হান কাং এর হিউম্যান অ্যাক্টস- বাংলা তরজমা - ১৪

বন্দীঃ ১৯৯০

একটা খুব সাধারণ বাইরো কলম – কালো, মোনামি। আমার আঙুল দুটো ফাঁক করে কলমটা ওরা চেপে ধরত দুই আঙুলের মাঝে – যতটা জোরে সম্ভব।

তবে বাঁ হাত সেটা, বলাই বাহুল্য। কারণ রিপোর্ট লেখার জন্য আমার ডান হাতটা ওদের প্রয়োজন ছিল।

প্রথম দিকে তাও কোনমতে সহ্য করে নেওয়া যেত। কিন্তু প্রতিদিন একই জায়গায় পেনটার চাপা আর ঘষায় ওই জায়গার চামড়াটা নরম হয়ে যাচ্ছিল – ক্ষতস্থানটা থেকে সারাক্ষণ রক্ত আর পুঁজ গড়ানো শুরু করেছিল। কদিনের মধ্যেই চামড়া – মাংসের স্তর ভেদ করে সাদা হাড়ের অংশ দিব্যি খালি চোখেই দেখা যেত। সবসময়ে না – কিন্তু ওরা যখন অ্যালকোহলে ভেজানো তুলোর টুকরোটা ওই ক্ষতস্থানটায় লাগাতে দিত, তখনই হাড়টা স্পষ্ট হয়ে দেখা যেত।

ওই সেলে আমার মত আরও প্রায় নব্বইজন কয়েদি ছিল। তাদের মধ্যে আর্ধেকেরও বেশী লোকের হাতের আঙুলেই ওই অ্যালকোহল ভেজানো তুলোর টুকরো গোঁজা থাকত প্রায় সবসময়েই। আমাদের একে অন্যের সাথে কথা বলার অনুমতি ছিল না। কিন্তু আমরা শুধু এক ঝলক একে অন্যের আঙুলের দিকে তাকালেই বুঝতে পারতাম ওই তুলোর টুকরোটা আছে কি না – সেটুকুই যথেষ্ট ছিল, যা বোঝার বুঝে নেবার জন্য।

আমি ভেবেছিলাম এরকম অবস্থা হয়ে যাবার পর অন্ততঃ ওরা ওই ক্ষতটা সেরে ওঠার সময়টুকু দেবে – কিন্তু ওদের তেমন কোনো পরিকল্পনা আদৌ ছিল না। অতএব ওই তুলোর টুকরোটা সরিয়ে নেবার পর থেঁতলানো মাংসগুলোকে আরও থেঁতলে যেতে দেখার সাথে সাথে যন্ত্রণার আরও একটা নতুন রূপ আবিষ্কার করে ফেলেছিলাম আমি।

সব মিলিয়ে মোট পাঁচটা সেল – একটা গোল চত্বরকে কেন্দ্র করে পাখার ব্লেডের মতন ছড়ানো। গরাদের ওপারটা ঠিক মাঝখানে – সেখানে বন্দুকধারী সৈন্যরা একসাথে পাঁচটা সেলের উপরেই নজরদারী চালাতে পারে। প্রথম যেদিন ওরা আমাদের ঠেলে এখানে ঢুকিয়ে পিছন থেকে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল, আমরা কেউই সাহস করে জানতে চাইতে পারিনি যে আমাদের কোথায় আনা হল। এমনকি হাইস্কুলের বাচ্চাগুলোও বুঝেছিল যে মুখ বন্ধ রাখাই ভালো এখানে। আমরা চুপচাপই ছিলাম, কেউ কারুর দিকে তাকাচ্ছিলাম না। সেদিন সকালে যে অভিজ্ঞতা আমাদের হয়েছিল, তা হজম করর জন্য আমাদের সকলেরই কিছুটা সময় দরকার ছিল। হতাশায় ডুবে থেকেও সেই এক ঘন্টার নৈঃশব্দই মানুষ হিসাবে আমাদের শেষ আশীর্বাদ ছিল যেন।

প্রতিদিন, প্রতিবার যখন আমাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যাওয়া হত, টেবিলের উপর সেই কালো মোনামি বাইরো কলমটা শোয়ানো থাকত। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একই ঘটনাক্রম, একই ধারায় চলতে থাকত, সবটাই যেন হাতুড়ির বাড়ি মেরে মেরে একটাই কথা আমার মাথায় ঢোকানোর চেষ্টা করত – আমার শরীরটা আর আমার নিজের নয়। আমার জীবনের সব অধিকারই কেড়ে নেওয়া হয়েছে এবং আমার শুধু একটা ব্যাপারেই অনুমতি আছে – যন্ত্রণা সহ্য করা। সে যন্ত্রণা এতইটাই ভয়ঙ্কর যে আমার মাঝে মাঝেই মনে হত আমি নিজের উপর সব নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছি। সত্যি সত্যিই কখনো কখনো আমি যন্ত্রণার চোটে পেচ্ছাপ বা পায়খানা করে ফেলতাম ওখানেই।

সবকিছু আবার একটু ঠিকঠাক হয়ে এলে শুরু হত প্রশ্নপর্ব। যে প্রশ্ন করত, তার কন্ঠস্বরে কোনোদিনও একটুও উত্তেজনা প্রকাশ পেত না – ঠান্ডা, ধীর স্বরে সে প্রশ্ন করত। কিন্তু উত্তরে আমি যা-ই বলি না কেন, ফলাফল একই হত সবসময়েই; আমার মুখের উপর রাইফেলের কুঁদোর ঘা। আমি প্রায় বাধ্য হয়েই দেওয়ালে সেঁটে গিয়ে হাত দিয়ে নিজের মুখ মাথা আড়াল করার চেষ্টা করতাম, তার ফলটা হত আরও খারাপ। আমি মাটিতে পড়ে যাবার পর ওরা আমার পিঠের উপর ওদের ফৌজি বুট পরা পা দিয়ে লাথি মারতে থাকত সমানে – তারপর যখন আমি প্রায় জ্ঞান হারানোর পর্য্যায়ে পৌঁছতাম, তখন ওরা আমাকে উল্টোদিকে ঘুরিয়ে আমার পায়ের সামনের হাড়ে লাথি মারত।

এতকিছুর পর ঐ ঘর ছেড়ে সেলে ফিরে যাবার হুকুম হলে হয়তো মনে হবে একটু বাঁচোয়া হল, এবার একটু ছাড় মিলবে হয়তো, কিন্তু না। সেটাও একটা মস্ত বড় ভুল ভাবনা।

সেলে গিয়ে আমাদের ঘন্টার পর ঘন্টা শিরদাঁড়া সোজা রেখে বসে থাকতে হত সামনের দিকে তাকিয়ে। চোখ ওই গরাদের দিকে সোজা রাখতে হবে, একটুও নড়বে না। একটু এদিক ওদিক চোখ সরাবার চেষ্টাও করলে ওপার থেকে সার্জেন্ট খেঁকিয়ে উঠবে। চোখ সরালে কী হতে পারে তা আমাদের সবাইকে বোঝানোর জন্য একবার একজন বয়স্ক কয়েদির চোখের মধ্যে সোজা জ্বলন্ত সিগারেট চেপে ধরেছিল একজন সৈন্য। একবার একটা হাইস্কুলের বাচ্চা অসাবধানে নিজের ঘাড় চুলকে ফেলেছিল বলে মারতে মারতে বাচ্চাটাকে আধমরা করে দিয়েছিল – ছেলেটা একটা ন্যাকড়ার পুতুলের মত অচৈতন্য হয়ে পড়েছিল।

আমাদের প্রায় ১০০ জনকে এমনভাবে বেঁধে সারি দিয়ে বসিয়ে রাখা হত যে আমার পিছনের জনের হাঁটু আমার পিঠে লেগে আছে, টের পেতাম। আমরা প্রায় আক্ষরিক অর্থেই বালতি বালতি ঘামতাম সেই ভ্যাপসা ঘরে – দেখে মনে হত আমরা প্রবল বৃষ্টিতে ভিজেছি সবাই। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যেত – কিন্তু দিনে তিনবার খাবারের সঙ্গে ছাড়া আমরা আর জল পেতাম না। সেই বন্য, ভয়ঙ্কর পিপাসার কথা আমার স্পষ্ট মনে আছে। যে কোনো তরল, এমন কি প্রস্রাবও যদি পেতাম তাহলে তার উপরে ঝাঁপিয়ে পড়তে বিন্দুমাত্র দ্বিধা হত না আমার সেই সময়ে। আর সর্বক্ষণ সেই আতঙ্ক তাড়া করত – ভুল করেও যদি ঘুমিয়ে পড়ি! নিজের চোখের মধ্যে একটা জ্বলন্ত সিগারেট চেপে বসার সেই ভয়াবহ আতঙ্ক, সেই মাংস পোড়া গন্ধ আজও আমার স্পষ্ট মনে আছে।

আর বলাই বাহুল্য, খিদে। সর্বক্ষণ যেন একটা রক্তচোষা বাদুড়ের মত ঘাড়ের কাছে ঝুলে থাকত সেই সর্বগ্রাসী খিদে। মাঝে মাঝে ঘোরের মধ্যে মনে হত যেন সেই বাদুড়টা আমার আত্মাটা শুষে শুষে খেয়ে নিচ্ছে আস্তে আস্তে।

দিনে তিনবার, প্রতিদিন ঠিক একই খাবার দেওয়া হত আমাদের; একমুঠি ভাত, আধবাটি স্যুপ, তাতে কয়েক কুচি কিমচি। এটা দুজনের জন্য। যেদিন আমার কিম জিন-সু র সাথে জোড় হত, সেদিনগুলো আমি একটু স্বস্তি পেতাম। আমার তখন কী অবস্থা ছিল সেটা বুঝতে এটুকুই যথেষ্ট। আমার ভিতরে যে মানুষটা ছিল, তাকে যে ধীরে ধীরে চুষে ছিবড়ে করে ফেলা হচ্ছিল, তার প্রমান। কিম জুন-সু কে দেখে মনে হত, ওর খাবার তেমন ইচ্ছে নেই – ফলে আমার ভাগে একটু বেশী পড়বে, সেজন্যই উৎফুল্ল হয়ে উঠতাম আমি। ওর প্রাণহীন চোখ, ফ্যাকাসে চেহারা, চোখের দুপাশের কালো ছোপ দেখে মনে হত ওর কোনো হাসপাতালে থাকার কথা এখন। ওর ভাগেরটা আমি পাব তাহলে।

গতমাসে ওর স্মৃতিফলকটা দেখে আমার ওই চোখগুলোর কথাই প্রথম মনে পড়েছিল। সেই চোখদুটো, যারা দেখত ওই স্যুপের সাগর থেকে একটা বীনের কুঁচি তুলে নিচ্ছে আমার আঙুলগুলো; আমার চোখের দিকে নীরবে তাকাত, যখন আমি ওর ঠোঁটের ফাঁকে কোনো একটা কঠিন খাবার চলে যেতে দেখলেও হিংস্র চোখে তাকাতাম, ভয় পেতাম, ও সবটাই খেয়ে নেবে নাকি? সেই দুটো শীতল, ভাষাহীন চোখ, মনুষ্যত্বের শেষ চিহ্নটুকুও যাতে আর অবশিষ্ট ছিল না, ঠিক আমারই মত।