আখ্যানপাঠ : ‘রাজসিংহ’
- 07 August, 2026
- লেখক: সৌভিক ঘোষাল
১
‘রাজসিংহ’ উপন্যাসের ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ সংস্করণে’র সম্পাদক ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও সজনীকান্ত দাস এই উপন্যাসের পত্রিকা সংস্করণ ও বিভিন্ন গ্রন্থ সংস্করণের পাঠভেদ প্রসঙ্গে জানিয়েছেন যে ১২৮৪ বঙ্গাব্দের চৈত্র সংখ্যা থেকে ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় ‘রাজসিংহ’ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে শুরু করে। ১২৮৫ বঙ্গাব্দের ভাদ্র মাস পর্যন্ত মোট ছয়টি সংখ্যায় এর ১৯তম পরিচ্ছেদ পর্যন্ত ছাপা হওয়ার পর লেখাটি অসমাপ্ত থেকে যায়।
এরপর ১২৮৮ বঙ্গাব্দে কলকাতার জনসন প্রেস থেকে বইটি প্রাথমিক পূর্ণাঙ্গ রূপ পেয়ে প্রকাশিত হয়; এটি মুদ্রণ ও প্রকাশ করেছিলেন রাধানাধ বন্দ্যোপাধ্যায়। এই বইটির পৃষ্ঠাসংখ্যা ছিল ৮৩ এবং পরিচ্ছেদ সংখ্যা ছিল ১৯। প্রথম সংস্করণে এটিকে ‘উপন্যাস’ না বলে “ক্ষুদ্র কথা” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
১২৯২ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত এর দ্বিতীয় সংস্করণটি (৯০ পৃষ্ঠা) ছিল মূলত প্রথম সংস্করণেরই পুনর্মুদ্রণ। পরবর্তীতে ১৮৯৩ সালে প্রকাশিত চতুর্থ সংস্করণে (৪৩৪ পৃষ্ঠা) বইটি আজকের বিশাল আকারে পরিবর্ধিত ও রূপান্তরিত হয়। প্রথম সংস্করণের সঙ্গে এর আকাশ-পাতাল তফাত রয়েছে। পত্রিকাপাঠ থেকে গ্রন্থপাঠের তৃতীয় সংস্করণ অবধি এই বইতে চঞ্চলকুমারীর ঔরঙ্গজেবকে ঘৃণা করে তার ছবিতে পদাঘাত, সে খবর মুঘল বাদশাহের কাছে যাবার পর তাকে শাস্তি দেবার উদ্যোগ, চঞ্চলকুমারীর রাজসিংহকে চিঠি লেখা এবং চঞ্চলকুমারীকে নিতে আসা তুলনামূলক ছোট মুঘল বাহিনীর সঙ্গে রাজপুতদের কৌশলী ও সংক্ষিপ্ত যুদ্ধের কথা ছিল। চতুর্থ সংস্করণে যুক্ত হল রাজসিংহের সঙ্গে বিরাট মুঘল বাহিনীর পূর্ণাঙ্গ এক যুদ্ধকথার বিস্তারিত বিবরণ। কেন এই বিস্তার ও বিরাট বদল আনলেন, তা বঙ্কিম নিজেই এই বইয়ের চতুর্থ সংস্করণের ভূমিকায় স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন। - “ভারতকলঙ্ক’ নামক প্রবন্ধে আমি বুঝাইতে চেষ্টা করিয়াছি, ভারতবর্ষের অধঃপতনের কারণ কি কি। হিন্দুদিগের বাহুবলের অভাব সে সকল কারণের মধ্যে নহে। এই ঊনবিংশ শতাব্দীতে হিন্দুদিগের বাহুবলের কোন চিহ্ন দেখা যায় না। ব্যায়ামের অভাবে মনুষ্যের সর্ব্বাঙ্গ দুর্ব্বল হয়। জাতি সম্বন্ধেও সে কথা খাটে। ইংরেজ সাম্রাজ্যে হিন্দুর বাহুবল লুপ্ত হইয়াছে। কিন্তু তাহার পূর্ব্বে কখনও লুপ্ত হয় নাই। হিন্দুদিগের বাহুবলই আমার প্রতিপাদ্য। উদাহরণ স্বরূপ আমি রাজসিংহকে লইয়াছি। মহারাষ্ট্রীয় অপেক্ষাও রাজপুত বাহুবলে বলবান্ ছিলেন বলিয়া আমার বিশ্বাস। তবে রাজকার্য্যে অন্যান্য গুণে তাঁহারা নিকৃষ্ট ছিলেন।
যখন বাহুবল মাত্র আমার প্রতিপাদ্য, তখন উপন্যাসের আশ্রয় লওয়া যাইতে পারে। উপন্যাসে সে কথা পাঠকের হৃদয়ঙ্গম করিতে গেলে, রাজসিংহের পূর্ব্ব পূর্ব্ব সংস্করণে যে ক্ষুদ্র ঘটনাটি অবলম্বন করা গিয়াছিল, তদ্দ্বারা অভীষ্ট সিদ্ধ হয় না। রাজসিংহের সঙ্গে মোগল বাদশাহের যে মহাযুদ্ধ হইয়াছিল, তাহা সমস্তই উপন্যাসভুক্ত করিতে হয়। তাহা করিতে প্রয়াস পাইয়াছি বলিয়া গ্রন্থের কলেবর এত বাড়িয়াছে।”
২
রাজসিংহ ও ঔরঙ্গজেবের দ্বন্দ্বের ইতিহাস সম্পর্কে বঙ্কিম যে সব উপাদান ব্যবহার করেন, সে সম্পর্কে এই বইয়ের চতুর্থ সংস্করণের ভূমিকায় তিনি লেখেন, “রাজসিংহের পূর্ব্ব তিন সংস্করণে যে ঐতিহাসিক ঘটনাটি অবলম্বন করা হইয়াছিল, তাহা একটা অতি গুরুতর ঐতিহাসিক ঘটনার একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। মোগল সাম্রাজ্যের প্রধান কথা, হিন্দুদিগের সঙ্গে মোগলের বিবাদ। মোগলের প্রতিদ্বন্দ্বী হিন্দুদিগের মধ্যে প্রধান রাজপুত ও মহারাষ্ট্রীয়। মহারাষ্ট্রীয়দিগের কথা সকলেই জানে। রাজপুতগণের বীর্য্য অধিকতর হইলেও, এদেশে তেমন পরিচিত নহে। তাহা সুপরিচিত করিবার যথার্থ উপায়, ইতিহাস। কিন্তু ইতিহাস লিখিবার পক্ষে অনেক বিঘ্ন। প্রকৃত ঐতিহাসিক ঘটনা কি, তাহা স্থির করা দুঃসাধ্য। মুসলমান ইতিহাসলেখকেরা অত্যন্ত স্বজাতিপক্ষপাতী; হিন্দুদ্বেষক। হিন্দুদিগের গৌরবের কথা প্রায় লুকাইয়া থাকেন—বিশেষতঃ মুসলমানদিগের চিরশত্রু রাজপুতদিগের কথা। রাজপুত ইতিহাসের উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করা যায় না—স্বজাতিপক্ষপাত নাই, এমন নহে। মনুষী নামে একজন ভিনিসীয় চিকিৎসক মোগলদিগের সময়ে ভারতবর্ষে বাস করিয়াছিলেন। তিনিও মোগল সাম্রাজ্যের ইতিহাস লিখিয়া রাখিয়াছিলেন; কত্রু নামা এক জন পাদ্রি তাহা প্রকাশিত করিয়াছিলেন। কিন্তু এই তিন জাতীয় ইতিহাসে পরস্পরের সহিত অনেক্য আছে। ইহাদের মধ্যে কাহার কথা সত্য, কাহার কথা মিথ্যা, তাহার মীমাংসা দুঃসাধ্য। অন্তত: এ কার্য্য বিশেষ পরিশ্রমসাপেক্ষ। …
ঐতিহাসিক ঘটনার মধ্যে কোনটি প্রকৃত বলিয়া গ্রহণ করা যাইতে পারে, তাহার পক্ষে বিচার আবশ্যক। আমি সে বিচার বড় করি নাই। দুই একটা উদাহরণ দিলে বুঝা যাইবে। রূপনগরের রাজকন্যা সম্বন্ধে যে স্থূল ঘটনা বিবৃত হইয়াছে, তাহা টডের গ্রন্থে আছে, কিন্তু অর্মের গ্রন্থে নাই। আর উদিপুরী সম্বন্ধে যে ঘটনা বিবৃত হইয়াছে, তাহা অর্মের গ্রন্থে আছে, কিন্তু টডের গ্রন্থে নাই। আমি উভয় ঘটনাই সত্য বলিয়া গ্রহণ করিয়াছি। রন্ধ্রমধ্যে ঔরঙ্গজেব যে অবস্থায় পতিত হওয়ার কথা লিখিয়াছি, অর্ম ঐরূপ লেখেন। কিন্তু টডের গ্রন্থে শাহজাদা সম্বন্ধে ঐ ঘটনা ঘটিয়াছিল বলিয়া লিখিত হইয়াছে। আমি এখানে অর্মের অনুবর্তী হইয়াছি। এইরূপ অনেক আছে।”
বঙ্কিম যে সব উপাদানের ওপর নির্ভর করেছেন তার বেশ কিছু, যেমন টডের বই ‘অ্যানালস অ্যান্ড অ্যান্টিকুইটিস অব রাজস্থান’, এর অনেকগুলি অংশই পরবর্তী গবেষণায় কিছুটা ভ্রান্ত ও অতিরঞ্জিত বলে সমালোচিত হয়েছে। টডের ওপর নির্ভর করায় সেই সব ভ্রান্তির কিছু কিছু বঙ্কিম স্বাভাবিকভাবেই এড়াতে পারেন নি। তবে মোটের ওপর বঙ্কিম ঔরঙ্গজেব রাজসিংহ দ্বন্দ্বের মূল ইতিহাসটিকে বিশ্বস্ত ও জীবন্তভাবে রূপায়ণে সক্ষম হয়েছেন।
এই পর্বের ইতিহাস রচনার যে সব উপাদান এখন আমাদের হাতের সামনে রয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল -
১. সরকারি ও সমসাময়িক ফারসি নথি ও চিঠি-পত্র
‘আদাব-ই-আলমগীরী’: শাহজাদা মহম্মদ আকবরের নিজস্ব চিঠি-পত্রের সংকলন। রাজপুত যুদ্ধের সময় তাঁর মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হওয়া ও যুদ্ধের ভেতরের রূপটি এখান থেকে স্পষ্ট জানা যায়।
‘আখবারাত-ই-দরবার-ই-মুঅল্লা’: মুঘল রাজদরবারের প্রতিদিনের সরকারি রেকর্ড ও রিপোর্ট, যা বর্তমানে জয়পুরে সংরক্ষিত আছে। প্রতিদিনের খবর, বাদশাহের উক্তি ও সরকারি হুকুম এতে হুবহু নথিভুক্ত হতো।
‘মাসির-ই-আলমগিরি’: মুস্তাদ খাঁ রচিত ঔরঙ্গজেবের সরকারি ইতিহাস। এতে রাজপুত যুদ্ধের ঘটনাক্রম, মন্দির ধ্বংস, তোষাখানা লুট এবং জিজিয়া কর পুনরারোপের বিবরণ পাওয়া যায়।
২. স্থানীয় রাজপুত ও হিন্দি ভাষার মূল বিবরণী
ঈশ্বরদাস নাগরের ‘ফুতুহাৎ-ই-আলমগীরী’: ইনি যোধপুরের একজন সরকারি ব্রাহ্মণ কর্মকর্তা ছিলেন, যিনি মাড়োয়ারের মুঘলদের অধীনে দীর্ঘ দিন চাকরি করেন। এই প্রত্যক্ষদর্শীর লেখা ফারসি ইতিহাসগ্রন্থটি রাজপুত যুদ্ধের সবচেয়ে বস্তুনিষ্ঠ বিবরণ প্রদান করে।
‘রাজপ্রশস্তি মহাকাব্য’: রাজসমুদ্র দীঘির (রাজসমন্দ হ্রদ) ঘাটে ১৬টি পাথরের স্ল্যাবে খোদিত জয়পুরের রাজা রাজসিংহের একটি বিস্তৃত সংস্কৃত শিলালেখ। এতে মেবারের পক্ষ থেকে যুদ্ধের নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়।
৩. ইউরোপীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও ভ্রমণকারীদের বিবরণ
নিকোলো মানুচীর ‘Storia do Mogor’ (মোগলদের ইতিহাস): ইতালীয় পর্যটক মানুচী শাহজাদা মুয়াজ্জমের সঙ্গে মেবার অভিযানে উপস্থিত ছিলেন। তাঁর এই প্রত্যক্ষদর্শী বিবরণটি অত্যন্ত মূল্যবান ও বাস্তবসম্মত ঐতিহাসিক উপাদান।
৪. ঔপনিবেশিক রচনাবলী
কর্নেল টডের ‘অ্যানালস অ্যান্ড অ্যান্টিকুইটিজ অব রাজস্থান’ (Annals and Antiquities of Rajasthan): রাজস্থানের ঐতিহ্য ও লোকগাথার সংকলন। তবে মূল ফারসি দলিলে প্রমাণ না থাকায় টডের কিছু বিবরণ অতিরঞ্জিত।
৫. আধুনিক গবেষণা
আচার্য যদুনাথ সরকার বিপুল পরিশ্রম ও পাণ্ডিত্যে ফারসি ও ইউরোপীয় ইতিহাস থেকে মূল সত্য উদঘাটন করে ‘History of Aurangzib’-এ রাজসিংহ-ঔরঙ্গজেব যুদ্ধের প্রকৃত রূপটি তুলে ধরেছেন।
রাজসিংহ উপন্যাসের পত্রিকাপাঠ ও গ্রন্থপাঠের প্রথম তিন সংস্করণ যে ইতিহাস অংশের ওপর নির্মিত সে সম্পর্কে ইতিহাসবিদ যদুনাথ সরকার বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ সংস্করণের ভূমিকায় আমাদের জানিয়েছেন যে, পূর্বে জয়পুর রাজ্য, পশ্চিমে যোধপুর আর দক্ষিণে বাদশাহি আজমির সুবা—এই তিন দিয়ে ঘেরা একটি ছোট্ট রাজপুত রাজ্য আছে। তার নাম কৃষ্ণগড়, আর এই রাজ্যের বর্তমান রাজধানীও “কিশনগড়” শহর। এই রাজ্যের উত্তর অংশে রূপনগর নামে একটি নগর আছে, তাই “রূপনগরের রাজকুমারী” বলতে কিশনগড়ের রাজকন্যাকেই বোঝায়। এই দেশের রাজা রূপসিংহ দারাশুকোর পক্ষে সামুগড়ের যুদ্ধক্ষেত্রে ২৯ মে ১৬৫৮ সালে প্রাণ হারালে, তাঁর ছেলে মানসিংহ রাজা হন এবং আজীবন মুঘলদের অনুগত হয়ে থাকেন। ওই যুদ্ধে বিজয়ী ঔরঙ্গজেব রূপসিংহের বড় মেয়ে চারুমতিকে বিয়ে করার দাবি জানান, যাতে পরাজিত শত্রুর বংশ ভালোভাবে লজ্জিত ও অপমানিত হয়। কিন্তু অভিমানী চারুমতি কুলপুরোহিতের মারফত মহারানা রাজসিংহের কাছে তাঁর বিয়ের প্রস্তাব পাঠালেন। রাজসিংহও দলবল নিয়ে এক বিশাল “বরাৎ” অর্থাৎ বরযাত্রীদের শোভাযাত্রা সঙ্গে করে কিশনগড়ে গিয়ে চারুমতিকে বিয়ে করলেন। ঔরঙ্গজেব আপাতত প্রতিশোধের ইচ্ছা চেপে রেখে মহারানার দুটি পরগনা কেড়ে নিয়ে তা হরিসিংহ দেবলিয়াকে দিয়ে দিলেন।
এই ইতিহাসকে বঙ্কিম আনন্দমঠে রাজসিংহ লেখার সময়ে নামধাম সহ বেশ খানিকটা বদলে নিয়েছিলেন। যেমন নায়িকার নাম চারুমতি থেকে বদলে করেছেন চঞ্চলকুমারী। নিয়ে এসেছেন সম্পূর্ণ কাল্পনিক এক চরিত্র মানিকলালকে। তবে ঔরঙ্গজেবের সঙ্গে রাজসিংহের পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ বর্ণনা পত্রিকাপাঠ তথা প্রথম তিন সংস্করণের গ্রন্থপাঠে ছিল না। সেটি এল চতুর্থ সংস্করণে। মুঘল রাজপুত দ্বন্দ্বের এক ব্যাপ্ত পরিসরকে এই সংস্করণে বঙ্কিম উপন্যাস পট হিসেবে ব্যবহার করলেন আর উপন্যাসের চারগুণ বিবর্ধিত যে নতুন রূপটি এই সংস্করণে সামনে এল, তা যেন একই নামের এক নতুন উপন্যাস। মুঘল রাজপুত দ্বন্দ্বের এই অধ্যায়ের প্রকৃত ইতিহাসটি সম্পর্কে আচার্য যদুনাথ ‘রাজসিংহ’ উপন্যাসের সাহিত্য পরিষৎ সংস্করণের ভূমিকায় আমাদের জানিয়েছেন যে, এই পর্বে মুঘল রাজপুত দ্বন্দ্ব প্রথম পেকে ওঠে মারওয়াড়ের ঘটনাবলীকে কেন্দ্র করে। মারওয়াড়ের রাজধানী হল যোধপুর। যোধপুরের মহারাজা যশোবন্ত সিংহ ছিলেন ঔরঙ্গজেবের প্রধান হিন্দু সেনাপতি। তিনি একটি বড় প্রদেশের সুবাদারি পদেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৬৭৮ সালের ১০ই ডিসেম্বর আফগানিস্তানের জামরুদ গিরিসংকটে ফৌজদার পদে কর্মরত অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। এর এগারো বছর আগেই অন্য সর্বোচ্চ হিন্দু মনসবদার, আম্বরের (জয়পুর) রাজা জয়সিংহ মারা গিয়েছিলেন। ফলে এই সময়ে সমগ্র ভারতবর্ষে আর কোনো প্রভাবশালী হিন্দু নেতা অবশিষ্ট রইলেন না।
যশোবন্তের মৃত্যুর খবর দিল্লিতে পৌঁছানোমাত্রই ঔরঙ্গজেব মাড়োয়ার রাজ্যকে সরাসরি নিজের অধীনে এনে মুঘল শাসনের অন্তর্ভুক্ত করে নেন। তিনি মুসলিম ফৌজদার, কেল্লাদার, কোতোয়াল ও আমিন পাঠিয়ে যোধপুর শহর দখল করেন। এর কয়েক দিন পর (৯ জানুয়ারি ১৬৭৯) বাদশাহ নিজে আজমিরে রওনা হন, যাতে মাড়োয়ারের সীমানায় থেকে সেখানকার রাজপুতদের ভয় দেখিয়ে নিষ্ক্রিয় রাখতে পারেন।
মাড়োয়ারের রাঠোররা সদ্য রাজাকে হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছিল। তাদের রাজপরিবার, সেনাবাহিনী এবং স্বজাতীয় নেতারা তখনও আফগানিস্তান থেকে ফিরতে পারেননি; কারণ তাঁরা সেখানে মুঘল বাহিনীর বেষ্টনীতে আটকে ছিলেন। ফলে রাঠোররা কোনো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারল না।
ঔরঙ্গজেবের আদেশে খাঁ জাহান বাহাদুরের নেতৃত্বে বিশাল এক মুঘল সেনাবাহিনী (৭ ফেব্রুয়ারি) মাড়োয়ারে ঢুকে সমস্ত মন্দির ধ্বংস করতে শুরু করে। তারা রাজধানীর তোষাখানা খুলে নেয় এবং কেল্লার মাটি খুঁড়ে যশোবন্তের বিপুল সম্পত্তি লুট করে। (এটি ঔরঙ্গজেবের সরকারি ঐতিহাসিক মুস্তাদ খাঁর বিবরণ; সূত্র: ‘মাসির-ই-আলমগিরি’, ফারসি মূল, পৃষ্ঠা ১৭২)।
যশোবন্তের মৃত্যুর পর তাঁর পাঁচজন রানি সহমরণে যান। তবে অন্য দুজন রানি অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন; তাঁরা দেশে ফেরার পথে লাহোর পৌঁছে প্রত্যেকে একটি করে অমুসলিমদের ওপর আবারও জিজিয়া কর চাপিয়ে দেওয়া হলো, যা প্রায় একশো বছর আগে উদারচেতা বাদশাহ আকবর তুলে দিয়েছিলেন। মাড়োয়ারের মন্দির ভেঙে দেবদেবীর মূর্তিগুলো গরুর গাড়িতে বোঝাই করে দিল্লিতে নিয়ে আসা হলো। বাদশাহের আদেশে সেগুলো দিল্লি দুর্গের উঠানে এবং শহরের জামে মসজিদের সিঁড়ির নিচে ফেলে রাখা হলো, যাতে সবাই সেগুলো পদদলিত করতে পারে। (সূত্র: ‘মাসির-ই-আলমগিরি’, ফারসি মূল, পৃষ্ঠা ১৭৫)।
কিন্তু অজিত সিংহ দেশে ফিরে আসায় রাজনৈতিক দৃশ্যপট পুরোপুরি বদলে গেল। যোগ্য নেতা পেয়ে মাড়োয়ার আবার জেগে উঠেছে বুঝতে পেরে বাদশাহ তৎক্ষণাৎ (১৭ আগস্ট) এক বিশাল বাহিনী সেদিকে পাঠালেন। এর দুই সপ্তাহ পর তিনি নিজেও দিল্লি ছেড়ে আজমিরে হাজির হলেন। চারদিক থেকে নিজের অন্যান্য সৈন্যদলকে ডেকে এনে আজমিরকে মূল কেন্দ্র বানিয়ে ঔরঙ্গজেব যুদ্ধ, লুটপাট, হত্যাকাণ্ড ও অগ্নিসংযোগের ঝড় তুললেন মাড়োয়ারের ওপর।
পুষ্কর হ্রদের কাছে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে রাজপুত দেশপ্রেমিকেরা টানা তিন দিন লড়াই করে শেষ পর্যন্ত প্রাণ দিলেন। “মেঘ যেভাবে পৃথিবীর বুকে বর্ষণ করে, ঠিক তেমনিভাবে ঔরঙ্গজেব এই দেশের ওপর তাঁর বর্বর সৈন্য ঢেলে দিলেন... মাড়োয়ারের সব বড় বড় শহর লুট হলো এবং মন্দির ভেঙে তৈরি করা হলো মসজিদ।” পুরো মাড়োয়ারকে মুঘল সাম্রাজ্যের একটি সুবা (প্রদেশ) হিসেবে ঘোষণা করা হলো এবং কয়েকটি প্রশাসনিক সাব-ডিভিশনে ভাগ করে প্রতিটিতে একজন করে মুঘল শাসক বসানো হলো।
ক্রমশ মারওয়াড়ের দ্বন্দ্বের আগুন মেবারে ছড়িয়ে পড়ল। এই মেবারের রাজধানী এককালে ছিল চিতোর। চিতোরের পর মেবারের রাজপুত রাজধানী হয় উদয়পুর। রাজসিংহ উদয়পুরের রাজধানী থেকেই মেবারের রাজকার্য পরিচালনা করতেন।
মাড়োয়ার পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর ঔরঙ্গজেব মেবারের পেছনে লাগলেন। তিনি মহারানা রাজসিংহের রাজ্যের কাছেও জিজিয়া কর দাবি করে পাঠালেন। অন্যদিকে অজিত সিংহের মা (যিনি মহারানার ভাইঝি ছিলেন) শিশু অজিতকে রক্ষা করার জন্য রাজসিংহের আশ্রয় চাইলেন। মহারানাও নিজের দেশ রক্ষায় যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করলেন।
আজমির থেকে পুর ও মণ্ডল পরগনা হয়ে সোজা দক্ষিণে চিতোর দুর্গ পর্যন্ত রাস্তাটি ছিল প্রায় সমতল। আর চিতোর থেকে পশ্চিমে উদয়পুরে যেতে হলে মাঝখানে পড়ত দেবারী গিরিসংকট। প্রকৃতপক্ষে মেবারের মূল এলাকাটি ছিল প্রায় গোলাকার এবং চারদিক থেকে বড় বড় পাহাড় দিয়ে ঘেরা। আর এই সুরক্ষিত পাহাড়ি ঘেরাটোপের ঠিক মাঝখানেই অবস্থান করছিল উদয়পুর করে পূর্ব দিকের প্রবেশদ্বার দেবারি, উত্তর দিকের প্রবেশদ্বার রাজসমুদ্র হ্রদ এবং পশ্চিম দিকের প্রবেশদ্বার দেসুরি-ঝিলওয়ারা গিরিসংকট, যার কাছে রানাদের শেষ আশ্রয়স্থল গোগুণ্ডা ও কমলমীর (যার আসল নাম “কুম্ভলগড়”) অবস্থিত। এই পশ্চিম সীমানায় আরাবল্লি পর্বতমালা উত্তর থেকে দক্ষিণে বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত, যার পূর্ব দিকে মেবার এবং পশ্চিম দিকে মাড়োয়ার রাজ্য।
ঔরঙ্গজেবের অসংখ্য সুসজ্জিত অশ্বারোহী সৈন্য আর ফিরিঙ্গি গোলন্দাজদের চালানো অত্যন্ত উন্নত ও আধুনিক কামানগুলোর সামনে সমতল প্রান্তরে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করার মতো শক্তি রাজপুতদের ছিল না। তাই রাজসিংহ লোহার বড় বড় দরজা ও কাঠের খুঁটি দিয়ে দেবারি গিরিপথ বন্ধ করে দিলেন, সমতল এলাকার সমস্ত প্রজাকে তুলে নিয়ে পাহাড়ে আশ্রয় দিলেন; এমনকি রাজধানী উদয়পুর পর্যন্ত একেবারে জনমানবশূন্য করে ফেললেন।
ঔরঙ্গজেব নিজেই প্রথম আক্রমণ করলেন; ১৬৭৯ সালের নভেম্বরের শেষ দিন আজমির ছেড়ে তিনি উদয়পুরের দিকে অভিযান চালালেন। ৪ জানুয়ারি ১৬৮০ মুঘল সৈন্যরা জনশূন্য দেবারি গিরিসংকট দখল করে নিল এবং তার কয়েক দিন পর বিনা বাধায় উদয়পুরে প্রবেশ করল। মহারানা তখন তাঁর সৈন্যদল নিয়ে উদয়পুরের উত্তর-পশ্চিমে আরাবল্লি পর্বতের কোলে গোগুণ্ডা-কমলমীর অঞ্চলে লুকিয়ে ছিলেন।
উদয়পুর থেকে বাদশাহ সৈয়দ হাসান আলি খাঁকে একদল সৈন্যসহ এই পাহাড়ি এলাকার মধ্যে পাঠালেন। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তা ও দক্ষতার সঙ্গে এই খাবারহীন ও অচেনা শত্রু অঞ্চলে নিজেকে বাঁচিয়ে এক যুদ্ধে মহারানাকে হারিয়ে তাঁর শিবির ও পথের রসদ লুট করলেন। এই বিজয়ের সময় উদয়পুরে ১৭৩টি এবং চিতোরে ৬৩টি মন্দির ভেঙে ফেলা হলো। এরপর মেবারের পতন সম্পন্ন হয়েছে ভেবে বাদশাহ আজমিরে ফিরে গেলেন। তবে ছেলে আকবরকে চিতোরে ঘাঁটি করে সৈন্যসহ মেবার দমনের জন্য রেখে গেলেন; উদয়পুরে মুঘলদের কোনো থানা রইল না (মার্চ মাসের শেষের দিকের ঘটনা)।
এটাই রাজসিংহের রণকৌশল দেখানোর মোক্ষম সুযোগ হয়ে দাঁড়াল। কেন্দ্রস্থলে থাকা আরাবল্লির পর্বতশৃঙ্গ থেকে তিনি ইচ্ছেমতো পূর্ব দিকে নেমে খুব সহজেই মেবারের মুঘল থানা ও রসদ লুট করতেন, অথবা পশ্চিম দিকে নেমে মাড়োয়ারে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বাদশাহি ফৌজের ওপর আক্রমণ চালাতেন। কিন্তু বাদশাহের পক্ষে মেবার থেকে মাড়োয়ারে সাহায্যকারী সৈন্য পাঠাতে হলে একটি ত্রিভুজের দুই দিক ঘুরে যেতে হতো, যাতে প্রচুর সময় লাগত।
তার ওপর দেশের সব মানুষই মুঘলদের শত্রু ছিল; তারা গোপনে মহারানার লোকদের সাহায্য করত, শত্রুদের খবর দিত এবং রসদ জোগাত। আকবর ছিলেন ২২ বছরের এক বিলাসী যুবক রাজপুত্র, যিনি যুদ্ধে একেবারে অকর্মণ্য ছিলেন। আর তাঁর অধীনে ছিল মাত্র বারো হাজার সেনা, তা দিয়ে এত বড়... বিশাল এই অঞ্চল রক্ষা করা মুঘলদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ল। বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে থাকা মুঘল ঘাঁটিগুলোর ছোট ছোট রক্ষীদল রাজপুতদের আক্রমণে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল; কখনও পালিয়ে যেত, আর সবসময় ভয়ে নিস্তেজ হয়ে পড়ে থাকত।
বাদশাহ আজমিরে ফিরে যাওয়ার পর, এপ্রিল মাস থেকেই রাজপুতদের আক্রমণের তীব্রতা দ্বিগুণ বেড়ে গেল এবং তারা বিশাল সাফল্য পেতে শুরু করল। মুঘল সৈন্যদের মনে এমন ভীতি সঞ্চার হলো যে, কোনো সেনাপতিই এখন আর ঘাঁটির দায়িত্ব নিতে রাজি হচ্ছিলেন না; সবাই সদর দপ্তরে থেকে প্রাণ বাঁচাতে চাইছিলেন। কোনো গিরিসংকটের মুখে পৌঁছে ভেতরে ঢোকার সাহস সৈন্যরা পেত না, তারা সমতলেই বসে থাকত। এমনকি মূল কেন্দ্র থেকে দল থেকে আলাদা করে যে সৈন্যদল পাঠানো হতো, তারা কিছুটা দূর কুচকাওয়াজ করে এগিয়ে গিয়ে আর সামনে যেতে অস্বীকার করত। (শাহজাদা আকবর তাঁর বাবা ঔরঙ্গজেবকে যে চিঠি লেখেন, তা থেকেই এসব তথ্য নেওয়া হয়েছে।)
এরপর খোদ শাহজাদা আকবরের বিপদ ঘনিয়ে এল। মে মাসের মাঝামাঝি এক রাতে মহারানার সৈন্যরা মুঘলদের চোখ ফাঁকি দিয়ে চিতোর দুর্গের নিচে আকবরের তাঁবুতে ঢুকে পড়ল। তারা বেশ কিছু মুঘল সেনাকে হতাহত করল এবং জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে গেল।
মহারানা নিজে পাহাড় থেকে নেমে এসে বেদনোর অঞ্চল আক্রমণ করলেন এবং আকবরের আজমিরে পালিয়ে যাওয়ার পথ পুরোপুরি বন্ধ করে দিলেন। ওই মাসের শেষেই মহারানা আকবরের ওপর আচমকা হামলা চালিয়ে তাঁর বাহিনীর প্রচুর ক্ষতি সাধন করলেন।
এর কিছুদিন পর, দশ হাজার শস্যবোঝাই বলদসহ এক দল বানিয়ারা (বাঞ্জারা) শাহজাদার তাঁবুতে রসদ নিয়ে আসার সময় রাজপুতেরা তাদের আটকে সব মালামাল লুট করে নিল।
রাজসিংহের বড় ছেলে ভীমসিংহ একদল সৈন্য নিয়ে রাজ্যজুড়ে চষে বেড়াতে লাগলেন; যেখানেই শত্রুসেনাকে দুর্বল দেখতেন, সেখানেই হামলা চালিয়ে তাদের খতম করতেন। রানার দেওয়ান দয়ালদাস নিজে বণিক সম্প্রদায়ের লোক হওয়া সত্ত্বেও সৈন্য দল বানিয়ে অন্যান্য অঞ্চলে মুঘল বাহিনীকে ধ্বংস করার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়লেন।
শাহজাদা আকবর লজ্জায় মুখ ঢাকলেন এবং চরম বিভ্রান্ত হয়ে বাবাকে চিঠিতে লিখলেন - “ঘৃণিত কাফেরদের (রাজপুতদের) অবিশ্বাস্য পরিশ্রম ও চটপটে তৎপরতায় যে ঘটনাগুলো ঘটেছে, তার জন্য আমি যে কতটা লজ্জা ও মানসিক কষ্টে আছি, তা নিজের স্বল্প জ্ঞান ও ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। যুদ্ধের ময়দানে আমি যেন সবে ‘এক, দুই, তিন’ শিখছি, আর বাস্তব বুদ্ধির পাঠশালায় আমার কেবল অক্ষরপরিচয় ঘটছে। আমি পুরোপুরি অজ্ঞ; এসবই ঘটেছে আমার স্বাভাবিক দুর্বলতা ও অভিজ্ঞতার অভাবের কারণে ঘটেছে। ইনশাআল্লাহ, ভবিষ্যতে আপনার নির্দেশিত সাবধানতা ও সতর্কতা থেকে একটুও বিচ্যুত হব না। ঈশ্বরের ইচ্ছায় ও আপনার অনুগ্রহে এই হতভাগ্য শত্রু নিজের কাজের উপযুক্ত শাস্তি পাবে।” (সূত্র: ‘আদাব-ই-আলমগিরি’, আমার হস্তলিপি, পৃষ্ঠা ২৭০খ)।
ঔরঙ্গজেব চরম রেগে গিয়ে আকবরকে তিরস্কার করলেন এবং চিতোর জেলা থেকে বদলি করে মাড়োয়ারে পাঠিয়ে দিলেন। চিতোরের দায়িত্ব দিলেন তাঁর দ্বিতীয় ছেলে আজম শাহকে। আজম এর আগে বাংলার সুবাদার ছিলেন, বাবার ডাকে সাড়া দিয়ে সেখান থেকে দ্রুত রাজপুতানায় এসে পৌঁছেছিলেন। আর বড় ছেলে মুয়াজ্জম (অর্থাৎ শাহ আলম), আমাদের পরিচিত নিকোলো মানুচিসহ দাক্ষিণাত্য থেকে বাবার কাছে এসে পৌঁছান; তাঁকে উত্তর দিক থেকে মেবার আক্রমণের দায়িত্ব দেওয়া হলো। কিন্তু এই দুই ভাইয়ের চেষ্টাই পুরোপুরি ব্যর্থ হলো।
কনিষ্ঠ শাহজাদা আকবরের মাড়োয়ার অভিযানও বাদশাহের জন্য আরও বেশি ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়াল। তিনি কোনোমতে আরাবল্লি পর্বতশ্রেণীর পশ্চিম দিকে গডবার (গোদোবার) জেলায় পৌঁছে চুপচাপ বসে রইলেন, দেসুরি গিরিপথ দিয়ে মেবার আক্রমণের কোনো চেষ্টাই করলেন না। এর পেছনের গোপন কারণটি অবশ্য তিন মাস পর সামনে আসে।
দুর্গাদাস রাঠোর এবং মহারানা রাজসিংহ গোপনে দূত পাঠিয়ে শাহজাদাকে বললেন - “আপনার বাবা মুঘল সাম্রাজ্য ধ্বংস করতে উঠেপড়ে লেগেছেন। রাজপুতদের সাহায্যেই কিন্তু আপনার পূর্বপুরুষেরা এই সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন। আপনি যদি নিজের বংশানুক্রমিক এই সম্পত্তি টিকিয়ে রাখতে চান, তবে রাঠোর ও শিশোদিয়া—এই দুই শ্রেষ্ঠ হিন্দু জাতির সমস্ত বীর যোদ্ধা আপনাকে সমর্থন জোগাবে। আপনি তাদের নেতা হয়ে যুদ্ধ করুন, ঔরঙ্গজেবের তখত কেড়ে নিয়ে খুব সহজেই নিজে বাদশাহ হয়ে যান।”
এই চক্রান্ত আড়ালে চলতে লাগল। এরই মধ্যে ২২ অক্টোবর ১৬৮০ সালে মহারানা রাজসিংহ রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান এবং ১২ দিন অশৌচ পালনের পর তাঁর ছেলে জয়সিংহ সিংহাসনে বসেন। তখন চক্রান্তটি চূড়ান্ত রূপ পেল। অবশেষে ১৬৮১ সালের ১ জানুয়ারি আকবর নিজেকে বাদশাহ হিসেবে ঘোষণা করে সেনাশিবিরেই সিংহাসনে বসলেন এবং ঔরঙ্গজেবকে আক্রমণ করতে মাড়োয়ার থেকে আজমিরের দিকে রওনা হলেন। তাঁর এই প্রচেষ্টা কীভাবে ব্যর্থ হলো এবং সেই হতভাগ্য শাহজাদাকে কীভাবে মহারাষ্ট্রে ও পরবর্তীতে পারস্যে জীবনের বাকি দিনগুলো কাটাতে হলো - তা অবশ্য ‘রাজসিংহ’ উপন্যাসের সময়ের গণ্ডির বাইরে।
বঙ্কিম কিছু অদল বদল ও কিছু কল্পনা মিশিয়ে উপন্যাস লিখলেও মোটের ওপর ইতিহাসের সূত্রকে সঠিকভাবে অনুসরণ করেছেন। তবে যে ইতিহাসের ওপর তিনি মূলত নির্ভর করেছিলেন সেই টডের ইতিহাসে বেশ কিছু ভুল্ভ্রান্তি ছিল। বঙ্কিম স্বাভাবিকভাবেই সেই সব ভুলের শিকার হয়েছেন। আচার্য যদুনাথ জানিয়েছেন, টডকে অনুসরণ করে “উপন্যাসের ৮ম খণ্ড, ২য় পরিচ্ছেদ এবং ৭ম খণ্ড, ৩য় পরিচ্ছেদে বঙ্কিম দেখিয়েছেন যে আওরংজীব মহারাণার সৈন্য কর্তৃক ঘেরাও হইয়া এক দিন অনাহারে কাটাইলেন, উদিপুরী বেগম বন্দিনী হইবার পর রাণা তাঁহাকে মুক্তি দিলেন।
টডের এই বিবরণ সত্য নহে, এবং জ্ঞাত ইতিহাসের অন্যান্য ঘটনা হইতে অসম্ভব প্রমাণ হয়। বাদশাহী সৈন্যদল মেবারে অনেক বার ঘেরাও হয় এবং আহারের অভাবে এবং রাজপুতদের ভয়ে আড়ষ্ট হইয়া থাকে—এ কথা সত্য, এবং ফারসী ইতিহাস হইতে প্রমাণ হইয়াছে, কিন্তু স্বয়ং বাদশাহ নহে। তবে কুচ করিবার সময় কখন কখন তাঁহার নিজ রক্ষীদলের মধ্যেও রসদ আনা রাজপুতেরা বন্ধ করিয়া দেয়। ফলতঃ টড, হসন আলি খাঁর্ বিযুক্ত দলের (detachment) এবং শাহজাদা আকবরের নিজ সৈন্যবিভাগের বিপদ্ ও ভয়ভীতিকে বাদশাহের নিজদলের উপর চাপাইয়াছেন। আমার History of Aurangzib, vol iii. pp. 340, 379-তে এই বিষয় বিস্তৃত আলোচনা করিয়া দেখানো হইয়াছে।”
৩
রাজসিংহ উপন্যাসের নান্দনিক বিশ্লেষণ রবীন্দ্রনাথ যেভাবে করেছেন, সেই সূত্রকে এর পরের সব আলোচকই অমোঘ বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ এই উপন্যাসের নান্দনিক বিশ্লেষণে জানান ‘রাজসিংহ’ উপন্যাসের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর দ্রুত ও অনিবার্য গতি। লেখক অনাবশ্যক দীর্ঘ কৈফিয়ত বা ব্যাখ্যার পেছনে সময় নষ্ট না করে ঘটনাকে দ্রুত পরিণামের দিকে এগিয়ে নিয়েছেন। উপন্যাসটির পাত্র-পাত্রীরা (বিশেষ করে স্ত্রীচরিত্ররা) দীর্ঘ দ্বিধা বা চিন্তা না করে সাহসের সাথে লক্ষ্য অর্জনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাদের আবেগ ও প্রেম কোনো দীর্ঘ বাসররাতের কাব্য নয়, বরং সংকটের মুহূর্তে দ্রুত ও সংহত। আধুনিক ইংরেজি উপন্যাসের জটিল মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও অতিরিক্ত বর্ণনার যে চাপ থাকে, ‘রাজসিংহ’-এ তা নেই। বঙ্কিমচন্দ্র ঘটনার দ্রুত গতির দ্বারাই বাস্তবতার প্রয়োজনীয় ভারের ঘাটতি পূরণ করেছেন।
তবে রবীন্দ্রনাথ এও জানান যে শুরুর দিকে ঘটনাগুলোকে সরল ও চঞ্চল মনে হলেও, উপন্যাসের ৬ষ্ঠ ও ৭ম খণ্ডে গিয়ে তা অত্যন্ত গম্ভীর, ট্র্যাজিক এবং ভারতীয় ইতিহাসের এক বিশাল যুগান্তরের পটভূমিতে রূপ নেয়। একদিকে সাম্রাজ্যের পতন ও জাতীয় ইতিহাস, অন্যদিকে জেবউন্নিসার মতো ব্যক্তির তীব্র হৃদয়জ্বালা ও প্রেম-বেদনা - এই দুয়ের এক চমৎকার ভারসাম্য এতে ফুটে উঠেছে।
রবীন্দ্রনাথের মতে রাজসিংহ উপন্যাসের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হল এখানে শ্রেষ্ঠ শিল্পীর মতো বঙ্কিম ইতিহাস ও উপন্যাসের মধ্যে, ঘটনাগতি ও চরিত্র নির্মাণের মধ্যে ভারসাম্যটি চমৎকারভাবে বজায় রাখতে পেরেছেন। “এই ইতিহাস এবং উপন্যাসকে একসঙ্গে চালাইতে গিয়া উভয়কেই এক রাশের দ্বারা বাঁধিয়া সংযত করিতে হইয়াছে। ইতিহাসের ঘটনাবহুলতা এবং উপন্যাসের হৃদয়বিশ্লেষণ উভয়কেই কিছু খর্ব করিতে হইয়াছে - কেহ কাহারো অগ্রবর্তী না হয়, এ বিষয়ে গ্রন্থকারের বিশেষ লক্ষ্য ছিল দেখা যায়। লেখক যদি উপন্যাসের পাত্রগণের সুখদুঃখ এবং হৃদয়ের লীলা বিস্তার করিয়া দেখাইতে বসিতেন তবে ইতিহাসের গতি অচল হইয়া পড়িত। তিনি একটি প্রবল স্রোতস্বিনীর মধ্যে দুটি-একটি নৌকা ভাসাইয়া দিয়া নদীর স্রোত এবং নৌকা উভয়কেই একসঙ্গে দেখাইতে চাহিয়াছেন। এইজন্য চিত্রে নৌকার আয়তন অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র হইয়াছে, তাহার প্রত্যেক সূক্ষ্মানুসূক্ষ অংশ দৃষ্টিগোচর হইতেছে না। চিত্রকর যদি নৌকার ভিতরের ব্যাপারটাই বেশি করিয়া দেখাইতে চাহিতেন তবে নদীর অধিকাংশই তাঁহার চিত্রপট হইতে বাদ পড়িত। হইতে পারে কোনো কোনো অতিকৌতূহলী পাঠক ঐ নৌকার অভ্যন্তরভাগ দেখিবার জন্য অতিমাত্র ব্যগ্র, এবং সেইজন্য মনঃক্ষোভে লেখককে তাঁহারা নিন্দা করিবেন। কিন্তু সেরূপ বৃথা চপলতা পরিহার করিয়া দেখা কর্তব্য, লেখক গ্রন্থবিশেষে কী করিতে চাহিয়াছেন এবং তাহাতে কতদূর কৃতকার্য হইয়াছেন। পূর্ব হইতে একটা অমূলক প্রত্যাশা ফাঁদিয়া বসিয়া তাহা পূর্ণ হইল না বলিয়া লেখকের প্রতি দোষারোপ করা বিবেচনাসংগত নহে। গ্রন্থপাঠারম্ভে আমি নিজে এই অপরাধ করিবার উপক্রম করিয়াছিলাম বলিয়াই এ কথাটা বলিতে হইল।”