জীবনের কথা বলিতে ব্যাকুল - গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের আত্মজীবনী - পর্ব ৩৪
- 07 June, 2026
- লেখক: অরুন্ধতী ভট্টাচার্য
জীবনের কথা বলিতে ব্যাকুল
(গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের আত্মজীবনী)
মূল স্প্যানিশ থেকে অনুবাদঃ অরুন্ধতী ভট্টাচার্য
পর্ব - ৩৪
আরেকজন যাত্রী আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন সবার থেকে আলাদা থাকার জন্য। সে যুবক, বলিষ্ঠ চেহারা, গায়ের রঙ লালচে-সাদা, চোখে প্লাস পাওয়ারের চশমা ও মাথায় বয়সের আগেই টাক পড়েছে, কিন্তু সেটা তাঁকে বেশ মানাচ্ছিল। কাচাকো পর্যটকের আদর্শ উদাহরণ। প্রথম দিন থেকেই তিনি সবচেয়ে আরামদায়ক চেয়ারটা দখল করে কোনের টেবিলে অনেক নতুন বই জড়ো করে রেখেছেন। সকাল থেকে চোখের পলক পর্যন্ত না ফেলে পড়তে শুরু করতেন একেবারে রাতের পার্টির শোরগোল শুরু হওয়া পর্যন্ত। প্রত্যেক দিন খাবার টেবিলে তাঁকে দেখা যেত সমুদ্রতটে পরার ফুল আঁকা বিভিন্ন শার্ট গায়ে দিয়ে। জলখাবার খেতেন, দুপুরের ও রাতের খাবার খেতেন আর সবচেয়ে বিচ্ছিন্ন ও একা চেয়ারটিতে বসে সারাদিন বই পড়তেন। কারুর দিকে তাকিয়ে একবার হেসেছিলেন বলেও মনে হয় না। আমি ওঁর নাম দিয়েছিলাম ‘অতৃপ্ত পাঠক’।
বইগুলো উঁকি-ঝুঁকি মেরে দেখার চেষ্টা করলাম। বেশিরভাগটাই বদহজম হওয়ার মতো আইনের বই, —যেগুলো তিনি সকালবেলা পড়েন আর লাইনের নিচে দাগ দেন ও লেখেন। বিকেলের দিকের তাজা হাওয়ায় পড়েন উপন্যাস। তারই মধ্যে একটা আমার শ্বাস রুদ্ধ করে দিল—দস্তভস্কির ‘দ্য ডাবল’১। বাররানকিয়ার একটা বইয়ের দোকান থেকে এই বইটা চুরি করার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু পারিনি। ওটা পড়ার জন্য এতই পাগল হয়ে উঠেছিলাম যে ভাবলাম যুবকটির কাছ থেকে চেয়ে পড়ি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সাহসে কুলিয়ে উঠল না। তারপর একদিন তাঁর হাতে দেখলাম ‘লম্বা মোইল’২ (Le Grand Meaulnes) উপন্যাসটি। এই বইটার নাম তখনও পর্যন্ত শুনিনি, কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই সেটা আমার অন্যতম প্রিয় বই হয়ে উঠবে। অন্যদিকে আমি বয়ে নিয়ে চলেছি কয়েকটা মাত্র বই, যার সবগুলোই আমার পড়া কিন্তু আরেকবার পড়ার যোগ্য নয়: পাদ্রে কোলোমার ‘হেরোমিন’৩ (Jeromin) যেটা কোনোদিন শেষ করতে পারিনি; হোসে এউস্তাসিয়ো রিবেরার ‘ঘূর্ণিজল’৪ (La voragine), এদমুন্দো দে আমিসিসের ‘আপেনিনোস থেকে আন্দেস’৫ (De los Apeninos a los Andes) আর দাদুর অভিধানটা, যা অল্প অল্প করে পড়তাম। উলটোদিকে নিরলস পাঠকের পক্ষে এত কিছু পড়ার সময় থাকবে না। আসলে আমি যা বলতে চেয়েছি এবং বলে উঠতে পারিনি তা হল—যেকোনো মূল্যেই আমি ওই যুবকটি হতে চাইছিলাম।
তৃতীয় যাত্রী হল জ্যাক দ্য রিপার, আমার কেবিন-সঙ্গী। ঘুমের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অবোধ্য ভাষায় বকবক করত। তার সেই ভাষ্যে একটা করুণ সুর ছিল। তাতে আমার মাঝরাতের পড়ায় এক অন্য গভীরতা তৈরি করত। আমাকে বলেছিল যে ঘুমের মধ্যে কথা বলার ব্যাপারটা সে জানত না। কোন ভাষাতেই-বা স্বপ্ন দেখত তার সম্বন্ধেও ধারণা ছিল না তার। কেননা ছোটবেলায় সার্কাসে ট্রাপিজ শিল্পীদের সঙ্গে সে ছ’টা এশীয় ভাষায় কথা বলতে পারত, কিন্তু মা মারা যাওয়ার পর সব ভুলে যায়। শুধু পোলিশ ভাষাটা তার মনে আছে, সেই দেশেরই মানুষ সে। তারপর দুজনে কথা বলে বুঝতে পেরেছিলাম ঘুমের মধ্যে যে ভাষায় কথা বলত তা পোলিশ নয়। সে যখন তার অলক্ষুণে ছুরিটায় তেল মাখিয়ে নিজের লালচে জিভে তার ধার পরীক্ষা করত, তখন তার চেয়ে চমৎকার আর কাউকে লাগত না।
তার একমাত্র সমস্যা শুরু হল প্রথম দিন থেকেই। খাবার টেবিলে গিয়ে সে বেয়ারাদের কাছে দাবি করল যে তাকে চারজনের খাবার একসঙ্গে না দিলে তার পেট ভরবে না। ডেকের যিনি প্রধান তিনি তাকে বুঝিয়ে বললেন যে সে যদি আলাদা টাকা দেয় তাহলেই তাকে অতিরিক্ত খাবার দেওয়া হবে এবং অনেকটা ছাড়ও তাতে থাকবে।—কিন্তু তার যুক্তি হল সে সারা বিশ্বের সমুদ্রে ঘুরে বেড়িয়েছে এবং সর্বত্রই মেনে নিয়েছিল যে অভুক্ত না রাখাটা মানবাধিকারের মধ্যেই পড়ে। ব্যাপারটা ক্যাপ্টেন অবধি গড়াল এবং তিনি কলোম্বীয় সুলভ ব্যবস্থা করে দিলেন। তাকে দু’জনেরই খাবার দেওয়া হবে, তবে পরিবেশনকারীরা ভুল করে তাকে আরেকটু বেশি দিয়ে দেবে। এমনকি টেবিলের সঙ্গী ও আশেপাশের কয়েকজন যাদের অত খিদে থাকত না তাদের থালা থেকে সে কাঁটা-চামচ দিয়ে খাবার তুলে নিত। সেখানে থেকে এসব না দেখলে একথা বিশ্বাস করা কঠিন।
আমি যে কী করি তা বুঝতে পারছিলাম না। এমন সময় লা গ্লোরিয়া১৫৬ থেকে একদল ছাত্রছাত্রী উঠল এবং তিনজন-চারজন করে দল তৈরি করে রাতে ভারী সুন্দর প্রেমের বোলেরো গাইতে লাগল। যখন আবিষ্কার করলাম যে তাদের একটা তিপলে বাড়তি আছে আমি সেটা চেয়ে নিলাম। তারপর দুপুরে তাদের সঙ্গে মহড়া দিয়ে একসঙ্গে গান গাইতাম প্রায় মাঝরাত পর্যন্ত। ক্লান্তিকর অবসর সময়ের এমন একটা সমাধান পেলাম যা আমার হৃদয় থেকে উৎসারিত। যে গান গাইতে জানে না সে বুঝতে পারবে না গান গাওয়ার কী আনন্দ।
একদিন পূর্ণিমার রাতে আমাদের ঘুম ভাঙল নদীর তীর থেকে ভেসে আসা এক হৃদয়বিদারী বিলাপে। ক্যাপ্টেন ক্লিমাকো কোন্দে আবেইয়ো, কর্তাব্যক্তিদের একজন, নির্দেশ দিলেন সার্চলাইট জ্বালিয়ে কান্নার উৎস খুঁজতে। আসলে সেটা ছিল একটা বড় মেয়ে-শুশুক। একটা পড়ে যাওয়া গাছের ডাল-পালায় আটকা পড়েছিল। কয়েকজন নাবিক জলে নেমে কাছি গুটিয়ে রাখার যন্ত্রের সাহায্যে তাকে মুক্ত করল। শুশুকটা দারুণ দেখতে, অর্ধেক মেয়ে আর অর্ধেক গরু, প্রায় চার মিটার লম্বা। গায়ের চামড়া উজ্জ্বল ও নরম। বড় স্তনসহ বুকটা যেন বাইবেলের মাতৃরূপের মতো। ক্যাপ্টেন কোন্দে আবেইয়োকে প্রথম বলতে শুনি নদীর জন্তুদের মারতে থাকলে পৃথিবীটাই ধ্বংস হয়ে যাবে এবং তার জাহাজ থেকে গুলি ছোড়া নিষিদ্ধ ছিল। তিনি চিৎকার করে বলেছিলেন:
- ‘কারুর যদি মারতে ইচ্ছে হয় নিজের বাড়িতে গিয়ে মারুক, আমার জাহাজে নয়।’
১৯৬১ সালের ১৯ জানুয়ারি দিনটা আমার কাছে দুর্ভাগ্যজনক। সতের বছর পর ওই দিন এক বন্ধু আমাকে মেহিকোয় ফোন করে জানিয়েছিল যে মাগাঙ্গে বন্দরে দাভিদ আরাঙ্গো আগুন লেগে ভষ্মীভূত হয়ে গেছে। ফোন রেখে ভগ্নহৃদয়ে ভাবলাম সেই দিনই আমার যৌবন শেষ হয়ে গেল। আমাদের স্মৃতির নদীর সামান্য যেটুকু অবশিষ্ট ছিল তাও শেষ হয়ে গেল। এখন মাগদালেনা নদী মৃত। তার জল পচে গেছে আর জলের জন্তুরা বিলুপ্ত। পর পর সমস্ত সরকার তাকে উজ্জীবিত করার জন্য এত কথা বলেছে কিন্তু কাজ কিছুই করেনি। এই কাজ করার জন্য দরকার ব্যক্তি-মালিকানার জমির নব্বই শতাংশ অংশে ষাট লক্ষ গাছ বসানো। তার জন্য ওই জমির মালিকদের শুধু মাত্র দেশকে ভালোবাসার কারণে নিজেদের রোজগারের নব্বই শতাংশ ত্যাগ করতে হবে।
প্রতিটি জাহাজ যাত্রা জীবনের বিরাট শিক্ষা দিত। যাত্রাপথে যে অসংখ্য জনপদের দেখা পেতাম তাদের সঙ্গে ক্ষণস্থায়ী কিন্তু অবিস্মরণীয় এক সংযোগ তৈরি হয়ে ওঠে আর সেখানে আমাদের মধ্যে অনেকেরই নিয়তি চিরদিনের মতো বাঁধা পড়ে যায়। একজন নামকরা ডাক্তারি ছাত্র এক বিয়ের অনুষ্ঠানে অনাহুতের মতো নাচের আসরে ঢুকে পড়ে ও সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েটার সঙ্গে অনুমতি না নিয়েই নাচতে শুরু করে। মেয়েটির স্বামী তাকে গুলি করে হত্যা করে। আরেকজন পুয়ের্তো বেররিয়োতে১৫৭ একটি বিরাট মদের আসরে যে মেয়েটাকে এক ঝলকে ভালো লেগে যায় তাকেই বিয়ে করে এবং নটি সন্তানসহ তারা সুখে সংসার করছে। আমাদের সুক্রের এক বন্ধু হোসে পালেন্সিয়া তেনেরিফের১৫৮ এক ড্রাম বাজানোর প্রতিযোগিতায় একটা গরু পুরস্কার পায় এবং সেখানেই তা বিক্রি করে দেয় পঞ্চাশ পেসোয়। সেই সময়ে এটা বিরাট অঙ্কের টাকা। পেট্রোলের রাজধানী বাররানকাবেরমেহার১৫৯ বিরাট বেশ্যাপল্লিতে আমাদের হতবাক করে দিয়ে দেখা মিলল হোসের তুতো ভাই আনহেল কাসি পালেন্সিয়ার। সে সেখানে একটি বাড়িতে অর্কেস্ট্রার সঙ্গে গাইছে। এর আগের বছরেই সে সুক্রে থেকে উধাও হয়ে গিয়েছিল। কোথাও কোনোভাবে তার কোনও সন্ধান পাওয়া যায়নি। ভোর অবধি চলা সেই আসরের টাকা মিটিয়েছিল অর্কেস্ট্রার ব্যান্ড।
আমার সবচেয়ে খারাপ অভিজ্ঞতা হয়েছিল পুয়ের্তো বেররিয়োর একটা অন্ধকারাচ্ছন্ন পানশালায়। সেখান থেকে পুলিশ আমাদের চারজনকে লাঠি দিয়ে মারতে মারতে বের করে আনল। পুলিশ কোনও কারণ বলল না, আমাদের কোনও কথাও শুনল না। উপরন্তু আমাদের গ্রেপ্তার করল এক ছাত্রীর শ্লীলতাহানির জন্য। আমাদের যখন হেডকোয়ার্টারে নিয়ে গেল ততক্ষণে আসল অপরাধীরা ধরা পড়ে গেছে—এলাকার কয়েকটা গুন্ডা প্রকৃতির ছেলে, যাদের সঙ্গে আমাদের জাহাজের কোনও সম্পর্ক নেই। ছেলেগুলোকে আটক করেছিল ঠিকই, কিন্তু তাদের গায়ে একটা আঁচড়ও কাটেনি।
তারপর এল পুয়ের্তো সালগার১৬০—জলযাত্রার শেষ গন্তব্য। ভোর পাঁচটার সময় সেখানে নামতে হবে উচ্চভূমির উপযুক্ত পোশাক পরে। কালো রঙের স্যুট, ভেতরে হাতকাটা কোট, মাথায় মাশরুম-আকৃতির টুপি ও হাতে ঝুলছে উপরে পরার কোট –এইভাবে যখন যাত্রীরা প্রস্তুত, একদিকে ব্যাঙেদের কোরাস আর অন্যদিকে নদীতে উপচে পড়া মৃত প্রাণীর মড়কের গন্ধের মধ্যে তাদের পরিচিতির বৈশিষ্ট্য আর বজায় রইল না। ঠিক নামার সময় আমার জন্য হঠাৎ একটা চমক অপেক্ষা করছিল। যাত্রার আগের মুহূর্তে মায়ের এক বন্ধুর উপদেশ অনুযায়ী মা একটা বান্ডিল সঙ্গে দেন। তার মধ্যে ছিল একটা সস্তার দড়ির হ্যামক, একটা কম্বল আর জরুরি প্রয়োজনে একটা মূত্রধানী। এই সবকিছু একটা ঘাসের মাদুরের মধ্যে পুরে হ্যামকের দড়ি দিয়ে বাঁধা। আমার গানের বন্ধুরা সভ্যতার সেই শৈশবে আমাকে ওই রকম একটা বোঁচকা নিয়ে যেতে দেখে হেসে বাঁচে না। তারপর ওদেরই একজন যে কাজ করল তা আমি অন্তত করতে পারতাম না। সে আমার বোঁচকাটা ছুঁড়ে জলে ফেলে দিল। আমার সেই যাত্রার অবিস্মরণীয় শেষ দৃশ্য ছিল জলের ঢেউয়ে দুলতে দুলতে বোঁচকাটা তার উৎসের দিকে এগিয়ে চলেছে।
পুয়ের্তো সালগার থেকে ট্রেন ছেড়ে প্রথম চার ঘণ্টা পাহাড়ের কার্নিস বেয়ে হামাগুড়ি দিয়ে উপরের দিকে উঠতে লাগল। সবথেকে খাড়াইতে গিয়ে ট্রেনটা একটু পিছিয়ে গেল। তারপর ড্রাগনের মতো দম নিয়ে আবার উপরে উঠতে শুরু করল। মাঝে মাঝে যাত্রীদের নেমে পড়তে হচ্ছিল ট্রেনের ওজন কমানোর জন্য। হাঁটতে হাঁটতে পরের খাড়াইতে গিয়ে আবার ট্রেনে চাপতে হত। পথের পাশের জনপদগুলো নিতান্তই বিষণ্ণ ও শীতার্ত। ফাঁকা স্টেশনগুলোয় আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল সেইসব মেয়েরা যারা সারা জীবন ধরে শুধু জিনিস বিক্রি করে। ট্রেনের জানলা দিয়ে তারা বেশ বড় ও হলুদ রঙের রান্না করা গোটা মুরগি আর স্বর্গীয় স্বাদের বরফের মতো ঠান্ডা আলু বিক্রি করছে। সেখানেই প্রথম অনুভব করি এক অপরিচিত ও অদৃশ্য শারীরিক অবস্থা—শীত। গোধূলিবেলায় ভাগ্যক্রমে হঠাৎই আবির্ভূত হল নিষ্পাদপ প্রান্তর। দিগন্ত অবধি প্রসারিত সেই প্রান্তর বিরাট বড়, সবুজ রঙের আর ভারি সুন্দর, যেন বা আকাশ সমুদ্র হয়ে গেছে। জগৎ হয়ে উঠল শান্ত ও গতিময়। ট্রেনের পরিবেশও পালটে গেল।
সেই অতৃপ্ত পাঠকের কথা আমি একেবারেই ভুলে গিয়েছিলেম। তিনি আচমকা এসে আমার ঠিক সামনে বসলেন। তাঁকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন খুব তাড়া রয়েছে। তারপর যা ঘটল তা অবিশ্বাস্য। জাহাজে যে বোলেরো গেয়েছিলাম তার একটা গান তাঁর খুব ভালো লেগেছে। আমাকে বললেন যদি সেটা তাঁকে লিখে দিই। আমি শুধু লিখেই দিলাম না, গানের সুরটাও শিখিয়ে দিলাম। তাঁর চমৎকার শ্রবণ-ক্ষমতা ও অসাধারণ সুরেলা গলায় আমি মুগ্ধ হলাম। শোনার পর প্রথমবারেই তিনি একেবারে নিখুঁতভাবে গাইতে পারলেন।
- ‘সেই মেয়েটা এ গান শুনলে মরেই যাবে!’ দীপ্ত চোখে তিনি বললেন।
এইবার বুঝলাম তাঁর কীসের ব্যস্ততা। জাহাজে আমাদের বোলেরো শোনার পর থেকে তিনি ভেবেছেন এই গান গেয়ে প্রেমিকাকে চমকে দেবেন। তিন মাস আগে বোগোতায় মেয়েটি তাঁকে বিদায় জানিয়েছিল আর সেদিন বিকালে সে স্টেশনে তাঁর জন্য অপেক্ষাও করবে। তিনি গানটা দু’-তিনবার শুনেছিলেন এবং টুকরো টুকরো করে খানিক গাইতেও পারতেন। তাই আমাকে ট্রেনে একা বসে থাকতে দেখে তাঁর মনে হয় আমার কাছ থেকে লিখে নেওয়া যেতে পারে। তখন আমিও তাঁকে সাহস করে বললাম, অপ্রাসঙ্গিক হলেও উদ্দেশ্যটা টনটনে, যে আমি ভীষণ অবাক হয়েছি তাঁর কাছে ওইরকম একটা দুষ্প্রাপ্য বই দেখে।
- ‘দ্য ডাবল।’
তিনি হাসলেন, হাসিটা আত্মতৃপ্তির।
- ‘এখনও বইটা পড়া শেষ হয়নি,’ তিনি বললেন, ‘কিন্তু আমার পড়া বইয়ের মধ্যে এটা বড়ই অদ্ভুত।’
তিনি আর কথা বাড়ালেন না। বোলেরোর জন্য অসংখ্য বার ধন্যবাদ দিয়ে করমর্দন করে বিদায় নিলেন।
অন্ধকার হতে শুরু করেছে যখন ট্রেনের গতি কমে এল। বাতিল লোহার স্তুপের একটা বড় শেড পার হয়ে ট্রেন থামল অন্ধকারাচ্ছন্ন এক প্ল্যাটফর্মে। ট্রাঙ্কের হ্যান্ডেল ধরে সাবধানে প্লাটফর্মের দিকে এগোলাম যাতে ভিড়ের ধাক্কায় পড়ে না যাই। আমি প্রায় পৌঁছে গেছি এমন সময় একজন চিৎকার করে ডাকলেন:
- ‘এই ছেলেটা, এই ছেলেটা!’
আমি ফিরে তাকালাম। প্রচুর ছেলে আমার সঙ্গে এগিয়ে চলেছে, তারই মধ্যে ‘অতৃপ্ত পাঠক’ আমার কাছে এসে একটা বই আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে চলে যেতে যেতে বললেন:
- ‘ভালো করে পড়বেন।’ আর জনতার ভিড়ে হারিয়ে গেলেন।
বইটা ছিল সেই ‘দ্য ডাবল’। আমি এত অবাক হয়ে গিয়েছিলাম যে বুঝতেই পারলাম না মুহূর্তের মধ্যে আমার সঙ্গে কী ঘটল। ওভারকোটের পকেটে বইটা রেখে দিলাম। তারপর স্টেশন থেকে বাইরে বেরোতেই সন্ধ্যের এক ঝলক ঠান্ডা বাতাস আমায় আঘাত করল। যেন নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। ফুটপাতে ট্রাঙ্কটা রেখে তার উপর বসলাম ভালো করে নিশ্বাস নিতে। রাস্তায় কোনও জনপ্রাণী নেই। যেটুকু দেখতে পেলাম তা হল বরফতুল্য ঠান্ডা ও ভুতুড়ে একটা এভিনিউয়ের একটা কোণ। ঝিরঝিরে হালকা বৃষ্টি পড়ছে আর তার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে ধুলো। দু’ হাজার চারশো মিটার উচ্চতায় মেরু বাতাস বইছে আর তার জন্যই শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।
ঠান্ডায় মৃতপ্রায় অবস্থায় আধ ঘণ্টার উপর বসে অপেক্ষা করছিলাম। কোনও একজনের আসার কথা। আমার বাবা তাঁর এক আত্মীয় এলিয়েসের তোররেস আরাঙ্গোকে জরুরি টেলিগ্রাম করেছিলেন। তিনিই আমাকে সাহায্য করবেন। আমার তখন চিন্তা কে আসবে না-আসবে তাই নিয়ে নয়, বরং সম্পূর্ণ উলটো প্রান্তের এক জগতে যেখানে কাউকে চিনিনা সেখানে কবরের মতো ট্রাঙ্কটার উপরে বসে আমার প্রচন্ড ভয় করছিল। হঠাৎই একটা ট্যাক্সি থেকে একজন বিশিষ্ট মানুষ নামলেন। তাঁর পরণে গোড়ালি অবধি নেমে আসা উটের লোমের কোট ও হাতে সিল্কের ছাতা। বুঝতে পারলাম ইনিই আমার সেই ত্রাতা, কিন্তু আমার দিকে না তাকিয়ে সোজা চলে গেলেন। আর আমারও সাহস হল না তাঁকে কোনও একটা ইশারা করার। প্রায় দৌড়ে স্টেশনের মধ্যে ঢুকলেন আর অপেক্ষা না করে এক মিনিট বাদেই বেরিয়ে এলেন। অবশেষে আমাকে আবিষ্কার করলেন তিনি এবং আমার দিকে আঙুল দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন:
- ‘তুমিই গাবিতো, তাই না?’
অন্তরের অন্তর থেকে তাঁকে উত্তর দিলাম:
- ‘হ্যাঁ, প্রায় তাই।
টীকা
১। দ্য ডাবল – ফিওদোর দস্তভস্কির লেখা দ্বিতীয় উপন্যাস, প্রকাশকাল – ৩০ জানুয়ারি, ১৮৪৬।
২। লম্বা মোইল – ফরাসি লেখক আলাঁ ফুরনিয়ের একমাত্র উপন্যাস। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রথম মাসে ফুরনিয়ের নিহত হন। এর এক বছর আগে ১৯১৩ সালে উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়।
৩। হেরোমিন – স্পেনের লেখক, সাংবাদিক ও জেসুইট লুইস কোলোমার ঐতিহাসিক উপন্যাস।
৪। ঘূর্ণিজল – কলোম্বিয়ার কবি ও ঔপন্যাসিক হোসে এউস্তাসিয়ো রিবেরার অন্যতম বিখ্যাত উপন্যাস।
৫। আপেনিসোস থেকে আন্দেস – ইতালির লেখক এদমুন্দো দে আমিসিসের উপন্যাস।