উমাশশী : তারাশঙ্করের জীবনের একটি অধ্যায়
- 07 September, 2026
- লেখক: নীতা মণ্ডল
(১)
বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিক। রাঢ়বঙ্গের লাভপুর গ্রামে তখন ছোট খাটো বড় মাঝারি নানা আকারের এবং নানা আয়ের জমিদারদের রমরমা। জমিদারির অহংকার তাঁরা নিজেরাই ঘোষণা করেন তাঁদের বিলাসবহুল জীবনযাপন ও প্রজাপীড়নের মাধ্যমে। তবে কয়েক বছর আগেই জমিদারদের একচ্ছত্র প্রভাবকে ম্লান করে দেওয়ার জন্যই যেন উদয় হয়েছিলেন এই গ্রামেরই মানুষ যাদবলাল বন্দ্যোপাধ্যায়। নিতান্ত নিম্নবিত্ত ব্রাহ্মণ সন্তান গ্রাম ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন উপার্জনের খোঁজে। কয়লাখনিতে সামান্য মাইনের কাজ করতে করতে একসময় অনেকগুলি কয়লা খনির মালিক হয়ে গ্রামে ফিরলেন। শুধু ফিরলেন না, গ্রামের উন্নতিকল্পে তাঁর ভাণ্ডার উজাড় করে দিলেন। ইংরাজি স্কুল, দাতব্য চিকিৎসালয়, রাস্তাঘাট মন্দির নির্মাণ ইত্যাদির মাধ্যমে তিনি লাভপুরকে নতুন ভাবে নির্মাণ করলেন। তাঁর ঐশ্বর্যের কাছে গ্রামের সবচেয়ে বড় জমিদারও শিশু। তবে জমিদারকুল সহজে সবকাজ হতে দিলেন না। বলা বাহুল্য, উঠতি ব্যবসায়ী এবং পুরনো জমিদারের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলতেই থাকল।
গ্রামের অগণিত জমিদারবর্গের একজন ছিলেন হরিদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। একবার শারদীয়া দুর্গাপুজোর মধ্যেই টায়ফয়েডে তাঁর অকালমৃত্যু হল। সালটা ১৯০৫। তখন তাঁর বড়পুত্র তারাশঙ্করের বয়স মাত্র আট বছর। তারাশঙ্করের পরে ছিল কমলা ওরফে বুড়ি আর ভাই দুর্গাশঙ্কর। কনিষ্ঠ ভ্রাতা পার্বতীশঙ্কর তখনও মাতৃগর্ভে। এমতাবস্থায় তারাশঙ্করের অভিভাবক দুজন। বিধবাপিসি শৈলজা, হরিদাসের অবর্তমানে তিনিই সংসারের কর্তা। অন্যদিকে তাঁর মাতা প্রভাবতী দেবী। প্রভাবতীদেবী দৃঢ় ও সংযমী মানুষ। সে সংযম বৈধব্য বা হিন্দুত্বের সংযম নয়। তিনি ছিলেন নির্লোভ, নির্ভীক এবং সত্যনিষ্ঠ। তাছাড়া তিনি শিক্ষিতা ও রুচিসম্পন্ন মহিলা। দুর্বলের প্রতি তিনি বিশেষ মনোযোগী ছিলেন। বৈষয়িক ব্যাপারে তিনি দূরে থাকতেন। তারাশঙ্করের নৈতিক সততা, জাগতিক সম্পদের প্রতি ঔদাসীন্য, মানুষের প্রতি মমতা—এসব তিনি পেয়েছিলেন তাঁর মায়ের শিক্ষার গুণে।
অন্যদিকে শৈলজাদেবী ছিলেন প্রখর ব্যক্তিত্ব আর বাস্তববুদ্ধিসম্পন্না মহিলা। সঠিক অর্থে জমিদার তনয়া। কলেরায় একই দিনে স্বামী পুত্রকে হারিয়ে তিনি পিতৃগৃহে ফিরে এসেছিলেন। তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল ভাইয়ের যুবতী স্ত্রী ও তাঁর সন্তানদের মঙ্গলসাধন। তাঁর মুখে কখনও মার্জিত ভাষা শোনা যেত না, বরং জগতের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ লৌকিক ছড়া বলতেন। তার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য:
'সম্পত্তি বাপের নয় দাপের' 'না খাইব উচ্ছিষ্ট ভাত না দিব চরণে হাত।'
ধীরে ধীরে এই দুই বিপরীত চরিত্রের নারীর সহায় সম্বল ও নয়নের মণি হয়ে উঠছিলেন তারাশঙ্কর।
তারাশঙ্করের বসতবাড়িটি ছিল গ্রাম্য রাস্তার ঠিক পাশে। সামনের গলি পথ দিয়ে যেতে হত যাদবলাল ঠাকুরবাড়ি। যাদবলাল বন্দ্যোপাধ্যায় তখন দেহ রেখেছেন। তাঁর বড়ছেলে ষষ্ঠীকিঙ্কর, স্বভাবে বাবার মতো বিনয়ী নম্র নয়। ব্যবসা ছাড়াও বিপুল পরিমাণ জমিদারির মালিক। তিনিই প্রবল প্রতাপে জমিদারী ও ব্যবসা পরিচালনা করেন। যাদবলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্ত্রী জাঁদরেল প্রকৃতির জন্য সুবিদিত। সমগ্র গ্রামের মানুষ তাঁকে গিন্নীমা বলে ডাকেন।
সকাল সন্ধ্যে গিন্নীমা যান তাঁর ঠাকুরবাড়িতে। সঙ্গে একটি বালিকা। বালিকাটি তাঁর কলজের টুকরো ফন্টি। তাঁরই মৃতা কন্যার কন্যা। ঠাকুরবাড়ি আসা যাওয়ার পথে কিশোর তারাশঙ্করকে দেখে ফেললেই ফন্টি ছড়া কাটে,
'ঠাকুরদাদা গালে কাদা বাগবাজারের দই ঠাকুরদাদার সঙ্গে দুটো মনের কথা কই।'
তারাশঙ্কর গ্রাম সম্পর্কে ফন্টির দাদু হয়। হবুদাদু। হবু অর্থাৎ তারাশঙ্কর ফন্টির দাদার বন্ধুও বটে। পাকা পাকা কথার জন্যে সে মাঝেমধ্যে এই ঠাকুরদার কাছে কানমোলা বা চড়চাপড় খেয়ে থাকে।
(২)
১৯১৫ সালে তারাশঙ্কর ম্যাট্রিক পরীক্ষায় বসে এবং অকৃতকার্য হয়। ততদিনে তার দুটি বিয়ের সম্বন্ধ এসে গিয়েছে। একটি করে গিয়েছিলেন তাঁর পিতৃদেব স্বয়ং। তবে মায়ের ইচ্ছে তারাশঙ্কর লেখাপড়া শিখে বড় মানুষ হবে। তাই বিয়ে নিয়ে কোনও ভাবনা মার ছিল না। অবশ্য সে কালের নিয়ম অনুযায়ী তারাশঙ্করের একমাত্র বোন কমলার বিয়ের বয়স পেরিয়ে যায় যায়।
কমলাকে পছন্দ করলেন গিন্নীমা অর্থাৎ যাদবলাল গিন্নী নিজে। পাত্র তাঁর দৌহিত্র লক্ষ্মীনারায়ণ। সে রূপবান, শিক্ষিত এবং তারাশঙ্করের সমবয়সী। সবচেয়ে বড়কথা পাত্র বিত্তশালী। যাদবলালের কন্যা শিবরানীর স্বামী চারুচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ছিলেন ঘরজামাই। মাত্র আঠাশ বছর বয়সে শিবরাণী পাঁচজন ছোট ছোট ছেলেমেয়ে রেখে মারা যায়। চারুচন্দ্র দেখেন সমস্ত সম্পত্তি তাঁর মৃতা স্ত্রীর হওয়ার ফলে সেসবের উত্তরাধিকারী ছেলেমেয়েরা। এই নাবালকদের সম্পত্তি থাকবে তাদের বড় মামা ষষ্ঠীকিঙ্করের হেফাজতে। তাই রাগে, ক্ষোভে তিনি শ্বশুরবাড়ির সংস্রব ত্যাগ করে, ছেলেমেয়েদের ফেলে রেখে গিয়ে অন্যত্র বিয়ে করে সংসারী হলেন।
গিন্নীমা তাঁর আঁচল দিয়ে নাতিনাতনিগুলিকে আড়াল করে রাখেন। সেই নাতিনাতনিদের জ্যেষ্ঠ হল লক্ষ্মীনারায়ণ। অর্থের অভাব তাদের নেই। কেবল প্রয়োজন একজন নিপুণ গৃহিণীর। যার হাতে তিনি দুর্গার ছেলেমেয়েদের তুলে দেবেন। পাড়ার মেয়ে কমলাকেই তাঁর উপযুক্ত মনে হয়েছে। অন্যদিকে শৈলজাদেবী বা প্রভাবতীদেবীর তরফ থেকে অমত নেই।
বড় ছেলে ষষ্ঠীকে নিয়ে পাকা কথা বলতে এলেন গিন্নীমা। হঠাৎ তিনি একটি অদ্ভুত দাবি উত্থাপন করে বসলেন। তিনি যেমন এঁদের মেয়েটিকে নিচ্ছেন তেমনই এঁদের তাঁদের মেয়েটিকে ঘরের বউ করে আনতে হবে। এমন প্রস্তাব তিনি আর্থিক সাশ্রয়ের কথা ভেবে মোটেও বলেন নি। সেই আমলে ফন্টি, যার পোশাকি নাম উমাশশী, তার বিয়ের জন্য নগদ পাঁচহাজার টাকা রাখা ছিল। এছাড়াও তার নামে ছিল আলাদা সম্পত্তি।
তারাশঙ্করের মা মৃদু আপত্তি করলেন। বললেন, তারা যে পাল্টি ঘর নয়। বংশ মর্যাদায় উমাশশীরা তারাশঙ্করের উপরে। ধনীগৃহিণী সে কথা কানে তুললেন না। তখন তাঁর মাথায় অন্য চিন্তা ঘুরছে। নাতনি উমাশশীর নাকে মুখে কথা অর্থাৎ সে মুখরা। লঘুগুরু বিচার না করে লোকের মুখের উপর যা খুশি বলে দেয়। এমন নাতনির শ্বশুর বাড়িতে কী পরিণতি হবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হবে না। উপরন্তু এ বাড়ির মেয়ে তাঁর বাড়িতে বউ হয়ে যাবে, কাজেই নাতনির সুখের চাবি কাঠিটি তাঁর আঁচলেই বাঁধা থাকবে।
প্রভাবতীদেবীর কথায় তাঁর প্রতিক্রিয়া ছিল অনেকটা, তোমরা 'জায়বদল বিয়ে' দেবে তো দাও নইলে তোমাদের মেয়েকেও আমরা বউ করে আনব না।
তারাশঙ্করের পিসিমা শৈলজাদেবী ধীরে ধীরে নরম হতে শুরু করেছিলেন। তাঁকে যেন শৈশবের পুতুলখেলার নেশায় পেয়ে বসেছিল। তিনি রাজি হয়ে গেলেন। মার আপত্তি টিকল না। তবে আবার গোলমাল বাঁধল কোষ্ঠীর যোটকবিচার করতে গিয়ে। দেখা গেল দুজনের মিল হয় না কোনও মতেই। গ্রহাচার্য বললেন, 'এ বিবাহ চলতে পারে। তবে পাত্রকন্যাতে ঝগড়াঝাঁটি হবে। এ বলবে আমি বড় ও বলবে আমি।' সমাধান আবার তিনিই দিলেন, 'দু বছর, পাঁচ বছর বড়জোর দশ বছর। কত ঝগড়া করবে, শেষে ক্লান্ত হয়ে ক্ষান্ত দেবে।'
সুতরাং ১৯১৬ সালের ২৬ জানুয়ারী তারাশঙ্করের বিয়ে হয়ে গেল।
(৩)
মাত্র সাড়ে দশ বছরের উমাশশী সোনার পুতুলের মতো এক গা গয়না পরে এবং মোটা অঙ্কের অর্থসম্বল নিয়ে পদার্পণ করলেন শ্বশুরবাড়িতে। যে শৈলজাদেবী পুতুল বিয়ের নেশায় বুঁদ হয়েছিলেন হঠাৎ তাঁর কী হল বালিকাবধূটিকে তিনি সহজভাবে গ্রহণ করতে পারলেন না। এমনকি প্রভাবতীদেবীও তাঁর এবং তাঁর ঠাকুরঝির নয়নের মণি তারাশঙ্করের জীবনে অন্যমেয়ের উপস্থিতি তেমনভাবে মানতে পারেন নি। শৈলজাদেবী বিয়ে দেওয়ার পরে বুঝলেন বউ 'পুতুল' নয়। সে রীতিমতো 'কথা বলা' মানুষ। চেহারায় ক্ষীণ ও খর্বকায়া বালিকাটিকে মুড়িয়ে খাবার জো নেই। কাজেই গোল বাঁধল।
প্রভাবতীদেবী চেষ্টা করলেন উমাশশীকে তাঁর আদর্শ মতো গড়ে নিতে। কিন্তু বুঝতে পারলেন দিদিমার অবাধ প্রশ্রয়ে বেড়ে ওঠা উমাকে বাগ মানানো শক্ত।
অন্যদিকে ছিল শৈলজাদেবীর ভয় ঐশ্বর্যের দাপটে এই মেয়ে ঠিক তারাশঙ্করকে কেড়ে নেবে। তিনি তাঁর রাগ ক্রোধ গোপন করতে পারতেন না। তারাশঙ্করের স্ত্রীর সঙ্গে সামান্য মিষ্টি করে কথা বলা বা রসিকতাকে তিনি বিষ নজরে দেখতেন।
বালিকা উমা খিড়কির দরজা দিয়ে বেরিয়ে দিদিমার বাড়িতে গিয়ে উঠত। এতে শাশুড়ি বা পিসিশাশুড়ির শাসনকে যে উপেক্ষা করা হয় বুঝত না। শেষ পর্যন্ত প্রবল টানাপোড়েন শুরু হয় তারাশঙ্করের পিসিমা আর উমার দিদিমার মধ্যে। কেউ পিছু হটবেন না। উভয়েই দাবী করলেন বরকনে অর্থাৎ তারাশঙ্কর ও উমা তাঁর বাড়িতে থাকবে। মীমাংসা হল না। যেমন করে পুতুল খেলার মত তাদের বিয়ে দেওয়া হয়েছিল তেমনই যে যার পুতুল বর আর কনে নিয়ে বাড়ি ফিরে গেল। তারাশঙ্করের তরুণ বয়সের রোমান্স এই দুই প্রবল প্রতাপা মহিলার দাপটে উবে গেল।
এমন সময় গ্রামে কলেরা দেখা দিতে তারাশঙ্করের মা স্থির করলেন তিনি নববধূকে সঙ্গে নিয়ে বাপের বাড়ি পাটনায় যাবেন। কিন্তু গিন্নীমা সে কথায় কর্ণপাত করলেন না। সপরিবারে এমনকি তাঁর পরিবারের নবদম্পতি লক্ষ্মীনারায়ণ-কমলা সহ উমাশশীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি গ্রাম ছাড়লেন। উঠলেন সিউড়িতে। ভুল বোঝাবুঝি আরও বাড়ল। পাটনা থেকে তারাশঙ্কর তার স্ত্রীকে পত্র লিখেছে এ খবর কানে যেতেই শৈলজাদেবী গৃহত্যাগ করে কাশী যাবার উদ্যোগ করলেন। দুই পরিবারের বিচ্ছেদ অনিবার্য হয়ে উঠল।
শৈলজাদেবী ভাবলেন বিয়ে দেওয়াটা ভুল হয়ে গিয়েছে। গ্রামের মধ্যে তিনি বলে বেড়ালেন হবুর আবার বিয়ে দেবেন। একথা শুনে গিন্নীমা ঘোষণা করলেন তারা যদি ছেলের একটা বিয়ে দেয় তিনিও নারাণের তিনটে বিয়ে দেবেন। এমন চরম বিবাদের মুহূর্তে তারাশঙ্কর একদিন একটা দুর্ঘটনার হাত থেকে বেঁচে ফিরলেন। সেদিন গাঁয়ে রটে গেল এ অসাধ্যসাধন উমাশশীর সতীত্বের কারণেই ঘটেছে। অতঃপর তুমুল বিবাদে কিছুটা ভাঁটা পড়ল।
তারাশঙ্কর দ্বিতীয়বারের চেষ্টায় ম্যাট্রিক পাশ করে কলকাতায় পড়তে গেলেন। কলেজে পড়ার উন্মাদনায় দাম্পত্যজীবনের জটিলতা থেকে সাময়িক রেহাই পান তারাশঙ্কর। কিন্তু কিশোরী উমা কেমন দিনে দিনে নিষ্প্রভ হয়ে পড়তে লাগল। সে ভাবে তার সংসার করার স্বপ্ন বোধ হয় ব্যর্থ হয়ে যাবে। স্বামীর কলেজ, বন্ধুবান্ধব, সাহিত্যসভা, দেশসেবার কাজ কত কিছু আছে। তার উপর আছে মা পিসিমার স্নেহের আশ্রয়। কিন্তু তার সম্বল বলতে প্রবলপ্রতাপান্বিতা দিদিমার আদর ও আশ্রয়। সেও নিষ্কণ্টক নয়, সেখানে আছে মামির বিদ্বেষ। আশৈশব মা-বাবার স্নেহবঞ্চিতা মেয়েটি ঘটনার ঘাত প্রতিঘাতে যেন বয়সের তুলনায় অনেকটা বড় হয়ে গেল।
সেই আমলে মেয়েদের সবচেয়ে গর্বের বস্তু ছিল স্বামী। সম্মানের আশ্রয় বলতে স্বামীর ঘর। কাজেই উদ্বেগের মেঘ তার দিদিমার মনেও ঘনিয়ে ওঠে। তিনি সাময়িকভাবে হার মানেন। নারাণের নাম করে তারাশঙ্করকে ডেকে পাঠান। কায়দা করে একঘরে বন্দি করা হয় উমাশশী ও তারাশঙ্করকে। গিন্নীমা ভাবেন, এভাবেই দুজনের মনের মিল ঘটিয়ে দেবেন।
পরবর্তী জীবনে তারাশঙ্কর এক জায়গায় লিখেছেন, ছুটির মধ্যে কয়েকদিন বউটির সঙ্গে এইভাবেই দেখা হয়েছিল, বোধ করি আমার সারা জীবনে রোমান্স বলতে ওই কটা দিনের দেখাশোনা।
(৪)
পুজোর পর কলকাতায় ফিরে অবশ্য কলকাতায় আর থাকা হয় নি তারাশঙ্করের। রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়ার কারণে পুলিশ তাঁকে গ্রামে অন্তরীণ থাকা সাব্যস্ত করেন। এই অন্তরীণ থাকার সময় দুইবাড়ির রেষারেষিতে খানিক ভাঁটা পড়ে। উমাকে শ্বশুরবাড়ি পাঠানো হয়। উমার বয়স তখন বারো আর তারাশঙ্করের কুড়ি। পরের বছর তারাশঙ্করের প্রথম সন্তান সনৎকুমারের জন্ম হয়। নাবালিকা মায়ের দুর্বল সন্তান সনৎ। তাকে অতি কষ্টে ও যত্নে বাঁচিয়ে তোলা হয়। তুলোয় মুড়ে রাখা হতো তাকে। এরপর থেকে প্রতি দু তিন বছর অন্তর সরিৎ, গঙ্গা, বুলু ও বাণী ছাড়াও তাঁদের আরও পাঁচটি স্বল্পায়ু সন্তান জন্মেছিল।
লাভপুরে সংসার করার সময় তাঁদের দুজনের ভাবনাচিন্তা অথবা জীবন দুটো ভিন্ন খাতে বয়ে চলত। মাঝখানে পিসিমার উপস্থিতি তাঁদের নৈকট্যের প্রধান বাধা। এ সময় ক্ষীণকায়া উমা পর পর সন্তানের জন্ম দিতে দিতে আরও ক্ষীণ, রক্তশূন্য ফ্যাকাসে হয়ে পড়েছিলেন। ছেলেমেয়েদের পরিচর্যা ছাড়াও মায়ামমতাহীন সংসারে অনেকগুলি মানুষের রান্না, পুজোর যোগাড়, বাসন মাজা আর বার বার স্নান করে শুদ্ধ হওয়া ছিল বাধ্যতামূলক।
ঠিক তখনই তারাশঙ্কর মেতে ছিলেন রাজনীতি, সমাজসেবা ও সাহিত্যচর্চা নিয়ে। স্থায়ী উপার্জনের প্রতি তাঁর তেমন ইচ্ছে নেই। যে পৈতৃক জমিদারিটুকু আছে তাতে আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি। জমিদারি টিকিয়ে রাখতে তাঁকে প্রায়ই বউয়ের গয়না বন্ধক রাখতে হয়। মাঝখানে শ্বশুরবাড়ির সূত্রে কোম্পানিতে কাজ করতে গিয়ে লোকসান করে ফিরে আসেন। এমন পরিস্থিতিতে তাঁদের স্বামীস্ত্রীর সম্পর্কে মাধুর্যের চেয়ে তিক্ততা জমে বেশি। একটা সময় এমন হয়, তারাশঙ্কর কাজকর্ম নিয়ে বাইরে থাকলেই উমা যেন নিশ্চিন্ত থাকেন। কারণ কাছাকাছি থাকলেই তাঁদের মতান্তর ও মনান্তর অবধারিত।
এল উনিশশ তিরিশ সাল। গান্ধিজির নেতৃত্বে আইন অমান্য আন্দোলন শুরু হয়েছে। তারাশঙ্কর গ্রামবাসীদের নিয়ে গাঁজামদের দোকানে পিকেটিং করতে গিয়ে পুলিশের হাতে বন্দি হলেন। সঙ্গে তাঁর এক শ্যালক। উমাশশীর মামা লক্ষ্মীনারায়ণকে ভার দিলেন দুজনকে দিয়ে মোক্তারনামা সই করাতে এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য ভালো উকিলের ব্যবস্থা করতে। সব খরচের ব্যবস্থা তিনি করবেন। অন্যথায় দুজন যুবকের ভবিষ্যৎ মাটি হবে। জেল খেটে এলে সরকারী কোনও কাজ আর পাবে না। তারাশঙ্কর সই করলেন না। সেই যে পিসিমার শিক্ষা, 'না খাইব উচ্ছিষ্ট ভাত, না দিব চরণে হাত।'
তিনি কারাবরণ করলেন। অবশ্য কারাবাসে থাকাকালীন তাঁর রাজনীতির প্রতি মোহ কিছুটা ঘুচে গেল। সিদ্ধান্ত নিলেন সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে এসে সাহিত্যসেবা করবেন।
কারাগার থেকে বেরিয়ে মেজোভাইকে সঙ্গে নিয়ে স্ত্রী ও ভ্রাতৃবধূর গয়না বিক্রি করে বোলপুরে একটি ছাপাখানা খোলেন। ইচ্ছা ছিল স্বাধীনভাবে একটি পত্রিকা প্রকাশ করবেন। কিন্তু সরকারের বিরুদ্ধে একটি ব্যঙ্গ ছড়া ছেপে রাজরোষে পড়ে সেই ছাপাখানা তুলে দিতে হয়।
ততদিনে কলকাতার পত্র পত্রিকায় তারাশঙ্করের দু-একটা লেখা ছাপা হয়েছে। কল্লোল থেকে তিনি সমাদৃত হয়েছেন। লেখালিখির জন্য তিনি কলকাতায় গিয়ে মনোহর পুকুর লেনে একটি টিনের ছাউনি দেওয়া ঘরে একজন সাধারণ শ্রমিকের মত থাকতে শুরু করলেন। পাইস হোটেলে খান আর লেখেন। পত্রিকার অফিসে ঘোরাঘুরি করেন। সংসারে সাহায্য করতে তো পারেন না উলটে বাড়ি থেকে টাকা চেয়ে পাঠান। ইতিমধ্যে উমাশশীর বিবেচনা অনুযায়ী তার বড় কন্যা গঙ্গা বিবাহযোগ্যা হয়ে ওঠে। গঙ্গার বয়স তখন বড়জোর আট। ১৯৩৩ সাল নাগাদ সে একটি বয়স্ক দ্বিতীয় পক্ষের পাত্রকে মনোনীত করে তিনি তারাশঙ্করকে চিঠি লেখেন।
বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে থেকেও তারাশঙ্কর তেমন প্রতিবাদ করতে পারেন নি। উলটে চিঠিতে লেখেন, 'এখন তোমরা যা ভালো বোঝো করো। আমার মতামতের অপেক্ষা করো না। ...'
অবশ্য সে বিয়ে অন্য কারণে ভেঙে যায়।
(৫)
উমাশশীর অর্থকে তাঁর শ্বশুরকুল অনর্থ বলেই গণ্য করত। এই অর্থই তাঁদের সম্পর্কের মধ্যে পাঁচিলের মতো দাঁড়িয়েছিল। তবে উমা তাকে কখনও উপেক্ষা করে নি। দিদিমার শিক্ষায় শিক্ষিত উমা ভাবত অর্থই জীবনে সুখী হবার প্রধান উপকরণ। সংসারের কাজে সেই অর্থ নয়ছয়ের পক্ষপাতী সে ছিল না। তাঁর দুইপুত্রের পড়াশোনা ও মেয়েদের বিয়ের জন্য সেই অর্থ যক্ষের ধনের মতো আগলে রাখত। এদিকে নগদ টাকার অভাব দেখা দিলেই তারাশঙ্কর ধার চান স্ত্রীর কাছে। স্বামীস্ত্রীতে তাই নিয়ে বারংবার মনোমালিন্য হয়। তারাশঙ্কর বই ছাপার জন্যও টাকা চাইতেন। উমা রাগ করতেন আবার শেষমেশ দিয়েও দিতেন। ১৯৩৪-৩৫ সাল নাগাদ 'আগুন' উপন্যাসটি বই হিসেবে প্রকাশ করার সময় তারাশঙ্কর স্ত্রীকে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন, '... দুশ টাকা বাদলকে দিয়ে এখানে পাঠিয়ে দাও। আমি ভিক্ষা চাইছি। না দাও, আমি রাগ করব না, অভিমান করব না। তবে এ জীবন এ সাহিত্যিক জীবন শেষ করব। সমস্ত দগ্ধ করে ভস্ম করে গঙ্গার জলে বিসর্জন দিয়ে মঙ্গলবার বাড়ি ফিরব। কাউকে কোনও কথা তুমি বল না। সাবধান এ পত্রের কথা যেন ঘুণাক্ষরে ও প্রকাশ না হয়। তাহলে লাভপুরে শত্রু হাসবে। ...।'
চল্লিশের দশকের প্রথম দিকে উমাশশীর অসুস্থতাহেতু তাঁকে কলকাতায় নিয়ে আসতে হয়। তারাশঙ্কর মেস জীবনে ইতি টেনে বাসা করেন আনন্দ চ্যাটার্জী লেনে। সেই সময় লাভপুরের আত্মীয় বা পাড়া প্রতিবেশীর অবজ্ঞা ও বৈরিতাও তাঁর কাছে অসহ্য হয়ে উঠেছিল।
বাড়িটার সামনেই থাকতেন শিল্পী যামিনী রায়। সাহিত্যিক ডাক্তার পশুপতি ভট্টাচার্য উমাশশীর রোগ নির্ণয় করলেন। এক জটিল ধরণের ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত সে। বড়ছেলে সনৎ তখন কলকাতায় মেসে থেকে এম এ পড়ছিল, বাসা হওয়ায় সেও এল। স্বামী স্ত্রী, চার ছেলেমেয়ে ছাড়াও একজন রান্নার ঠাকুর ছিল। তারাশঙ্করের বাঁধা আয় তখন ২৫ টাকা অথচ খরচ প্রায় একশ টাকা। সজনীকান্ত 'শনিবারের চিঠি'তে একটি কাজের ব্যবস্থা করে দিলেন। যদিও তা পাঁচমাসের বেশি টেকে নি।
এরমাঝে পুজোর মরশুম এগিয়ে এল। এই একটা সময় লেখকদের মর্যাদা খানিক বাড়ত। কেউ কেউ দশ বারোটা পর্যন্ত গল্প লিখে আড়াই থেকে তিনশ টাকা পর্যন্ত উপার্জন করতেন। তারাশঙ্কর পুজোর গল্প লিখে চলেছেন। ঘরের একদিকে স্ত্রী লেপ তোশক জড়ো করে যথাসম্ভব মোটা বিছানা করে তার উপর শুয়ে কাতরাচ্ছেন। পায়ের নিচে হটওয়াটার ব্যাগ। দুপাশে গরম জলের বোতল আর মাথার কাছে দুই মেয়ে বসে বাতাস করছে। যন্ত্রণায় দুচোখ থেকে জলের ধারা গড়িয়ে পড়ছে। আর তারই একপাশে একটি আসনের উপর পা ছড়িয়ে বসে কোলের উপর ফাইবারের একটা সুটকেসকে ডেস্কের মতো নিয়ে লিখে চলেছেন তারাশঙ্কর।
সেবারে লেখা অনেকগুলো গল্পের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল চন্দ্র জামাইয়ের জীবন কথা, বন্দিনী কমলা আর কবি। কবির চরিত্ররা তাঁর চোখে দেখা। কিন্তু কবির গান তারাশঙ্করের নিজের রচনা। 'কালো যদি মন্দ তবে কেশ পাকিলে কান্দ কেনে' লেখার পরের লাইনটি কিছুতেই দানা বাঁধছে না। ওই লাইনটির খোঁজে প্রায় বাহ্যজ্ঞান লুপ্ত হয়ে গিয়েছে তাঁর। তন্ময় হয়ে ভেবেই চলেছেন। এমন সময় স্ত্রী ডুকরে কেঁদে ওঠায় হুঁশ ফেরে। কাছে গিয়ে কপালে হাত দিয়ে শুধোন, কি হল, খুব কষ্ট হচ্ছে? উমা হাতখানি সরিয়ে দিয়ে বলেন, 'তুমি এমন দয়ামায়াহীন, পাষাণ, আমি এক পাশে শুয়ে কাতরাচ্ছি আর তুমি সুটকেস কোলে করে লিখেই যাচ্ছ!'
চমকে উঠেছিলেন তারাশঙ্কর। স্ত্রী ভুল তো কিছু বলেন নি।
এরপর কবি প্রকাশিত হল। উমাশশী রোগমুক্ত হলেন। তবে শারীরিক বল ফিরে পান নি। স্ত্রীর অর্থআনুকূল্যে বরানগর, কাশীনাথ দত্ত লেনে একটি দোতলা বাড়ি কেনেন তারাশঙ্কর। ১৯৪২ এর অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিতে বড়কন্যা গঙ্গার বিয়ে হয়। তাঁর মনের মতো পাত্র। লাভপুরের ছেলে শান্তিশঙ্কর মুখোপাধ্যায়। এর মধ্যে গণদেবতা, হাঁসুলিবাকের উপকথা প্রকাশিত হয়েছে। দুই পুরুষ ও কালিন্দী নাটক দুটি মঞ্চ সফল হওয়ায় তাঁর কিছুটা আর্থিক স্বচ্ছলতাও এসেছে। স্বাধীনতার বছরেই তারাশঙ্কর পঞ্চাশে পদার্পণ করেছেন।
১৯৪৯ সাল নাগাদ তারাশঙ্কর টালাপার্কে বাড়ি করে উঠে আসেন। পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি ছোট কন্যার বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর তাঁর সংসার ছোট হয়ে যাওয়ার কথা কিন্তু দেখা গেল চাকর বাকর মিলিয়ে জনা ছয় এবং আশ্রিত প্রায় কুড়ি জন। পরে বড়কন্যা গঙ্গা বিধবা হয়ে তাঁর চার সন্তানকে নিয়ে পিতৃগৃহেই বসবাস করেন। সেই বিপুল সংসারের দুই প্রান্তে তারাশঙ্কর আর উমাশশী বাস করতেন। দিনে দুবার খাবার সময় আর শোবার সময় দুজনের সাক্ষাৎ হতো। খাবার বেড়ে দিত বড় পুত্রবধূ, উমাশশী শুধু সামনে এসে বসতেন।
চার দশক পার করেও তাঁদের স্বামী স্ত্রীর আদর্শের কোনও মিল হয় নি। তারাশঙ্কর তখন ক্রমশ সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে উঠছেন। উমা দেবসেবায় নিজেকে পুরোপুরি ডুবিয়ে দিয়েছেন। এইসময় তারাশঙ্করের সাহিত্যকীর্তি সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন হয়ে যান তিনি। যে উমা কম বয়সে গল্প উপন্যাসের পোকা ছিল সেই আর তারাশঙ্করের পরিণত বয়সের কোনও লেখা ছুঁয়ে দেখেন নি। তারাশঙ্করও তাঁর লেখা সংক্রান্ত বিষয়ে কোনও আলাপ আলোচনা স্ত্রীর সঙ্গে করতেন না। ধীরে ধীরে ধর্মগ্রন্থ পড়াটা উমাশশীর অনেকটা বাতিকের মতো হয়ে পড়েছিল।
তারাশঙ্করের সঙ্গে বহু গণ্যমান্য ব্যক্তি দেখা করতে আসতেন তিনিও যেতেন নানা গুরুত্বপূর্ণ জায়গায়। রাজ্যসভার সদস্য হওয়ার পর দেশের নানা জায়গায় ঘুরেছেন। কিন্তু উমাশশী কখনও তাঁর সঙ্গে যান নি। হয়ত কোনও দুরন্ত অভিমান বুকে চেপে তিনি অন্তঃপুর আঁকড়ে বসে থেকেছেন। বেশবাসেও তাঁর কোনও বাহুল্য ছিল না। সবকিছুতেই অবিন্যস্ত ভাব। ভাষাতেও চিরকালের বীরভূমী টান। কোনওদিন শহুরে হবার কোনও চেষ্টা তিনি করেন নি। এ যেন তারাশঙ্করের প্রতি তাঁর প্রতিশোধ।
(৬)
হঠাৎই জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তারাশঙ্কর নিজেও আত্মমগ্ন আর আধ্যাত্মিকতায় ডুবলেন। সেসময় দিনের অনেকটা সময় তিনি পুজোর ঘরে কাটাতেন। পুজো করার সময় তাঁর দুচোখ দিয়ে জলের ধারা বয়ে যেত। এই সময় পুজোকে কেন্দ্র করেই তাঁদের স্বামী স্ত্রীর মধ্যে একটা সখ্য গড়ে ওঠে যা তাঁদের সারা জীবনেও ঘটে নি। উমাশশীর ঘর ভর্তি ঠাকুর, পাথর, পট। তারাশঙ্করের পুজোর আয়োজন উপাচার যোগাড় করে দিয়ে তিনি পাশে বসে থাকতেন।
আবার একটা অধ্যায় এল ১৯৬৭ সালে। তারাশঙ্কর জ্ঞানপীঠ পেলেন। সরস্বতীর সাধনা করতে করতে লক্ষ্মীর কৃপাদৃষ্টি এর আগে তাঁর উপর পড়েছে কিন্তু একসঙ্গে এক লক্ষ টাকা সে সময় একটা বিশাল অঙ্ক। তারাশঙ্কর যেন তাঁর নিজস্ব পরিমণ্ডলেই ভি আই পি হয়ে উঠলেন। পারিবারিক সদস্যরা তাঁকে ঘিরে থাকে। অবশ্য উমাশশী এই পরিমণ্ডলের বাইরেই থেকে যান। বহু মানুষ বাড়িতে আসে। তারাশঙ্করের প্রতিক্রিয়া জানতে চায় তারা। এমন সময় একজন ভদ্রমহিলা উমাশশীর প্রতিক্রিয়া জানতে তাঁর ইন্টারভিউ নিতে চান। উমাশশী বাড়িতে সেই আদি অকৃত্রিম লালপাড় মটকার শাড়ি পরে ছিলেন। তাঁকে সামান্য সাজগোজ করতে বললে প্রকাশ্যে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। লাভপুরী ঢঙে বলে ওঠেন, 'কে আসছে কে যে সাজগোজ করতে হবে। যেমন আছি তাতেই হবে। আমরা তো আর বড়লোক নই।'
তারপর মটকার শাড়িখানি গায়ে জড়িয়ে বসে পড়েন ইন্টারভিউ দিতে। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়, — আপনার স্বামী জ্ঞানপীঠ পেয়েছেন আপনার কেমন লাগছে? — পুরস্কার পেলে আনন্দই হয়। — জ্ঞানপীঠের টাকাটা কী করবেন? — জ্ঞানপীঠের টাকাটা কিছু বেশি বটে তবে উনি পুরস্কার তো এর আগেও অনেক পেয়েছেন। সে সব টাকাই খরচ হয়ে গেছে। আমরা বড়লোক নই, তাই এই টাকাও থাকবে না। খরচ হয়ে যাবে। তবে এ টাকা না পেলেও সংসার থেমে থাকত না।
সেই উমাশশী যিনি ধনীর ঘরের দুলালী বলে আশৈশব গর্বিত ছিলেন। তাঁর মতো এমন নিঃস্পৃহ উত্তর সম্ভবত তারাশঙ্করও সেদিন দিতে পারেন নি।
এরপর মহাসমারোহে তারাশঙ্কর দিল্লী থেকে পুরস্কার নিয়ে এলেন। বহু সমাবেশ, বহু সম্বর্ধনার স্রোতে তারাশঙ্কর আবার ভেসে গেলেন। উমাশশী পড়ে থাকলেন তাঁর সংসার আর ঠাকুর ঘর আগলে।
১৯৭১ সালের বর্ষার শেষের দিকে তারাশঙ্কর ইহলোক ত্যাগ করলেন। উমাশশী তাঁর মৃত্যুকে বয়সজনিত পরিণতি হিসেবে মেনে নিয়েছিলেন। তিনি তাঁর ভগবানভক্তিকে আশ্রয় করে দিনাতিপাত করছিলেন। কিন্তু হঠাৎই তাঁর অনাড়ম্বর জীবনে ছন্দপতন ঘটল। ১৯৭৮ সালে সনৎকুমারের মৃত্যুতে তাঁর চারিদিক স্তব্ধ হয়ে গেল। বড়পুত্রের মৃত্যুতে উমাশশী চরম আঘাত পেলেন। নিজের চেয়ে মাত্র তের বছরের ছোট তাঁর এই সন্তান। তার জন্মের পরও উমাশশী কাচের পুতুল নিয়ে খেলতেন। সনৎ পুতুল ভেঙে দিলে তিনি পুতুলের শোকে কাঁদতেন। সেই ছেলে চলে যেতে তাঁর মনোরোগের লক্ষণ প্রকট হয়ে উঠল। এতদিন যা ছিল ভগবৎপ্রীতি তা দাঁড়াল স্কিজোফ্রিনিয়ায়। ঠাকুর পুজো ছেড়ে তিনি ডুব দিলেন অতীতে। সময়ের চেয়ে তিরিশ বছর আগে। যখন জামাই, স্বামী, ছেলে সবাই জীবিত। তবে আর ঠাকুর পুজো করতেন না। কারণ ততদিনে তাঁর আর কোনও নিরাপত্তাহীনতা নেই।