সুমিত সরকার, মডার্ন ইন্ডিয়া ও মডার্ন টাইমস
- 07 September, 2026
- লেখক: সৌমিতা মিত্র
ভারতের আধুনিক ইতিহাসচর্চার পরিসরে সুমিত সরকারের Modern India 1885–1947 এবং Modern Times: India, 1880s–1950s—এই দুটি গ্রন্থকে পাশাপাশি রাখলে একজন ইতিহাসবিদের বৌদ্ধিক বিবর্তনের পাশাপাশি ভারতীয় ইতিহাসচর্চার গত কয়েক দশকের পরিবর্তনও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দুটি বইয়ের প্রকাশনার মধ্যে প্রায় তিন দশকের ব্যবধান। Modern India প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৮৩ সালে, যখন ভারতীয় জাতীয়তাবাদ, ঔপনিবেশিকতা এবং স্বাধীনতা আন্দোলনকে ঘিরে নতুন সামাজিক ইতিহাসের প্রবল উত্থান ঘটছে। Modern Times প্রকাশিত হয় ২০১৪ সালে, এমন এক সময়ে যখন ইতিহাসচর্চার পরিসর জাতীয়তাবাদ ও ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসের বাইরে গিয়ে পরিবেশ, সংস্কৃতি, দৈনন্দিন জীবন, নগরায়ণ, জাতপাত, অর্থনীতি এবং আধুনিকতার বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতার দিকে প্রসারিত হয়েছে। ফলে একই বৃহৎ সময়পর্বকে কেন্দ্র করে লেখা হলেও দুটি গ্রন্থ আসলে একই ধরনের ইতিহাস নয়। বরং দ্বিতীয় গ্রন্থটি প্রথমটির সঙ্গে এক দীর্ঘ বৌদ্ধিক সংলাপ। এই সংলাপের বিশেষ তাৎপর্য এই কারণে যে সুমিত সরকার তাঁর প্রথম গ্রন্থকে কয়েক দশক পরে কেবল সংশোধন বা পরিমার্জন করেননি। তিনি বুঝেছিলেন যে তিন দশকের নতুন গবেষণা এবং ইতিহাসচর্চার পদ্ধতিগত পরিবর্তনের ফলে আগের কাঠামোর মধ্যে নতুন তথ্য সংযোজন যথেষ্ট হবে না। তাই একই সময়পর্বকে নতুন প্রশ্নের আলোকে দেখতে হবে। Modern Times-এর জন্ম এই প্রয়োজন থেকেই। ফলে দুটি গ্রন্থকে একসঙ্গে পড়লে দেখা যায়, ইতিহাসের বিষয়বস্তু শুধু বদলায়নি, বদলেছে ইতিহাসবিদের প্রশ্ন করার পদ্ধতিও।
Modern India 1885–1947 মূলত ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ইতিহাসকে নতুনভাবে নির্মাণের একটি প্রয়াস। উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে স্বাধীনতা ও দেশভাগ পর্যন্ত সময়কে কেন্দ্র করে সুমিত সরকার জাতীয় আন্দোলনের বিকাশকে রাজনৈতিক ঘটনাবলির ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখেননি। তাঁর কাছে জাতীয়তাবাদ কোনও পূর্বনির্ধারিত বা একরৈখিক প্রক্রিয়া নয়। এর মধ্যে রয়েছে শ্রেণি ও সামাজিক স্বার্থের দ্বন্দ্ব, আঞ্চলিক বৈচিত্র্য, কৃষক ও শ্রমিকের অংশগ্রহণ, মধ্যবিত্তের রাজনৈতিক ভূমিকা, সাংস্কৃতিক পরিবর্তন এবং ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের সঙ্গে বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর জটিল সম্পর্ক। এই কারণে গ্রন্থটি জাতীয় আন্দোলনের প্রচলিত নেতাকেন্দ্রিক ইতিহাস থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিচ্যুতি ঘটায়। ভারতীয় জাতীয় আন্দোলনের ইতিহাসচর্চার প্রথম দিকের প্রবণতা ছিল মূলত জাতীয়তাবাদী। ঔপনিবেশিক ইতিহাসচর্চা ভারতীয় সমাজকে রাজনৈতিকভাবে অক্ষম এবং ঐতিহাসিকভাবে পশ্চাৎপদ হিসেবে নির্মাণ করেছিল। জাতীয়তাবাদী ইতিহাসবিদদের কাজ সেই ঔপনিবেশিক ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী বৌদ্ধিক প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ভারতীয় জাতির রাজনৈতিক আত্মসচেতনতা, জাতীয় নেতাদের ভূমিকা এবং স্বাধীনতা অর্জনের দীর্ঘ সংগ্রাম এই ইতিহাসের প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে। এই ধারার ঐতিহাসিক গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না, কারণ তারাই ভারতীয়দের নিজেদের ইতিহাসের সক্রিয় নির্মাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কিন্তু এর একটি সীমাবদ্ধতা ছিল—জাতীয় আন্দোলনের অভ্যন্তরীণ বৈপরীত্য এবং বিভিন্ন সামাজিক শ্রেণির পৃথক অভিজ্ঞতা অনেক সময় জাতীয় ঐক্যের বৃহৎ বয়ানের আড়ালে চলে যায়।
এই জাতীয়তাবাদী বয়ানের বিপরীতে মার্ক্সবাদী ইতিহাসচর্চা ভারতীয় জাতীয়তাবাদ ও ঔপনিবেশিকতাকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে স্থাপন করে। ঔপনিবেশিক অর্থনীতির প্রকৃতি, সম্পদ নিষ্কাশন, কৃষি-সম্পর্ক, শিল্পায়ন, বাণিজ্য, শ্রেণি-গঠন এবং ভারতীয় বুর্জোয়া শ্রেণির বিকাশ জাতীয় ইতিহাসের ব্যাখ্যার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে ওঠে। মার্ক্সবাদী ইতিহাসচর্চার সবচেয়ে বড় অবদান ছিল রাজনৈতিক ঘটনাকে বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত করা। সুমিত সরকারের Modern India-তে এই ঐতিহ্যের গভীর প্রভাব রয়েছে। কিন্তু তিনি ইতিহাসকে কোনও যান্ত্রিক অর্থনৈতিক নির্ধারণবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তাঁর কাছে শ্রেণি ও অর্থনৈতিক কাঠামোর পাশাপাশি রাজনৈতিক চেতনা, মতাদর্শ, সংস্কৃতি এবং মানুষের নিজস্ব ঐতিহাসিক agency-ও গুরুত্বপূর্ণ। এই সমন্বয়ই তাঁর ইতিহাসচর্চাকে বিশেষ চরিত্র দেয়। অপরদিকে Cambridge School জাতীয়তাবাদী ও মার্ক্সবাদী উভয় ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে ভিন্ন ধরনের প্রশ্ন উত্থাপন করেছিল। আনিল শীল, জন গ্যালাঘার, গর্ডন জনসন প্রমুখের কাজের মধ্যে ভারতীয় রাজনীতিকে স্থানীয় ক্ষমতার সম্পর্ক, patronage, faction এবং elite competition-এর আলোকে দেখার প্রবণতা দেখা যায়। এই দৃষ্টিভঙ্গি জাতীয়তাবাদের একটি heroic narrative-কে প্রশ্ন করেছিল। জাতীয় নেতৃত্ব বা সর্বভারতীয় জাতীয় চেতনার পরিবর্তে স্থানীয় রাজনীতি ও ক্ষমতার সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়াই ছিল এই ধারার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এর ফলে জাতীয়তাবাদকে আরও বাস্তব রাজনৈতিক প্রক্রিয়া হিসেবে বিশ্লেষণের সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু এর সীমাবদ্ধতা ছিল এই যে জাতীয়তাবাদের আদর্শগত শক্তি, গণমানুষের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং ঔপনিবেশিক বিরোধিতার বৃহত্তর চেতনাকে কখনও কখনও স্থানীয় elite politics-এর মধ্যে অতিরিক্ত সংকুচিত করে দেখা হয়েছে।
সুমিত সরকারের Modern India এই বিভিন্ন ইতিহাসচর্চার ধারার সঙ্গে একটি জটিল সম্পর্ক তৈরি করে। তিনি জাতীয়তাবাদী ইতিহাসের মতো জাতীয় আন্দোলনের গুরুত্বকে অস্বীকার করেন না, কিন্তু জাতীয়তাবাদকে একটি অভিন্ন ও দ্বন্দ্বহীন শক্তি হিসেবেও দেখেন না। তিনি মার্ক্সবাদী ইতিহাসচর্চা থেকে শ্রেণি, অর্থনীতি ও ঔপনিবেশিক শোষণের বিশ্লেষণ গ্রহণ করেন, কিন্তু জাতীয় আন্দোলনকে শুধুমাত্র শ্রেণিস্বার্থের প্রতিফলন হিসেবে ব্যাখ্যা করেন না। একইভাবে Cambridge School-এর elite politics-এর গুরুত্ব তিনি উপেক্ষা করেন না, কিন্তু জাতীয়তাবাদকে কেবল স্থানীয় ক্ষমতার প্রতিযোগিতায় নামিয়ে আনেন না। তাঁর ইতিহাসচর্চার মূল শক্তি এখানেই—তিনি জাতীয় রাজনীতি, সামাজিক কাঠামো, শ্রেণি, অঞ্চল এবং গণ-অংশগ্রহণকে একই বিশ্লেষণাত্মক কাঠামোর মধ্যে আনতে চেষ্টা করেন। এই জায়গায় Modern India-র সঙ্গে Subaltern Studies-এর সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। রণজিৎ গুহ ও তাঁর সহকর্মীদের উদ্যোগে গড়ে ওঠা Subaltern Studies জাতীয় ইতিহাসের elite-centred চরিত্রকে প্রশ্ন করে কৃষক, আদিবাসী ও অন্যান্য অধস্তন মানুষের রাজনৈতিক agency-কে সামনে আনতে চেয়েছিল। সুমিত সরকার নিজেও জাতীয়তাবাদের ইতিহাসে ‘history from below’-এর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলেন। ফলে তাঁর কাজ ভারতীয় ইতিহাসচর্চায় নিচুতলার মানুষের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়ার বৃহত্তর প্রবণতার সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে তাঁর ইতিহাসচর্চাকে সরলভাবে Subaltern Studies-এর সমার্থক করা যায় না। তাঁর কাছে ‘উপরতলা’ ও ‘নিচুতলা’ পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়; বরং রাষ্ট্র, জাতীয় নেতৃত্ব, মধ্যবিত্ত, কৃষক, শ্রমিক এবং স্থানীয় সমাজের পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যেই ঐতিহাসিক প্রক্রিয়াকে বোঝার চেষ্টা করা হয়।
এইসব বৈশিষ্ট্যগুলির জন্যই Modern India ভারতীয় আধুনিক ইতিহাসচর্চায় একটি ক্লাসিক হয়ে উঠেছে। কোনও ইতিহাসগ্রন্থকে ক্লাসিক করে তোলে শুধু তার তথ্যের পরিমাণ নয়; বরং নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করার ক্ষমতা, পূর্ববর্তী গবেষণাকে নতুনভাবে সংশ্লেষিত করার ক্ষমতা এবং পরবর্তী ইতিহাসচর্চাকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা। Modern India এই তিন ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ। বইটি এমন এক সময়ে প্রকাশিত হয়েছিল যখন ভারতীয় জাতীয় আন্দোলন সম্পর্কে বিপুল নতুন গবেষণা ইতিমধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে, কিন্তু সেই গবেষণাকে একটি সুসংবদ্ধ জাতীয় ইতিহাসের কাঠামোয় সংহত করার প্রয়োজন ছিল। সুমিত সরকার সেই কাজটি করেন। তিনি জাতীয় আন্দোলনের বৃহৎ রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, মধ্যবিত্ত এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক সমাজের অভিজ্ঞতাকে যুক্ত করেন। ফলে বইটি একই সঙ্গে একটি রাজনৈতিক ইতিহাস, একটি সামাজিক ইতিহাস এবং একটি ইতিহাসচর্চার হস্তক্ষেপ। Modern India-র ক্লাসিক হয়ে ওঠার আর একটি কারণ হল তার explanatory power। বইটি কেবল কী ঘটেছিল তা বলে না; কেন ঘটেছিল, কোন সামাজিক শক্তি তার পিছনে কাজ করেছিল এবং জাতীয় আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর ভূমিকা কেন বদলেছিল—এই প্রশ্নগুলির উত্তর খোঁজে। স্বদেশি আন্দোলন থেকে গান্ধীয় গণআন্দোলন এবং পরবর্তী স্বাধীনতা সংগ্রাম পর্যন্ত রাজনৈতিক পরিবর্তনকে তিনি সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত করেন। এই কারণে বইটি একটি নির্দিষ্ট সময়ের ইতিহাস হয়ে থেকেও পরবর্তী গবেষণার জন্য একটি analytical framework তৈরি করেছে।
প্রায় তিন দশক পরে Modern Times প্রকাশের সময় ইতিহাসচর্চার বৌদ্ধিক পরিবেশ সম্পূর্ণ ভিন্ন। এতদিনে Subaltern Studies, cultural history, environmental history, gender history, micro-history এবং post-structuralist ইতিহাসচর্চা ইতিহাসের বিষয়বস্তুকে অনেক বিস্তৃত করেছে। জাতীয়তাবাদ এবং ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংঘাত আর ইতিহাসের একমাত্র কেন্দ্র নয়। মানুষের দৈনন্দিন জীবন, পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্ক, সাংস্কৃতিক চর্চা, শহরের বিকাশ, জাতপাতের পুনর্গঠন, শিক্ষা, বিনোদন, জনপরিসর এবং আধুনিকতার নানা অভিজ্ঞতাও ইতিহাসের বৈধ বিষয় হয়ে উঠেছে। Modern Times এই নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এখানে সুমিত সরকার একই বৃহৎ সময়পর্বকে অনেক বিস্তৃত পরিসরে দেখেন। Modern India-র কেন্দ্রে ছিল জাতীয় আন্দোলন; Modern Times-এর কেন্দ্রে উঠে আসে colonial modernity। ঔপনিবেশিক শাসন কীভাবে ভারতীয় অর্থনীতি, পরিবেশ, সমাজ ও সংস্কৃতিকে পুনর্গঠন করেছিল—এই প্রশ্নটি এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কৃষি, ভূমি, বন, সেচ, বাণিজ্য, শিল্প, ঋণ, দুর্ভিক্ষ এবং ঔপনিবেশিক অর্থনৈতিক নীতির পাশাপাশি শহুরে সমাজ, সংবাদপত্র, থিয়েটার, সিনেমা, সাহিত্য, সংগীত, নৃত্য, খেলাধুলা ও জনসংস্কৃতির পরিবর্তনও ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠে। অর্থাৎ Modern Times জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের বাইরে গিয়ে সেই সমাজের দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তরকে ধরতে চায়, যার ভিতর থেকে জাতীয়তাবাদী রাজনীতি গড়ে উঠেছিল।
এই অর্থে Modern India এবং Modern Times-এর মধ্যে একটি গভীর পার্থক্য রয়েছে। প্রথম বইটি মূলত প্রশ্ন করে, ভারতীয় জাতীয়তাবাদ কীভাবে বিকশিত হল এবং কীভাবে তা গণভিত্তিক স্বাধীনতা সংগ্রামে রূপ নিল। দ্বিতীয় বইটি আরও বিস্তৃত প্রশ্ন তোলে—যে ভারতীয় সমাজে এই জাতীয়তাবাদ জন্ম নিল, সেই সমাজ ঔপনিবেশিক আধুনিকতার প্রভাবে কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছিল? এই পরিবর্তন কেবল রাজনৈতিক ছিল না; অর্থনৈতিক, সামাজিক, পরিবেশগত এবং সাংস্কৃতিকও ছিল। এই কারণে Modern Timesকে Modern India-এর পরবর্তী সংস্করণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং এটি একই অতীতের পুনর্পাঠ। কয়েক দশকের নতুন গবেষণা সুমিত সরকারকে এমন কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি করেছে, যা Modern India লেখার সময় তাঁর কাছে একইভাবে উপস্থিত ছিল না। তাঁর নিজের ইতিহাসচিন্তাও বদলেছে। ফলে তিনি পুরনো বইকে সংশোধন না করে একটি নতুন বই লিখেছেন। এই সিদ্ধান্তটি একজন ইতিহাসবিদের আত্মসমালোচনামূলক বৌদ্ধিক অবস্থানের পরিচয় বহন করে। একজন ইতিহাসবিদ তাঁর নিজের পূর্ববর্তী ব্যাখ্যাকেও সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে পুনর্বিবেচনা করতে পারেন—Modern Times তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
তবে দুটি বইয়ের মধ্যে বিচ্ছিন্নতার চেয়ে ধারাবাহিকতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। Modern India যদি আমাদের জাতীয় আন্দোলনের সামাজিক ভিত্তি বুঝতে সাহায্য করে, Modern Times দেখায় সেই সামাজিক ভিত্তি নিজেই কীভাবে তৈরি হয়েছিল। Modern India যদি রাজনৈতিক mobilisation-এর ইতিহাস হয়, Modern Times সেই mobilisation-এর অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটকে আরও বিস্তৃতভাবে ধরতে সাহায্য করে। একটি বই জাতীয়তাবাদকে ইতিহাসের কেন্দ্রে রেখে তার ভিতরের বহুত্বকে দেখেছে; অন্যটি জাতীয়তাবাদের বাইরে গিয়ে ঔপনিবেশিক আধুনিকতার বহুমাত্রিকতাকে সামনে এনেছে। দুই গ্রন্থের সম্পর্ক তাই ভারতীয় ইতিহাসচর্চার বৃহত্তর পরিবর্তনের সঙ্গেও যুক্ত। জাতীয়তাবাদী ইতিহাস আমাদের ‘জাতি’র ইতিহাস দিয়েছে; মার্ক্সবাদী ইতিহাস আমাদের শ্রেণি, অর্থনীতি ও ঔপনিবেশিক শোষণের দিকে তাকাতে শিখিয়েছে; Cambridge School জাতীয় রাজনীতির ভিতরের ক্ষমতার সম্পর্ক ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেটওয়ার্কের গুরুত্ব দেখিয়েছে; Subaltern Studies ইতিহাসের নিচুতলার মানুষ ও তাদের agency-কে সামনে এনেছে। পরবর্তী সাংস্কৃতিক ও পরিবেশগত ইতিহাস ইতিহাসের ক্ষেত্রকে আরও প্রসারিত করেছে। সুমিত সরকারের দুটি বই এই দীর্ঘ historiographical journey-এর দুই গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়কে প্রতিনিধিত্ব করে।
সর্বোপরি বলা যায় যে, Modern India একটি ক্লাসিক শুধু এই কারণে নয় যে এটি বহু বছর ধরে পড়ানো বা উদ্ধৃত হয়ে আসছে। এর প্রকৃত ক্লাসিকত্ব নিহিত তার পদ্ধতিতে—জাতীয়তাবাদকে সামাজিক ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করা, রাজনৈতিক ঘটনাকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর মধ্যে স্থাপন করা এবং গণমানুষকে জাতীয় ইতিহাসের সক্রিয় অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। এটি এমন একটি বই, যার সঙ্গে পরবর্তী ইতিহাসচর্চাকে বিতর্ক করতে হয়েছে, সহমত হতে হয়েছে, আবার অনেক ক্ষেত্রে তাকে অতিক্রম করতেও হয়েছে। সেই অর্থেই একটি ইতিহাসগ্রন্থের ‘ক্লাসিক’ হয়ে ওঠা সম্ভব এবং Modern Times সেই ক্লাসিকেরই এক ধরনের আত্মসমালোচনামূলক উত্তর। প্রায় তিরিশ বছর পরে একই সময়পর্বে ফিরে গিয়ে সুমিত সরকার দেখিয়েছেন যে ইতিহাসকে একবার কোনও নির্দিষ্ট কাঠামোয় বন্দি করে রাখা যায় না। নতুন প্রশ্ন, নতুন গবেষণা এবং নতুন অভিজ্ঞতা অতীতকে নতুনভাবে দেখতে বাধ্য করে। তাই Modern India এবং Modern Times পাশাপাশি পড়লে আমরা শুধু ১৮৮০ বা ১৮৮৫ থেকে স্বাধীনতা ও স্বাধীনতার পরবর্তী ভারতের ইতিহাস পাই না; পাই ইতিহাস লেখার পদ্ধতিরও একটি ইতিহাস। একটি বই আমাদের জাতীয় আন্দোলনের ভিতরের সমাজকে দেখায়, অন্যটি সেই সমাজের বৃহত্তর অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও সাংস্কৃতিক রূপান্তরকে দৃশ্যমান করে। এই দ্বৈত দৃষ্টিই সুমিত সরকারের ইতিহাসচর্চার সবচেয়ে বড় শক্তি এবং এই কারণেই দুটি বই একসঙ্গে আধুনিক ভারতের ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।