হান কাং এর হিউম্যান অ্যাক্টস- বাংলা তরজমা - ১০

চতুর্থ চড়

সম্পাদক কিম ইউন-সুক এক জায়গায় স্থির হয়ে বসে লোকটার হাতটা আবার নেমে আসার অপেক্ষা করছিল। না, লোকটা থেমে যাক, তেমন কোনো প্রার্থনাও করছিল না সে। আসলে সে কোনো কিছুর অপেক্ষাই করছিল না আর। স্রেফ মার খাচ্ছিল। লোকটা মারছিল, সে মার খাচ্ছিল। আর এখন সেটাই ওকে ভুলতে হবে। আজ চতুর্থ চড়টা ভোলবার দিন।

অফিসের বাইরের করিডোরটার শেষ মাথায় এসে ওয়াশ বেসিনটা খুলে ঠান্ডা জলে নিজের হাত দুটোকে ভিজিয়ে নেয় ও। তারপর ওর যে লম্বা চুলগুলো নিজে থেকেই কার্ল হয়ে থাকে, সেগুলোয় ভিজে হাতটা একবার বুলিয়ে একটু ঠিকঠাক করে নিয়ে একটা কালো রাবার ব্যান্ড দিয়ে চুলটাকে বেঁধে ফেলে ও।

নিজের ফাটা ঠোঁটগুলোয় একটু ভেসলিন দেওয়া ছাড়া সে আর কোনোরকম মেক আপ ব্যবহার করে না। মুখে একটু পাউডার দেওয়া, পারফিউম ছড়ানো, হাই হীল জুতো পরা, ইত্যাদি যা কিছু অন্যান্য মেয়েরা করেই থাকে, সে তার কোনোটাই করে না। আজ শনিবার, একটায় অফিস ছুটি হয়ে যাবে, কিন্তু লাঞ্চ খেতে যাবার মতন কোনো বয়ফ্রেন্ডও ওর নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের অল্প কদিনে ওর এমন কোনো বন্ধুও হয়নি, যার সাথে এখন দেখা করা যেতে পারে। অতএব ও সবসময়ে যা করে, সেটাই করবে আজও, চুপচাপ নিজের ভাড়ার বাসায় ফিরে যাবে। ভাতটা একটু গরম করে খেয়ে নেবে, তারপর শুয়ে একটা ঘুম দেবে। ঘুমের মধ্যেই সে তার চতুর্থ চড়টার কথা ভুলে যেতে পারবে।

দিনের বেলাও করিডোরটা প্রায় অন্ধকারই থাকে। কেউ ওর নাম ধরে ডাকছে শুনে ফিরে তাকায় ইউন-সুক। যে-ই হোক, সে ওকে দেখে বেশ খুশী বলেই মনে হচ্ছে গলা শুনে। এবারে ও বুঝতে পারে যে থিয়েটারের প্রযোজক মিঃ সিও ওর দিকে এগিয়ে আসছে, পিছনের ছোট জানলাটা দিয়ে ওর মাথার পেছনে একটা আলো এসে পড়েছে।

“কেমন আছ তুমি, ইউন-সুক?”

এরকম উষ্ণ প্রশ্নের উত্তরে শুধু আস্তে করে “হ্যালো” বলে যখন ও বাও করল, মিঃ সিওর খয়েরি ফ্রেমের চশমার পিছনে চোখগুলো বিস্ময়ে গোল গোল হয়ে গেল।

“হায় ভগবান! তোমার মুখে কী হল!”

“ওই, একটা দুর্ঘটনা হয়েছিল আর কি” আধা হেসে বলে সে।

“কিভাবে?” বলে ফেলেও ইউন-সুকের অস্বস্তিটা বুঝে বিষয় বদলান ভদ্রলোক, “বস আছে ভেতরে?”

“না। আজ তো উনি আসেননি। বললেন একটা বিয়েবাড়ি যেতে হবে।“

“সে কি! কাল সন্ধেবেলা যখন ফোন করলাম, তখন তো বললেন উনি এখানেই থাকবেন!”

অফিসের দরজাটা খুলে ধরে ইউন-সুক, “ভিতরে আসুন সার”

ভদ্রলোককে ওদের অতিথি বসানোর টেবিলের দিকে নিয়ে যাবার সময়ে ওর গালে চিড়িক করে একটা টান টের পেল সে। ওঁকে বসিয়ে রান্নাঘরে গিয়ে নিজের দুই গাল হাত দিয়ে স্পর্শ করে সে। ডান গালটা অল্প অল্প কাঁপছে, বাঁ গালটা সিঁটিয়ে আছে। জোরে একটা নিঃশ্বাস নিয়ে নিজেকে গুছিয়ে নেবার চেষ্টা করে ও, তারপর কফির পাত্রটা চাপিয়ে দেয়। ওর হাতগুলো এভাবে কাঁপছে কেন বুঝে উঠতে পারে না ও, যেন কোনো মিথ্যে বলে ধরা পড়ে গেছে। ওই বইটা তো আর ও নষ্ট করেনি। বস আজ এল না কেন? এই স্পর্শকাতর অবস্থাটা কি ইচ্ছে করেই এড়িয়ে গেল লোকটা?

“আরে কাল যখন আমি জিজ্ঞেস করলাম যে বইটার কতখানি বাদ গেছে, বস খালি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল” মিঃ সিও বলে ওঠেন। হালকা হলুদ রঙের টেবিল ক্লথটার উপরে কফির পাত্র আর সরঞ্জামগুলো রাখে ইউন-সুক। “সেজন্যই আমি ভাবলাম একবার নিজেই দেখে যাই এসে। আরে পুরো বইটা প্রকাশিত হতে না পারলেও তো অভিনয় বন্ধ হয়ে যাবে না। ওদের যেসব জায়গায় সমস্যা, সেগুলোকে একটু ঠিকঠাক করে নিলে বা দরকার হলে বাদ দিয়ে দিলেই হল। তখন তো আর ওদের কোনো সমস্যা থাকবে না?”

উঠে গিয়ে নিজের টেবিলের নীচের ড্রয়ারটা খোলে ইউন-সুক। পাণ্ডুলিপির প্রুফটা বার করে এনে টেবিলে মিঃ সিওর হাতে তুলে দেয় ও। তারপর বসতে বসতেই দেখতে পায় ভদ্রলোকের স্বভাবসিদ্ধ হাসিটা কয়েক মুহুর্তের জন্য যেন শুকিয়ে যাচ্ছে। তবে চমকে গেলেও দ্রুতই নিজেকে সামলে নেন ভদ্রলোক। পাণ্ডুলিপির প্রতিটা পাতা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করেন উনি, এমনকি যে পাতাগুলো কালির রোলার দিয়ে পুরোই কালো করে দেওয়া হয়েছে, সেগুলোও ছাড়েন না।

“আমি খুব দুঃখিত সার” লোকটা যখন একদম শেষ পাতায় যেখানে কপিরাইটের খুঁটিনাটি ছাপা আছে সেই জায়গাটায় আঙুল বোলাচ্ছিল, তখন বলে ওঠে ইউন-সুক। “সত্যিই দুঃখিত। কিছু বলার মত ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না।“

“ইউন সুক” ওঁর দিকে চোখ তুলে তাকায় সে। ওঁকে কিছুটা বিভ্রান্ত লাগে, “কী হয়েছে?”

একটু অপ্রস্তুত হয়েই তড়িঘড়ি চোখ মোছে ও। পরপর সাতটা চড় খেয়েও চোখ দিয়ে এক ফোঁটা জল বের হয়নি ওর, সোজা বসেছিল, অথচ আজ যে কী হচ্ছে, ও নিজেই বুঝতে পারছিল না।

“আমি দুঃখিত” আবার বলে সে। ওর দুচোখ দিয়ে অঝোর ধারে জল গড়াচ্ছে, ও সবটা মুছেও উঠতে পারছে না। গাছের বাকল থেকে যেমন রস বেরোতেই থাকে সমানে। “আমি সত্যিই খুব দুঃখিত সার।“

“কিন্তু তোমার দুঃখিত হবার কী আছে? তোমাকে আমার কাছে ক্ষমা চাইতে হবে কেন?”

ইউন-সুক নিজের কাপটা তুলে চুমুক দিতে যাবে, এমন সময়ে হঠাৎ করে পান্ডুলিপিটা ধপ করে টেবিলে নামিয়ে রাখলেন মিঃ সিও। চমকে গিয়ে ওর কাপ থেকে একটু কফি ছিটকে পড়তেই মিঃ সিও হাত বাড়িয়ে বইটা সরিয়ে নিলেন, যেন ওটায় কফির ছিটে না পড়ে। যেন সেটায় এখনো সারবস্তু কিছু রয়ে গেছে। যেন সবকিছুই শেষ হয়ে যায়নি ওটার এখনো।

 

 

পঞ্চম চড়

আজ রবিবার, অতএব টানা ঘুম দেবার পরিকল্পনা ছিল ইউন-সুকের। কিন্তু যথারিতি ভোর চারটে বাজারও আগে ওর চোখদুটো সটান খুলে গেল।

অন্ধকারে আরও কিছুক্ষণ মটকা মেরে পড়ে রইল সে, তারপর উঠে রান্নাঘরের দিকে গেল। এক্ষুণি আর ঘুম আসবে বলে মনে হয় না, তাই একটু ঠান্ডা জল খেয়ে কাপড় কাচার কাজে লেগে গেল সে। বিভিন্ন রঙের সব মোজা, তোয়ালে আর সাদা শার্টগুলো ওর ছোট্ট ওয়াশিং মেশিনটার খোঁদলে সেঁধালো, আর ওর ধুসর জাম্পারটা আর অন্তর্বাসগুলো হাতেই কেচে নিয়ে একটা উলটো করে রাখা বেতের ঝুড়ির উপর মেলে দিল সে। জিনসটাকে লন্ড্রি বাস্কেটের মধ্যে ফেলে রাখলো ও – আরও কয়েকটা হলে তখন কাচা যাবে। তারপর রান্নাঘরের মেঝেতেই গুটিশুটি মেরে বসল ও, ওয়াশিং মেশিনের ছন্দোবদ্ধ সোঁ সোঁ আওয়াজটা শুনতে শুনতে আবার একটু ঝিমুনি আসছিল ওর।

বেশ আবার ঘুমানো যাক তাহলে

নিজের ঘরে ফিরে এসে শুয়ে পড়ে জোর করে নিজের চোখগুলো বন্ধ করতেই নিচের শক্ত গদিটা, কাগজে মোড়া মেঝেটা, সব যেন চারদিক থেকে এসে ওকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল। প্রথমে ওর কাঁধের কাছ থেকে শুরু হয়ে শরীরের নীচ পর্যন্ত যেন পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে গেল সে, এমনকি মুখ দিয়ে একটু আওয়াজ করার ক্ষমতাও আর ছিল না ওর। তারপর সেটা আস্তে আস্তে কেটে যাবার পর মনে হল ওর চারপাশটা যেন কেমন ছোট হয়ে আসছে, সিমেন্টের দেওয়ালগুলো, ছাদ, সব যেন ক্রমশঃ ওর দিকেই এগিয়ে আসছে।

নিঃশ্বাস নেবার জন্য ছটফট করছিল ও, চোখগুলো সম্পূর্ণ খোলা অবস্থায়। ওয়াশিং মেশিনটা শেষবারের মত স্পিন করছে, শব্দ শুনে বুঝতে পারছিল ও। কয়েক মিনিট পরে সেই হুশ হুশ আওয়াজ আর ড্রামটা ঘোরার শব্দ সম্পূর্ণ থেমে গেল, যেমন হঠাৎ করে থেমে যায় নিঃশ্বাস নেওয়া। তারপর একটা তীক্ষ্ণ শব্দ করে ওটা জানান দিল যে ওর কাজ শেষ।

ইউন-সুক যেখানে ছিল, সেখানেই চুপ করে শুয়ে থাকল। এখনো তিনটে চড় ভোলা বাকি, আজ পাঁচ নম্বরটার পালা। পঞ্চম চড়, যখন সে নিজেকে বলেছিল আর না গুনতে। সেই পঞ্চম চড়, যেটার সময়ে মনে হয়েছিল ওর গালের চামড়াগুলো এবার ফেটে যাবে, যখন ওর চামড়ায় বিন্দু বিন্দু রক্ত বেরিয়ে আসতে শুরু করেছিল।

এবারে পায়ে পায়ে উঠে সিঙ্কের উপরে টাঙানো তারগুলোয় ধোয়া কাপড়গুলো মেলে দিল ও। কিন্তু এই কাজটাতেও যতটা আশা করা গেছিল ততটা সময় লাগলো না আদৌ, এখনো ভোর হতে অনেকটাই বাকি। আবারও নিজের শোবার ঘরেই ফিরে যায় সে অগত্যা।

খুব যত্ন নিয়ে লেপটাকে ভাঁজ করে ড্রয়ারের উপরের তাকে ঢোকায় ও, নিজের ডেস্কটাকে ভালো করে গুছিয়ে নেয়, ড্রয়ারের জিনিষগুলোও আবার বের করে ঠিকমত সাজিয়ে রাখে। কিন্তু তারপরেও সকাল হতে যেন অনেক দেরী মনে হয়। আরও যা কিছু ঠিকঠাক সাজিয়ে রাখা যেতে পারে সেগুলো সবই গুছিয়ে নেয় ও, নিজের প্রসাধনীগুলোও একটা একটা করে নিজের সাইড টেবিলে সাজিয়ে রাখে আবার। ঘরের ছোট্ট আয়নাটাতে আনমনে একবার হাত বোলায় ও। ওটার ভিতরে বদ্ধ হয়ে আছে একটা শীতল, নীরব এবং অপরিবর্তনীয় একটা দুনিয়া। সেই দুনিয়াটার দিকে অন্যমনে দেখতে দেখতে প্রায় পরিচিত একটা মুখও দেখতে পায় ও – ওই নীলচে কালশিটের দাগগুলো না থাকলেই ওটাকে দিব্যি চিনতে পারা যেত।

একটা সময় ছিল যখন লোকজন ওকে দেখলেই “কী মিষ্টি” বলে উঠত চট করে। তুই এত্ত সুন্দর, যেন পটে আঁকা ছবির মত ওই কালো চুলের নর্তকীদের মত দেখতে তোকে, তোর তো সেলুনে গিয়ে চুল কার্ল করার দরকারও পড়ে না কিন্তু ওর আঠেরো বছর বয়সের সেই গ্রীষ্মের পর থেকে, সেই ফোয়ারার গ্রীষ্মের পর থেকে আর কেউ ওকে এরকম কিছু বলে না। এখন এই তেইশ বছর বয়সে তার সৌন্দর্য একটু অন্যরকম হবে, এটাই প্রত্যাশিত ছিল হয়তো। আপেলের মত লাল টুকটুকে গালে হালকা টোল পড়বে, তাতে ফুটে উঠবে জীবনের উজ্জ্বলতা আর মাধুর্য, এরকমটাই ভাবা হত। কিন্তু ইউন-সুক এখন শুধুই বুড়িয়ে যেতে চায় তাড়াতাড়ি। তার এই অভিশপ্ত, ভয়ঙ্কর জীবনটা অনেক লম্বা টেনে নিয়ে যাবার কোনো ইচ্ছে তার নেই।

একটা ভিজে ন্যাকড়া দিয়ে ঘরটার প্রতিটা কোনা খুঁজে খুঁজে মুছল সে। তারপর সেই ন্যাতাটাকে ভালো করে ধুয়ে, মেলে দিয়ে গিয়ে যখন নিজের ডেস্কে বসল, নাছোড়বান্দা অন্ধকার তখনো কাটার নামই নিচ্ছে না। সে কোনো বই খোলার চেষ্টা করল না – শুধুই চুপচাপ বসে থাকা – এভাবে বসে থাকতে থাকতে অল্পক্ষণের মধ্যেই খিদে পেতে শুরু করল ওর। অগত্যা উঠে গিয়ে একটা বাটিতে ওর মায়ের বানানো কিছুটা ফেনাভাত ঢেলে এনে নিজের ডেস্কে বসল। চুপচাপ বসে সেই ভাতটা খেতে খেতে আগের মতই এখন আরও একবার ওর মনে হল, খাওয়াটা খুবই একটা লজ্জার ব্যাপার যেন। লজ্জাটা প্রতিবারের মতই আরও বেশী করে চেপে বসল, যখন মনে পড়ে গেল যে মৃত মানুষেরা কিছুই খেতে পারে না – কারণ তাদের জীবনটাই নেই, তাদের আর কখনোই খিদে পাবে না। কিন্তু তার জীবনটা এখনো আছে, ফলে খিদে পায় রোজই। এই চিন্তাটাই গত পাঁচ বছর ধরে ওকে কুরে কুরে খায় – যে এখনো ওর খিদের বোধ আছে, এখনো খাবার দেখে জিভে জল আসে।

“এসব এবারে ভুলে যেতে পারিস না?” যেবার শীতে ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকা পরীক্ষায় ফেল করে নিজেকে ঘরবন্দী করে ফেলেছিল, সেবারে ওর মা বলেছিলেন, “এটা কিন্তু আমার জন্যও খুব চাপ হয়ে যাচ্ছে। যা হয়ে গেছে তা হয়ে গেছে, এখন আবার ইউনিভার্সিটি যা, বাকি সবার মত, তারপর যা হোক কিছু একটা কর – বেঁচে থাক। তাতেই আমার বোঝা অনেক হালকা হবে।“

অবশ্যই মায়ের বোঝা হয়ে থাকতে চায়নি সে, তাই আবার পড়াশোনা শুরু করে ইউন-সুক। সে গুয়াংজু থেকে অনেক দূরে চলে যেতে চেয়ে সিওল ইউনিভার্সিটিতে ভর্তির জন্য আবেদনপত্র পাঠায়। যদিও সেখানেও আদৌ কিছু মুক্ত পরিবেশ বা নিরাপত্তা ছিল না কিছুই। সাদা পোশাকের পুলিশেরা সবসময়েই ক্যাম্পাসে ঘোরাঘুরি করত। যে সব ছাত্রছাত্রী ওদের বিষনজরে পড়ত, তাদের ওরা জবরদস্তি সেনাবাহিনীতে ভর্তি করিয়ে DMZ তে পাঠিয়ে দিত। অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে যে কোনো মীটিং মিছিল যখন তখন বাতিল হত, জীবনে সঙ্ঘর্ষ, লড়াই লেগেই থাকত। সেন্ট্রাল লাইব্রেরির কাচের জানলাটা ভিতর থেকে ভেঙে ফেলা হয়েছিল – সেখান থেকে “কসাই চান ডু হুয়ান নিপাত যাক” লেখা বিশাল ব্যানার ঝোলানো হত। কিছু কিছু ছাত্র ছাদ থেকে কোমরে একটা দড়ি বেঁধে লাফ দিত – খানিকটা সময় কেনার জন্য। সাদা পোশাকের পুলিশেরা যতক্ষণে ছাদে গিয়ে সেই দড়ি ধরে ওকে টেনে তুলে আনত, ততক্ষণ স্লোগান দিতে দিতে সে লিফলেট ছড়াতো। নীচে একঝাঁক ছেলেমেয়ে ভীড় করে দাঁড়িয়ে স্লোগান দিত, গান গাইত। যদিও কোনোদিনই কোনো গানই ওরা পুরোটা গেয়ে উঠতে পারেনি, তার আগেই পুলিশ এসে ওদের নিষ্ঠুরভাবে মেরে ছত্রভঙ্গ করে দিত। একটু দূর থেকে এরকম দৃশ্য যতবার দেখেছে ইউন-সুক, প্রতিবারই সে জানত, আরও একটা অশান্ত রাত্রি নেমে আসতে চলেছে তার জীবনে। যদি বা কোনোমতে ঘুম আসতও, দুঃস্বপ্নেরা তাড়া করে আবার ঘুম ভাঙিয়ে দিত তার।

জুন মাসে ওর প্রথম টার্মের পরীক্ষার পরে পরেই ওর বাবার সেরিব্রাল হ্যামারেজ হল, ডানদিকটা সম্পূর্ণ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ল। ওর মা একটা ওষুধের দোকানে সহকারীর কাজে ঢুকলেন, তিনিই হয়ে দাঁড়ালেন সংসারের একমাত্র আয়ের উৎস। ইউন-সুক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছুটি নিতে বাধ্য হল কিছুদিনের জন্য। দিনের বেলায় সে তার বাবার দেখাশোনা করত আর বিকালে তার মা কাজ সেরে ঘরে ফিরলে সে বেরিয়ে যেত তার নিজের কাজে – শহরের কেন্দ্রে একটা বেকারিতে প্যাকেজিং আর সেলসের কাজ – বাড়ি ফিরতে সেই রাত দশটা। বাড়ি ফিরে কয়েক ঘন্টার সংক্ষিপ্ত ঘুম, তারপরে ভোর থাকতেই উঠে ওর ছোট ছোট ভাইবোনদুটোর জন্য লাঞ্চ বানানোর কাজে লেগে পড়তে হত তাকে। অবশেষে বছরের শেষদিকে যখন ওর বাবা অন্ততঃ নিজের খাবারটুকু নিজে খেতে পারার মত সচল হলেন, তখন ও ইউনিভার্সিটিতে ফিরে গেল, কিন্তু মাত্র একটা টার্ম করেই আবার ওকে পড়া বন্ধ রেখে একটা কাজে ঢুকতে হল, পরের টার্মের খরচ জোগাড় করার জন্য। এভাবে একবার চালু, আবার বন্ধ করে কোনোমতে দ্বিতীয় বর্ষের পড়াটা শেষ করার পর স্নাতক হবার চেষ্টায় ক্ষান্ত দিতে বাধ্য হল সে। ওর প্রোফেসর যখন এই প্রকাশনার কাজটার জন্য তদ্বির করলেন, সে এক কথায় কাজটা নিয়ে নিল।

তার মায়ের এ নিয়ে প্রচুর আফশোস থাকলেও ও নিজে সেভাবে ভাবে না। আর্থিক অবস্থা এরকম না হলেও ও আদৌ স্নাতক হতে পারত বলে ওর মনে হয় না। বরং খুবই সম্ভাবনা ছিল যে ও ওই ছাত্রদের দলে ভিড়ে লড়াই-সংগ্রামে জড়িয়ে পড়ত। সেখানে ওই ছাত্রছাত্রীদের তরুণ মুখগুলোর মধ্যে দাঁড়িয়ে বরং যতক্ষণ পারা যায় বেঁচে থাকার রসদ খুঁজত। একমাত্র বেঁচে যাওয়া মানুষ হিসাবে থেকে যাওয়ার চেয়ে ভয়াবহ আর কিছু হতে পারে না।