এভারেস্ট বেস ক্যাম্প : সাগর মাথার পায়ের কাছে - দ্বিতীয় পর্ব

প্রথম পর্বের লিংক 

আগেরদিন নামচেবাজারে ভীষণ বোরিং সময় কেটেছে। আগেই বলেছি দিনটা আমাদের অ্যাক্লাইমেটাইজেশন ডে ছিল। প্ল্যান ছিল সেদিন ব্রেকফাস্ট করে এভারেস্ট ভিউ পয়েন্ট হোটেলে গিয়ে এভারেস্টকে দেখা। তারপর নেমে এসে উল্টো দিকের রাস্তায় শেরপা গ্রাম খুমজুম ঘুরতে যাওয়ার। কিন্তু অনবরত বৃষ্টি আর মেঘলা আকাশ আমাদের প্ল্যান ভেস্তে দিলো। সকালে একবার মার্কেট ঘুরতে বেরিয়ে বৃষ্টি শুরু হওয়ায় হোটেলে ঢুকে গেছি। দুপুরে আবার চিকেন ভাত বিকেলে চানাচুর আমতেল দিয়ে মুড়ি মেখে খেয়ে কিছু জামাকাপড় আর খাবার দাবার লেফট লাগেজ করে নিয়েছিলাম। সন্ধ্যেবেলাও যথারীতি ডাইনিং এ বসে গল্প করে কেটেছে। আর কত গল্পই বা করবো!!রাতে আবার মোমো আর নুডলস খেয়ে চটজলদি ঘুম।

আজকে সক্কাল সক্কাল ঘুম থেকে উঠে জানালার পর্দা সরিয়ে একটা ভালো দিনের ইঙ্গিত পাওয়া গেলো। মাউন্ট  থামসেরকু এবং মাউন্ট কাংটেগা যারা কিনা নামচেকে ঘিরে রেখেছে আমরা এই দুদিনে যাদের কিছুই দেখতে পাইনি আজকে তারা খানিকটা পরিষ্কার হচ্ছে। ওয়েদার ভালোর দিকে যাবে বলে মনে হচ্ছে। সেই আনন্দে তাড়াতাড়ি দুধ কর্নফ্লেক্স খেয়ে রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়লাম। আমাদের খাবারের ব্যাগ একটা কমিয়ে সেখানে কিছু ড্ৰাই ফুড আর জামাকাপড় লেফট করা হয়েছে। সকাল আটটা নাগাদ যাত্রা শুরু করলাম। আজ পৌঁছতে হবে থ্যাংবোচে।  

 

রাস্তা মনাস্ট্রির পাশ দিয়ে নামচেকে বেষ্টন করে বামদিকে চলে গেছে। প্লেন মাটির রাস্তা বহুদূর পর্যন্ত গেছে। দূরে অনেক নিচে দুধকোশী নদী ডানদিকে। আকাশ পরিষ্কার তাই নিচে পিছন দিকে হিলারি ব্রিজ দেখা যাচ্ছে। আর সামনে ডানদিক ঘেঁষে উন্মুক্ত হচ্ছে সোলোখুম্বু এলাকার সুন্দরী হিরোইন মাউন্ট আমাদাবলাম। 'আমা' শব্দের অর্থ মা আর 'দাবলাম' হলো মায়ের কোলে সন্তান। উঁচু যে অংশ তিনি মা আর পাশেই নিচু অংশ কোলের শিশু গলার হারের মতো দুলছে যেন।

এই পিকটি সত্যিই অদ্ভুত। এই যে একবার দেখা দিলো তারপর সারা ট্রেক রুটে একে বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন শেপে দেখা যাবে। একটি পিককে একটি ট্রেক রুটেই এত রূপে এর আগে কখনো দেখিনি। এটা এতটাই লম্বা রুট। তবে সুন্দরী সহজে ধরা দিচ্ছেননা। মেঘের আড়ালে কখনো চলে যাচ্ছেন। তো আবার বেরিয়ে আসছেন।

এইভাবে মেঘ যুদ্ধের খেলা বেশ কিছুক্ষণ চললো। আমরাও অনবরত ছবি তুলে গেলাম। পুরো ট্রেক রুটে আজকে প্রথম ঝকঝকে ওয়েদার পেয়েছি সাথে পিক। আমাদের আর পায় কে!!রাস্তায় মাঝে মাঝে চোর্তেন করা আছে। হালকা সিঁড়ি বেয়ে ওঠা তারপর আবার সোজা রাস্তা। এইভাবে ঘন্টা দুয়েক হেঁটে দাঁড়িয়ে ছবি তুলে আমরা কিয়ানজুমা গ্রামে এসে পৌঁছলাম। ফেরারদিন এখান থেকে আমদাবলামের ভীষণ ভালো ভিউ পেয়েছিলাম। এখানে ছোট্ট একটি মার্কেট আছে যেখানে হাতে তৈরি জিনিস বিক্রি হচ্ছে।

কিয়ানজুমা থেকে একটা রাস্তা বামদিকে রেলিং দেওয়া সিঁড়ি বেয়ে গোকিয়ো সরোবরের দিকে চলে যাচ্ছে। আর আমরা যাবো ডানদিকের জঙ্গলের উৎরাই রাস্তায়। অনেকটা নিচে নেমে নদী পেরিয়ে পৌঁছতে হবে ফুঙ্গিটুঙ্গা গ্রামে। নামার সময় ভাবছি ফেরারদিন এই রাস্তা উঠতে হবে

সানাসা, লোসাসা গ্রাম পেরিয়ে উৎরাই পথে দেড় ঘন্টায় ফুঙ্গিটুঙ্গা পৌঁছে লাঞ্চ অর্ডার করা হলো। এখন সাড়ে এগারোটা বাজে। কিন্তু রাস্তায় আর গ্রাম নেই তাই এখানেই খেয়ে নিতে হবে। তারপর চড়াই পথে থ্যাংবোচে। আমি আর পূরবী নেপালি ভাত ডাল সবজি নিলাম। ভাত খেলে হাঁটতে অসুবিধা হবে এই ভয়ে নন্দিনীদি আর সুপ্রিয় নুডলস খেলো। রেস্ট করে আবার হাঁটা শুরু।

প্রথমেই একটা ব্রিজ পার করে চেক পোস্ট পড়লো। তারপর দম ফাটা চড়াই শুরু হলো। হালকা জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে রাস্তা। কুয়াশা এসে রাস্তা ঢেকে দিচ্ছে। প্রায় দুঘন্টা চড়াই রাস্তার শেষে পৌঁছলাম থ্যাংবোচে।

থ্যাংবোচের শুরুতেই একটা মনাস্ট্রি রয়েছে। এটি সোলোখুম্বু এলাকার সব থেকে বড় মনাস্ট্রি। হোটেল পৌঁছে ফ্রেশ হয়ে আমরা মনাস্ট্রি ঘুরতে বেরোলাম।

মনাস্ট্রিকে ঘিরেই এই অঞ্চলটি তৈরি হয়েছে। তাই এখানে হাতে গোনা দু তিনটি হোটেল আর কয়েকটি বেকারি রয়েছে। জায়গা না পেয়ে অনেকেই তাই আরও হেঁটে নিচের দেবোচে গ্রামে চলে যাচ্ছে। মনাস্ট্রিতে তখন প্রেয়ারের টাইম। জুতো খুলতে হবে বলে কেও ভিতরে ঢুকলোনা আমি ছাড়া। বেশ কিছু বিভিন্ন দেশের ট্রেকারদের সাথে বসে প্রার্থনা শুনলাম। হঠাৎ দেখি লামাদের চা পরিবেশন করা হচ্ছে। মনে হলো ওটা প্রার্থনার অঙ্গ। ওই ঠান্ডার মধ্যে আমারও চা চা করে উঠলো মনটা। সবাই মিলে হোটেলে ফিরে চা অর্ডার করে ডাইনিং এ বসা হলো।

একটি বড় ট্রেকিং গ্রুপ এসেছে বিভিন্ন দেশের ট্রেকারদের একত্রিত করে। তাদের বিচিত্র কার্যকলাপ দেখতে লাগলাম। তবে সবাই দেখলাম প্রচন্ড পরিমানে জামাকাপড় শুকোতে ব্যস্ত। আসলে হাঁটার সময় তো জামা ঘামে ভিজে যাচ্ছে সেটাই আগুনের পাশে রেখে শুকিয়ে নিচ্ছে। আমাদের ওসব বালাই নেই। কে কী করে সেটাতেই বেশী ইন্টারেস্ট। একজন একলা বেশ লম্বা দাঁড়িওয়ালা ট্রেকার অনেকক্ষন ধরে ডাইরি লিখে তারপর তার গাইডের সাথে দাবা খেলা শুরু করলো। বড় বিষণ্ন যেন সবার মধ্যেও। আমাদেরও গল্প গুজবে সময় চলছে।

হোটেলের মালকিন ভদ্রমহিলার কর্মতৎপরতা দেখে আমরা মুগ্ধ। হাসি মুখে এতজনের বিভিন্ন আবদার সামলাচ্ছেন একা হাতে। আর ওনার রান্নাঘরে অত্যাধুনিক সমস্ত আয়োজনও রয়েছে। কফি মেশিন থেকে শুরু করে পিৎজা বানানোর মেশিন পর্যন্ত। আজকে খুবই ঠান্ডা। আমরা প্রায় চার হাজার মিটারের কাছাকাছি রয়েছি।

সন্ধ্যে ঘনিয়ে আসতে পূরবী হঠাৎ করে বাইরে বেরিয়ে  চাঁদের আলোয় রুপোলি পর্বতশৃঙ্গ দেখে ডাইনিং এ জানাতেই সবাই ক্যামেরা নিয়ে পড়িমরি করে ছুটলো। আমরাও ছুটলাম। বেরিয়ে এসে দেখি হোটেলের পিছনে মাউন্ট আমাদাবলাম সপারিষদে দাঁড়িয়ে আছে। ডানদিকে মাউন্ট থামসেরকু আর কাংটেগা। পিছনে মাউন্ট খুম্বিলা। আকাশগঙ্গা দেখা যাচ্ছে। অপার্থিব আলোয় চারিদিক ভেসে যাচ্ছে। কে যেন মনে করালো আগামীকাল কোজাগরী পূর্ণিমা। শেষ রাতে আরও চমক বাকি ছিলও۔

۔উঁকি

চাঁদের আলোয় পাহাড়চূড়ার ইভনিং শো দেখে ডাইনিঙে ফিরে এলাম। ডিনার অর্ডার করে হোটেলের মালকিনের সাথে গল্প করতে করতে জানা গেলো হোটেলের উত্তরদিকের সব জানালা থেকেই নাকি 'তাকে' দেখা যায়। আমাদের আর দেখে কে!শোনামাত্র ডাইনিং এর জানালার কাঁচে চোখকে একেবারে আটকে দিয়ে 'তাকে' দেখার চেষ্টা করলাম। কিন্তু এমনিতেই তিনি সবসময় নিজের সঙ্গীসাথীদের কড়া প্রহরাতে থাকেন তার ওপর বাইরে ঘন অন্ধকার। 'তার' বেরোনোর কোনো পারমিশনই নেই। হতদ্যম হয়ে আবার টেবিলে এসে বসতে না বসতেই রাতের খাবার দেওয়া শুরু হয়ে গেলো।

প্রত্যেকেকে একটা করে গরম ধোঁয়া ওঠা ভেজা তোয়ালে দেওয়া হচ্ছে ফ্রেশ হওয়ার জন্য। এটা আমাদের সবার খুব পছন্দ হয়েছে। সারাদিন রাস্তার ধকল, স্নান না করা,সব ক্লান্তি দূর হয়ে গেলো ওই ভীষণ সুন্দর গন্ধযুক্ত তোয়ালেতে হাত মুখ মুছে। এদিকে একে একে খাবার আসতে থাকলো। এক একজনের এক একরকম অর্ডার। পিৎজা পাস্তা বার্গার নুডলস কী নেই!!আমরা অভিভূত হয়ে যাচ্ছি ঐটুকু জায়গার মধ্যে একা এত ব্যবস্থা ভদ্রমহিলা কী সুন্দরভাবে করেছেন। এমনিতে নিয়ম হলো গাইডরাই খাবার সার্ভ করে। কিন্তু সেদিন দুই বুদ্ধিরাজকেই বহুক্ষণ ধরে দেখতে পাইনি। ভদ্রমহিলা নিজেই আমাদের খাবার পরিবেশন করলেন। অসাধারণ ভালো চিকেন ভাত খাওয়া হলো।

আমাদের সব গেস্টদের খাওয়া শেষ হওয়ার পর গাইড পোর্টারা খায়। ওদেরও খুব যত্ন নিয়ে ভদ্রমহিলা খাওয়ালেন۔বুদ্ধিরাজদ্বয়ও চলে এসেছে। তারা তাদের ঘরে রেস্ট নিচ্ছিলো জানালো। তারপর একে একে সবাই শুতে এলাম

সারারাত ভালো করে ঘুম হলোনা 'তাকে' দেখা যাবে এই উত্তেজনায়। সূর্যোদয়ের অপেক্ষা করতে লাগলাম ভোর চারটে থেকে। ভোরের আলোয় যদি সে বেরোনোর পারমিশন পায়!পূরবী জানালার কাঁচ দিয়ে যেই একটু আলোর আভাস পেয়েছে আমাদের সবাইকে তুলে দিয়ে ক্যামেরা নিয়ে বাইরে। আমরাও ঝটপট শীতের পোশাক পরে রেডি হয়ে একেবারে মনাস্টির সিঁড়িতে চলে এসেছি। ততক্ষনে সামনের পর্বতশৃঙ্গগুলোতে সূর্যের আলো এসে পড়তে শুরু করেছে ।

যার ওপর প্রথম আলো পড়লো সেই তো 'তিনি'। যার জন্য এত দূর থেকে এত কষ্ট করে এত পয়সা খরচ করে আসা। তবে সামনেই লোৎসে এবং লোৎসে সার শৃঙ্গের পাহারায় 'তাকে' খুব ভালো দেখা গেলোনা। শুধু একটু উঁকি দিয়ে সঙ্গীদের সাথে আলোর খেলায় মেতে গেলেন। তাতেও আমাদের কোনো দুঃখ নেই। চারিদিকের কালকের অন্ধকারে ঢাকা পিকগুলো আজকে সোনালী আলো মেখে আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। মনাস্ট্রির সামনের মাঠ অদ্ভুত এক আলো কুয়াশায় ভরে উঠেছে। সবটাই যেন অপার্থিব লাগছে। আমরা যেন এই পৃথিবীতে নেই। স্বর্গের কোনো একপ্রান্তে যেন বিচরণ করছি।

সূর্যোদয় দেখে প্রচুর পরিমানে ফটো তুলে হোটেলে ফিরে রোজদিনের মতো দুধ কর্নফ্লেক্স খেয়ে রেডি হয়ে সাড়ে আটটা নাগাদ বেরিয়ে গেলাম। আজকে বেশ অনেকটা হাঁটা। পৌঁছতে হবে ডিংবোচে।

হাঁটার শুরুতেই বাঁধানো রাস্তায় উৎরাই পথে মিনিট তিরিশের মধ্যে দেবোচে গ্রামে পৌঁছলাম। আজকেও হাঁটতে খুব মজা লাগছে। ভালো ওয়েদার। সামনে গাছের আড়ালে পর্বত শৃঙ্গের উঁকিঝুঁকি। প্রচুর ফটো তুলতে তুলতে এগোচ্ছি। এসে গেলো নদীর পাড়ে মিলিঙ্গ গ্রাম। হাতে গোনা ঘরবাড়ি নিয়ে এই গ্রাম। সামনেই ইমজা খোলার ওপর ঝুলন্ত ব্রিজ পার হয়ে প্রকৃতির অপূর্ব দৃশ্য দেখে আমরা অনেকক্ষন দাঁড়িয়ে গেলাম সেখানে। ডানদিক দিয়ে নদী বয়ে চলেছে। সামনেই আমাদাবলাম সমহিমায় দাঁড়িয়ে। সিঁড়ি রাস্তা ওপর দিকে ওঠে গেছে প্যাংবোচে গ্রামের দিকে। ওপরে গ্রামে ঢোকার মুখে অপূর্ব কারুকার্যময় তোরণ দেখা যাচ্ছে। আমরা তো প্রচুর ফটো তুলছি। আর রাস্তায় যারা যাচ্ছে তাদের সাথে আলাপ চালিয়ে যাচ্ছি। এক বৃদ্ধার সাথে দেখা। মাথায় ঝুড়ি নিয়ে কোথায় চলেছেন কে জানে। উনি বোধহয় ওই রাস্তাতেই ঘোরাফেরা করেন কারণ ফেরার পথেও ওনার সাথে আমাদের দেখা হবে। পূরবী ওনাকে কিছু টাকা দিলো। তার বিনিময়ে আমরা পেলাম একটা মনভোলানো  হাসি। এখানেই আলাপ হলো একটি ডাচ পরিবারের সাথে। বাবা মা এবং তিন সন্তান। তিনজনের বয়স পাঁচ থেকে দশের মধ্যে। বাচ্ছারা হাঁপিয়ে গেছে। তাই মা বাবা তাদের বুস্ট আপ করছেন। আমরাও তাদের সাথে খানিক কথা বলে এগোতে শুরু করলাম। পরে এদের সাথে রাস্তায় আর কোথাও দেখা হচ্ছিলো না বলে চিন্তা হচ্ছিলো। ঐটুকু টুকু বাচ্ছা বোধহয় পারেনি কমপ্লিট করতে। কিন্তু ফিরে এসে নেপালের একটি ট্রেকিং নিউস গ্রুপে আমরা ওদের ছবি দেখি এবং খবর পাই ওরা সফল ভাবে গোকিও সরোবর অভিযান করে ফিরেছে। অর্থাৎ ওরা বেস ক্যাম্প যায়নি তাই আমাদের সাথে পরে আর দেখা হয়নি। স্যালুট!

প্যাংবোচে গ্রামটা ভীষণ সুন্দর। বামহাত দিয়ে মনাস্ট্রি যাওয়ার রাস্তা ওপরের দিকে উঠে গেছে আর ডানহাতের রাস্তা গ্রামে প্রবেশ করেছে। গ্রামের মানুষ নিত্য প্রয়োজনীয় কাজে ব্যস্ত। ফেরিওয়ালা নামচেবাজার থেকে ফেরি নিয়ে এসেছে। গৃহস্থ্য প্রয়োজনীয় জিনিষ কিনে নিচ্ছে দরদাম করে। এইসব দৃশ্য উপভোগ করতে করতে এগিয়ে চলেছি। এটা লোয়ার প্যাংবোচে। গ্রামের শেষ দিকে হোটেল চত্বর পেরিয়ে আপার প্যাংবোচে গ্রামে পৌঁছলাম। এখান থেকে গ্রামের পিছন দিকে তেবোচে শৃঙ্গ দেখা যাচ্ছে। এই শৃঙ্গটা অদ্ভুত দেখতে। কেমন যেন ঘাড় বেঁকা বুড়োর মতো। গ্রামের শেষে একদম টপে একটা চোর্তেন রয়েছে। দূরে সোমারে গ্রাম দেখা যাচ্ছে। আজকে ওখানে আমরা লাঞ্চ করবো। নিচে ইমজা খোলা বয়ে চলেছে। সামনে আমাদাবলাম এখন মেঘে ঢেকে গেছে। খুব খিদে পেয়েছে আমাদের। কিন্তু সোমারে গ্রাম আর আসেনা । দূর থেকে দেখতে পাচ্ছি প্রায় আধ ঘন্টা ধরে। পয়ঁতাল্লিশ মিনিট পর গ্রামে পৌঁছলাম।

ছোট্ট গ্রাম। খুব একটা পরিষ্কারও নয়। এখানে লাঞ্চ অর্ডার দিয়ে আমরা অপেক্ষা করছি। নেপালি ডাল ভাত সবজি ভেজ ওমলেট আর ফ্রেঞ্চ ফ্রাই। ফ্রেঞ্চ ফ্রাইটা আমরা যেখানেই পারছি অর্ডার দিচ্ছি প্রথমত এটা আমরা খেতেও ভালোবাসি আর কার্বোহাইড্রেটও আছে। এখানে খাবারের এত দাম তাই সব খাবারের গুনাগুন বিচার করে আমরা খাবার অর্ডার করছি۔খাবার যখন এলো প্রতিটা খাবারই জঘন্য এবং ওমলেটে ভেজও নেই। কারণ ওদের ভেজ ফুরিয়ে গেছে। বেশ কিছুদিন ওয়েদার খারাপ ছিলো বলে নিচের থেকে জিনিসপত্র ওপরে আসেনি। কিন্তু দাম ওরা ভেজ ওমলেট এরই রাখলো। এই ব্যাপারটা ভালো লাগলোনা।

খাওয়া দাওয়ার পরই রোদ চলে গিয়ে কুয়াশা ঢুকতে শুরু করে দিয়েছে। এখন প্রায় দুপুর একটা বাজে। পূরবীর আজকে আর হাঁটতে ভালো লাগছিলোনা। কিন্তু সোমারে গ্রামটাও আমাদের কারও পছন্দ হয়নি। তাই এগোনোই সিদ্ধান্ত হলো। গ্রাম পার করে একটা ফ্ল্যাট মতো জায়গা দিয়ে বেশ কিছুক্ষন হাঁটা হলো। এখন চারিদিক কুয়াশায় ঢাকা। ওরসো নামের একটি ছোট্ট  গ্রাম পেরিয়ে এগিয়ে চললাম। গ্রামে দুতিনটা ঘরবাড়ি। এবার খুব হালকা চড়াই বেয়ে ওঠা। তারপর উৎরাই পথে নেমে ইমজা খোলার ওপর ব্রিজ পার হয়ে আবার অনেকটা চড়াই রাস্তা ওঠা। এখানে সোলা খোলা এসে ইমজার সাথে মিশেছে। দূর থেকে চড়াই রাস্তাটা দেখা যাচ্ছে। যেই বড় বিদেশীদের টিমটা থ্যাংবোচেতে আমাদের হোটেলে ছিল তাদের সাথে আবার সোমারেতে দেখা হয়েছিল। পাশের হোটেলে লাঞ্চ করছিলো। নদীর এপার থেকে ওদের দেখলাম ওই চড়াই রাস্তাটা খুব ধীরে ধীরে পার করছে।

আমরাও আসতে আসতে ঐ রাস্তায় পৌঁছে গেলাম। এখানে রাস্তা ভালো না। ছোটো ছোটো বোল্ডার ভর্তি রাস্তা। একটু উঠি আবার একটু দাঁড়িয়ে দম নিয়ে আবার উঠি। এইভাবে চড়াই রাস্তা পার হয়ে গেলাম। আজকে লিডারের যেন কী হয়েছে। খালি পিছিয়ে পড়ছে। এত ফগি ওয়েদারে হাঁটতে কারও ভালো লাগছে না। কিন্তু এগোতে হবে। এরপর আর বেশিক্ষণের পথ নেই। নদীর পাশের একটু উঁচু রাস্তা দিয়ে মিনিট চল্লিশের হাঁটা। নন্দিনীদি এগিয়ে গেছে। আমাদের টিমের সিনিয়র মেম্বার কিন্তু অসম্ভব মনের জোর আর স্ট্যামিনা। প্রতিটা জায়গায় ও সবার আগে পৌঁছয়। খুব হালকা পদক্ষেপে হাঁটে কিন্তু দাঁড়ায়না। আমিও সুপ্রিয়কে পূরবীর সাথে থাকতে বলে এগিয়ে গেলাম۔ ঠান্ডা ভীষণ বেড়ে গেছে। আস্তে হাঁটলে ভীষণ শীত করছে তাই তাড়াতাড়ি এগোতে শুরু করলাম। আমার সাথে বুদ্ধিরাজ ওয়ান। টু কে অনেকক্ষন দেখিনি। ও অনেক আগেই হোটেল পৌঁছে গেছে। দূর থেকে এখন ডিংবোচে গ্রাম দেখা যাচ্ছে। নদীর পাশে আলু আর বার্লি চাষ হচ্ছে। আগেই পড়েছিলাম সোলো খুম্বু এলাকায় একমাত্র এখানেই বার্লি চাষ হয়। সোমারে থেকে ডিংবোচে আসতে পাক্কা আড়াই ঘন্টা সময় লাগলো।

ডিংবোচে খুব সম্মৃদ্ধ গ্রাম। অনেক হোটেল বাড়িঘর রয়েছে। এটাই এই রুটের লাস্ট গ্রাম। এরপরে শুধুই টি হাউস। নন্দিনীদিকে অনেকক্ষন আর দেখতে পাইনি। নিশ্চই হোটেলে পৌঁছে বিশ্রাম করছে। হোটেল তো ঠিক হয়েই গেছে আগে কারণ বুদ্ধিরাজ টু অনেক আগে ছিলো। আমাকে বুদ্ধিরাজ ওয়ান গ্রামের ওপরে বাম পাশের একটা রাস্তা দিয়ে হোটেলে নিয়ে এলো। হোটেলে ঢুকে নন্দিনীদিকে দেখতে না পেয়ে আমি ডাকাডাকি করছি। বুদ্ধিরাজ টু বেরিয়ে এসে অবাক সুরে বললো ম্যাডাম তো আসেননি এখনো !সেকি !! কোথায় গেলো মানুষটা !!!