পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬ এর ফলাফল : একটি প্রাথমিক বিশ্লেষণ

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের আগে অনেকেই ভাবতে পারেন নি বিজেপি এত বড় মাত্রায় এখানে জিতবে। কিন্তু শেষপর্যন্ত দেখা গেল ভোট শতাংশ অনেকটা বাড়িয়ে বিজেপি দুই তৃতীয়াংশ আসনে জিতে বিরাট জয়  অর্জন করল। যে বিপুল ক্ষোভ জমা হয়েছিল শাসক দল ও সরকারের ওপর তা বেরিয়ে এলো পূঞ্জীভূত আকারে এবং এই সরকারের পতন ঘটিয়ে দিল।

পনেরো বছর আগে যে পরিবর্তন হয়েছিল তা সংগঠিত হয় একের পর এক বড় মাত্রার গণ আন্দোলনের ওপর ভিত্তি করে৷ আন্দোলনের ঐতিহ্য মুখর বাংলায় তাই অনেকেই ভেবেছিলেন বড় মাত্রার ধারাবাহিক গণ আন্দোলন না থাকায় এবার রাজনৈতিক পালাবদলের সম্ভাবনা কম।

প্রধান বিরোধী দলের বুথ স্তরের সংগঠন তেমন মজবুত নয় বলে অনেকে পালাবদল নিয়ে সংশয়ী ছিলেন। অনেকেই মনে করেছিলেন ভাতা বন্টনের কর্মসূচীর মাধ্যমে সরকারকে টিঁকিয়ে রাখা যাবে। অনেকের হিসাব বলছিল মুসলিম প্রধান অঞ্চলে প্রধান বিরোধী দলের খাতা খোলার সম্ভাবনা নেই আর সেরকম আসন সংখ্যায় অনেক বলে শাসক দল সহজে বৈতরণী পার হয়ে যাবে৷

কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল এইসব দিয়ে অপশাসনের কঙ্কালকে ঢাকা যায় নি। ভারতের এক অঙ্গরাজ্যে প্রধানমন্ত্রী বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বহিরাগত বলে, দেশের ঊর্ধ্বে রাজ্যকে স্থান দেবার প্রাদেশিক রাজনীতি দিয়ে বাজিমাত করার প্রকল্পটিও দেখা যাচ্ছে একেবারেই কাজে দেয় নি।

সরকার ও শাসক দলের সার্বিক অপশাসন, দুর্নীতি, দলতন্ত্র ইত্যাদি সংক্রান্ত ক্ষোভকে SIR সংক্রান্ত ক্ষোভ দিয়ে প্রতিস্থাপিত করা যাবে কীনা সেটা ছিল শেষ কয়েক সপ্তাহের প্রধান প্রশ্ন। দেখা গেল সেই খড়কুটো ধরে টিঁকে থাকার শেষ চেষ্টাকেও গণক্ষোভ এর তীব্র স্রোত ভাসিয়ে দিয়েছে।

বিজেপির এই বিপুল জয়ের কারণগুলি কী? অনেকে বলছেন এস আই আর প্রক্রিয়ায় যেভাবে নাম বাদ গেছে বহু লক্ষ ভোটারের তা বিজেপির জন্য সহায়ক হয়েছে। অনেকের বক্তব্য কেন্দ্রীয় বাহিনী ও কেন্দ্রের অফিসারদের নিয়ন্ত্রণে যেভাবে ভোট হয়েছে, তা তৃণমূলের সমস্যা বাড়িয়েছে। এসব অভিযোগ সত্ত্বেও নির্বাচনী ফলাফল থেকে এটা স্পষ্ট মানুষ তৃণমূল দল ও সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিল এবং সেই ক্ষোভের প্রতিফলনই ভোটবাক্সে পড়ে রাজ্যে রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। 

তৃণমূলের বিরুদ্ধে ক্ষোভের নানা দিক আছে। তার অন্যতম হল সীমাহীন দলতন্ত্র ও এক পরিবারের স্বৈরতন্ত্র। এই নয়া শাসকেরা ক্ষমতায় এসেছিল দলতন্ত্রের বিরুদ্ধে স্লোগান তুলে। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই গোটা রাজ্য দলতন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্রের গ্রাসে চলে গেল। রাজ্যবাসী দেখতে লাগল মুখ্যমন্ত্রীর বিরাট মাত্রার সব পোস্টার এবং রাজ্যের যেখানে যা কিছু সবেতেই তাঁর অনুপ্রেরণার কথা ও ছবি।  স্কুলে স্কুলে ছাত্রছাত্রীদের যে খাতা দেওয়া হল, তা পর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রীর ছবিতে ভরিয়ে দেওয়া হয়। ক্লাস এইটের ইতিহাস বইতে নিয়ে আসা হল মুখ্যমন্ত্রী ও তার সাঙ্গোপাঙ্গদের সিঙ্গুর আন্দোলনের ছবি সহ প্রচারগাঁথা। নন্দন চত্বরের মতো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের প্রাঙ্গনকেও কুৎসিৎভাবে মুখ্যমন্ত্রীর ছবি দিয়ে ভরিয়ে দিতে তারা দ্বিধা করে নি। বলা বাহুল্য রাজ্যের সর্বত্র সরকারী টাকায় তৃণমূল নেত্রীর ভজনা চলেছে নির্লজ্জভাবে। কয়েক বছর  যেতে না যেতেই জুড়ে দেওয়া হয়েছে মুখ্যমন্ত্রীর ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে এবং তাকে প্রকাশ্যেই  অভিহিত করা হয়েছে যুবরাজ বলে। কালীঘাট অঞ্চলের অনেক জমি জায়গা রাস্তাঘাট এই পরিবারের দখলে চলে যাবার অভিযোগ উঠেছে বারেবারে। বালি, কয়লার অবৈধ কারবার সহ নানা উৎস থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা নেওয়া সহ নানা দুর্নীতির অভিযোগে মুখ্যমন্ত্রীর ভাইপো এখন তদন্তের আওতায় আছেন।

দলতন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্রের আর একটি দিক হল সমস্ত বিরোধী জনপ্রতিনিধিদের ওপর নানাভাবে চাপ দিয়ে তাদের নিজেদের দলে নিয়ে আসার চেষ্টা করা। নির্বাচনের আগে ব্যাপক সন্ত্রাস চালিয়ে পুরসভা ও পঞ্চায়েতে বিরোধীদের দাঁড়াতে বারবার বাধা দিয়েছে তৃণমূল। নির্বাচনে দাঁড়ানোর জন্য আদালতের দারস্থ হতে হয়েছে বিরোধী প্রার্থীদের। নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে রক্তাক্ত করেছে তৃণমূলের গুণ্ডারা। এত কিছুর পরেও যে সব বিরোধীরা জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছেন, তাদের ওপর নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করে তাদের নিজেদের দলভুক্ত করেছে তৃণমূল। এই কাজে অর্থশক্তি, পেশিশক্তি, পুলিশ প্রশাসনের চাপ সবকিছুকেই নির্লজ্জভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। এত কিছুর পরেও যে কয়েকটি জায়গায় বিরোধীরা পুরসভা ও পঞ্চায়েতে বোর্ড গঠন করতে সক্ষম হয়, সেই বোর্ডগুলির প্রতি রাজ্য সরকারের বিমাতৃসুলভ আচরণ চলতে থাকে। এই নজিরবিহীন দলতন্ত্র থেকে বাঁচতে এইবার সমস্ত বিরোধী শক্তি মরীয়া হয়ে উঠে এককাট্টাভাবে ভোট দিয়েছে এবং ভোটের তীব্র মেরুকরণ দেখা গিয়েছে।

স্বৈরতন্ত্র ও দলতন্ত্র ছাড়া আর যে দিকটি এইবারের নির্বাচনে বড়মাত্রায় প্রভাব ফেলেছে তা হল সীমাহীন দুর্নীতি। তৃণমূল সরকার ক্ষমতায় আসার আগেই সারদা ও চিটফাণ্ড দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছিল, যে টাকা ২০১১ র বিধানসভা নির্বাচনে এর পরে নানাভাবে ব্যবহৃত হয়। ক্ষমতায় আসার পর পুলিশ প্রশাসন দল একযোগে এক বিরাট দুর্নীতি সিন্ডিকেট গড়ে তোলে। সমস্ত ছোট বড় ব্যবসা থেকে কাটমানি খাওয়া নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। শুধু আর্থিক সংস্থাগুলি থেকে ব্যাপক পরিমাণ টাকা হাতিয়েই এরা সন্তুষ্ট থাকে নি, বেকার যুবক যুবতীদের চাকরীর লোভ দেখিয়ে মধ্যবিত্ত নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েদের থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা আত্মস্যাৎ করেছে। টাকার বিনিময়ে চাকরী বেচার চক্রটি এস এস সি দুর্নীতি মামলায় যেভাবে বে আব্রু হয়ে গেছে, প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী থেকে শিক্ষা ও নিয়োগ সংস্থার সর্বোচ্চ আমলারা যেভাবে কারাগারে গেছেন দুর্নীতির দায়ে, তা গোটা দেশে এবং বিশ্বে বাংলার সম্মানকে ভূলুন্ঠিত করেছে।

দুর্নীতি অবশ্য শিক্ষা ও চাকরী বেচার ক্ষেত্রটিতেই শুধু সীমাবদ্ধ ছিল না। খাদ্য দপ্তর সহ আরো হরেক দপ্তরের মন্ত্রী আমলারা দুর্নীতির দায়ে জেল খেটেছেন। তৃণমূ্লের জেলা ও রাজ্য স্তরের অনেক নেতা মন্ত্রী ও তাদের কারবারের সঙ্গী আমলারা দুর্নীতির দায়ে জেল খাটার পরেও সেই সংখ্যাটা সার্বিক দুর্নীতিগ্রস্থদের একটি ছোট অংশ বলেই মনে করেছেন মানুষ। তাঁরা বুঝেছেন দুর্নীতির গোটা নেটওয়ার্কটাকে শাস্তি দিতে হলে তৃণমূলকে ক্ষমতা থেকে সরানো ছাড়া অন্য কোনও উপায় নেই। এই জরুরী প্রয়োজন থেকে রাজ্যের জনগণ এবার তৃণমূলের বিরুদ্ধে ঢেলে ভোট দিয়েছেন।

এই রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থার ভেঙে পড়া দিকটিকে যেমন শিক্ষা দুর্নীতি সামনে এনেছে, তেমনি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মারাত্মক চেহারা ও দুর্নীতির দিকগুলিকে সামনে এনেছে আর্জিকর কাণ্ড। লক্ষ লক্ষ মানুষ যেভাবে আর্জিকর আন্দোলনে পথে নেমেছিলেন তা শুধু কোনও একটি নৃশংস ধর্ষণ ও হত্যার বিরুদ্ধে ক্ষোভ ছিল না, শুধু নারীর নির্ভয় স্বাধীনতার দাবিতে প্রতিবাদ ছিল না, ছিল রাজ্যের সরকার ও শাসক দলের সার্বিক অপশাসন, স্বৈরতন্ত্র, গুণ্ডামি, দলতন্ত্র, দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রবল গণবিক্ষোভ।

বেকার যুবদের চাকরী ও কর্মসংস্থানের প্রশ্নটি এবারের নির্বাচনে একটি বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছিল। তৃণমূল জমানা এস এস সি সহ অধিকাংশ নিয়োগ প্রক্রিয়াকে দুর্নীতিপূর্ণ, স্থবির, ও জটিল করে ফেলেছে। রাজ্যে কিছু ছোট ও মাঝারি শিল্প হলেও তা থেকে আয় বেশি নয়। বড় শিল্প, যা চাকরী ও আয় বাড়াতে পারে, তা নিয়ে গত পনেরো বছরে মানুষ অনেক প্রতিশ্রুতি শুনেছেন, বড় বড় শিল্প সম্মেলনের ছবি দেখেছেন, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় নি। এই  সময়কালে রাজ্যের কৃষিক্ষেত্র ও অকৃষি ক্ষেত্রও বিরাটভাবে সঙ্কটে পড়েছে। রাজ্য থেকে পরিযায়ী শ্রমিকদের প্রস্থানের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে। রাজ্য সরকারের তরফে কিছু ক্যাশ ট্রান্সফার প্রোগ্রাম চালু হলেও তা বিপুল আর্থিক সঙ্কটের সামনে কোনও উপযুক্ত সুরাহা হয়ে ওঠে নি। এই সংক্রান্ত ক্ষোভ বিক্ষোভ গ্রাম শহর সর্বত্র এবার ঢেউয়ের মতো তৃণমূলের বিরুদ্ধে ভোটবাক্সে আছড়ে পড়েছে।

এই নির্বাচনে বামেরা আগের কয়েকটি নির্বাচনের তুলনায় বেশি উজ্জীবিত ও সংগঠিত হয়ে প্রচার করেছে। বামফ্রন্টের বাইরের কয়েকটি বাম দল, যার অন্যতম সি পি আই (এম এল) লিবারেশান - এইবারের নির্বাচনে বামফ্রন্টের সঙ্গে আসন সমঝোতা করে লড়েছে। আই এস এফও এই আসন সমঝোতায় সামিল ছিল। কিন্তু এই সমঝোতা মাত্র চারটি আসন ও ছ সাত শতাংশ ভোটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে গেছে। কংগ্রেস দুটি আসন ও তিন শতাংশের কম ভোট পেয়েছে ২৯৪ টি আসনে এককভাবে লড়ে। সব মিলিয়ে বিজেপি তৃণমূল মেরুকরণ প্রায় নব্বই শতাংশ ভোট করায়ত্ত করেছে ও অন্যরা সবাই মিলে দশ শতাংশের বেশি ভোট পায় নি। এককথায় বলা যায় এই নির্বাচন হয়েছে মেরুকৃত নির্বাচন। এই নির্বাচনে ধর্মীয় মেরুকরণ যেভাবে দেখা গিয়েছে তা এক চিন্তাজনক দিক। নির্বাচন যত এগোচ্ছিল, তত রাজ্য শুধু বিজেপি আর তৃণমূলে বিভক্ত হয়ে যাচ্ছিল তা নয়, হিন্দু মুসলিমের মেরুকরণও প্রবলভাবে দেখা যাচ্ছিল। নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর দেখা যাচ্ছে কংগ্রেস, সি পি আই এম, আই এস এফ ও আম জনতা উন্নয়ন পার্টি সব মিলিয়ে গোটা ছয়েক মুসলিম প্রধান আসনে জিতলেও অধিকাংশ মুসলিম ভোট বিজেপির ভয়ে জমা পড়েছে তৃণমূলের ঘরে। তবে সেটা আবার তৃণমূলের নিজেদের হিসাব থেকে বেশ কিছুটা কমেও গেছে। অন্যদিকে হিন্দু ভোটের প্রায় তিন চতুর্থাংশ বিজেপি একাই হাসিল করেছে। এই রকম ধর্মীয় মেরুকরণ রাজ্যের সংহতির জন্য দুশ্চিন্তাজনক।