সন্ধ্যাকর নন্দীর রামচরিত ও পাল আমলের ইতিহাস, রাজনীতি
- 07 July, 2026
- লেখক: সৌমিতা মিত্র
"মহারাজ, বরেন্দ্র আবার আমাদের হাতে এসেছে।"
রাজসভায় বার্তাবাহকের কণ্ঠে স্বস্তি, কিন্তু সিংহাসনে বসে থাকা রামপালের মুখে বিজয়ের উল্লাস নেই। বহু যুদ্ধ, অসংখ্য প্রাণহানি এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকটের পর যে রাজ্য ফিরে এসেছে, তা আর সেই পুরনো অজেয় পাল সাম্রাজ্য নয়। কবি সন্ধ্যাকর নন্দী এই দৃশ্যের প্রত্যক্ষদর্শী না হলেও, তাঁর রামচরিত-এ যেন সেই মুহূর্তের প্রতিধ্বনি শোনা যায়। সেখানে রামপাল কেবলমাত্র একজন বিজয়ী নন; তিনি এমন এক সম্রাট, যিনি ভেঙে পড়া রাষ্ট্রকে শেষবারের মতো দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছিলেন। ইতিহাসের এক বিস্ময়কর সত্য হলো কখনও কখনও একটি সাম্রাজ্যকে তার সূচনা নয়, বরং তার শেষ সংগ্রামের মধ্য দিয়েই সবচেয়ে ভালো বোঝা যায়। রামপালের যুগ সেই কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর রাজত্বে আমরা একই সঙ্গে দেখি গৌরবময় অতীতের স্মৃতি এবং আসন্ন পতনের পূর্বাভাস দেখতে পাই। দ্বাদশ শতকের এক বিকেল। গৌড়ের রাজসভায় একজন কবি বসে লিখছেন তাঁর নাম সন্ধ্যাকর নন্দী। তিনি লিখছেন রামচরিত। নাম শুনলে মনে হয় এটা বুঝি অযোধ্যার রামচন্দ্রের কাহিনি। কিন্তু কাহিনী একটু এগোলেই বোঝা যায়, এই রাম একজন পাল সম্রাট রামপাল। কবির চোখে তিনি একাধারে রাজা, উদ্ধারকর্তা এবং এক ভেঙে পড়া রাষ্ট্রের শেষ ভরসা। ইতিহাসের অদ্ভুত নিয়ম কখনও একটি যুগকে সবচেয়ে ভালো বোঝা যায় তার শেষ অধ্যায় থেকে। রামপালের রাজত্ব তেমনই একটি জানালা। এখানে পাল সাম্রাজ্যকে দেখা যায় তার পূর্ণ মহিমায় নয়, বরং ক্ষয়, সংকট এবং পুনর্গঠনের সংগ্রামের ভিতর দিয়ে। তাই পাল আমলের রাজনৈতিক ইতিহাস শুরু হতে পারে রামপালকে দিয়েই।
রামপাল যখন সিংহাসনে আরোহণ করেন, তখন পাল সাম্রাজ্যের ভিত নড়বড়ে। বরেন্দ্রে কৈবর্ত বিদ্রোহ রাজকীয় কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলো। সামন্তপ্রভুরা আর সম্রাটের অনুগত অধীনস্থ নন; তাঁরা তখন ক্ষমতার অংশীদার। রামপাল বিদ্রোহ দমন করেন, জোট গড়েন এবং সাম্রাজ্য পুনর্গঠনের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ইতিহাসের একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে সেটা হলো তিনি কি সাম্রাজ্যকে নতুন জীবন দিয়েছিলেন, নাকি কেবল তার পতনকে কিছুদিনের জন্য বিলম্বিত করেছিলেন মাত্র? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে অষ্টম শতকের বাংলায়। এমন এক বাংলা যেখানে কোনও একচ্ছত্র শাসক নেই। নদী, জনপদ ও দুর্গকেন্দ্রিক অসংখ্য ক্ষুদ্র শক্তি একে অপরের বিরুদ্ধে লড়ছে। কৃষকের জমি অনিরাপদ, বণিকের পথ অনিশ্চিত, মানুষের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। পরবর্তী ঐতিহ্য জানায়, এই দীর্ঘ মাৎস্যন্যায় অর্থাৎ শক্তিশালীর দুর্বলের উপর অত্যাচারের অবসান ঘটাতেই প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলি গোপালকে রাজা হিসেবে নির্বাচিত করেছিলেন। ভারতীয় ইতিহাসে এই ঘটনা ব্যতিক্রমী। অধিকাংশ রাজবংশ জন্মসূত্রে ক্ষমতা লাভ করলেও, পালদের সূচনা হয় নির্বাচনের স্মৃতিকে কেন্দ্র করে। ঘটনাটি পুরোপুরি ঐতিহাসিক হোক বা রাজনৈতিক ঐতিহ্যের অংশ, এর তাৎপর্য ছিল গভীর। এটি জানায় যে পাল সাম্রাজ্যের জন্মের সঙ্গে সঙ্গে জনগণের সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা ছিল স্থিতিশীলতা। গোপাল রাষ্ট্রের ভিত নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু সেই ভিতের উপর সাম্রাজ্যের মহীরুহ গড়ে তোলেন তাঁর পুত্র ধর্মপাল। ধর্মপালের সময় বাংলা প্রথমবার উত্তর ভারতের ক্ষমতার রাজনীতির কেন্দ্রে প্রবেশ করে। তখন কানৌজ ছিল উত্তর ভারতের রাজনৈতিক মর্যাদার প্রতীক। যে কানৌজ নিয়ন্ত্রণ করবে, সেই হবে উত্তর ভারতের প্রধান শক্তি। এই লক্ষ্যকে ঘিরে পাল, প্রতিহার ও রাষ্ট্রকূটদের মধ্যে শুরু হয় দীর্ঘ ত্রিপাক্ষিক সংগ্রাম। এই সংঘর্ষকে কেবল যুদ্ধ বলে ভাবলে ভুল হবে। এটি ছিল কূটনীতি, সামরিক শক্তি এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের এক দীর্ঘ দাবাখেলা। কখনও ধর্মপাল এগিয়ে যাচ্ছেন, কখনও প্রতিহার, কখনও রাষ্ট্রকূট। কিন্তু এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা একটি বিষয় নিশ্চিত করে—বাংলা আর ভারতের প্রান্ত নয়; সে এখন কেন্দ্রের রাজনীতির অন্যতম নির্মাতা। বিভিন্ন শিলালিপিতে উল্লেখ আছে যে বহু উত্তর ভারতীয় রাজা তাঁর দরবারে উপস্থিত হয়ে তাঁকে সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর শাসক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। বাস্তবে সেই আনুগত্য হয়তো ছিল রাজনৈতিক সমঝোতা, কিন্তু এই বিবরণই প্রমাণ করে যে গৌড়ের রাজসভা তখন উত্তর ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী ক্ষমতাকেন্দ্র।
দেবপালের সময় পাল শক্তি আরও বিকশিত হয়। তাঁর শিলালিপিতে বিজয়ের তালিকা এত দীর্ঘ যে ইতিহাসবিদেরা আজও আলোচনা করেন—কতটা সত্য, কতটা রাজকীয় অলংকার। কিন্তু একটি বিষয় সন্দেহাতীত—দেবপালের আমলেই পাল সাম্রাজ্য তার সর্বোচ্চ ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক মর্যাদায় পৌঁছেছিল। বঙ্গ থেকে বিহার, মগধ থেকে উত্তর ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চল পর্যন্ত পালদের প্রভাব বিস্তার করেছিল। কিন্তু ইতিহাসের চাকা কখনও একদিকে ঘোরে না। দেবপালের মৃত্যুর পর শুরু হয় উত্তরাধিকার-সংকট, দুর্বল শাসন, সামন্তদের ক্রমবর্ধমান স্বাধীনতা এবং বহিরাগত আক্রমণের চাপ। সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ে না একদিনে। প্রথমে অদৃশ্য ফাটল দেখা দেয়, তারপর ভিত্তি দুর্বল হয়, শেষে বিশাল অট্টালিকাও ধসে পড়ে। পাল সাম্রাজ্যের পতনও ছিল ঠিক তেমনই ধীর কিন্তু অনিবার্য। দশম শতকের শেষভাগে মহীপাল প্রথম আবার সাম্রাজ্যকে পুনর্জীবিত করেন। হারানো অঞ্চল উদ্ধার করেন, প্রশাসনে শৃঙ্খলা ফেরান এবং রাজকীয় কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। ইতিহাসবিদেরা একে অনেক সময় "পাল পুনর্জাগরণ" বলে অভিহিত করেন। কিন্তু দ্বিতীয় জাগরণ খুব কম ক্ষেত্রেই প্রথম জাগরণের মতো দীর্ঘস্থায়ী হয়।
ইতোমধ্যেই বরেন্দ্রে কৈবর্ত বিদ্রোহ প্রমাণ করে যে কেন্দ্রীয় শাসনের ভিত্তি আর আগের মতো দৃঢ় নেই। এটি কেবল একটি বিদ্রোহ ছিল না; এটি ছিল সামন্ততান্ত্রিক শক্তির উত্থানের প্রতীক। এরপর আবার রামপাল। তিনি যেন ঝড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা এক অভিজ্ঞ নাবিক, যিনি জানেন জাহাজটি হয়তো শেষ পর্যন্ত ডুববেই, তবু শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত হাল ছাড়েন না। তিনি বিদ্রোহ দমন করেন, মিত্র সংগ্রহ করেন এবং সাম্রাজ্যকে আবার সংগঠিত করেন। তাঁর প্রচেষ্টা অসাধারণ ছিল, কিন্তু সময় তখন পালদের অনুকূলে ছিল না। রামপালের মৃত্যুর পর পাল সাম্রাজ্যের অবসান কেবল সময়ের অপেক্ষা। দ্বাদশ শতকে সেনদের উত্থানের মাধ্যমে বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস নতুন যুগে প্রবেশ করে। তবু পালদের অবদান কেবল একটি রাজবংশের ইতিহাস নয়। তাঁরা বাংলাকে দিয়েছিলেন দীর্ঘস্থায়ী রাষ্ট্রব্যবস্থার ধারণা, পূর্ব ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং এমন এক সাংস্কৃতিক ও প্রশাসনিক ঐতিহ্য, যার প্রভাব বহু শতাব্দী ধরে অনুভূত হয়েছে।
ঐতিহাসিক রণজিৎ গুহের মতে ইতিহাস কেবল ঘটনার ধারাবিবরণী নয়, বরং এক নৈতিক জ্ঞানকাণ্ড —যেখানে রাষ্ট্রপোষিত বয়ানের অন্তরালে হারিয়ে যাওয়া স্বরগুলোকেই শোনা জরুরি।
আধুনিক ইতিহাসচর্চার এই নৈতিক অভিযাত্রায় গুহের উত্তরসূরিরা তাই দলিল ও দস্তাবেজের বাইরে কান পাতেন সাহিত্যের দিকে, বিশেষত লোকসাহিত্যের স্পন্দনে। ইতিহাসের ন্যায়ের অন্বেষণ এখানেই নতুনভাবে অর্থ খুঁজে পায়।
এই সূত্রেই দ্বাদশ শতকের সংস্কৃত কাব্য ‘রামচরিত’ নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। সন্ধ্যাকর নন্দীর এই কাব্য মূলত একাদশ শতকের শেষভাগে পাল রাজা দ্বিতীয় মহীপালের শাসনের বিরুদ্ধে বরেন্দ্র অঞ্চলে সংঘটিত কৈবর্ত বিদ্রোহের কাব্যিক দলিল। আদি মধ্যযুগীয় বাংলার ইতিহাসের অনন্য এই উৎস চৌধুরী মুফাদ আহমদের অনুবাদে নতুন জীবন পেয়েছে। তাঁর অনুবাদ কেবল ভাষান্তর নয়; এটি ইতিহাস ও কাব্যের সংলগ্ন এক সহৃদয় পাঠ। মুফাদ আহমদ পাঠককে আহ্বান জানান—ইতিহাসের গভীরে প্রবেশ করো কাব্যরসের সহচর হয়ে; কারণ অতীতকে অনুভব করা মানেই নৈতিকতার নতুন আবিষ্কার। খানিকটা অতিরঞ্জন সত্ত্বেও, এই কাব্য ইতিহাস, সাহিত্য ও ভূগোল তিন ক্ষেত্রেই মধ্যযুগীয় বাংলার এক অমূল্য সম্পদ। সন্ধ্যাকর নন্দীর ‘রামচরিত’ শুধু প্রাচীন কাব্য নয়, বরং ইতিহাস, নৈতিকতা ও নন্দনের এক আন্তঃসম্পর্কিত দলিল। এখানে রামায়ণের পৌরাণিক কাহিনি ও পাল যুগের রাজনৈতিক বাস্তবতা একে অপরের প্রতিফলন হয়ে ওঠে। সন্ধ্যাকর নন্দী একদিকে যেমন কাব্যের মাধ্যমে রাজশক্তির গৌরবগাথা রচনা করেছেন; তেমনি এখানে ইতিহাসের অন্তরালে থাকা সামাজিক স্পন্দনও সূক্ষ্মভাবে প্রকাশ পেয়েছে।
সন্ধ্যাকর নন্দীর রামচরিত কেবল একজন রাজার প্রশস্তি নয়; এটি অস্তগামী এক সাম্রাজ্যের শেষ আলোকরেখা। সেই আলোয় আমরা দেখতে পাই গোপালের নির্বাচনের আশা, ধর্মপালের সাম্রাজ্য-স্বপ্ন, দেবপালের বিজয়ের গৌরব, মহীপালের পুনর্জাগরণ এবং রামপালের শেষ সংগ্রাম। এই ধারাবাহিকতাই পাল আমলের রাজনৈতিক ইতিহাসকে কেবল রাজাদের তালিকা নয়, বরং উত্থান, শক্তি, সংকট এবং পুনর্গঠনের এক অনন্য ঐতিহাসিক মহাকাব্যে পরিণত করেছে। রামচরিত কাব্যটির বিবর্তন সত্যিই কৌতূহলোদ্দীপক, কারণ মনে হয় এটি মূলত রামপালের প্রশংসায় রচিত হয়েছিল। তবে, পরবর্তী রাজারা সিংহাসনে আরোহণ করলে কবি তাঁর পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনেন এবং রামপালের মৃত্যুর পরেও কাহিনীটি চালিয়ে যান। কুমারপাল ও তৃতীয় গোপালের রাজত্বকালের জন্য শ্লোক উৎসর্গ করার পর, কবি অবশেষে কাব্যটির শেষ অংশে মদনপালের জীবন ও রাজত্ব বর্ণনার উপর মনোনিবেশ করেন। সন্ধ্যাকর নন্দী যে মদনপালের দীর্ঘ শাসনের জন্য একটি প্রার্থনার মাধ্যমে তাঁর গ্রন্থটি শেষ করেছেন, তা থেকে বোঝা যায় যে মদনপাল সিংহাসনে থাকাকালীনই তিনি তাঁর এই মহান কাব্যটি সমাপ্ত করেছিলেন, যা রামচরিতের সমাপ্তির ক্ষেত্রে একটি আকর্ষণীয় ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট যোগ করে।