণ নাগরিকদের উপর? দুনিয়াটা কি রসাতলে চলে গেছে?