না-শরীরী কাহন - নিকোলাই গোগোলের ‘ডেড সোলস' এর নাট্যরূপ - ১২

                                      দ্বিতীয় অঙ্ক : পঞ্চম দৃশ্য

                    ------------------------------------------------

       [ কারাগারকক্ষ ]

 চিচিকভ : ( একা পায়চারিরত) ওরা সব বাইরে আমি এই জেলের ভিতরে কেন! আমি কী করেছি? আমার অপরাধ কোথায়? আমি খুব একটা মোটা নই। সেটাই আমার একমাত্র দোষ হতে পারে। একবার ওদের দিকে তাকান। একবার আমার দিকে। আরাম - আয়েশের ভরপুর জীবন, অপরকে জেলে পাঠান, ঈশ্বরের আশীর্বাদে ঘরের সিন্দুক উপচে ওঠা, শহরে একটি বিশাল বাড়ি, দেশ- গাঁয়ে তার চেয়েও বড়ো একখান, বউ- মেয়েদের জন্য প্যারি থেকে পোশাক - আশাক আনা, বাগানে ঘেরা এক বিশাল তালুক, সুন্দর চকচকে সব ঘোড়া, আমার মতো মানুষের চাইতেও চাকরের দামি পোশাক, শহর - গাঁয়ে সকলের কাছে জো-হুজুর, ভবিষ্যৎ বংশধরদের জন্য বিশাল সম্পত্তি রেখে যাওয়া — এ সব ঠিকঠাক হলেই তুমি ইয়া মোটা হয়ে যাবে। মোটা লোকেরা শুধু বসে থাকে আর ওদের পাছার তলের চেয়ার খালি কঁকিয়ে ওঠে। ওরা খালি তাস খেলে আর কোলের ওপর সব ফেলতে থাকে যখন আমরা পাতলা-পুতলার দল এখানে ওখানে হাস্যকরভাবে ছোটাছুটি করি আর ঠক্কর খেয়ে মরি ; আমরা নিরাপত্তাহীন…মানুষ নই যেন দাঁত খোঁচানো কাঠি, বাতাসের মতো উড়ুক- ফুড়ুক করি আর আমাদের আঙুলের ফাঁক গলে সব পড়ে পড়ে যায়… ওঃ,ওঃ, কী অন্ধকার সময় ; ঈশ্বরকে একটি ব্যাপারে অবশ্য ধন্যবাদ দিতেই হয় যে আমার মা তার ছেলের এই দুর্দশা দেখার জন্য আর বেঁচে নেই ; এ ছাড়া আমার কোনও প্রিয় সন্তানও নেই যারা আমাকে এভাবে দেখে লজ্জায় মুখ লুকোবে ( থামে ও কোমরে হাত দিয়ে অনুভব করে)! কিন্তু থামো, আমি তো ততটা হালকা নই ( দেহের ওপর - নিচ হাত দিয়ে অনুভব করে)। আমি মোটা নই ঠিক, কিন্তু তা বলে খুব পাতলাও নই। মোটাও নই, পাতলাও নই। এটাই ঠিক। অন্য যে কোনও মানুষের চাইতে আমি আদর্শ মানুষ। অনেক সৎ। আমি আমার পরিশ্রমের ফসলের যথার্থ হকদার, আর তারা কিনা তা ভোগ করবে! কেন? কেন? এমন নিষ্ঠুর বিচার কেন? ( সে থামে, বাইরে থেকে আসা শোক গান আর শেষ বিদায়ের কলরব শুনতে পায়। জানলা ফুঁড়ে সে তা লক্ষ করে। আঃ, গভর্নররে শেষ যাত্রা! ( জানলায় মুষ্ঠাঘাত করে) এই শহরের শয়তান লোকেদের আমি চিনি। সব এক একটা ঠগ। জোচ্চোর। জুডাসের দল। জিশুকে বেচে দেবার দল। বিশ্বাসঘাতক।

        ( পুলিশকর্তা আর প্রেসিডেন্ট প্রবেশ করে)

 চিচিকভ : আমার বন্ধুর দল। আমার পৃষ্ঠপোষকের দল।

 পুলিশকর্তা: পৃষ্ঠপোষক! তুমি তোমার বিদ্রুপের অপচয় করছ, চিচিকভ।

 প্রেসিডেন্ট : একটা জঘন্য অসম্মানের কাজ করে তুমি তোমার নামের গায়ে এমন কলঙ্কের কালি লেপেছ যে আমার সন্দেহ হয় এমনটা আগে আর কেউ কখনও করেছে কি না! নিজের নামকে এমন নোংরা পাঁকে পুঁতে দেওয়া!( কাগজপত্র বের করে) গাড়ি নির্মাতা মিচিয়েভ! আর আর মৃত সব!

চিচিকভ : হ্যাঁ, সবাই। আমি স্বীকার করছি। আপনার কাছে পুরো সত্যিটা বলব…কিন্তু ষড়যন্ত্রী অপপ্রচারের শিকার হয়েছি। আমার শত্রু আছে… নজদ্রেভ।

 পুলিশকর্তা: তুমি মিথ্যে বলছ। ( দরজা ফুঁড়ে দেখা যাচ্ছে যে জার প্রথম নিকোলাসের বিরাট ছবিটার দিকে আঙুল দেখিয়ে) এটা সম্রাটের কাছে পাঠানো হবে। এটা চুরি। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপরাধ। খ্রিস্টান মৃত আত্মাদের অবমাননা। দেখো। ওই যে জার নিকোলাস, তুম কি ভুলে গেছ? এই হচ্ছে চাবুক আর ওই হচ্ছে সাইবেরিয়া।

 চিচিকভ : ওঃ, ও আমাকে কেটে ফেলবে। আমাকে শেষ করে দেবে। বরফের ওপর নগ্ন অবস্থায় আমি মারা যাব। ( নিজেকে ওদের দিকে নিক্ষেপ করে) আমাকে রক্ষা করুন, পৃষ্ঠপোষকগণ। আমার দণ্ড মকুব করুন। লোভে পড়ে ভুল কাজ করে ফেলেছি… কিন্তু ওই লোকটাই আমাকে পথ দেখিয়েছে। আমি কীভাবে তা এড়িয়ে যাই?

 প্রেসিডেন্ট : কে? কে তোমাকে বিপথগামী করেছে?

 চিচিকভ : রাজ্য বন্ধকি ব্যাঙ্কের সচিব। ওই তো প্রথমে শুরু করে। তার আগে আমি তো জানতামই না… আমার কথা শুনুন… আমি আদালতে সব প্রমাণ করে দেব।

 প্রেসিডেন্ট : দ্য স্টেট মর্টগেজ ব্যাঙ্ক! ( হঠাৎই সে যেন আলো দেখতে পায়। তারপর পুলিশকর্তাকে বলে) আঃ! ( চিচিকভকে) তাহলে তুমি এই গোটা তালিকাটি সরকারের ঘরে বন্ধক রাখতে যাচ্ছিলে?

 চিচিকভ : হ্যাঁ।

 প্রেসিডেন্ট : নগদ অর্থের বিনিময়ে?

 চিচিকভ : হ্যাঁ, আমি অপরাধী।

 প্রেসিডেন্ট : কী করে ভাবলে, এটা তুমি ভালোয় ভালোয় সেরে ফেলবে?

 চিচিকভ : সেক্রেটারি আমায় বলেছিল… যদি তারা এখনও করদাতাদের তালিকায় থেকে থাকে…

 প্রেসিডেন্ট : ওরা আইনত জীবিত। আইনের চোখে বন্ধকযোগ্য সম্পত্তি!

 পুলিশকর্তা: কিন্তু আগামী দু-তিন বছরের মধ্যে আর একটা লোকগণনা হবে। তখনই সত্যিটা বেরিয়ে আসবে। তখন সরকার বাহাদুর কী করবেন?

 চিচিকভ : তার আগেই বন্ধ করে দেবে।

 প্রেসিডেন্ট : তাহলে ওই মরাদের ওপর কিছুই পাবে না যে?

        ( চিচিকভ গুড়গুড়িয়ে হেসে ওঠে)

 প্রেসিডেন্ট : লোকটা তো দারুণ বুদ্ধিমান! আমি জানতাম, ও একটা জিনিয়াস!

 পুলিশকর্তা: তা হলেও দু তিন বছরের মধ্যেই ও দোষী সাব্যস্ত হত।

 প্রেসিডেন্ট : সে সটকেও পড়তে পারত…রিভিয়েরাতে…

 পুলিশকর্তা: ব্যাডেন- ব্যাডেনে।

 প্রেসিডেন্ট : এমনকি প্যারিতেও…

 পুলিশকর্তা:( হঠাৎই কঠোর হয়ে ওঠে) তুমি সেখানে কতগুলো দলিল পেয়েছ? ( দলিলের বাক্সে টোকা দিয়ে)

 চিচিকভ : প্রায় এক হাজার।

 প্রেসিডেন্ট : সরকারি ব্যাঙ্ক তোমাকে কত দিতে চেয়েছিল?

 চিচিকভ : দুশো রুবল, জনপ্রতি।

       ( এ কথা শুনে পুলিশকর্তা ও প্রেসিডেন্ট ফিসফিস করে কথা বলে)

 প্রেসিডেন্ট : জনসমক্ষে তোমার বিচার হবে।

 চিচিকভ : কিন্তু আমি তো সব স্বীকারই করলাম।

 পুলিশকর্তা: সেন্ট পিটার্সবার্গে… ( তিনি পুনরায় জার নিকোলাসের ছবির দিকে আঙুল তুলে দেখান)

 চিচিকভ : আমায় বাঁচান…! আমার সব গেল! ছেঁড়া কম্বলে শুয়ে আমায় একা মরতে হবে রে! হায়!...

 প্রেসিডেন্ট : এ সব আগে ভাবা উচিত ছিল।

       ( পুলিশকর্তা বাকসো থেকে সব দলিল বের করে নেয়)

 প্রেসিডেন্ট : ( দলিলের পোটলা দোলাতে দোলাতে) প্যাভেল ইভানোভিচ, এদিকে দেখো ; এগুলি আমাদের সই করে দাও আর আমাদের অফিসখচ্চা বাবদ দশ হাজার রুবল দাও।

চিচিকভ : তাহলেই আমাকে ছেড়ে দেবেন তো? ( হঠাৎই যেন অনেকটা সাহস পেয়ে যায়) আর কিছু না?( জার নিকোলাসের দিকে ইশারা করে)

 প্রেসিডেন্ট : আর নিকোলাস নয়।

 চিচিকভ : ও! আচ্ছা শুনুন, আমরা কী করব? আপনাদের দশ হাজার রুবল অবশ্যই দেব, তবে ওই মরা আত্মাদের ভাগ করে ফেলব।

 পুলিশকর্তা: ওহো! তাই? করবে?

 প্রেসিডেন্ট : ( বিনয়ের সঙ্গে) দেখো, বিধবা করোবোচকার কাছ থেকে যা তুমি কিনেছ তা সব তোমার কাছে রাখতে দিতে চাইছি না কেন জানো? তুমি নিশ্চয়ই এদের জন্য খেটেছ খুব? ( কঠোরভাবে) আমরা কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত উদারতা দেখাতে চাইছি।

 চিচিকভ : ( নোটকেস থেকে ঘুষের টাকা বের করে ওদের দেয় আর নাটকের প্রস্তাবনায় যেভাবে বলেছিল ঠিক সেইভাবে বলতে থাকে)... ঠিকাছে স্যার, আপনি যদি দয়া করে আমাকে বলবার অনুমতি দেন… ( ওরা দুজন টাকাটা নিয়ে করোবোচকার দলিল ওকে দিয়ে দেয়)

 পুলিশকর্তা: এবার কেটে পড়ো। আজ সন্ধের আগে যদি পঞ্চাশ মাইল না গিয়েছ তবে সারা জীবনের জন্য ফাটকে পুরে দেব, বুঝলে?

        (বাইরে ঘোড়ার পায়ের শব্দ। পেত্রুশকা দৌড়ে এসে ঢোকে ও ভয়ে থতমত খায়)

 পেত্রুশকা : প্রভু, ওরা বলল, তৈরি হয়ে নিন ( ও লক্ষ করে চিচিকভ ঘেমে একাকার ; পেত্রুশকা সান্ত্বনা দেয়) নাল-টাল লাগানো শেষ, প্রভু। ঈশ্বরের নামে বলছি, কুবারি আর চেয়ারম্যানের পায়ে ঝকঝকে খুর লাগিয়েছি… দেখবেন কেমন ছোটে এবার। টগবগ… টগবগ…

       ( পেত্রুশকা আর চিচিকভ ছুটে বেরিয়ে যায়)

 পুলিশকর্তা: বিদায়,চিচিকভ ( দলিলগুলি গুনতে থাকে)

 প্রেসিডেন্ট : ( চেঁচিয়ে) প্যাভেল ইভানোভিচ, তোমার যাত্রা শুভ হোক।

 পেত্রুশকা : ( মঞ্চের বাইরে) হুট,হুট…হে…ই… উড়ে চল ব্যাটা…উড়া চল…

        ( পুলিশকর্তা আর কোর্ট প্রেসিডেন্ট প্রথম নিকোলাসের বিরাট ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকে আর তিনি ওদের দিকে চোখ মেরে মৃদু হাসেন)

                                         দ্বিতীয় অঙ্ক : উপসংহার

                             –----------------------------------------------

          ( রাস্তায়)

     ( চিচিকভ ও পেত্রুশকা পাগলের মতো একে অপরকে ধাক্কা দিতে দিতে জিনিসপত্র নিয়ে গাড়ির কাছে পৌঁছে লাফিয়ে ওঠে। রাস্তা থেকে গান ভেসে আসে। ওরা গাড়ি চালিয়ে দেয় আর কথা বলতে থাকে)

 চিচিকভ : পেত্রুশকা, আগে চল, আগে চল।

 পেত্রুশকা : কোথায় প্রভু?

 চিচিকভ : কোথায় মানে? বোকা গাধা! সমুদ্রের কাদা! যেখানে খুশি, চল…

 পেত্রুশকা : হ্যাঁ প্রভু, যেখানেই হোক।

 চিচিকভ : রাশিয়া বিশাল দেশ, পেত্রুশকা। কোথায় ভুল হয়েছিল, আমি জানি। এবারে নতুন দেশে। গভর্নরের দেশে! বুঝলি?

 পেত্রুশকা : হুট…হুট…হেই…হু…র…র…চল…

সমাপ্ত