জীবনের কথা বলিতে ব্যাকুল - গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের আত্মজীবনী - পর্ব ৩৭

জীবনের কথা বলিতে ব্যাকুল

(গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের আত্মজীবনী)

মূল স্প্যানিশ থেকে অনুবাদঃ অরুন্ধতী ভট্টাচার্য

পর্ব – ৩৭

সূর্যোদয় থেকে শুরু হয় গিয়ের্মো গ্রানাদোসের সংগ্রহে যত অক্ষয় তাঙ্গো আছে উচ্চৈস্বরে সেই প্রতিভার নিদর্শণ। হস্টেলে আমার পাশে শুতো রিকার্দো গোন্সালেস রিপোল। সে আর আমি যে কাপড়টা দিয়ে জুতো পালিশ করতাম সেটাকে খাটের মাথায় বেঁধে তারই তালে তালে যখন ক্যারিবীয়ার গুয়ারাচাস গাইতাম, তখন আরেক বন্ধু সাবাস কারাবাইয়ো শোবার ঘরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে জন্ম মুহূর্তের মতোই নগ্ন অবস্থায় দৌড়ে বেড়াত আর তার কংক্রিটের মতো চাঙ্গা পুরুষাঙ্গ থেকে একটা তোয়ালে ঝুলত।

যদি সম্ভব হত তাহলে আমাদের মধ্যে অনেকেই মাঝরাতে পালিয়ে যেতাম সপ্তাহ শেষের যত পরিকল্পনা আছে তা পূরণ করতে। রাতের কোনও পাহারাদার ছিল না। যাঁর সেদিনের পালা তিনি ছাড়া আর কোনও মাস্টারমশাইও থাকতেন না শোবার ঘরে। আর লিসেয়োর গেটের চিরন্তন পাহারাদার রিবেরিতোস সব সময় জেগে ঘুমোত ও তার দায়িত্ব পালন করত। সে চিলে কোঠার একটা ঘরে ঘুমোত আর ভালো করেই নিজের কাজ করত। কিন্তু রাতে আমরা গীর্জার দরজার ভারি খিল কোনও শব্দ না করে খুলে ফেলতাম। তারপর বাইরে গিয়ে অন্য বাড়িতে রাত কাটিয়ে প্রচন্ড ঠান্ডা রাস্তা দিয়ে ভোরের একটু আগে ফিরে আসতাম। কেউ জানত না রিবেরিতোসকে যেমনটা দেখে মনে হয় সেরকম সত্যি সত্যি মড়ার মতো ঘুমোয়, নাকি ওটা ছিল ছেলেদের কুকর্মে সাহায্য করার বিনম্র ভঙ্গী। খুব বেশি জন পালাত না। তবে সেই গোপন কান্ডকারখানা তাদের বিশ্বস্ত সহচরদের স্মৃতিতে সঞ্চিত থেকে পচে যাচ্ছে। আমি কয়েকজনকে চিনতাম যারা নিয়ম করে পালাত। অন্যরা সাহস করে একবার-দুবার অভিযানে যেত প্রচন্ড আতঙ্কের মধ্যে আর বিদ্ধস্ত হয়ে ফিরে আসত ভয়ে ভয়ে। কখনও কেউ ধরা পড়েছিল বলে শুনিনি।

অন্যদের সঙ্গে থাকতে আমার একটাই অসুবিধা ছিল – মায়ের কাছ থেকে উত্তরাধিকারী সূত্রে প্রাপ্ত দুঃস্বপ্ন দেখা। অন্য ছেলেদের কাছে তা ঘুমের মধ্যে কবর থেকে উঠে আসা ভৌতিক চিৎকারের মতো লাগত। আমার পাশে যারা শুত তারা এটায় অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল, তবুও মাঝরাতের নৈঃশব্দের মধ্যে প্রথম গর্জনটাকে তারা ভয় পেত। যেদিন যে শিক্ষকের রাতে থাকার পালা পড়ত তিনি একটা কার্ডবোর্ডের ঘরে শুতেন আর শোবার ঘরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে স্বপ্নচারণের মতো হেঁটে যেতেন যতক্ষণ না আমার দুঃস্বপ্নের গর্জন শান্ত হচ্ছে। শুধু যে ঘুমটা আমার আয়ত্তের বাইরে ছিল তাই নয়, এর সঙ্গে আমার চেতনের খারাপ দিকেরও একটা সম্পর্ক ছিল কেননা দু’বার এটা ঘটেছিল খারাপ পাড়ায় থাকার সময়। দুঃস্বপ্নের মানেও বোঝা যেত না, কেননা ভয়ংকর স্বপ্নের সঙ্গে যে সেটা ঘটত তা নয়, বরং চেনা-পরিচিত লোকের সঙ্গে বা চেনা জায়গায় আছি এরকম খুশির স্বপ্নের সময় হঠাৎই ভয়াবহ কিছু একটা ঘটত। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আপাত নিরীহ ঝলকের পরই আসল রূপটি প্রকাশ পেত। আমার একটা দুঃস্বপ্নের সঙ্গে মায়ের একটা স্বপ্নের তুলনা করা যায়। তিনি স্বপ্নে দেখেছিলেন যে নিজের মাথাটা কোলের উপর ধরে নিকি আর ড্যাঙর বাছছেন কেননা ওরা মাকে ঘুমোতে দিচ্ছে না। আমি যে চিৎকার করতাম তা ভয় থেকে নয়, আসলে আমি সাহায্য চাইতাম যাতে কেউ দয়া করে আমার ঘুম ভাঙিয়ে দেয়। লিসেয়োর শোবার ঘরে কোনও কিছু করার জন্যই সময় থাকত না। দুঃস্বপ্নের প্রথম আওয়াজটা শুরু হতেই আশপাশের বিছানা থেকে সব বালিশ উড়ে এসে আমার উপর পড়ত। হাঁপাতে হাঁপাতে আমার ঘুম ভাঙত, তারপর বুক ধড়ফড় করত, কিন্তু ভালোই লাগত, বেঁচে আছি বলে।

লিসেয়োর যে ব্যবস্থাটা সবচেয়ে ভালো ছিল তা হল ঘুমের আগে একজন চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বই পড়বে। এই নিয়ম শুরু করেছিলেন কার্লোস হুলিও কালদেরোন স্যার, মার্ক টোয়েনের একটা গল্প দিয়ে। গল্পটা থেকে পরের দিন নবম শ্রেণীর ছাত্রদের হঠাৎ একটা পরীক্ষা নেওয়া হবে। তার জন্য ঘুম থেকে উঠে সবার আগে পড়তে হত। স্যার তাঁর কার্ডবোর্ডের ঘরে বসে চিৎকার করে চারটে পাতা পড়ছিলেন যাতে যারা তখনও পর্যন্ত গল্পটা পড়ার সময় পায়নি তারা শিখে নিতে পারে। ব্যাপারটা এত আকর্ষণীয় ছিল যে এর পর থেকে ঘুমের আগে প্রতিদিন রাতে উচ্চৈস্বরে গল্প পড়াটা একটা প্রথা হয়ে দাঁড়াল। প্রথমে এটা সহজ ছিল না। অতিশালীন কোনও শিক্ষক কোন বই পড়া হবে তা নির্ধারণ করে দেওয়ার দাবী করলেন। কিন্তু একটা বিপ্লব ঘটে যাওয়ার ভয়ে বড় ছেলেদের উপর পছন্দের ভার ছেড়ে দিলেন।

শুরুটা হয়েছিল আধ ঘন্টা পড়া দিয়ে। যেদিন যে মাস্টারমশাই থাকতেন তিনি শোবার ঘরের দরজার কাছে তাঁর আলোকোজ্জ্বল কক্ষে বসে পড়তেন। পড়া শুরু করলেই আমরা সত্যি বা নকল নাক ডাকার আওয়াজ করে তাঁকে থামিয়ে দিতাম। বেশিরভাগ সময়ে তাঁরা এমনই পড়া পড়তেন! অনেক পরে আধ ঘন্টা এক ঘন্টায় পরিণত হয়। সেটা নির্ভর করত গল্পের উপর আর মাস্টারমশাইয়ের জায়গায় ছেলেরাই পড়া শুরু করল প্রতি সপ্তাহে একজন করে। ‘নস্ত্রাদামুস’ ও ‘লৌহ মুখোশের মানুষ’ – এই বই দুটি দিয়ে সূচনা হল একটা ভালো সময়ের। সকলের ভালো লেগেছিল। কিন্তু একটা ব্যাপার আজও বুঝতে পারিনা টমাস মানের ‘জাদু পাহাড়’ গল্পটা কেন অত সাফল্য পেয়েছিল। হ্যান্স ক্যাসটর্প আর ক্ল্যাভদিয়া শাউচ্যাটের একটা চুম্বনের আশায় আমরা যাতে সারা রাত জেগে না থাকি তার জন্য রেক্টরকে পর্যন্ত এসে ব্যবস্থা নিতে হয়েছিল। অথবা ন্যাপথা আর তার বন্ধু সেতেম্ব্রিনির মধ্যে বিশৃঙ্খল দার্শনিক দ্বন্দ্বযুদ্ধের একটা শব্দও যাতে বাদ না যায় তার জন্য কী অদ্ভুত আতঙ্কে আমরা সবাই বিছানার উপর বসে ছিলাম। সেদিন রাতে এক ঘন্টার বেশি পড়া হয়েছিল আর সবাই মিলে হাততালি দিয়ে উদযাপন করেছিলাম।

একমাত্র যে শিক্ষক আমার যৌবনের অন্যতম রহস্য হয়ে ধোঁয়াচ্ছন্ন থেকে গিয়েছিলেন তিনি স্কুলের রেক্টর। যেদিন আমি এসেছিলাম সেদিনই তাঁর সঙ্গে দেখা হয়। তাঁর নাম আলেহান্দ্রো রামোস। জেদি ও নিঃসঙ্গ মানুষ। চোখের চশমার কাচ এমন পুরু ছিল যে অন্ধদের চশমার মতো মনে হত। তাঁর আঢ়ম্বরহীন ক্ষমতার দেওয়া নির্দেশের প্রতিটি শব্দ ছিল লৌহমুষ্ঠির মতো। সকাল সাতটায় তিনি তাঁর ঘর থেকে নামতেন আমাদের সব কিছু ঠিক ঠাক আছে কিনা দেখার জন্য। তারপর খাবার ঘরে ঢুকতেন। বিভিন্ন উজ্জ্বল রঙের পোশাক পরতেন তিনি, শার্টের কলার থাকত সেলুলয়েডের মতো মার দেওয়া, তার সঙ্গে ঝলমলে টাই আর ঝকঝকে জুতো। আমাদের নিজেদের পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতায় কিছুমাত্র ভুল হলে তিনি এমনভাবে বলতেন যে শোবার ঘরে গিয়ে তা ঠিক করে আসতে হত। দিনের বাকি সময়টা থাকতেন তাঁর দোতলার অফিসে এবং তাঁকে আর দেখতে পেতাম না পরের দিন সকালের নির্দিষ্ট সময়ের আগে অথবা অফিস থেকে দশম শ্রেণীর ক্লাসে যখন যেতেন ঠিক বারোটি পদক্ষেপে। সেখানে তিনি সপ্তাহে তিনদিন অঙ্ক করাতেন, তাঁর একমাত্র ক্লাস। তাঁর ছাত্ররা বলত যে তিনি সংখ্যার একজন প্রতিভা। ক্লাসে বেশ মজা করে পড়ান। ছাত্ররা তাঁর জ্ঞানে একই সঙ্গে অভিভূত ও ভীত হত, বছরের শেষ পরীক্ষার ভয়ে।

লিসেয়োতে আসার অল্প কিছুদিন পরেই এখানকার একটি অনুষ্ঠানের জন্য আমায় উদ্বোধনী ভাষণ লিখতে বলা হল। বেশির ভাগ মাস্টারমশাই আমার লেখা অনুমোদন করলেন, কিন্তু বললেন যে এই সমস্ত ব্যাপারে শেষ কথা বলবেন রেক্টর। তিনি দোতলায় সিঁড়ির উপরে অফিস ঘরে বসতেন। কিন্তু ওইটুকু যেতে এত কষ্ট হচ্ছিল যে মনে হচ্ছিল যেন সারা পৃথিবী পায়ে হেঁটে ঘুরছি। আগের রাতে ভালো করে ঘুম হয়নি, রবিবারের টাই গলায় দিয়েছি আর জলখাবারটা প্রায় খেতেই পারলাম না। তাঁর ঘরের দরজায় এত আস্তে টোকা দিয়েছি যে তিনবার শব্দ করার পর তবে তিনি নিজে দরজা খুলে দিলেন এবং কোনও অভিবাদন না জানিয়েই ভেতরে যেতে বললেন। তাঁকে উত্তর দেওয়ার ক্ষমতা তখন আমার ছিল না। শুধু তাঁর রাগী ভাবের জন্য নয়, তাঁর অফিসের সৌন্দর্য দেখে বিমুগ্ধ হওয়াও একটা কারণ। ঘরের সবকিছু সুন্দর শৃঙ্খলায় সাজানো, দামী কাঠের আসবাব, ভেলভেটের সাজ আর দেয়ালজোরা অপূর্ব বইয়ের তাকে চামড়ায় বাঁধানো মোটা মোটা বই। রেক্টর অপেক্ষা করছেন তাঁর ভদ্রতাবোধক নৈঃশব্দে আর ততক্ষনে আমি দম নিচ্ছি। তারপর তিনি ইশারায় তাঁর টেবিলের সামনের ইজি চেয়ারে বসতে বললেন আর তিনি বসলেন তাঁর নিজেরটায়।

আমি কী বলব তা ওই উদ্বোধনী ভাষণের মতোই মন দিয়ে ভেবে রেখেছি। তিনি চুপ করে আমার কথা শুনছেন, প্রত্যেক বাক্যের পর মাথা নাড়াচ্ছেন, কিন্তু আমার দিকে একবারও তাকাচ্ছেন না, তাকিয়ে আছেন আমার কাঁপতে থাকা হাতের কাগজটার দিকে। একটা জায়গায় আমার মনে হল একটু মজার ব্যাপার আছে, তাঁকে হাসাতে চেষ্টা করলাম, কিন্তু ব্যর্থ হলাম। এমনকি আমি এখন নিশ্চিত যে তিনি আমার দেখা করতে যাওয়ার কারণ ভালো করেই জানতেন, তবুও নিয়ম অনুযায়ী আমার কথা পুরোটা শেষ করতে দিলেন।

কথা শেষ করার পর টেবিলের উপর দিয়ে হাত বাড়িয়ে কাগজটা নিলেন। চশমা খুলে গভীর মনোযোগ সহকারে পড়তে শুরু করলেন। শুধু দু’বার থামলেন ও পেন দিয়ে দু’ জায়গায় সংশোধন করলেন। তারপর আবার চশমা চোখে দিয়ে আমার চোখের দিকে না তাকিয়ে গম্ভীর গলায় কথা বলতে শুরু করলেন আর আমার বুক ধড়ফড় শুরু হল।

  • ‘এখানে দুটো সমস্যা আছে,’ আমাকে বললেন, ‘তুমি লিখেছ: “আমাদের দেশে যেমন প্রচুর গাছপালা একসঙ্গে বেড়ে উঠছে, যে কথা অষ্টাদশ শতাব্দীতে বলেছিলেন জ্ঞানী স্পেনীয় হোসে সেলেস্তিনো মুতিস, এই লিসেয়ো স্কুলে সেই রকম স্বর্গীয় পরিবেশে আমরাও রয়েছি।” কিন্তু এক্সুবেরান্তে শব্দে এইচ থাকে না আর পারাদিসিয়াকো শব্দে উচ্চারণের ঝোঁকের চিহ্ন বসে না।’

আমার খুবই খারাপ লাগল। প্রথমটায় আমার কিছুই বলার নেই, কিন্তু দ্বিতীয়টায় আমি প্রায় নিশ্চিত ছিলাম আর গলায় যেটুকু স্বর বাকি ছিল তাই দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে বললাম:

  • ‘ক্ষমা করবেন, রেক্টর স্যার, তবে অভিধানে ওই শব্দটা চিহ্ন-সহ ও চিহ্ন-ছাড়া দুভাবেই রয়েছে। চিহ্ন-সহটা আমার মনে হয়েছে বেশি ধ্বন্যাত্মক।’

নিশ্চয়ই আমার মতোই তাঁরও খারাপ লেগেছে, তবুও আমার দিকে তাকালেন না। পরিবর্তে, একটা কথাও না বলে, বইয়ের তাক থেকে অভিধানটা নিলেন। ভয়ে আমার বুক শুকিয়ে গেল। এটা সেই আমার দাদুর অভিধান, নতুন, ঝকঝক করছে, সম্ভবত ব্যবহারই হয়নি। একবারেই সঠিক পাতাটা খুলে ফেললেন, পড়লেন, আবার পড়লেন আর তারপর বইয়ের পাতা থেকে মুখ না সরিয়েই আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন:

  • ‘কোন বছরের ছাত্র?’

  • ‘তৃতীয় বছরের,’ উত্তর দিলাম।

অভিধানটা জোরে বন্ধ করলেন এবং প্রথমবার আমার চোখের দিকে তাকালেন।

  • ‘সাবাশ,’ তিনি বললেন, ‘এভাবেই এগিয়ে যাও।’

সেই দিন থেকে শুধু একটা জিনিষই বাকি ছিল – আমার সহপাঠীদের আমাকে হিরো হিসাবে মেনে নেওয়া। কিন্তু তারা যারপরনাই খ্যাপানোর জন্য আমাকে ‘রেক্টরের সঙ্গে কথা বলা উপকূলবাসী’ বলে ডাকতে লাগল। যাই হোক, এই ঘটনায় যেটা আমায় সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছিল তা হল বানান নিয়ে আবার একবার আমায় ঝামেলা পোহাতে হল। কোনোদিন এটা শিখতে পারলাম না। আমার একজন শিক্ষক আমাকে মরণ ঘা দিয়েছিলেন এই বলে যে সিমোন বোলিবার মারাত্মক বানান ভুলের জন্য সম্মানের যোগ্য ছিলেন না। অন্যরা সান্ত্বনা দিয়ে বলতেন যে অনেক লোকেরই এই ভুল হয়। এমনকি আজও, সতেরটা বই প্রকাশ হওয়ার পরেও, প্রুফ সংশোধনকারীরা আমার ভয়ংকর বানান ঠিক করে দিয়ে বলেন যে ওগুলো টাইপ করার ভুল।

সিপাকিরার সামাজিক উৎসবে লোকজনের ব্যক্তিত্ব ও পছন্দের প্রতিফলন দেখা যেত। লবণের খনি ছিল সপ্তাহ শেষে পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্র। স্পেনীয়রা এই খনি জীবন্ত আবিষ্কার করেছিল। পর্যটকরা সেখানে খেত বাছুরের বুকের মাংসের স্টেক আর বিরাট কড়ায় নুনের মধ্যে রাখা ঠান্ডা আলু। উপকূলের ছেলেদের অর্থাৎ আমাদের খ্যাতি ছিল কুবংশজাত ও গন্ডগোল করার জন্য। আমরা কিন্তু সেখানে জনপ্রিয় গানের সঙ্গে কলা-কুশলীদের মতো নাচতাম ও পাগলের মতো প্রেমে পড়ার সুন্দর রুচিও আমাদের ছিল।

আমি এতটাই আবেগপ্রবণ হয়ে উঠলাম যে বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্তির ঘোষনার পতাকা, ফেস্টুন নিয়ে আনন্দের উচ্ছ্বাসে অন্যদের সঙ্গে পথে বেরোলাম আর জয়ধ্বনি দিতে লাগলাম। সেখানে বলা হল কোনও একজন কিছু বলতে এগিয়ে আসুক। আমি একটুও না ভেবে দল থেকে বেরিয়ে ওখানকার ক্লাবের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম; আমার সামনে তখন শহরের প্রধান প্লাজা। সেখানে মনে যা এল তাই এমন চিৎকার করে বললাম যে অনেকে ভেবেছিল মুখস্থ করে বলেছি।

আমার সতের বছরের জীবনে সেটাই ছিল একমাত্র তৈরি না করা বক্তৃতা। বলা শেষ করেছিলাম চারটি বৃহৎ শক্তির প্রতি কাব্যিক শ্রদ্ধা জানিয়ে। কিন্তু যেটা সকলের নজর কাড়ল তা আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতির অভিপ্রায়। তিনি কিছুদিন আগে মারা গিয়েছিলেন। আমি বলেছিলামঃ ‘ফ্রাঙ্কলিন ডেলুনো রুজভেল্ট মহাবীর সিদের মতোই মৃত্যুর পরেও যুদ্ধ কীভাবে জয় করতে হয় তা জানেন।’ বেশ কিছুদিন ধরে এই বাক্যটা শহরে ঘুরপাক খেয়েছিল আর পোস্টারে লেখা হচ্ছিল। আবার যেসব দোকানের শোকেসে রুজভেল্টের ছবি ছিল সেখানেও কথাটা লেখা হল। সুতরাং জনগনের মধ্যে আমার প্রথম খ্যাতি হয়েছিল কবি বা ঔপন্যাসিক বলে নয়, বরং বক্তা হিসাবে। বলতে গেলে তার চেয়েও খারাপ – রাজনৈতিক বক্তা হিসাবে। সেই দিন থেকে লিসেয়োর এমন কোনও প্রকাশ্য অনুষ্ঠান হয়নি যেখানে আমি মঞ্চে উঠে দাঁড়াইনি। একটাই তফাত ছিল, বক্তৃতাগুলো আগে থেকেই লিখে এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সংশোধন করে নিতাম।

আমার এই প্রগলভতা সময়ের সঙ্গে আমার মধ্যে প্রচন্ড মঞ্চের ভয় সঞ্চারিত করল। এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেল যে প্রকাশ্যে কথা পর্যন্ত বলতে পারতাম না। তা সে বড়লোকদের বিয়েবাড়ি হোক আর পঞ্চু ও পাটের চটি পরা আদিবাসীদের বিয়েই হোক। আদিবাসীদের বিয়েতে তো শেষে আমরা মেঝেয় গড়াগড়ি খেতাম। সুন্দরী ও মুক্তমনা বেরেনিসের বাড়িতে যেতাম। কিন্তু তার সৌভাগ্য যে আমায় বিয়ে করেনি। তখন সে অন্য একজনের প্রেমে মত্ত ছিল। আরেকজন ছিল টেলিগ্রাফ অফিসের অবিস্মরণীয় সারিতা। সে আমাকে ধারে টেলিগ্রাম করতে দিত যদি বাবা আমার হাত খরচের টাকা পাঠাতে দেরি করতেন এবং একাধিকবার সরাসরি টাকাও দিয়েছিল সমস্যার হাত থেকে আমাকে বাঁচাতে। তবে যে মেয়েটিকে ভোলা যায় না সে কারুর প্রেমিকা ছিল না, কবিতা পাগলদের কাছে সে ছিল রূপকথার পরী। তার নাম সেসিলিয়া গোন্সালেস পিসানো। সে ছিল প্রত্যুতপন্নমতি, বুদ্ধিমতি, সহমর্মী, রক্ষণশীল বংশে উদারতার প্রতিমূর্তি আর তার ছিল সমস্ত কবিতা মনে রাখার মতো অলৌকিক স্মৃতিশক্তি। লিসেয়োর প্রবেশ দ্বারের উলটো দিকে সে থাকত হাতিশুঁড় গাছের বাগান দিয়ে ঘেরা এক ঔপনিবেশিক প্রাসাদে সম্ভ্রান্ত ও অবিবাহিত পিসীর সঙ্গে। শুরুতে সম্পর্কটা ছিল কবিতার মধ্যে সীমায়িত। কিন্তু পরে সে প্রকৃত বন্ধু হয়ে উঠল। সব সময় হাসিখুশি থাকত আর শেষ পর্যন্ত আমাদের সকলের সহযোগিতায় কালদেরোন স্যারের সাহিত্যের ক্লাসে সে ঢুকে পড়ত।

আরাকাতাকায় যখন থাকতাম আমার স্বপ্ন ছিল মেলায় মেলায় ঘুরে অ্যাকর্ডিয়ান বাজিয়ে গান করে বেড়াব। সেটাই আমার কাছে সবচেয়ে প্রাচীন ও সুন্দর করে গল্প বলার শ্রেষ্ঠ পথ। যেহেতু আমার মা বাচ্চা হওয়ার জন্য পিয়ানো বাজানো ছেড়ে দিয়েছিলেন আর বাবা বেহালা টাঙিয়ে রেখেছিলেন আমাদের মানুষ করতে, তাই তাঁদের জেষ্ঠ্য সন্তান যদি সঙ্গীতের জন্য খেতে না পেয়ে মারা যায় তাহলে সেটাই হবে সবচেয়ে ভালো দৃষ্টান্ত। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান গাওয়া ও স্কুলের দলে তিপলে বাজানোয় অংশগ্রহণ এটাই প্রমাণ করে যে আরও জটিল কোনও বাদ্যযন্ত্র শেখার মতো কান আমার আছে আর আমি গাইতেও পারি।

লিসেয়োর সমস্ত দেশাত্মবোধক সান্ধ্য অনুষ্ঠান বা জাঁকজমকপূর্ণ জলসা সবেতেই আমার কিছু না কিছু যোগ থাকত আর তা সম্ভব হয়েছিল শিক্ষক গিয়েরমো কেবেদো সোরনোসার জন্য। তিনি ছিলেন সুরকার, শহরের বিশিষ্ট নাগরিক ও পৌরসভার গানের দলের চিরন্তন নির্দেশক। তিনিই লিখেছিলেন ‘আমাপোলা’ সঙ্গীতটি – ‘রাস্তার আফিম গাছ, হৃদয়ের মতোই রক্তিম’ – যা সেই সময়ের যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে সান্ধ্য অনুষ্ঠান ও প্রেমের গানের আত্মা হয়ে উঠেছিল। রবিবারে প্রার্থনার পরে প্রথম দলের মধ্যে আমি থাকতাম যারা উদ্যান পেরিয়ে গিয়ে তাঁর কনসার্টের দলে যোগ দিতাম। শুরু হত ‘লা গাডজা লাদ্রা’ দিয়ে, তারপর ‘কোরো দে লোস মার্তিয়োস’ এবং শেষে ‘ত্রোবাতোরে ২’। তিনি কখনও জানতে পারেননি, আমারও কোনোদিন তাঁকে বলার সাহস হয়নি যে সেই সময়ে আমার জীবনের স্বপ্ন ছিল তাঁর মতো হওয়া।

স্কুলে যখন বলা হল যে সঙ্গীত মূল্যায়নের একটি কোর্সের জন্য ছেলে দরকার, গিয়েরমো লোপেস গেররা আর আমি প্রথম হাত তুলেছিলাম। সেটি হবে প্রতি শনিবার সকালে শিক্ষক আন্দ্রেস পারদো তোবারের অধীনে। তিনি ছিলেন ‘বোগোতার স্বর’-এ উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের প্রথম অনুষ্ঠানের অধিকর্তা। সঙ্গীত ক্লাসের জন্য খাবার ঘরের এক-চতুর্থাংশও ভর্তি হয়নি, কিন্তু তাঁর দেবদূতের মতো কন্ঠে আমরা মুহূর্তের মধ্যে আচ্ছন্ন হয়ে গেলাম। তিনি ছিলেন খাঁটি কাচাকো – ঘন নীল রঙের ব্লেজার ও ভেতরে সার্টিনের গেঞ্জি, তরঙ্গময় গলার স্বর এবং সূক্ষ্ণ আদব-কায়দা। আজকের দিনে যেটা প্রাচীন বলে নতুন মনে হতে পারে তা তাঁর হাতে ঘোরানো কলের গানের যন্ত্রটি। সেটি তিনি সিল মাছের প্রশিক্ষকের ভালোবাসা নিয়ে দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করতেন। তাঁর ধারণা ছিল যে আমরা একবারেই নবিশ। সেভাবেই আরম্ভ করলেন। অবশ্য আমাদের কাছে তা ছিল শুধুই ভুল শুধরে নেওয়া। শুরু করলেন সাঁ সন্সের ‘এল কার্নাবাল দে লোস আনিমালেস’ দিয়ে। এই সুরের মধ্যে দিয়ে প্রতিটি জন্তুর চরিত্র বর্ণনা করলেন বিশেষজ্ঞের মতো। তার পরে অবশ্যই বাজালেন প্রোকোফিয়েফের ‘পেদ্রো ই এল লোবো’। শনিবারের এই সঙ্গীত উৎসবের খারাপ দিকটা হল এই যে তখন আমি ভাবতে শুরু করলাম প্রতিথযশা সঙ্গীতকারকদের সঙ্গীত যেন গোপনে শোনার বিষয় আর আমি লজ্জায় ম্লান হয়ে যেতে লাগলাম। আর একটা ব্যাপার বুঝতে আমার বহুদিন সময় লেগেছিল। চট করে কোনও সঙ্গীতকে ভালো বা খারাপ বলা আসলে ঔদ্ধত্যের পরিচয়।

পরের বছর অবধি রেকটরের সঙ্গে আর কোনও যোগাযোগ আমার হয়নি। আবার দেখা হল যখন তিনি চতুর্থ বছরে জ্যামিতির ক্লাস নিতে শুরু করলেন। প্রথম মঙ্গলবার সকাল দশটায় ক্লাসে ঢুকলেন। ভারি গলায় সুপ্রভাত জানালেন, কিন্তু ক্লাসের কারুর দিকে তাকালেন না। সোজা ব্ল্যাকবোর্ড মোছার ছোট্ট তোয়ালে দিয়ে নিখুঁতভাবে বোর্ডটা এমন পরিষ্কার করলেন যে একটুও ধুলো রইল না। তারপর তিনি আমাদের দিকে ফিরলেন এবং নাম না ডেকেই আলবারো লুইস তোররেসকে জিজ্ঞাসা করলেন:

  • ‘বিন্দু কি?’

কোনও উত্তর দেওয়ার আগে সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষক দরজায় টোকা না দিয়েই ক্লাসে ঢুকে রেক্টরকে বললেন যে শিক্ষা দপ্তর থেকে তাঁর জন্য জরুরী ফোন এসেছে। রেক্টর দ্রুত ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেলেন ফোন ধরতে এবং আর কোনোদিনই ক্লাসে ফিরে এলেন না। কারণ ফোন এসেছিল একটা কথাই জানাতে যে তাঁর পদ অন্য কাউকে দেওয়া হবে। তিনি ওই পদে ছিলেন পাঁচ বছর এবং সারা জীবন ধরে সাফল্যের সঙ্গে শিক্ষকতা করেছেন।


 

টীকা

১। সিদ – আসল নাম রোদ্রিগো দিয়াস দে বিবার। তিনি মধ্যযুগের স্পেনের একজন বিখ্যাত রাজা ও নাইট। খ্রীস্টান ও মুসলমান উভয়ের সঙ্গে লড়াই করে তিনি আরবের সইদ (প্রভু) উপাধী পান। তাই কালক্রমে ‘এল সিদে’ পরিণত হয়। স্পেনে তাঁকে ‘এল কাম্পেয়াদোর’ অর্থাৎ চ্যাম্পিয়নও বলা হয়।

২। লা গাডজা লাদ্রা – যোয়াকিনো রোসিনির সৃষ্ট একটি ইতালিয়ান অপেরা যার মধ্যে ট্রাজেডি ও কমেডি উভয়ই আছে। ১৮১৭ সালে প্রথম উপস্থাপিত হয়।

৩। কোরো দে লোস মার্তিয়োস – ‘Anvil Chorus’-এর স্প্যানিশ নাম। জেসেপি ওদি রচিত ত্রোবাতোরে ২ অপেরার একটি জিপসি কোরাস।

৪। ত্রোবাতোরে ২ – ১৮৫৩ সালে জেসেপি ওদির সৃষ্টি চার অঙ্কের একটি কোরাস।

৫। সাঁ সন্স – পুরো নাম কামিয়ে সাঁ সন্স – উনবিংশ শতকের শেষ ও বিংশ শতকের শুরুর রোম্যান্টিক যুগের ফরাসি সুরকার, পিয়ানো ও অর্গান বাদক এবং কন্ডাকটর।

৬। প্রোকোফিয়েফ – সের্গেই প্রোকোফিয়েফ বিংশ শতকের প্রথমার্ধের একজন রাশিয়ান সুরকার ও কন্ডাকটর।