শ্রমিক নেত্রী মনিবেন কারা

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও বামপন্থী আন্দোলনের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মাপের সংগ্রামী মহিলা শ্রমিকনেত্রী ছিলেন মনিবেন কারা (১৯০৫- ১৯৭৯)। ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন ছাড়াও একই সাথে তিনি ছিলেন সমাজসেবা ও নারী আন্দোলনের এক বটবৃক্ষ, ব্যক্তি জীবনের স্বাধীনতারও এক পূজারী ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। তিনের দশকের মাঝামাঝি নাগাদ তিনি ঐক্যবদ্ধ এআইটিইউসি-র সাধারণ সম্পাদক ও তারপর সর্বভারতীয় সভানেত্রী ছিলেন ১৯৩৬-৩৭ সালে দু বছরের জন্য। তাঁর বয়স তখন মাত্র ৩১ বছর।                         

এমএনরায় পরিচালিত ৱ্যাডিক্যাল ডেমোক্রাটিক পার্টির কার্যকরী কমিটির সদস্য, ইন্ডিয়ান ফেডারেশন অফ লেবার-এর সভানেত্রী, নানা আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠনের পদাধিকারী, বোম্বে মিউনিসিপাল কর্পোরেশনের কাউন্সিলর, রেল সংগঠন এআইআরএফ এর পাঁচ বছরের জন্য সভানেত্রী, ওয়েস্টর্ন রেলের আজীবন সভানেত্রী, দেশের প্রাইভেট জাহাজ অফিসারদের সংগঠনের আজীবন সভানেত্রী, এইচএমএস-এর সর্বভারতীয় সভানেত্রী ছিলেন তিনি। একদিকে যেমন বস্তিবাসী সাফাই কর্মী, জাহাজ শ্রমিক, টেকস্টাইল শ্রমিক, রেল শ্রমিক সহ এতো বিভিন্ন ধরণের শিল্পক্ষেত্রে প্রত্যক্ষভাবে হাতেকলমে  সংগঠন গড়ে তুলে আন্দোলন তিনি পরিচালনা করেছেন, তেমনই অন্যদিকে আবার দেশ বিদেশে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে (আইএলও)  ভারতবর্ষের শ্রমিকদেরকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। কঠিন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক বিষয়ে তর্কবিতর্ক করেছেন, অন্যদিকে শ্রমিকদের জন্য সংগ্রামের মাধ্যমে নানা দাবিদাওয়া সফলভাবে আদায় করে আস্থা অর্জন করেছেন। স্বাধীনতার লড়াইয়ে একসময় কারাবরণ করেছেন (১৯৩২), পরে কেন্দ্রীয় লেজিসলেটিভ এসেম্বলির লেবার সদস্যও  হয়েছিলেন(১৯৪৬-৪৭),  আবার বরাবর সমাজসেবা ও ট্রেড ইউনিয়ন কাজে অবদানের  জন্য পরবর্তীতে স্বাধীন ভারতে পদ্মশ্রী উপাধিও পেয়েছেন(১৯৭০)। এক কথায় এরকম মহিলার উদাহরণ ভারতে দ্বিতীয় কাউকে খুঁজে পাওয়া খুব  দুরূহ। এই প্রতিভা সম্পন্ন সফল সংগ্রামী অনবদ্য মানুষের সৃষ্টি করে বামপন্থী আন্দোলন নিজে গৌরবান্বিত।

             ১৯০৫ সালে এক সমাজসংস্কারক স্বচ্ছল আর্যসমাজী পরিবারে বোম্বে শহরে তাঁর জন্ম। পার্সি পরিবারটি আদিতে গুজরাটের কচ্ছ থেকে এসেছিলো। বাল্যকালে সেন্ট কলম্বা উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন, যে স্কুলটি সমাজসেবার জন্য খ্যাত ছিল। স্কুলের প্রিন্সিপাল মিসেস ম্যাকলিন  সেই কাজ নিজের হাতে করতেন। এতে অনুপ্রাণিত হয়ে মনিবেন কারা তাঁর কাজের সঙ্গে এতটাই যুক্ত থাকতেন যে এর ফলে পড়াশোনার ঘাটতি হয়ে গেছিলো এবং তিনি ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় অকৃতকার্য হন। কিন্তু পরের বার আবার চেষ্টা করতে তিনি একদমই নারাজ হয়ে পড়েন। বাড়ি থেকে তাকে তখন ইংলন্ডের বার্মিংহামে পাঠানো হয়। সেখানকার ইউনিভার্সিটি থেকে সমাজসেবার ডিপ্লোমা কোর্সে ভর্তি হয়ে  তিনি সাফল্য পান। সমাজসেবার ডিপ্লোমা অর্জন করেন। দেশে ফিরে তিনি একটি সেবামন্দির ও অর্থনৈতিক ভাবে স্বাধীন হয়ে  নিজের ভরণ পোষণের জন্য ছাপাখানা খোলেন। বোম্বে ইম্প্রুভমেন্ট ট্রাস্টের সংরক্ষণ শ্রমিকদের বস্তিতে স্বাস্থ্যবিধি ও স্বাক্ষরতা নিয়ে গণকার্যকলাপ করা শুরু করেন। এর জন্য তিনি ওখানে মাদার্স ক্লাব ও হেলথ কেয়ার কেন্দ্র খোলেন।  স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী তৈরির কাজ চালান, যাতে সন্তানদের মানুষ করা ও তাদের স্কুলে পাঠানোর জন্য মায়েদের দক্ষতা অর্জিত হয়। এই বাহিনীর মাধ্যমেই মদ্যপান নিবারনী আন্দোলন গড়ে তুলে বাস্তবে পরিবারগুলোর আর্থিক ঋণের বোঝা কমানো শুরু হয়। কিন্তু বৃহত্তর ক্ষেত্রে একে ছড়িয়ে দিতে হলে  দরকার প্রশাসনের অংশগ্রহণ। তাই বস্তিবাসীদের উদ্যোগে বোম্বে মিউনিসিপাল কর্পোরেশনের ভোটে দাঁড়িয়ে একটি ওয়ার্ড থেকে কাউন্সিলর হয়ে যান। তখন অনেক রাস্তা খুলে যায়। ওই ওয়ার্ডটি  ছিল বিভিন্ন ধরণের সাফাইকর্মী ও অন্যান্য দলিত মানুষের বসবাসের  স্থান। সেই সুযোগে তিনি নানা ক্ষেত্রের শ্রমিকদেরকে ইউনিয়নভুক্ত করা শুরু করেন। টেকস্টাইল, সেলাই, বন্দর, ডক, রেল  ইত্যাদি শ্রমিকদের মধ্যে ইউনিয়ন বিস্তার চলতে থাকে। এমনকি বাজারের ও রাস্তার হকারদের মধ্যেও ইউনিয়ন গঠন হয়। শিল্পের বিস্তার তখন খুব গতিতে চলছিল। তার কেন্দ্রে ছিল বোম্বে শহর। নানা শিল্পে একের পর এক শ্রমিক ধর্মঘট তিনি পরিচালনা করেন। তিনি সর্বভারতীয় শ্রমিক সংগঠন এআইটিইউসিতে যোগদান করে তার মাধ্যমেই  এই কাজ চালিয়ে যান।

          এই কাজের প্রেরণা তিনি শুরুতেই পেয়েছিলেন  ইউরোপ থেকে গোপনে দেশে ফেরা প্রাক্তন কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক নেতা এম এন রায়ের কাছ থেকে। রায় ভারতের বোম্বে শহরে  ১৯৩০ সালে গোপনে এসে প্রচার পত্র ছাপার জন্য তাঁর এক সমর্থক মারফৎ মনিবেন কারার প্রেসে যোগাযোগ করে পরস্পর পরিচিত হন। ৭৫ হাজার কপি ম্যানিফেস্টো পুস্তিকা ছাপার দরকার পড়েছিল রায়ের। মনিবেন রাজনৈতিক ভাবে প্রভাবিত হয়ে দ্রুতই  রায়পন্থী হিসাবে গড়ে ওঠেন, যা তিনি জীবনের শেষদিন পর্যন্ত ধরে রেখেছিলেন। রায়ের পরিচালনায় "ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইন্ডিয়া" পত্রিকার প্রকাশক হয়ে যান মনিবেন কারা। ১৯৩১ সালে রায় পুলিশের হাতে ধরা পড়ে পুরানো কানপুর ষড়যন্ত্র মামলার এক নম্বর আসামি হিসাবে জেলে যান। মনিবেন তখন তাঁর আদর্শকে মাথায় রেখে কাজ চালিয়ে যান। পাশাপাশি ট্রেড ইউনিয়নের কাজ শেখেন প্ৰখ্যাত নেতা এন এম জোশির কাছে, যাঁকে ভারতের ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের জনক বলা হয়। জোশিবাবুর পুত্র ভিকু ছিল মনিবেনের শৈশবের বন্ধু।

                  শ্রমিক আন্দোলনকে স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করেই তিনি ইউনিয়ন কাজ করতেন।  ১৯৩২ সালে একবার  তিনি আইন অমান্য আন্দোলনের অংশ হিসাবে শ্রমিকদের নিয়ে  টেলিগ্রাফের তার ছিঁড়ে ও রেল লাইনকে বেলাইন করে থানায় একশোটি তার বার্তা পাঠানোর নির্দেশ দেন পুলিশদেরকেও  এই আন্দোলনে সামিল হবার আহ্বান রেখে। এর মধ্যেই মে দিবসে এমন জ্বালাময়ী ভাষণ দেন পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে, যাতে পুলিশ তাঁর বিরুদ্ধে শ্রমিক-মালিকে বিদ্বেষ সৃষ্টি ও  সংঘর্ষ বাঁধাবার চক্রান্ত করার অভিযোগে গ্রেফতার করে। তাঁর এক বছরের নির্জন কারবাস ও তিনশো টাকা ফাইন হয়। পরে অবশ্য তাঁর পক্ষের উকিলের দক্ষতায় তিনি কারবাস থেকে ছাড়া পান। শুধু তিনশো টাকার ফাইন বজায় থাকে। কিন্তু তাঁর  তিনজন সহবন্দির জেল বজায় থাকে, যাঁরা পুরুষ মানুষ ছিলেন। 

                ১৯৩৩ সাল নাগাদ এআইটিইউসি থেকে সংস্কারপন্থীরা ও তার প্রতিক্রিয়ায় বামেরা কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে গেলে একটা শূণ্যতার সৃষ্টি হয়, যেখানে মনিবেন কারা ও  ভি বি কার্নিক সহ দেশের প্রভাবশালী রায়পন্থীরা এআইটিইউসির নেতৃত্বে চলে আসে। কিন্তু আন্তর্জাতিকের নির্দেশ  অনুযায়ী কমিউনিস্টদের জন্য জাতীয়তাবাদীদের সাথে ঘনিষ্ঠ ভাবে কাজ করার নতুন লাইন এলে(ইউরোপে ফ্যাসিবাদের বাড়বাড়ন্তের প্রেক্ষিতে)ওই শ্রমিক সংগঠন আবার সবাইকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়। এই অবস্থায় মনিবেন কারা এআইটিইউসির সাধারণ সম্পাদকের সাময়িক দায়িত্ব এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৩৬ সালে সর্বভারতীয় সভাপতি পদে আসীন হন, যে দায়িত্বে তিনি মোট দু বছর ছিলেন। এই প্রথম কোনও মহিলা দেশের শ্রমিক সংগঠনের সর্বোচ্চ দায়িত্বপ্রাপ্ত হলেন, তাও আবার মাত্র একত্রিশ বছর বয়সে।

              ১৯৩৭ সালে ভোট হলে কংগ্রেস আটটি প্রদেশে শাসন ক্ষমতায় আসীন হয়। ফলে এমনিতেই প্রশাসন ও শ্রমিক আন্দোলনের মধ্যে স্বাভাবিক কারণে  কিছু দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হওয়া শুরু হচ্ছিলো। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই(১৯৩৯) দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ শুরু হলে কংগ্রেস দল প্রদেশ সরকারগুলো থেকে পদত্যাগ করে। তখন শ্রমিক সংগঠনের মধ্যে ভাঙ্গন হয়। এম এন রায়ের চিন্তা অনুযায়ী এই যুদ্ধ ছিল বিশ্বে ফ্যাসিবাদের সঙ্গে জনগণের যুদ্ধ। অক্ষ শক্তি জিতলে ভারতে তারা  আসবেই। তখন ভারতের  আর কোনোদিনই স্বাধীনতাপ্রাপ্তি হবে না। কিন্তু মিত্র শক্তি জিতলেও ইংলন্ড এতটাই ভেঙে পড়বে যে ভারতের স্বাধীনতা তারা মেনে নিতে বাধ্য হবে। তাই এখন সেই লক্ষ্যে শ্রমিক সংগঠনকে ব্রিটিশের  যুদ্ধপ্রচেষ্টার পক্ষে দাঁড়াতে হবে। পয়লা সেপ্টেম্বর যুদ্ধের একবছর পূর্তিতে দেশ জুড়ে রায়পন্থীরা ৱ্যাডিক্যাল ডেমোক্রাটিক পার্টির পক্ষে দেশ জুড়ে ফ্যাসিবাদ বিরোধী দিবস পালন করে। এই পার্টির অন্যতম নেত্রী ছিলেন মনিবেন । এআইটিইউসি নিরপেক্ষ থাকার সিদ্ধান্ত নিলে তার মধ্যে ভাঙ্গন ঘটে। রায়ের পরিচালনায় ইন্ডিয়ান ফেডারেশন অফ লেবার(আইএফএল) গঠিত হয় (১৯৪০), যার অন্যতম প্রধান নেত্রী হলেন মনিবেন কারা। 

             ১৯৪১ সালের জুন মাসে হিটলার রাশিয়া আক্রমণ করলে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। বৎসরান্তে শীতের সময়ে জার্মানি হারতে শুরু করে। সিপিআই তখন অবস্থান পরিবর্তন করে এই যুদ্ধকে জনযুদ্ধ বলে অভিহিত করে ব্রিটিশের পক্ষে দাঁড়ালে  তাদের ওপর থেকে স্বাভাবিক ভাবেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় সরকার। "ভারত ছাড়ো" আন্দোলনের সময়ে স্রোতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ফ্যাসীবিরোধী প্রচারে মনিবেন বহু যায়গায় বক্তৃতা করতে গিয়ে নানা রকম লাঞ্ছনার শিকার হন। কিন্তু তিনি আদর্শের কারণে সমস্ত ঝুকি নিয়ে কাজ করেন এবং জনপ্রিয়তা হারানোর সমস্যাকেও  বরণ করে নেন।

           ১৯৪৪ সালের মাঝামাঝি ব্রিটিশ ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস লন্ডনে একটি বিশ্ব শ্রমিক সম্মেলন ডাকে। তারা আমেরিকা ও রাশিয়ার ট্রেড ইউনিয়নের সাথে মিলে যুদ্ধ প্রচেষ্টার বিষয়ে একমত ছিল। অন্যান্য দেশের ইউনিয়নগুলোকেও সামিল করানোর ছিল উদ্দেশ্য। আইএফএলের পক্ষে মনিবেন ও কার্নিক প্রতিনিধি ছিলেন। আআইটিইউসির প্রতিনিধি শ্রীপাদ অমৃত ডাঙ্গেও তার মধ্যে   ছিলেন। বিপদশংকুল যাত্রাকে উপেক্ষা করে তাঁদের যেতে হয় জাহাজে। ইংলোন্ডেও যুদ্ধ চলছিল, যার আতঙ্কিত সাক্ষী তাঁরা প্রত্যেকেই হয়েছিলেন। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ প্রচেষ্টার পক্ষে মনিবেন জ্বালাময়ী বক্তৃতা করে ও তর্ক বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে বিশ্ব শ্রমিক সম্মেলনের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও অকুতোভয় থেকে নীতিকে ধরে রাখার  দৃষ্টান্ত হতে পেরেছিলেন। শেষে বহু ঝক্কি সহ্য করে তাঁকে দেশে ফিরতে হয়।

               প্রাইভেট জাহাজের কর্মরত কিছু অফিসারদের সাথে পরিচিত হয়ে মনিবেন তাঁদের এক আলোচনা সভায় এমএন রায়কে নিয়ে যান। সেখানের কথাবার্তায় তাঁরা এতটাই উৎসাহিত হন যে নিজেদের  এক ইউনিয়য়ন গড়ে তুলে মনিবেন কারাকে তার সভাপতি করেন। সারা দেশের মধ্যে  এই শ্রেণীর মানুষের  এটাই হয়ে ওঠে একমাত্র  ইউনিয়নে যেখানে মনিবেন আজীবন সভাপতি পদে ছিলেন। জাহাজ চালু না থাকার সময়েও তাদের জন্য  কিছু আর্থিক বরাদ্দ ব্যবস্থার জন্য ইনসিওরেন্স চালু করবার দাবিতে মনিবেন সংগ্রাম চালিয়েছিলেন।

                ১৯৪৬ সালে কেন্দ্রীয় এসেম্বলিতে মনিবেন সদস্য হয়ে শ্রম প্রতিনিধি হন। ওই দায়িত্ত্বে আরও তিনজন ছিলেন।  ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিলেশন বিল  সরকার আনে, যা পরে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিসপিউট এক্ট হিসাবে গৃহীত হয়। আইএফএল সদস্য মনিবেন অন্য আর এক এসেম্বলি সদস্য এআইটিইউসির  জোসিবাবুর সাথে কেন্দ্রীয় এসেম্বলিতে  জোট বেঁধে  এই বিলের বিরুদ্ধে অনেক লড়াই চালান। বেশ কিছু এমেন্ডমেন্ট আনতে চান। কিন্তু সেগুলোতে কোনো  পরিবর্তন আনতে তাঁরা পারেননি। এক্টটি পাশ হয়ে যায়। ওই এক্টই  পরবর্তীতেও প্রায় একই ভাবে চলে এসেছে। মাত্র সোয়া এক বছর ওই এসেম্বলিতে তিনি ছিলেন। ফলে বিশেষ কিছু করার মতো সময়ে পান নি। দেশের রাজনৈতিক ভোটের প্রার্থী হিসাবে তিনি কখনও দাঁড়ান নি।

                   দেশ স্বাধীন হলে মনিবেন ১৯৪৮ সালে ওয়েসটার্ন রেলওয়ে এমপ্লয়ইজ ইউনিয়ণের সভাপতি নির্বাচিত হন। এই ইউনিয়নটি রায়পন্থীদের পরিচালনায় অনেকদিন ধরেই ছিল। কিন্তু মণিবেনের নির্বাচিত হওয়া নতুন বার্তা নিয়ে আসে। যেখানে  সাধারণত সম্পাদকই সাংগঠনিক বিষয় দেখেন, সভাপতি অনেকটা ওপরের বিষয় বা নীতি সংক্রান্ত বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে অভ্যাস্থ থাকেন, সেখানে মনিবেন উদ্যোগ নিয়ে সভাপতির পদকে সমস্ত বিষয়েই কাজে লাগাতে শুরু করলেন। ইউনিয়নে অভুতপূর্ব গতি আসে। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত ওই পদে আর কেউ তাঁর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যায়নি।

              আইএফএল এবং কংগ্রেস সোশ্যালিস্টদের সংগঠন হিন্দ মজদুর পঞ্চায়েত একসাথে মিলে হিন্দ মজদুর সভা (এইচ এম এস) তৈরী করে ১৯৪৮ সালে। মনিবেন সহ সভাপতি হন ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৪৯ সালে ইন্টারন্যাশনাল কনফেডারেশন অফ ফ্রী ট্রেড ইউনিয়নস লন্ডনে গঠিত  হলে তিনি তার কার্যকরী কমিটিতে থাকেন। ১৯৫০ সালে করাচিতে তার সম্মেলন হলে তিনি যান ও পাকিস্তানে থাকা দেশভাগের আগেকার পুরাতন সংগঠনের কর্মীদের সাথে তাঁর আবেগপূর্ণ পুনর্মিলনের এক সুযোগ হয়। কলকাতায় অফিস স্থাপন করে এর একটি এশিয়ান শাখা হয়। পরে তা দিল্লিতে স্থানান্তরিত হয়। ১৯৫১ সালে হিন্দ মজদুর সভার সভাপতি পদে নির্বাচিত হন। পাঁচ বছর ওই পদে ছিলেন। ১৯৫৫ সালে সরকারি চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের প্রমোশন কমিটি হলে তিনি তাতে সদস্য হয়ে প্রমোশনের অনেক পথ বাতলে সৃজনশীলতার পরিচয় দেন। 

            ১৯৪০ সাল থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত রায়পন্থী বাম- দল, রেডিক্যাল ডেমোক্রাটিক পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটিতে থাকেন, তারপর থেকে  রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত সিদ্ধান্তের কারণে  দলটিকে তুলে দেওয়া হলে ওই দলের সকলেই বিপ্লবী মানবতাবাদী আন্দোলনে (ৱ্যাডিক্যাল হিউম্যানিজম) সামিল হন। এরই মধ্যে পত্রিকায় সরকারি দুর্নীতি নিয়ে কিছু উদ্ঘাটিত করতে গিয়ে রায়ের "ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইন্ডিয়া" পত্রিকার ওপর সরকারি আক্রোশ পড়লে পাবলিশার হিসাবে মনিবেন কারাকেও  একবার গ্রেফতার করা হয়েছিল।

              ১৯৬০ সালে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীদের সর্বভারতীয় ধর্মঘট হলে মনিবেন সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তাঁকে জেলে রাখা হয়। অসুস্থ হয়ে পড়লেও তিনি জেল হাসপাতালে যেতে নারাজ হন। তিনি জেল কর্তৃপক্ষের সাথে প্রচুর ঝামেলা  করেও হাসপাতাল বয়কট করে বাস্তবে নির্জন কারাবাসেই কয়েকদিন রইলেন, কারণ ঠিক সেই জায়গায় আর অন্য  কোনো মহিলাকে গ্রেফতার করা হয়নি। পাঁচ লক্ষ শ্রমিক  এই ধর্মঘটে অংশ নেয়। এই ধর্মঘটে বোম্বের  দোহাদ এলাকায়  গুলি চললে পাঁচ জন রেল শ্রমিক শহীদ হন। প্রায় বিশ হাজার  মানুষের ওপর শারীরিক নির্যাতন, গ্রেফতারি ইত্যাদি চলে। পি ডি এক্ট জারি হয়। এর সাথে পোস্টাল কর্মীরাও সামিল হয়। কিন্তু ধর্মঘটে প্রত্যক্ষ লাভ তেমন হয়নি। সমাজের অন্য কোনো অংশ এতে কোনোভাবে সামিল হয়নি বা এমনকি সমর্থনও দেয়নি। অস্থায়ী কর্মচারীদের অনেকেরই চাকরি যায়। পরবর্তীতে তাদের পুনর্বাসনের চেষ্টা করতে মনিবেনকে কঠিন উদ্যোগ নিতে হয়। শহীদদের জন্য বেদি নির্মাণ করা হয়। কিন্তু এক কথায় উপযুক্ত পরিস্থিতির অভাবে   সাফল্যের দৃষ্টান্ত না থাকায়  ধর্মঘট ব্যর্থ বলেই ধরা হয়। 

                  ১৯৫৮ সালে তিনি অল ইন্ডিয়া উইমেন্স কনফারেন্স-এর লেবার কমিটির ইন-চার্জ পদ পান। আমেরিকা, ইউরোপ, জাপান প্রভৃতি পৃথিবীর নানা দেশে ঘোরেন। ১৯৭০ সালে ট্রেড ইউনিয়ন কাজ ও সমাজসেবার জন্য তিনি ভারতের সরকারের কাছ থেকে "পদ্মশ্রী" পান। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরির হাত থেকে তিনি তা গ্রহণ করেন। ১৯৭৩ সালে "মেম্বার অফ দ্য কমিটি অন দ্য স্টেটাস অফ উওম্যান" এ দায়িত্বপ্রাপ্ত হন এবং পরের বছর  ১৯৭৪ সালে ইন্টারন্যাশনাল ট্রান্সপোর্ট ফেডারেশন কর্তৃক সোনার মেডেল পান। আইএলও -র মহিলা শ্রমিকদের সমস্যা সংক্রান্ত স্টাডি প্যানেলের অন্তর্ভুক্ত হন। 

           ১৯৭৪ সালের রেল ধর্মঘটে অংশ নেন।তৎকালীন  এআইআরএফ সভাপতি জর্জ ফারনান্ডেজ সরকারের সঙ্গে আলোচনা কালীন গ্রেফতার হলে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। বিরোধী রাজনৈতিক  দলনেতাদের সাথে সরকারপক্ষ  আলোচনা করে সমাধান সূত্র বের করতে চেষ্টা করলে জর্জ সহ অনেক নেতা তা মানতে নারাজ হলে আন্দোলন আরও জোরদার হয়, মনিবেন যদিও ঠিক তখন পিছু হটার পক্ষে ছিলেন। কিন্তু তাঁর কথা কেউ শোনেনি। সৈন্যবাহিনী নামিয়ে জোর করে আন্দোলনকে ভেস্তে দেওয়া হয়। দাবিদাওয়া আদায় হয়নি। বরং  বহু রেল কর্মীর চাকরি যায় ১৪/২ ধারায়, জীবনে অনেক দুঃসহ অবস্থায় রেলকর্মীদের পড়তে হয়। সেখানে রেল কর্মীদের চাকরি ফেরতের জন্য মনিবেন অনেক ব্যর্থ চেষ্টা করেন। ১৯৭৫ সালে কেন্দ্র জরুরি অবস্থা জারি করার সময়ে এই রেল ধর্মঘটের কার্যক্রমকে অন্যতম অজুহাত হিসাবে প্রচার ও  ব্যবহার করার চেষ্টা করে।

             বয়স বাড়ার সাথে সাথে চলার শক্তি কমতে শুরু করে। পায়ের হাঁটু থেকে শুরু করে চোখের সমস্যা ইত্যাদির কারণে একটা পর্যায়ে বাড়ি থেকেই ইউনিয়নের কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন। একটা পর্যায়ে একাকিত্বকেই পছন্দ করতে শুরু করেন। অথচ বরাবর তিনি বহু মানুষের মধ্যেই থাকতে পছন্দ করতেন। শ্রমিকদের বাড়ির বাচ্চাদের নিয়ে প্রায়শই বিকাল বেলায়  বেড়াতে যেতেন। বাড়িটাই ইউনিয়নের অফিসের মতো ছিল। মানুষের জন্য বাড়িটা একরকম অবারিত দ্বার ছিল।

                ১৯৭৯ সালে তিনি শেষ নিঃস্বাস ত্যাগ করেন। ভারতের রেনেসাঁ আন্দোলনের এক বিস্ময়কর  মহিলা পথিকৃতের জীবনবসান ঘটলো। তাঁর মৃত্যুর পর ওয়েস্টার্ন রেলের রেলকর্মচারীরা তাঁর নামে একটি ফাউন্ডেশন এবং বোম্বে শহরে  গ্রান্ট এরিয়াতে তাঁর নামে একটি অডিটরিয়াম, "মনিবেন কারা ফাউন্ডেশন হল" নির্মাণ করেন। এইচ এম এস এর পক্ষে "মনিবেন কারা ইনস্টিটিউট" তৈরী হয়।

 

 

সূত্র: (১) মনিবেন কারা 

এ টেল অফ স্ট্রাগল এন্ড সার্ভিস (১৯৮৪)

লেখক : ভি বি কার্নিক, 

(২) উইমেন পায়োনিয়ার্স ইন ইন্ডিয়াজ রেনেসাঁ (২০১৫)

এডিটর:কমলা নায়ার ও সুশীলা মাঙ্কেকার

(৩) স্ত্রী-শক্তি - মনিবেন কারা