জীবনের কথা বলিতে ব্যাকুল - গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের আত্মজীবনী - পর্ব ৩১

জীবনের কথা বলিতে ব্যাকুল

(গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের আত্মজীবনী)

মূল স্প্যানিশ থেকে অনুবাদঃ অরুন্ধতী ভট্টাচার্য

পর্ব - ৩১

প্রথম ছুটিতে আমি সুক্রে এলাম এক রবিবার বিকেল চারটের সময়। ফেরিঘাট সাজানো মালা আর রঙ-বেরঙের বেলুন দিয়ে। প্লাজায় বসে গেছে বড়দিনের বাজার। তখনও পর্যন্ত মাটিতে ভালো করে পা রাখিনি, একটা সুন্দর দেখতে ফর্সা বাচ্চা মেয়ে অবাক করা স্বতঃস্ফূর্ততায় দু’হাত দিয়ে আমার গলা ধরে ঝুলতে ঝুলতে চুম্বনে চুম্বনে আমায় অস্থির করে তুলল। সে আমার বোন কার্মেন রোসা, বাবার বিয়ের আগের সন্তান। সে এসেছে অপরিচিত পরিবারে কিছু সময় কাটানোর জন্য। বাবার আরেক বিবাহ-পূর্ব ছেলে আবেলার্দো সেই সময়েই এসেছিল। সে একজন ভালো দর্জি। প্রধান প্লাজায় সে একটা দোকান দিয়েছে। আমার বয়ঃসন্ধিতে সেই আমাকে জীবন সম্বন্ধে শিক্ষা দিয়েছিল।

নতুন বাড়িতে, নতুন আসবাবের মধ্যে যেন একটা উৎসবের আবহ। সেইসঙ্গে একটা ভাই হয়েছে, নাম হাইমে। সে তিন মাস আগেই জন্মেছে এবং জন্ম নিয়েছে মিথুন রাশির লগ্নে, খুবই ভালো লক্ষণ। এখানে পৌঁছনোর আগে পর্যন্ত আমি সদ্যোজাত ভাইয়ের কথা জানতাম না। মনে হয় বাবা-মা তাদের বাৎসরিক সন্তান প্রসবকে ভালোভাবেই মেনে নিয়েছেন। কিন্তু মায়ের তর সইছিল না; তিনি আমায় বোঝালেন এই সন্তান রিতা সন্ন্যাসিনীর দান কারণ, সে জন্মানোর পর থেকেই সংসারে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য দেখা দিয়েছে। মা যেন নতুন করে যৌবন ফিরে পেয়েছেন। তিনি আনন্দে ভরপুর। অন্যদিকে বাবা তো বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছেন। মন-মেজাজ ফুরফুরে। তাঁর ডাক্তারখানা রুগিতে ভর্তি। ফার্মেসিতেও মজুত অনেক ওষুধ। বিশেষ করে রবিবারে প্রচুর রুগি আসে পার্শ্ববর্তী পাহাড়ি এলাকা থেকে। আমি জানিনা তিনি কখনও বুঝতে পেরেছিলেন কিনা যে তাঁর ওই সমৃদ্ধি আসলে তাঁর রোগ সারানোর দক্ষতার জন্য। গ্রামের লোকেরা অবশ্য তাঁর হোমিয়োপ্যাথিক জ্ঞানের মিছরি ও আশ্চর্য জলের বটিকাকে গুরুত্ব দিত না, বরং তারা বিশ্বাস করত তাঁর জাদুকরী ক্ষমতার উপর।

আমার স্মৃতিতে যা ছিল সুক্রে শহরটাকে যেন তার থেকেও বেশি সুন্দর লাগছিল। এর কারণ বড়দিনের উৎসবের সময় শহরটার দু’ভাগে ভাগ হয়ে যাওয়া—দক্ষিণের দিকে সুলিয়া আর উত্তরের দিকে কোঙ্গোবেয়ো। অন্যান্য ছো্টোখাটো অনুষ্ঠান বাদে সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতা ছিল নৌকোর আদলে তৈরি বড় বড় ট্যাবলোর শোভাযাত্রা—যাতে এলাকার ইতিহাস শৈল্পিক আকারে দেখানো হত। শেষপর্যন্ত বড়দিনের আগের দিন রাতে প্রধান প্লাজায় জড়ো হত সমস্ত মানুষ ও প্রচুর হট্টগোলের মাঝখানে তারাই ঠিক করত কোন এলাকা সেই বছর জয়লাভ করবে।

বাড়িতে আসা অবধি কার্মেন রোসা উৎসবকে নতুন রঙে রাঙিয়ে তুলেছে। সে আধুনিকা, তদুপরি ছলাকলা পটিয়সী। সহজেই সে একদল প্রেমাকাঙ্ক্ষী উচ্ছৃঙ্খল পুরুষের মাঝে নাচের দলের মধ্যমণি হয়ে উঠল। আমার মা, যিনি নিজের মেয়েদের বেলায় সদা-সতর্ক, তিনি কিন্তু কার্মেনের ক্ষেত্রে কিছু বললেন না। বরং তাকে আরও বেশি উৎসাহিত করতে লাগলেন এবং সেই প্রেমিকের দল বাড়িতে একটা নতুনত্বের সূচনা করল। কার্মেনের আর মায়ের সম্পর্কটা ছিল অনেকটা দোসরের মতো, যা কখনও তিনি নিজের মেয়েদের সঙ্গে হননি। অন্যদিকে আবেলার্দো তার জীবন বেছে নিয়েছিল নিজের মতো করে। একটা দর্জির দোকানের একটি ঘরকে পার্টিশান দিয়ে দুভাগ করে নিয়েছিল। দর্জির কাজে সবকিছু মোটামুটি চলছিল, কিন্তু পৌরুষের ঘোড়ার পরিচালনায় যতটা ভালো হচ্ছিল ততটা নয়, কেননা সেলাই মেশিনের নিঃসঙ্গ ও একঘেয়ে কাজের চেয়ে সে অনেক বেশি সময় কাটাত সঙ্গিনী নিয়ে পার্টিশানের ওই পাশের বিছানায়।

সেই ছুটিতে বাবার হঠাৎ খেয়াল চাপল যে আমাকে ব্যবসার কাজের উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। ‘যদি কাজে লাগে,’—আমাকে বোঝালেন। প্রথম যে কাজ আমায় শেখালেন—লোকের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ফার্মেসির বাকি থাকা টাকা আদায় করা। একদিন আমায় পাঠালেন শহরের প্রান্তে ‘লা ওরা’ বাড়িতে। সেটা একটা খোলামেলা পতিতাপল্লি।

রাস্তার ধারের একটা ঘরের আধখোলা দরজা দিয়ে উঁকি মেরে দেখলাম ভেতরে এয়ার ম্যাট্রেসের উপর এক মহিলা ঘুমোচ্ছেন। তাঁর খালি পা আর পরণে একটা স্লিপ যা তাঁর উরু পর্যন্তও ঢাকতে পারেনি। তাঁকে কিছু বলার আগেই তিনি বিছানার উপর উঠে বসে ঘুমন্ত চোখে আমায় দেখে জানতে চাইলেন কী দরকার? বললাম যে মালিক এলিহিয়ো মোলিনাকে বাবা একটা কথা বলতে পাঠিয়েছেন। কিন্তু আমি কোথায় যাব তা না বলে আমাকে ভেতরে ডাকলেন ও দরজা বন্ধ করে দিলেন। তারপর তর্জনী দিয়ে একটা ইশারা করলেন যা আমাকে সব বলে দিল:

  • ‘এখানে এসো।’

সেখানে গেলাম এবং যত তাঁর দিকে এগোচ্ছিলাম তাঁর বড় বড় শ্বাস বন্যার জলের মতো ঘরটাকে ছাপিয়ে উঠছিল। তখনই তিনি ডান হাত দিয়ে আমাকে ধরে ফেললেন ও বাঁ হাতটা আমার প্যান্টের মধ্যে ঢুকিয়ে দিলেন। অনুভব করলাম একটা মিস্টি ভয়।

‘তার মানে তুমি হলে বটিকা দেওয়া ডাক্তারের ছেলে,’ আমাকে বলছিলেন আর প্যান্টের ভেতরে কর্মতৎপর পাঁচটি আঙুল দিয়ে আমাকে এমনভাবে ছুঁয়ে চলেছেন যেন মনে হচ্ছিল দশটা আঙুল। আমার কানের কাছে ফিসফিস করে উত্তপ্ত কথা বলতে বলতে তিনি আমার প্যান্ট খুলে দিলেন, মাথার উপর দিয়ে খুলে ফেললেন নিজের স্লিপ এবং বিছানার উপর চিৎ হয়ে যখন শুয়ে পড়লেন তখন তাঁর গায়ে শুধু রঙিন ফুলের এক প্যান্টি। ‘এটা তুমি খুলবে,’ আমাকে বললেন, ‘এটা পুরুষের কাজ।’

আমি তার প্যান্টির চেন টেনে নামালাম কিন্তু তাড়াহুড়োয় সেটা খুলতে পারলাম না। তখন তিনি আমায় সাহায্য করলেন তাঁর পা দুটো ভালো করে ছড়িয়ে সাঁতারুর মতো দ্রুত শরীরি আন্দোলনে। তারপর আমার বগল ধরে তুলে তাঁর উপর শুইয়ে দিলেন। বাকিটা তিনি নিজেই করলেন যতক্ষণ না আমি ওই শোয়া অবস্থাতেই তাঁর ভরাট উরুর পিঁয়াজের স্যুপের মধ্যে ছটফট করতে করতে সম্পূর্ণ শেষ হয়ে যাই।

তিনি পাশ ফিরে শুয়ে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। আমিও চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে রইলাম, আরেকবার নতুন করে শুরু করার অপেক্ষায় – এবারে ভয় না পেয়ে ও বেশি সময় ধরে। হঠাৎ করে বললেন যে আমার কাছ থেকে তাঁর দর দুই পেসো নেবেন না, কারণ আমি প্রস্তুত হয়ে আসিনি। তারপর আবার সোজা হয়ে শুয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আমার মুখ দেখতে দেখতে বললেন:

  • ‘আরে, তুমি লুইস এনরিকের ভাই, তাই না? একেবারে এক গলার স্বর।’

আমি নিষ্পাপ সারল্যে জিজ্ঞাসা করলাম কী করে আমার ভাইকে চেনেন।

  • ‘বোকার মতো কথা বলো না,’ হাসতে হাসতে বললেন, ‘এখনও পর্যন্ত তার দুটো জাঙ্গিয়া এখানে আছে। আগের দিন সে-দুটো আমায় কাচতে হয়েছিল।’

ভাইয়ের বয়সের কথা চিন্তা করে কথাটা একটু বাড়িয়ে বলছেন বলে মনে হল, কিন্তু জাঙ্গিয়া দুটো দেখাতেই বুঝতে পারলাম যে কথাটা সত্যি। তারপর নগ্ন অবস্থাতেই ব্যালে নাচের ভঙ্গিমায় বিছানা থেকে উঠলেন ও জামা পরতে পরতে আমায় বলে দিলেন যে পাশের দরজার বাঁ দিকে আছেন এলিহিও মোলিনা। শেষে জিজ্ঞাসা করলেন:

  • ‘তোমার এটা প্রথম বার, তাই না?’

আমার হৃৎপিন্ডের একটা স্পন্দন বাদ পড়ে গেল।

  • ‘কী যে বলো,’ মিথ্যে কথা বললাম, ‘এই নিয়ে সাতবারের মতো।’
  • ‘সে যাই হোক,’ মজা করে বললেন, ‘বাড়ি গিয়ে ভাইকে বলতে পারো যে তোমায় একটু-আধটু শিখিয়েছি।’

এই সূচনা আমার মধ্যে এক ধরণের প্রাণশক্তি জাগ্রত করল। ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ছুটি ছিল। মনে মনে হিসাব করলাম তাঁর কাছে আবার যাওয়ার জন্য দুই পেসো করে কতবার জোগাড় করতে পারি। ইতিমধ্যে শরীরি অভিজ্ঞতার অধিকারী আমার ভাই হেসে কুটোপাটি হল। তার মতে যে কাজ দুজনে একসঙ্গে করবে এবং দুজনেই আনন্দ পাবে তার জন্য একজনকে টাকা দিতে হবে কেন।

লা মোহানার সামন্ততান্ত্রিক বাতাবরণে জমির মালিকেরা তাদের প্রজাদের কাছ থেকে কুমারী মেয়েদের নিয়ে এসে কয়েক রাত বিকৃত উপভোগের পর তাদের ছেড়ে দিত নিজের ভাগ্যের উপর। নাচ শেষ হওয়ার পরে এইসব মেয়েদের অনেকে যখন প্লাজায় বের হত শিকারের সন্ধানে তখন তাদের একজনকে ধরতে হত। কিন্তু সেই ছুটির সময়ে পূর্বের টেলিফোন-ভীতির মতো ভয় আমাকে টেনে রাখল আর সামনে দিয়ে মেয়েদের শুধু জলে ভেসে যাওয়া মেঘেদের মতো চলেই যেতে দেখলাম। হঠাৎ পাওয়া সেই প্রথম অভিজ্ঞতা আমার শরীরে এমন এক যন্ত্রণার সৃষ্টি করেছিল যে তারপর থেকে এক মুহূর্তের জন্য আমি স্বস্তি পাচ্ছিলাম না। আজও যখন ভাবি সে কথা, মনে হয় এটা বলা অত্যুক্তি হবে না যে—ওই ঘটনার জন্যই জঘন্য মেজাজ নিয়ে স্কুলে ফিরেছিলাম। তারপর থেকে বোগোতার কবি হোসে মানুয়েল মাররোকিনের একটা বিদঘুটে কবিতায় সম্মোহিত হয়ে সেটা আবৃত্তি করে যেতাম আর প্রথম স্তবক থেকেই শ্রোতাদের পাগলপারা দশা হত।  

“এখন যে কুকুর ডাকছে, এখন যে কাক ডাকছে,

এখন যে ঘণ্টায় জোরে জোরে বাজছে ঊষার ধ্বনি;

আর গাধাদের ডাক ও পাখিদের কলকাকলি,

আর পাহারাদারের হুইসেল ও শুয়োরের ঘোঁত ঘোঁত,

আর ভোরের গোলাপে স্বর্ণাভ বিস্তৃত মাঠ,

আমার কান্নার ধারায় ঢেলে দেয় তরল রুপালি

আর ঠান্ডায় কেঁপে কেঁপে ওঠে যদিও পোড়ে হৃদয়,

আমি এসেছি আমার প্রেম নিয়ে তোমার জানালার নিচে।”

আমি যখন যেখানে যেতাম ওই কবিতার অন্তহীন লাইন আউড়ে বিশ্রী গোলমাল পাকাতাম আর আবৃত্তি করতাম স্থানীয় মানুষদের উচ্চারণে—যদিও সে কোন স্থান তা কেউ জানত না। ক্লাসে যে কোনো প্রশ্নের ফটাফট উত্তর দিতাম, কিন্তু বেশিরভাগ সময়ে তা হয় অদ্ভুত নয় মজার হত আর মাস্টারমশাইরা পালানোর পথ পেতেন না। এরকমটা প্রায়শই ঘটত। একটা পরীক্ষায় আমি সঠিক উত্তরটা এমনভাবে লিখেছিলাম যে প্রথম নজরে তার পাঠোদ্ধার ছিল অসম্ভব এবং তিনি স্বাভাবিকভাবেই আমার মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উদগ্রীব হয়ে পড়েছিলেন। সবাইকে আনন্দ দেওয়া ছাড়া এসবের পেছনে আমার অন্য কোনও উদ্দেশ্য ছিল না।

আমি অবাক হয়ে দেখলাম যে পুরোহিতরা এমনভাবে আমার সঙ্গে কথা বলছে যেন আমি পাগল হয়ে গেছি আর আমিও তাদের সঙ্গে তাদের মতোই কথা বলতে লাগলাম। আমার আরেকটা ভয় ছিল যে—ধর্মীয় গানের প্যারডি করার সময়ে তার মধ্যে কিছু পৌত্তলিক শব্দ ব্যবহার করেছিলাম,ভাগ্যক্রমে সেগুলো কেউ বুঝতে পারেনি। বাবা-মায়ের অনুমতি নিয়ে আমার কাউন্সেলর আমাকে নিয়ে গেলেন একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে। তিনি একটা ক্লান্তিকর কিন্তু মজার পরীক্ষা করলেন। তাঁর প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব ছাড়াও এক দুর্নিবার সহানুভূতি ও আকর্ষণীয় পদ্ধতি ছিল। তিনি ভুলভাবে লেখা একটি কার্ড দিলেন যা আমাকে সঠিকভাবে পড়তে হবে। এত উৎসাহ নিয়ে সেটা পড়লাম যে ডাক্তার আমার খেলার অংশী হওয়ার লোভ সামলাতে পারলেন না। আমাদের মাথায় এমনসব অদ্ভুত পরীক্ষার ধারণা এল যে তিনি সেগুলো টুকে নিলেন ভবিষ্যতের পরীক্ষায় ব্যবহার করার উদ্দেশ্যে। আমার সমস্ত অভ্যাস নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে প্রশ্ন করার পর জিজ্ঞাসা করলেন আমি কতবার হস্তমৈথুন করেছি। প্রথম যা মাথায় এল তাই বললাম: কোনোদিন সাহস হয়নি। এ কথা তিনি বিশ্বাস করলেন না, কিন্তু অসতর্কভাবে বললেন যে যৌন স্বাস্থ্যের জন্য ভয় ভালো না এবং ওই অবিশ্বাস, আমার মনে হয়েছিল, আমাকে খানিকটা উসকে দেওয়ার জন্য। লোকটাকে দারুণ লেগেছিল। ‘এল এরালদো’-য় সাংবাদিকতা করার সময় তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলাম যাতে জানতে পারি আমাকে দেখার পরে আমার সম্বন্ধে কী কী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু, একটাই কথা শুনতে পেলাম যে বহু বছর আগেই তিনি আমেরিকা যুক্তরাস্ট্রে চলে গেছেন। ওঁর বন্ধুদের একজন খুবই স্পষ্টবক্তা ছিলেন এবং ভালোবাসার সঙ্গেই আমাকে বললেন যে শিকাগোর কোনও মানসিক হাসপাতালে থাকলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই, কারণ সবসময়ে তিনি মনে করতেন যে রুগিদের থেকেও তাঁর অবস্থা অনেক খারাপ।

ডাক্তার নির্ণয় করেছিলেন যে খাওয়ার পরে বই পড়ার জন্য আমার স্নায়বিক অবসাদ হয়েছে। তাই দু’ ঘণ্টা হজমের সময় সম্পূর্ণ বিশ্রাম নিতে হবে ও খেলাধুলার চেয়েও অধিক পরিশ্রমের শারীরিক কাজ করতে হবে। বাবা-মা ও শিক্ষকরা যে নিষ্ঠার সঙ্গে এই নির্দেশকে মেনে নিয়েছিলেন তা ভাবলে আজও আমার অবাক লাগে। আমার পড়ার সময় বেঁধে দিলেন এবং ক্লাসের মধ্যে ডেস্কের নিচে বই রেখে পড়তে দেখে একাধিকবার তা নিয়ে নিলেন। শক্ত কিছু বিষয় থেকে অবশ্য আমায় রেহাই দেওয়া হল, কিন্তু দিনে বেশ কয়েক ঘণ্টা শারীরিক পরিশ্রম করতে বাধ্য হলাম। ফলত অন্যরা যখন ক্লাস করছে আমি তখন বাস্কেট বল মাঠে বাচ্চাদের মতো বাস্কেটে বল ছুঁড়ছি আর কবিতা মুখস্থ বলছি। আমার সহপাঠীরা প্রথম থেকেই বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে গিয়েছিল: একদল, যারা ভাবত যে সবসময়ই আমি পাগল ছিলাম, অন্যদল মনে করত এই রকম মজায় জীবন কাটানোর জন্য পাগলামোর ভান করছি আর অন্য একটা দল ভাবত আমার সঙ্গে এই ধরণের আচরণ করা হচ্ছে কেননা শিক্ষকরাই আসলে পাগল। এই সময়ে একটা গল্প শোনা যেতে লাগল যে আমাকে স্কুল থেকে বিতাড়ন করা হয়েছে কারণ বোর্ডে তিনের নামতা লেখার সময়ে আমি অঙ্কের শিক্ষকের গায়ে কালি ছিটিয়ে দিয়েছি। সৌভাগ্যক্রমে বাবা ব্যাপারটাকে খুব সহজভাবে দেখলেন ও সিদ্ধান্ত নিলেন যে ওই স্কুলে থেকে সময় ও টাকা অপচয় না করে বাড়ি ফিরে আসাই ভালো, কেননা আমার যা হয়েছে তা লিভারের অসুখ ছাড়া আর কিছু নয়।

অন্যদিকে আমার ভাই আবেলার্দোর জীবনে এমন কোনও সমস্যা ছিল না যার সমাধান বিছানায় হত না। যখন আমার বোনেরা সমবেদনা দিয়ে আমায় সুস্থ করে তুলতে চাইছে, সে আমায় এক জাদুকরী নিদান দিল। তার দোকানে যেতে সে আমাকে বলল:

  • ‘তোর যেটা দরকার সেটা হল একটা ভালো মেয়ে।’

এই ব্যাপারটা সে সত্যিই গুরুত্ব দিয়ে দেখল। তাই বিলিয়ার্ড খেলার জন্য তার যে আধ ঘণ্টা সময় লাগত, তখন আমায় রেখে যেত তার দোকানের পার্টিশনের ওই পারে তার বান্ধবীদের সঙ্গে। সব ধরণের মেয়েরাই আসত আর কখনও একই মেয়ের পুনরাবৃত্তি ঘটেনি। সেই পর্বটা ছিল উদ্বৃত্ত সৃজনশীলতার সময় আর তাতেই মনে হল আবেলার্দোর নিদান কাজে লাগল। পরের বছর সুস্থ-সবল মন নিয়ে স্কুলে ফিরে গেলাম।

 

১। লা মোহানা – উত্তর কলোম্বিয়ার একটি বিস্তীর্ণ জলাভূমি যা তিনটি নদীর জলে সমৃদ্ধ – সান হোর্হে, কাউকা ও মাগদালেনা। এটি একটি নদী-বদ্বীপ।

২। হোসে মানুয়েল মাররোকিন রিকাউর্তে – কলোম্বিয়ার ৪৪তম রাষ্ট্রপ্রধান ও কবি। জন্ম – বোগোতা, ১৮২৭ এবং মৃত্যু – বোগোতা, ১৯০৮। ১৯০০ – ১৯০৪ রাষ্ট্রপতি পদে ছিলেন এবং কলোম্বিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধে তাঁর পূর্বপুরুষদের উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে।