হান কাং এর হিউম্যান অ্যাক্টস- বাংলা তরজমা - ১৫
- 07 September, 2026
- লেখক: রৌহিন
একটা ব্যাপার আমি আজও ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি।
আমি যদি কিম জুন-সু র জুড়িই হয়ে থাকি, তবে তো আমরা দুজনেই প্রতিদিন একই খাবার ভাগ করে খেয়েছি। তাহলে ও মরে গেল, আর আমি বেঁচে আছি কিভাবে এখনও?
ও কী তাহলে আমার থেকে বেশী অত্যাচার সহ্য করেছে?
না, তা হতে পারে না। আমি যা সহ্য করেছি, সেটা সাধারণভাবে সহ্যের সীমার অনেক বেশী।
তাহলে কি ও আমার থেকে কম ঘুমাতে পেরেছিল?
কিন্তু তাই বা কেমন করে হবে? ওর মতই আমরা কেউই আদৌ ঘুমাতে পারতাম না তখন। এমনকি এখনও প্রতি রাতে আমি যে কয়েকটা ঘন্টা যে একটু শুই, সেটাকে এমনকি হালকা বিশ্রামও বলা যায় কি না সন্দেহ। এ জীবনে আর এর অন্যথা হবার আশা নেই।
প্রোফেসর, আপনি যখন আমাকে কিম জুন-সু এর ব্যাপারে কথা বলতে ডাকলেন, আমি বেশ অবাকই হয়েছিলাম। এমনকি এই যে এখন আমি আপনার সাথে দেখা করছি, আপনি আবার আমাকে ডেকেছেন, আমার বিস্ময় কিন্তু এখনো কমেনি। প্রতিদিন, প্রতি পলে এই প্রশ্নটাই আমাকে এখনো কুরে কুরে খায় – আমি বেঁচে রইলাম অথচ কিম মরে গেল, কেন?
আপনার মনে আছে প্রোফেসর, প্রথমদিন আপনি আমাকে বলেছিলেন, “কিম জুন-সু র মৃত্যুটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়”? অর্থাৎ আপনার মতে আমাদের মত প্রাক্তন বন্দীদের অনেকেই শেষ অবধি আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে।
আপনি সম্ভবতঃ ভাবছেন যে আপনি আমাকে সাহায্য করছেন – যাতে আমিও ওই একই দুঃখজনক পথ বেছে না নিই? হ্যাঁ, আপনার মনে এরকম কোনো মহান ভাবনাই কাজ করছে, সেটা আমি ভালোই বুঝতে পারছি। কিন্তু সত্যি বলতে কি, ভেবে দেখুন তো, এই যে প্রবন্ধটা আপনি লিখতে যাচ্ছেন, তাতে আপনার নিজের ছাড়া আর কারুর বিন্দুমাত্র উপকার হবে কি?
আপনি বলছেন আপনি জিন-সুর “মনের ময়নাতদন্ত” করতে চান, কিন্তু সেটা কিভাবে হবে, তা এখনো আমার মাথায় ঢোকেনি। আপনি আমার কথা শুনতে চাইছেন – কিন্তু কেন? তাতে কি জিন-সু আবার জীবন ফিরে পাবে? আমাদের দুজনের অভিজ্ঞতা হয়তো একই ধরণের ছিল, কিন্তু একই রকমের ছিল না কোনোমতেই। এই ময়নাতদন্তে লাভটা কী হবে? ওর নিজের মনের মধ্যে কী চলছিল, এতগুলো বছর কোন সব ভাবনা ও বন্দী করে রেখেছিল সেই খাঁচায়, তা আমরা বাইরে থেকে বুঝতে পারব, এমন আশা করাটাই তো হাস্যকর।
হ্যাঁ একথা সত্যি যে জিন-সু এমনকি আমাদের তুলনাতেও অস্বাভাবিক, অমানুষিক অত্যাচার সহ্য করেছে। তার কারণ সম্ভবতঃ ওর আশ্চর্যজনক কোমল, প্রায় মেয়েলি ভঙ্গিমা, যা হয়তো রক্ষীদের অন্যভাবে উত্তেজিত করে তুলত ওর প্রতি।
কিন্তু এসব কথা আমি শুনেছি ঘটনার প্রায় বছর দশেক পরে। সে সময়ে এসব ব্যাপারে আমার কোনো ধারণাই ছিল না।
শুনেছি সেনারা ওকে একটা টেবিলের উপর ওর পুরুষাঙ্গটা রেখে বসিয়ে একটা কাঠের স্কেল দিয়ে সেটায় বাড়ি মারত আর হুমকি দিত। তারপর ওকে নগ্ন করে রক্ষীছাউনির সামনের উঠোনে পিছমোড়া করে হাত পা বেঁধে ঘাসের মধ্যে উপুড় করে শুইয়ে রাখত। ওর যৌনাঙ্গে পিঁপড়ে আর পোকামাকড় কামড়াত সারাক্ষণ। এরকম একেকবারে প্রায় ঘন্টা তিনেক চলত।
শুনেছি মুক্তি পাবার পরেও ও প্রায় প্রতি রাতে পোকামাকড়ের দুঃস্বপ্ন দেখে উঠে বসত।
এসবের আগে ও কেমন লোক ছিল, সে ব্যাপারে আমি আপনাকে বিশেষ সাহায্য করতে পারব না। আগে একবারই দূর থেকে ওকে দেখেছিলাম, আঞ্চলিক অফিসের বারান্দাটা দিয়ে হেঁটে যেতে।
সেটা ছিল ১৯৮০, ও তখন সবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তী হয়েছে। ঠোঁটের উপর হালকা গোঁফের রেখা দেখা যায়। ওর বড় বড় চোখের পাতাগুলো ওর ফ্যাকাশে চামড়ার উপর স্পষ্ট ফুটে উঠত। যখনই দেখতাম, মনে হত ওর যেন খুব তাড়া – রোগা হাতদুটো দুপাশে দুলাতে দুলাতে হন্তদন্ত হয়ে কোথাও চলেছে যেন।
কিসে ও এত ব্যস্ত থাকত সর্বক্ষণ সেটা অবশ্য আমি জানি; আহতদের সেবা, লাশগুলো ঠিকভাবে রাখার ব্যবস্থা করা, কফিন, পতাকা জোগাড় করা, অন্ত্যেষ্টির ব্যবস্থা করা… এরকম নানা ধরণের সব কাজ।
সেই রাতটায় ও যে ওখানে থেকে যাবে, সেটা আমি ভাবতে পারিনি, জানেন? পোড় খাওয়া কর্মীরাই শুধু থেকে গেছিল সেদিন। আর সমস্ত ছাত্রদেরই প্রায় সেনাবাহিনী আবার শহরে ঢোকার আগেই আঞ্চলিক অফিস ফাঁকা করে চলে যেতে বলা হয়েছিল, যাতে আর কোনো প্রাণহানি না হয় অকারণে। তারা তাদের বন্দুক ওখানেই রেখে যে যার ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়েছিল রাতটার মত; ভেবেছিলাম জিন-সু ও ওদের সাথেই চলে গেছে। পরে যখন ওকে দেখি, তখনও আমি ঠিক নিশ্চিত হতে পারিনি। ও মাঝরাতের আগেই ওদের দল থেকে সরে পড়ে আবার ওখানে ফিরে গিয়ে থাকলে আমি অবাক হব না।
আমাদের বারোজনের যে দলটা তৈরি হল, তাতে জিন-সু ও ছিল। আমরা ছোট কনফারেন্স রুমটায় মিলিত হয়ে নিজেদের মধ্যে আলাপ পরিচয় পর্বটা সেরে নিলাম – যদিও সে পরিচয় এক রাতের বেশী টিকবে বলে কেউই ভরসা করেছিল বলে মনে হয় না। আমরা প্রত্যেকেই একটা করে তড়িঘড়ি করে লেখা সংক্ষিপ্ত উইল তৈরি করলাম, আমাদের নাম ও ঠিকানা লিখে নিলাম এবং সেগুলো আমাদের শার্টের পকেটে ঢুকিয়ে রাখলাম, যাতে আমাদের সহজেই শনাক্ত করা যায়। কিন্তু এই যে আমরা পরিস্থিতির মোকাবিলার এত সব পরিকল্পনা করছিলাম, সে পরিস্থিতি আমাদের প্রায় ঘাড়ের উপর নাচার সময়েও অদ্ভুতভাবে আমাদের কারুরই সেটা ঠিক বাস্তবে ঘটছে বলে মনেই হচ্ছিল না। অন্ততঃ যতক্ষণ না রেডিওতে শুনতে পেলাম যে সেনাবাহিনী সত্যিই আবার শহরে ঢুকে পড়েছে। তখন আমরা সবাই উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠলাম।
মাঝরাতের একটু পরে আমাদের জঙ্গী বাহিনীর প্রধান জিন-সু কে বাইরের করিডোরে ডেকে পাঠিয়ে হুকুম করলেন, মেয়েদেরকে বাড়িটার বাইরে পৌঁছে দেবার জন্য। ও এত জোরে চেঁচাচ্ছিল যে আমরা কনফারেন্স রুমের ভিতরে বসেও প্রতিটা কথা শুনতে পাচ্ছিলাম। সর্দার মেয়েদের নিরাপদে বাড়ি পাঠানোর কাজটার জন্য জিন সু কেই বেছে নিয়েছিল, কারণ সে সম্ভবতঃ মনে করেছিল ওই প্যাংলা চেহারার একজনের থাকা বা না থাকা দিয়ে আসল যুদ্ধে আমাদের ভাগ্যে ইতর বিশেষ কিছু ঘটার সম্ভাবনা নেই। আমার মনে আছে জিন সু তারপরে ওর পাতলা ঠোঁটদুটো চেপে প্রায় সোজা করে, কাঁধে বন্দুকটা ঝুলিয়ে গটগট করে বেরিয়ে গেল। একদম ঠিক কাজ, আমি মনে মনে ভাবছিলাম, তোর জায়গায় আমি হলে এক্ষুণি ছুটে গিয়ে কোনো নিরাপদ গর্তে ঢুকতাম, এখানে ফেরার জন্য বিন্দুমাত্র তাড়াহুড়ো না দেখিয়ে।
সেজন্যই কিছুক্ষণ পরে ওকে ফিরে আসতে দেখে আমি বেশ অবাকই হয়েছিলাম। মিনিট কুড়ি আগে এখান থেকে যাবার সময় ওর চোখেমুখে যে উৎকণ্ঠার ভাব ছিল, তখন তার লেশমাত্র নেই। কিন্তু তখন ও আর নিজের চোখদুটো খুলে রাখতেও পারছিল না। ফিরে এসেই ও সোজা জানলার কাছে গিয়ে চামড়া ঢাকা সোফাটায় গিয়ে গুটিশুটি মেরে শুয়ে পড়ল আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়েও পড়ল। ওর কাছে গিয়ে আমি যখন ওকে ঝাঁকুনি দিলাম, ও চোখ না খুলেই বিড়বিড় করে ও কত দুঃখিত তা জানাল, তারপর আবার ঘুমিয়ে পড়ল। প্রচণ্ড ক্লান্ত দেখাচ্ছিল ওকে।