হান কাং এর হিউম্যান অ্যাক্টস- বাংলা তরজমা - ১৩

তুষারকুচি

যবনিকা উঠে যাবার পর আলো জ্বলে উঠল ধীরে ধীরে। মঞ্চের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন দীর্ঘদেহী এক মধ্যবয়স্ক নারী, তিরিশের কোঠায় বয় তাঁর। পরণে ঘরে বানানো শোকের পোশাকের মতন একটা স্কার্ট। নিঃশব্দে ঘুরে তিনি মঞ্চের বাঁদিকে তাকালেন। সেই ইশারাতেই যেন পর্দার আড়াল থেকে দীর্ঘদেহী, একহারা চেহারার একটি যুবক বেরিয়ে এল। তার পিঠের উপর একটা পূর্ণদৈর্ঘ্য মানুষের কঙ্কাল। খালি পায়ে যুবকটি পা টিপে টিপে এগিয়ে এল, যেন ভয়ে পাচ্ছে, যখন তখন সে পা পিছলে পড়ে যাবে।

মহিলা ঘুরে গিয়ে মঞ্চে ডানদিকটায় তাকালেন। এবারে সেদিক থেকে যে যুবকটি বেরিয়ে এল সে খর্বদেহ, মোটাসোটা, কিন্তু আগের জনের মতই এই যুবকটিও কালো পোশাক পরে আছে, এর পিঠেও ঠিক একই রকমের একটা কঙ্কাল। পুরনো দিনের সিনেমার দৃশ্যের মত ঘষটাতে ঘষটাতে দুই যুবক মঞ্চের দুদিক থেকে পরস্পরের দিকে এগিয়ে আসতে থাকল, যেন প্রোজেক্টরটা কষ্ট করে ঠেলে ঠেলে চালানো হচ্ছে। একদম একই সাথে তারা মঞ্চের মাঝখানে এসে পৌঁছাল, কিন্তু থামল না কেউই। বরং তারা ঠিক আগের মতই চলতে লাগল মঞ্চের অন্য দিকটা লক্ষ্য করে – যেন একে অপরের অস্তিত্ব সম্বন্ধে তারা কিছুই জানে না।

পুরো হলটার একটা আসনও খালি নেই। প্রথম দুটো সারিতে বসে আছেন অভিনেতা আর সাংবাদিকেরা, যেহেতু আজ অভিনয়ের প্রথম রজনী। বসের সাথে ইউন-সুক যখন নিজের আসন খুঁজে বসছিল, দর্শকাসনে চারটে লোক তার নজর কাড়ল। লোকগুলো ভীড়ের মধ্যেই মিশে ছিল, কিন্তু এরা যে সাদা পোশাকের পুলিশ, তাতে তার কোনো সন্দেহই ছিল না। মিঃ সিও ঠিক কী করতে চলেছেন? সে ভাবে। এই লোকগুলো যখন শুনতে পাবে সেন্সরদের ওরকম করে কেটে দেওয়া কথাগুলোই অভিনেতাদের মুখ থেকে বেরিয়ে আসছে, ওরাই বা কী করবে? ওরা কি অভিনয়ের মধ্যেই লাফিয়ে মঞ্চে উঠে যাবে? বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যন্টিন - সেই উড়ে আসা চেয়ার – ছেলেটার কপাল ফেটে ফিনকি দিয়ে রক্ত – তার খাবারটা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। আলোকসম্পাত করছে যারা, বা অন্যান্য প্রযোজনা কর্মী – তাদের কী হবে? ওরা কি মিঃ সিওকে গ্রেপ্তার করবে? নাকি উনি কোনোমতে পালিয়ে গিয়ে বাকি জীবনটা পলাতক হয়েই কাটাবেন? যাঁকে তাঁর নিজের পরিবারের লোকও সহসা খুঁজে পাবে না?

মানুষদুটি যেন স্বপ্নের ঘোরের মধ্যে ঘষটে ঘষটে হাঁটতে হাঁটতে দুদিকের পর্দা দিয়ে বেরিয়ে যাবার পর মঞ্চের মধ্যের নারীটির ঠোঁট নড়ে উঠল – যেন কথা বলছেন। কিন্তু সে কথার কিছুই কেউ শুনতে পাচ্ছিল না – কারণ তাঁর ঠোঁটগুলিই শুধু নড়ছিল, কোনো শব্দ বের হচ্ছিল না। কিন্তু উনি কী বলছেন, তা ইউন-সুক জানে। পেন দিয়ে লেখা মিঃ সিও র পাণ্ডুলিপির লাইনগুলো তার স্পষ্ট মনে আছে। ঐ পাণ্ডুলিপি সে নিজের হাতে টাইপ করেছে, তিন তিন বার প্রুফ দেখেছে।

তোমার মৃত্যুর পরে আমি কোনো শেষকৃত্য করতে পারিনি

আমার নিজের জীবনটাই এখন একটা শেষকৃত্য হয়ে দাঁড়িয়েছে

মহিলা এবার দর্শকদের দিকে পেছন ফিরে দাঁড়ালেন। আলোর রেখাটা সোজা মঞ্চের বাইরে, দর্শকাসনের মধ্যের সরু পথটা বেয়ে নেমে এল – তারপর চলে গেল দর্শকাসনের একেবারে পিছনের সারিতে। সেখানে এখন একজন বলিষ্ঠ পুরুষ দাঁড়িয়ে। তাঁর পোশাক শতচ্ছিন্ন, হাঁফাতে হাঁফাতে তিনি ধীরে ধীরে মঞ্চের দিকে এগিয়ে আসছেন। একটু আগেই যে দুজন যুবক মঞ্চের উপর দিয়ে ঘষটাতে ঘষটাতে চলে গেল, তাদের মত এঁর মুখ ভাবলেশহীন নয়, বরং আবেগে মুখটা যেন ভেঙেচুরে যাচ্ছে। নিজের হাতদুটো মাথার উপরে তুলে ধরলেন তিনি – কী ধরতে চাইছেন তা বোঝা গেল না। ডাঙায় তোলা মাছের মতই তাঁরও ঠোঁটদুটো যেন খাবি খাচ্ছে। তাঁর মুখ দিয়ে যে তীব্র আওয়াজ বেরোচ্ছে, তাকে ঠিক “কথা” বলা চলে না – কিন্তু উনি কী বলছেন, সেটাও ইউন-সুক এর মুখস্থ।

আমি তোমার নাম ধরে ডাকছিফিরে এসো

দেরি নয় আর একটুও; এখনি ফিরে এসো তুমি

বিস্ময়ের প্রাথমিক ঘোরটা কেটে যাবার পরে দর্শকেরা এখন নিঃশব্দ – প্রাণপণে তাঁরা লোকটির ঠোঁট নাড়া দেখে বোঝার চেষ্টা করছেন, অভিনেতা কী বলতে চাইছেন। দর্শকাসনের মাঝের সরণির আলোটা এবারে ধীরে ধীরে নিভু-নিভু হয়ে আসছে। মঞ্চের উপরের মহিলাটি এবারে আবার দর্শকদের দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন। যথারীতি নীরবেই তিনি দর্শকাসনের মাঝখানে মৃত আত্মাদের আহ্বান জানাতে থাকা মানুষটিকে লক্ষ্য করতে লাগলেন।

তোমার মৃত্যুর পরে কোনো শেষ বিদায় জানাতে পারিনি আমি

তাই আমার যে দুটো চোখ তোমাকে দেখত, তারা শবাধার হয়ে গেছে

তোমার কথা শুনত যে কানদুটি, তারা শবাধার হয়ে গেছে

যে ফুসফুস তোমার ঘ্রাণ নিত, সে- শবাধার হয়ে গেছে আজ

মানুষটার দু-চোখ খোলা, তবু যেন এই বাহ্য পৃথিবীর কিছুই সে দেখছে না। শব্দহীন চিৎকার করতে করতে এগিয়ে আসছে সে। মঞ্চের উপরের নারীটির ঠোঁট একটু একটু কাঁপছে শুধু। মঞ্চের সামনেটায় এসে এক ধারের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে এল মানুষটা। তারপর তার উর্দ্ধোত্থিত হাতগুলো নামিয়ে মেয়েটির কাঁধদুটো একটু ঝেড়ে দিল – যেন তুষারকুচি পরিস্কার করছে।

বসন্তের ফুল আর উইলো, বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা,

তুষারের প্রতিটি কনা আজ শবাধার হয়ে গেছে

দিন জাগানো সকাল আর আঁধার ডেকে আনা সন্ধ্যা,

শবাধার হয়ে গেছে সকলেই

আলোটা আচমকাই আবার ঘুরে গিয়ে দর্শকাসনের উপর এসে পড়ে তাদের চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। হঠাৎই দর্শকাসনের একপাশে একটা অল্পবয়সী ছেলেকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ইউন-সুক। পরণে সাদা ট্র্যাক স্যুট, ধুসর রঙের ট্রেনার, বুকের কাছে আঁকড়ে ধরা একটা ছোট্ট কঙ্কাল। ছেলেটা কঙ্কালটাকে এমনভাবে আঁকড়ে ধরে আছে, যেন ওর খুব শীত করছে। ছেলেটা এবারে মঞ্চের দিকে হাঁটতে শুরু করতেই তার পিছন পিছন আরও একদল অভিনেতা অভিনেত্রী দর্শকাসনের পিছনের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এসে তার আশেপাশে হাঁটতে শুরু করল। এদের শরীরগুলো কোমর থেকে প্রায় সমকোনে বাঁকানো, হাতগুলো সামনে ঝুলছে, যেন চতুষ্পদ জন্তু। মাথার কালো চুল দিয়ে মুখ ঢাকা, এই প্রায় ডজনখানের নারী-পুরুষ যখন দর্শকাসনের মধ্যে দিয়ে মঞ্চের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, তাদের দেখে একটা প্রায় অপার্থিব, প্রচণ্ড অস্বস্তিকর অনুভূতি দর্শকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছিল। তারা কেউ বিড়বিড় করছে, কেউ চিৎকার কুরছে, কেউ বা গোঙাচ্ছে, মাঝে মাঝে মাথাটা উঁচু করে তুলছে – তখন তাদের ঠোঁটগুলো দেখা যাচ্ছে – সেগুলো অনবরত নড়ে আর কেঁপে চলেছে। যতবার এই আওয়াজগুলো বেশ বেড়ে যাচ্ছে, ছেলেটা মুখ ঘুরিয়ে পিছনে ফিরে দেখছে আর ভয়ে বিষ্ময়ে চোখ কুঁচকে যাচ্ছে তার। এভাবে চলার ফলে তার স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হচ্ছিল, এই চতুষ্পদের দলটা ওর আগেই ওকে ছাড়িয়ে মঞ্চের সামনে চলে এল।

মন্ত্রমুগ্ধের মত এই দৃশ্য দেখতে দেখতে কখন যেন নিজের অজান্তেই ইউন-সুকের ঠোঁটও নড়ে উঠল নিঃশব্দে। যেন ওই অভিনেতাদেরই নকল করে সে-ও নীরবে একটা নাম উচ্চারণ করছিল, নৈঃশব্দের সেই শব্দ যেন তার গলায় ভারী হয়ে চেপে বসছিল। ডং হো

ঝুঁকে থাকাদের দলের সর্বশেষ ছেলেটি হঠাৎই ঘুরে ছেলেটির হাত থেকে ছোট্ট কঙ্কালটা কেড়ে নিল। তারপর ঐ ঝুলন্ত হাতে হাতে কঙ্কালটা পৌঁছে গেল এই মিছিলের একদম শূরুতে যে বৃদ্ধা যাচ্ছিলেন, তাঁর হাতে। বৃদ্ধার শরীরটা এতটাই বেঁকে আছে যে ওঁকে প্রায় ㄱ (গ্যক) অক্ষরের মতন দেখাচ্ছে। কঙ্কালটা শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরে তিনি মঞ্চের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছেন তখন। সাদা পোশাক পরা নারীটি এবং শতচ্ছিন্ন পোষাকের মানুষটি এই পুরো সময়টা নীরবে মঞ্চে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এখন ওঁরা নিঃশব্দেই সরে গিয়ে ওই বৃদ্ধাকে আসার পথ করে দিলেন।

ওই বৃদ্ধাই এখন একমাত্র কুশীলব, যিনি কোনোরকম নড়াচড়া করছেন।

কিন্তু তাঁর পদক্ষেপ এত অবিশ্বাস্য রকমের ধীর, যেন বাতাসটুকুও নড়ছে না তাতে। এই সময়ে দর্শকাসন থেকে একটা মৃদু কাশির আওয়াজ এল, যেন অন্য কোনো দুনিয়া থেকে ভেসে এল সেটা। এই আওয়াজটাই যেন প্রথমের ছেলেটিকে তার ঘোর ভেঙে জাগিয়ে তুলল। সে একলাফে মঞ্চে উঠে সোজা ওই বৃদ্ধা মহিলার বাঁকানো শরীরের পিছনে সেঁটে দাঁড়ালো। যেন কোনো বাচ্চা ছেলে বায়না করছে, অথবা যেন কোনো মৃতের আত্মা তার শরীরের সঙ্গে তখনো লেগে আছে। এত কাছে, তারা পরস্পরকে স্পর্শ করে আছে কি না তা-ও বোঝা যাচ্ছে না ঠিক করে।

ডং হো

শক্ত করে নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে ইউন-সুক। মঞ্চের ছাদের উপর থেকে এখন অনেক টুকরো টুকরো কাগজ আর কাপড় ভেসে ভেসে নীচে নেমে আসছে। তাতে শেষকৃত্যের স্তোত্র লেখা। মঞ্চের সামনেটায় জড়ো হওয়া অভিনেতারা এবার হঠাৎই সবাই একসাথে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। বৃদ্ধা মঞ্চের উপর চলা থামিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়ালেন। ওঁর ঠিক পিছনেই ছেলেটি এবার ঘুরে দাঁড়িয়ে দর্শকদের মুখোমুখি হল।

চোখ বন্ধ করে ফেলল ইউন-সুক। না, ওর মুখটা দেখতে পারবে না সে।

তুমি যখন মারা গেলে, শেষকৃত্য করতে পারিনি আমিআমার জীবনটাই তাই একটা শেষকৃত্য এখন যখন তোমাকে একটা ত্রিপলে মুড়ে ময়লা ফেলার ট্রাকে করে নিয়ে যাওয়া হল যখন ঝর্ণার জল নির্মমভাবে ধুয়ে দিল তোমার সমস্ত শরীর মন্দিরের প্রদীপ সর্বত্র জ্বলছে এখনো সর্বত্র বসন্তের ফোটা ফুলে, তুষারকণায় দিনের অবসান বয়ে আনা সন্ধ্যায় খালি পানিয়ের বোতলের উপর বসানো মোমবাতিগুলির প্রতিটি শিখায়

খোলা চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রুধারাগুলি মোছার কোনো চেষ্টা করে না ইউন-সুক। স্পষ্ট, তীব্র দৃষ্টিতে মঞ্চের দিকে তাকিয়ে থাকে সে, ছেলেটার মুখের দিকে, তার নিঃশব্দে নড়ে চলা ঠোঁটদুটোর দিকে।