কমিউনিস্ট নেত্রী মণিকুন্তলা সেন
- 07 March, 2026
- লেখক: সুমনা সেনগুপ্ত
ভারতে কমিউনিস্ট পার্টির জন্ম হয় ১৯২৫ সালে । মণিকুন্তলা সেন তখন ১৫ বছরের কিশোরী। মণিকুন্তলার জন্ম হয়েছিল ১৯ ১০ সালের ১১ই ডিসেম্বর বরিশালে। তাঁর মানসভুবন পুষ্ট হয়েছিল বরিশালের নদী বিধৌত শ্যামল প্রকৃতি দ্বারা। সেই সময়ের তিনজন মানুষের প্রভাব বরিশালের মানুষের উপর ছিল সুদূরপ্রসারী। মণিকুন্তলা ও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। এই তিনজন হলেন অশ্বিনী কুমার দত্ত, কালিশচন্দ্র পণ্ডিত ও জগদীশ আচার্য। তাঁর পরিবারে সবসময়ই একটা ধৰ্মীয় আবহাওয়া বইত। তাঁর পিতৃতুল্য ভগ্নিপতি খুব ধর্মপ্রাণ মানুষ ছিলেন এবং ছিলেন বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর সম্প্রদায় ভুক্ত। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর প্রভাবে পড়ে গেলেন মণিকুন্তলা। মণিকুন্তলাকে তিনি তাঁর ভাবশিষ্য হিসেবে তৈরি করতে চেয়েছিলেন। সেই জন্য তাঁর চলাফেরা চিন্তাধারা ইত্যাদি সব কিছুরই উপরে উনি কড়া নজর রাখতেন। এই প্রচন্ড শাসনে যাঝে মাঝে তিনি যেন হাঁপিয়ে উঠতেন। কিন্তু যেনে নিয়েছিলেন, এমনকি নিজের ভবিষ্যৎ হিসেবে তাঁকে যে একদিন গেরুয়া ধারিনী হতে হবে তাতেও তাঁর কোন সংশয় ছিল না। কিন্তু দুটি বিষয় নিয়ে তাঁর মধ্যে দ্বন্দ্ব জন্মাতে শুরু করল। সেই সময় বরিশালে গান্ধীজীর আইন অমান্য আন্দোলন যথেষ্ট সাড়া ফেলেছে। অন্যদিকে চলছে বিপ্লবী আন্দোলন। মণিকুন্তলার মন একদিকে রাজনৈতিক আকর্ষণ ও অন্যদিকে ধর্মের কড়া শাসনের মধ্যে পড়ে অশান্ত হয়ে উঠল। এবং অন্তরের তাগিদে একদিন তাঁকে মুখ খুলতেই হলো। রাজনীতি প্রশ্নে তাঁর ভগ্নিপতিকে পরিষ্কার বলে দিলেন, দেশের স্বাধীনতার জন্য আন্দোলনকে তিনি পবিত্র বলে মনে করেন দেশের জন্য যারা ফাঁসিতে যেতে পারেন তাদের তিনি শ্রদ্ধা করেন গান্ধীজীর আন্দোলনের প্রতিও তাঁর সমর্থন ছিল। ভগ্নিপতির কাছে পরিষ্কার জানতে চাইলেন 'দেশের স্বাধীনতার জন্য এভাবে যিনি জনসাধারণকে পথ দেখাচ্ছেন সে পথে কেন আপনার সমর্থন থাকবে না? আমরা কি তবে স্বাধীনতা চাই না? মণিকুন্তলার যায়ের মধ্যে ছিল দেশপ্রেমের প্রবল চেতনা যা তাঁকে প্রভাবিত করেছিল। এই সময় চট্টগ্রামের বিপ্লবীদের কিছু ছবি তাঁর কাছে আসে তাদের মধ্যে প্রীতিলতার ছবিও ছিল। লুকিয়ে লুকিয়ে সেই ছবিগুলো তিনি দেখতেন ও মনে মনে সেই পথে যাওয়ার জন্য প্রবল আকর্ষণ বোধ করতেন।
এই প্রবল আকর্ষণে কংগ্রেসের কর্মকেন্দ্র গুলোতে একটু একটু করে যাতায়াত করতে লাগলেন অন্যদিকে বিপ্লবী রাও তাঁর মন জুড়ে ছিলেন। কংগ্রেসের কর্মকেন্দ্র তাকে বিশেষ আকৃষ্ট করল না। এই সময়েই একটি স্কুলে অল্প কিছুদিনের জন্য একটি কাজ পেলেন আলাপ হলো যুগান্তর দলের কর্মী শান্তিসুধা ঘোষের সঙ্গে। যুগান্তর দলে যোগ দেওয়ার কথা সবে ভাবছেন হঠাৎ শান্তিসুধা ঘোষের বাড়িতে পুলিশ এলো এবং তিনি গ্রেপ্তার হলেন। এরপর তার আর যুগান্তর দলের কর্মী হওয়া হলো না। প্রতিবেশী অমৃত নাগের সূত্রে তার আলাপ হল প্রমথ সেন নামে এক ছাত্রর সঙ্গে। তাদের কাছেই শুনলেন কাল মার্কস, লেনিন,
কমিউনিজম এইসব অন্য এক রাজ্যের নতুন কথা। মণিকুন্তলাকে চার দেওয়ালের বাইরে আনার একটা প্রচন্ড ঝোঁক এই দলটির ছিল। কিন্তু প্রথম সংঘাত দেখা দিল তার গভীর ধর্মীয় মননের সঙ্গে কমিউনিজমের নিরীশ্বরবাদের। এই সময়ে তার নিজের মানসিক অবস্থার কথা তিনি লিখছেন 'সেদিনের কথা' নামক তার আত্মজীবনীতে "হঠাৎ একখানা বই 'এবিসি অফ কমিউনিজম' আমার হাতে এসে গেল। বইখানা খুব গোপনে আমি একটু একটু করে পড়তাম এর মধ্যে যেন আমার ধর্ম ও রাজনীতি তুই খুঁজে পেলাম। নির্যাতিত মানুষের সেবা ও মুক্তির জন্য সংগ্রাম করতে হবে এ তো ধর্ম। স্বামী বিবেকানন্দের জীবন ও শিক্ষাও তো এই। বইয়ের মধ্যে ধর্ম আছে কিনা এই চুলচেরা বিচারটা আমি এড়িয়ে চলতাম। তা দিয়ে আমার দরকার ই বা কি, যারা ধর্মের নামে মানুষকে শোষণ করে, তারা সমাজের শত্রু এ তো অবশ্যই যানি কিন্তু তাতে তো ভগবান নেই এ কথা প্ৰমাণ হয় না"।
এই মানসিক সংকটের সময় পাশে এসে দাঁড়ালেন মণিকুন্তলের যা বরিশালের আত্মীয়-স্বজনের ওই ধর্মীয় আবহাওয়ার থেকে তাকে যুক্ত করার জন্য পাঠিয়ে দিলেন কলকাতায়। সাময়িক সমাধান হলো বটে কিন্তু পরবর্তী সময়ে আমরা দেখব এই দ্বন্দ্ব তাঁকে সারা জীবন তাড়িয়ে বেড়িয়েছে এবং শেষ জীবনে তিনি আবার ধর্মীয় আশ্রয়তেই ফিরে গেছেন।
কলকাতায় শুরু হলো নতুন জীবন
ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলেন দর্শন শাস্ত্র নিয়ে। থাকতে শুরু করলেন আমহার্স্ট স্ট্রীটে একটা মেয়েদের বোর্ডিং এ। এক বছরের মধ্যে বরিশালের পরিচিত কিছু ছেলেও চলে এলো কলকাতায় পড়তে। শুরু হল কমিউনিস্ট পার্টিকে কলকাতায় খুঁজে বের করার চেষ্টা এবং তাতে যোগদান করা । খোঁজ পেলেন জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে এক নেতা থাকেন। তার নাম সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর। একদিন গিয়ে কথাবার্তা হল, মণিকুন্তলা সৌমেন ঠাকুরকে সরাসরি জিজ্ঞেস করলেন, 'আমার কাজ কি হবে? উনি বললেন "আপনি টাকাকড়ি তুলবেন পার্টির জন্য.... এই আর কি"। কথাটা মণিকুন্তলার পছন্দ হলো না কিন্তু তখন আর অন্য কোন পথের সন্ধান না পাওয়াতে সৌমেন ঠাকুরের পার্টিতেই যোগ দিলেন। কিন্তু কিছুদিন পরেই জানতে পারলেন সৌমেন বাবুর পার্টি ফোর্থ ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে যুক্ত আর তারা খুঁজছেন থার্ড ইন্টারন্যাশনাল। বন্ধুরা খবর আনলেন কমরেড মোজাফফর আহমাদ ও সোমনাথ লাহিড়ী হচ্ছেন থার্ড ইন্টারন্যাশনাল এর ভারতীয় নেতা। সালটা 1937-38, এদের সঙ্গে যোগ দিলেন মণিকুন্তলা। কিন্তু এখানেও শুরু হল অন্য এক দ্বন্দ্ব. বরিশালে থাকতে মণিকুন্তলা রাজনীতি বলতে বুঝতেন স্বাধীনতা সংগ্রাম। সে বিপ্লবী পথেই হোক বা কংগ্রেসি পথে। কিন্তু তাঁর পার্টিতে বিশ্ব রাজনীতি, পুঁজিবাদ, শ্রমিক শ্রেণীর অভ্যুত্থান এসব দিয়ে অনেক কথা শুনলেও স্বাধীনতা সংগ্রামের ব্যাপারে খুব কিছু নির্দেশ পেতেন না। অবশেষে ১৯৩৮-৩৯ নাগাদ পার্টি থেকে নির্দেশ
এল কংগ্রেসের সদস্য হতে এবং একসঙ্গে কাজ করতে। সদস্য হলেন এবং দক্ষিণ কলকাতার এড হক কমিটির দায়িত্ব পেলেন। এটা সম্ভব হয়েছিল প্রখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা বারীন চ্যাটার্জির জন্য।
কিন্তু এই অ্যাড হক কমিটির জন্মই হয়েছিল এক বিতর্কিত পরিস্থিতিতে। সেই সময় কংগ্রেসের সঙ্গে সুভাষচন্দ্র বসুর বিরোধিতা চরমে আর বাংলাদেশে সুভাষচন্দ্র ছিলেন কংগ্রেসের অবিসম্বাদিত নেতা। তাঁকে বাদ দিয়ে সংগঠন চালানো সম্ভব নয়। স্বভাবতই সংগঠন ভেঙে গেল এবং কেন্দ্র থেকে একটা এড হক কংগ্রেস কমিটি গঠন করে দেওয়া হল, যার পিছনে কোন গণসমর্থন ছিল না। আর শ্রেণী চরিত্রের দিক থেকে কংগ্রেসের সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টির যোজন যোজন পার্থক্য ছিল। কমিউনিস্ট পার্টি, কংগ্রেসের গণ সংগ্রাম বিরোধী নীতির তীব্র সমালোচক ছিল। কাজেই অ্যাড হক কমিটির সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টির সমঝোতা ছিল নেহাতই সাময়িক ও কিছুটা বাধ্যতামূলক।
এখানে এসেও মণিকুন্তলা অনুভব করলেন তার বস্তুত কোন কাজই নেই। পাৰ্টি নেতৃত্বে মহিলা সংগঠন গড়ে ওঠার অনেক আগেই, মোটামুটি বড় আকারের ছাত্রসংগঠন গড়ে উঠেছিল। তিনি সেই ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে
থাকতে শুরু করলেন। শুরু হল তার গ্রামে-গঞ্জে যাওয়া। প্রথম দিকে বক্তৃতা দেওয়ার ব্যাপারে যথেষ্ট শঙ্কুচিত এবং আড়ষ্ট ছিলেন। কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি সেই জড়তা কাটিয়ে উঠে নিজেকে পাকাপোক্ত বক্তা হিসেবে তৈরি করলেন। ছাত্র আন্দোলনে মণিকুন্তলার প্রধান আগ্রহ ছিল মেয়েদের যোগদানের বিষয় টি ।পরবর্তীকালে ছাত্র ফেডারেশনের একটি অঙ্গ হিসেবে পৃথকভাবে সাতটি ফেডারেশন গড়ে উঠেছিল। কিন্তু অচিরেই তিনি উপলব্ধি করলেন শুধুমাত্র ছাত্র আন্দোলনের বাধা গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ থাকা তাঁর কাজ নয়। তিনি চাইছিলেন কাজের জন্য আরও বৃহত্তর ক্ষেত্র। এই সময় বন্দী মুক্তির ডাক এল। ভারতের বিপ্লবীরা অনেকেই তখনো জেলে বন্দী, বাংলার বিপ্লবীরা আন্দামানে ও অন্যান্য জেলে,। যদিও রাজনীতিতে এরা কংগ্রেসের সমধর্মী ছিলেন না এবং গান্ধীজিও এদের একেবারেই পছন্দ করতেন না, কিন্তু চাপে পড়ে কংগ্রেসকেই আন্দোলনে আসতে হয়েছিল। গণ- আন্দোলনের প্রথম প্রোগ্রাম তাঁরা পেয়েছিলেন বন্দী মুক্তির জন্য একটা বড় মিছিলের আয়োজন করা। এই মিছিলে ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে সঙ্গে প্রচুর মহিলা এবং শ্রমিকরাও যোগদান করেছিল। এখান থেকেই জন্ম নিলো একটি মহিলা সংগঠন গড়ে তোলার ভাবনা। এই সময় লখনৌ তে একটি সর্বভারতীয় সম্মেলন হয়, যার প্রতিনিধি হিসেবে যান মণিকুন্তলা সেন। সেই প্রথম সারা ভারতের কমিউনিস্ট কর্মীদের সঙ্গে তাঁদের আলাপ হলো এবং পরবর্তীকালে তাঁদের অনেকেই ঘনিষ্ঠ বন্ধুতে
পরিণত হয়েছিলেন।
AIWC তখন ছিল কংগ্রেসের মহিলা সংগঠন, যার নেত্রী ছিলেন সরোজিনী নাইডু এবং রামেশ্বরী নেহেরু। মিসেস নাইডুর পরামর্শে মণিকুন্তলায যোগ দিলেন এই AIWC তে। কিন্তু অচিরে ই সেখানেও দ্বন্দ্ব দেখা দিল। যে কজন কংগ্রেসের মহিলা বাংলায় এই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাদের ঘোরতর কমিউনিস্টবিদ্বেষ বেশিরভাগ সদস্যদের প্রভাবিত করল এবং তারই জেরে নতুন কার্যকরী কমিটিতে কমিউনিস্টরা সবাই ভোটে হেরে গেলেন ।
এই সময়ে এলো এক ক্রান্তিকাল, শুরু হল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। ইংরেজ সরকার ভারতকেও যুদ্ধ সঙ্গী করার জন্য তৎপর হয়ে উঠলেন কিন্তু কিন্তু কংগ্রেস ঘোষণা করল এই যুদ্ধ সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ সুতরাং ভারতবাসী এতে কোনভাবেই
অংশগ্রহণ করবে না কিন্তু গান্ধীজি এই সময় কোন জোরালো আন্দোলন গড়ে তুলতে চাইলেন না । ডাক দিলেন গণ সত্যাগ্রহের পরিবর্তে ব্যক্তিগত সত্যাগ্রহের। কমিউনিস্ট পার্টি চাইছিল সমস্ত দলের সম্মিলিত নেতৃত্বে এই আন্দোলনকে গণআন্দোলনে পরিণত করতে কিন্তু কংগ্রেসের অসহযোগিতায় কমিউনিস্ট পার্টি তার সামান্য শক্তি নিয়ে যুদ্ধ বিরোধী প্রচারে নামলো। এই প্রচারে যোগ দিলেন। মণিকুন্তলাও। যাঠে মাঠে বক্তৃতা দিচ্ছেন, সমস্ত যিটিং অর্গানাইজ করছেন, জেলায় জেলায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ব্যক্তিগতভাবে তিনি ছিলেন সুভাষচন্দ্র বসুর অনুরাগী। সুভাষচন্দ্ৰ বসুর সমস্ত মিটিং-এই সুযোগ পেলেই যেতেন। হঠাৎই যুদ্ধের মোড় ঘুরে গেল। ১৯৪১ সালের জুন মাসে হিটলার সোভিয়েত রাশিয়া আক্রমণ করে বসলো। কংগ্রেস ভারতছাড়ো আন্দোলনের ডাক দিল। গন বিক্ষোভের উত্তাল তরঙ্গ বয়ে যেতে শুরু করল। কমিউনিস্ট পার্টি পড়ল উভয় সংকটে, সোভিয়েত তখন আক্রান্ত। যদি সে পরাস্ত হয়, তবে পৃথিবীব্যাপী ফ্যাশিজয চেপে বসবে অন্যথায় ব্রিটিশদের সঙ্গে সহযোগিতা
করতে হবে। স্বভাবতই যুদ্ধে দুটো পক্ষ হল। একদিকে আক্রমণকারী হিটলারচক্র অন্যদিকে সোভিয়েত রাশিয়া ব্রিটেন ফ্রান্স আর অন্যান্য আক্রান্ত দেশগুলো। ৪১ এর শেষ দিকে এলো পার্টির নতুন লাইন এ যুদ্ধ জনতার যুদ্ধ এ যুদ্ধ ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সমস্ত পৃথিবীর যুদ্ধ। অন্যদিকে সুভাষচন্দ্র জার্মানি এবং জাপানের সাহায্য নেওয়াতে তার বিরুদ্ধে কমিউনিস্ট পার্টি বিষোদগার করতে শুরু করল। জনযুদ্ধ কাগজে সুভাষকে কুইসলিং বলা হলো ও কার্টুন বের হল। এই সময়ের জটিলতা মণিকুন্তলা লিখেছেন তাঁর 'সেদিনের কথা' গ্রন্থে, "সবচেয়ে মুশকিলে পড়লাম আমরা, বিশেষ করে আমি। নিজের মনের মধ্যে আমি সর্বতোভাবে এ লাইন সঠিক যনে গ্ৰহণ করতে পারিনি। সাধারণ লোককে এই আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ও ফ্যাসিস্ট বিরোধী সংগ্রামের ঔচিত্য সম্পর্কে বোঝাতে আমরা সত্যিই হিমশিম খেতাম। কাল যেখানে বলেছি এই যুদ্ধে একটি মানুষ কিংবা একটি পয়সা নয়, আজই আবার কি করে বোঝাই এই যুদ্ধ জন যুদ্ধ। পার্টির নির্দেশ ছিল দেশপ্রেমিক ও পুলিশের মাঝখানে
দাঁড়াও। পঞ্চম বাহিনী ও দেশপ্রেমিক এর মাঝখানে দাঁড়াও। কিন্তু কেমন করে নির্দেশ কার্যকর করব? কারা পঞ্চম বাহিনী? এখন যনে হয় ওই কথাটা প্রয়োগ না করলেই ভালো ছিল।" ব্যক্তিগতভাবে মণিকুন্তলা মনে করতেন সুভাষ চন্দ্রের বিরুদ্ধে কমিউনিস্ট পার্টির এই অবস্থান প্রকারান্তরে কমিউনিস্ট পার্টির ই ক্ষতি করেছে।
কিন্তু যুদ্ধের বীভৎসতা যত বাড়তে লাগলো তত তাঁর দ্বিধা কাটতে লাগলো। একজন কমিউনিস্ট কর্মী হিসেবে মনের মধ্যে আর কোন সংশয় রইল না। বিশ্ব রাজনীতির নতুন ভূমিকায় এই নতুন পার্টি লাইন কার্যকরী করতে সমস্ত শ্ৰম এবং নিষ্ঠা নিয়োগ করলেন। এর আগে পর্যন্ত তিনি একটি স্কুলে কাজ করতেন এবং বাকি সময়টা পার্টির কাজ। এরপর থেকে পার্টির সর্বক্ষণের কর্মী হয়ে গেলেন। পার্টির নির্দেশে সে স্কুলের কাজ ছেড়ে দিলেন। পার্টির ভাতা তখন মাসিক কুড়ি টাকা। এছাড়া ট্রামের একটি মাসিক টিকিট দেওয়া হতো।
কলকাতা শহরে তখন নিরন্ন মানুষের ঢল নেমেছে। যুদ্ধ সাধারন মানুষের জীবনকে ছিবড়ে করে, ভিক্ষাপাত্র হাতে রাস্তায় এনে দাঁড় করিয়েছে। এই সময় মণিকুন্তলাদের মূল কাজ হলো এদের মুখে অন্নের যোগান দেওয়া। এই সময় তাঁরা একটি উল্লেখযোগ্য কাজ করেছিলেন। বাংলায় তখন ফজলুল হকের মন্ত্রিসভা। প্রচুর নিরন্ন মেয়েকে একত্র করে তারা আইনসভা অভিযান করলেন, ন্যায্য দরে চাল দেওয়ার দাবিতে এবং ফজলুল হকের কাছে প্রতিশ্রুতি আদায় করে ছাড়লেন। এই প্রথম কলকাতায় ষোলটি ন্যায্য দরের চালের দোকান খোলা হল। এবং সরকার থেকে কয়েকটা বড় বড় ক্যান্টিন চালু হল। অথচ অদ্ভুত ব্যাপার সরকারের কমিউনিস্ট বিদ্বেষের জন্য এ সম্পর্কে কোন খবরের কাগজ বা কোথাও এক লাইনও লেখা
হলো না।
১৯৪২ সালে এলা রীডকে সভাপতি করে কলকাতায় তৈরি হল মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি। মণিকুন্তলা সেন হলেন তার সহ- সভাপতি। কমিউনিস্ট পার্টিতে তখন মণিকুন্তলা সহ মহিলা হোলটাইমারের সংখ্যা যাত্রই তিনজন। ফ্যাসিস্ট বিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে সঙ্গে তাদের উপর দায়িত্ব বর্তালো বন্দী মুক্তি আন্দোলনেরও। আসলে বেশিরভাগ কংগ্রেস নেতা তখন জেলে বন্দি ছিলেন এবং তারা বাইরে না এলে স্বাধীনতা আন্দোলন জোরদার হবে না, এটা বোঝা গিয়েছিল। যদিও পরবর্তী সময় জেলের বাইরে এসে তারা কমিউনিস্ট নেতাদের সঙ্গে যে ব্যবহার করেছিলেন মণিকুন্তলা তার আত্মজীবনীতে সখেদে সেই কথা উল্লেখ করেছেন।
এই সময় মণিকুন্তলার মূল কাজ ছিল বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় জেলায় ঘুরে বেড়ানো। একদিকে প্রচন্ড দুর্ভিক্ষ অন্যদিকে কলেরা, মহামারী। আর তিনি ছুটে বেড়াচ্ছেন বাংলার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। বিভিন্ন রকম অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হচ্ছেন যা পরবর্তী সময়ে তাকে কমিউনিস্ট পার্টির অবিসংবাদী নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। তাঁর মূল উদ্দেশ্য ছিল মহিলাদের কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদানের ক্ষেত্রে উদ্বুদ্ধ করা। কাজটা খুব একটা সহজ ছিল না। তিনি একেবারে গ্রামের মহিলাদের সঙ্গে মিশে যেতেন। শুধু তাই নয়, মেয়েরা যাতে তাঁকে নিজেদের একজন বলেই মনে করে সেই জন্য ব্রাশ
দিয়ে দাঁত মাজা, গায়ে সাবান দেওয়া এসব ছেড়ে দিয়েছিলেন। তিন বছর পর যখন বাড়ি ফিরে এসেছিলেন যাথার উকুন ছাড়াতে সব চুল কেটে ফেলতে হয়েছিল আর চর্মরোগ সারাতে সময় লেগেছিল যাস খানেক।
বাংলার সর্বত্র রিলিফ এর কাজে সহায়তা করার জন্য এই সময় কলকাতায় নতুন এক শিল্পী গোষ্ঠীর সৃষ্টি হয়। এরা বিভিন্ন জায়গায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করে অর্থ সংগ্রহ করতেন। নাটক গান সবকিছুই নিয়ে শুধু বাংলা নয় বাংলার বাইরে গিয়েও অনুষ্ঠান করে অর্থ সংগ্রহ করা হতো। গণসংগীত এর ক্ষেত্রে এক নতুন জোয়ার এল এবং মহিলা শিল্পীদের অংশগ্রহণ ও বিপুল ভাবে দেখা গেল। মণিকুন্তলাও নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারলেন না। অংশগ্রহণ করলেন বিজন ভট্টাচার্যের নবান্ন নাটকের একটি ছোট্ট চরিত্রে।
দুর্ভিক্ষ এবং মহামারীর যৌথ আক্রমণের মোকাবিলার জন্য নারী আত্মরক্ষা সমিতির পাশাপাশি গড়ে উঠলো আরেকটি সংঘ, তার নাম নারী সেবা সংঘ। তাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেন মণিকুন্তলা সেন। এই সংগঠনটির পরিচালনায় ছিলেন লেডি রমলা সেন। মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির সদস্যদের মধ্যে কৃষক, শ্রমিক, শহরের বস্তি অঞ্চলের ও মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়েরাও ছিল। মহিলা সমিতির ঘোষিত অসাম্প্রদায়িক নীতির ফলে আত্মরক্ষা সমিতি, হিন্দু মুসলমান নারীদের যৌথ প্রতিষ্ঠান রূপেও স্বীকৃতি পেল। ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী নেতৃত্বে এই সমিতির প্রথম সম্মেলন হল কলকাতার ওভারটুন হলে। বাংলাদেশে এই প্রথম একটা মহিলা সম্মেলন তাদের মঞ্চ থেকে সরকার সৃষ্ট দুর্ভিক্ষের প্রতিবাদে তীব্র ধিক্কার ধনী উচ্চারণ করল। দারিদ্র ও ক্ষুধার সুযোগ নিয়ে অসংখ্য মেয়েদের লাঞ্ছনার বিরুদ্ধে অগ্নিবর্ষী প্রতিবাদ ধ্বনিত হল। এসব কথা ছাড়াও, যুদ্ধের বিরুদ্ধে, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সম্মেলনে প্রতিবাদ ঘোষিত হলো। অকারণে আক্রান্ত অন্যান্য দেশগুলির স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি সমর্থন জানানো হলো। আর ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের স্বার্থে দাবি করা হলো কংগ্রেস নেতৃত্বের বিনা শর্তে যুক্তি।
এই সময়ে মণিকুন্তলা তাঁর সহযাত্রীদের নিয়ে বাংলার বিভিন্ন জেলায় গড়ে তুলছেন মহিলা সংগঠন। গ্রাম বাংলার মহিলাদের সঙ্গে বিশেষভাবে পরিচিত হচ্ছেন। তাদের সংগঠনের ছত্রছায়ায় আনার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করছেন। বিভিন্ন জায়গায় জেলা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। কিন্তু এরকমই একটি জেলা সম্মেলন কে কেন্দ্ৰ করে আবার কমিউনিস্ট নেতৃত্ব সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন মণিকুন্তলার মনে তৈরি হল। ১৯৪৪ এর এপ্রিলে ময়মনসিংহের নেত্রকোণায় অনুষ্ঠিত হলো সারা ভারত কৃষক সম্মেলন। মণিকুন্তলা গেলেন পাহাড়ি হাজং এলাকায়। সেখানকার আদিবাসী মেয়েদের সঙ্ঘবদ্ধ করে নিয়ে এলেন নেত্রকোনার জেলা
সম্মেলনে। এছাড়াও সারা ভারত থেকে প্রচুর মানুষ বিশেষ করে মহিলারা এই সম্মেলনে যোগদান করলেন। সম্মেলনের পরে পার্টি নেতা পি সি যোশী একটি জেনারেল মিটিং ডাকলেন। সেখানে তিনি মহিলা নেতৃত্বকে প্রকাশ্যে তীব্র সমালোচনা করলেন। এই ঘটনার ফলে কমিউনিস্ট পার্টির একনিষ্ঠ কর্মী কনক মুখার্জি, পার্টির সারাক্ষণের কর্মী পদে ইস্তাফা দিলেন। এইসব ঘটনা মণিকুন্তলা পার্টিতে থাকা পর্যন্ত কারো সঙ্গে আলোচনা করেননি। কিন্তু পরবর্তীকালে তার মনে হয়েছে "পার্টির সর্বোচ্চ নেতা যতটা অবাধ ক্ষমতার অধিকারী হন ততটা হওয়া হয়তো ঠিক নয়। এর পরিণতি সবসময় ভালো নাও হতে পারে। অধিকারের অপব্যবহার কত দূর ক্ষতিসাধন করতে পারে গভীর মর্ম বেদনার সঙ্গে সোভিয়েট ও চীনের ঘটনা থেকে তাও আমাদের জানতে হয়েছে। "এইসব ঘটনা থেকে আমরা বুঝতে পারি যতই একনিষ্ঠ কর্মী হোন না কেন পার্টির প্রতি প্রশ্নহীন আনুগত্য তাঁর কোনদিনই ছিল না। সব সময়ই পার্টি লাইনের যেদিকটা তার অপছন্দ হয়েছে তিনি সমালোচনা করেছেন।
মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির প্রথম সম্মেলনে জাতীয় নেতাদের মুক্তির ডাক দেওয়া হয়েছিল। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসানে নেতারা যুক্ত হলেন। সেই সময়ে সারা দেশ জুড়ে চলছে যথেচ্ছ কালোবাজারি। বহু লোকের অনাহারে মৃত্যুর সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে। নেতারা ভ্রুক্ষেপও করলেন না। এমনকি যে জহরলাল নেহেরুর কাছ থেকে তারা এর বিরুদ্ধে যথেষ্ট বলিষ্ঠ পদক্ষেপ আশা করেছিলেন, তিনিও তাদের হতাশ করলেন। উল্টে কংগ্রেস তীব্র কমিউনিস্ট বিরোধিতার নীতি গ্রহণ করল । সেইসময়ের পথে ঘাটে কমিউনিস্ট নেতারা আক্রান্ত হতে থাকলেন।
১৯৩৭ সালের নির্বাচনের পর যুদ্ধের জন্য দীর্ঘদিন স্থগিত রেখে 1946 এর ডিসেম্বরে হলো নির্বাচন। এই সময় পশ্চিমবাংলায় কমিউনিস্ট পার্টি থেকে কয়েকটা এলাকায় নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়া হলো। মণিকুন্তলা দায়িত্ব পেলেন বজবজ চটকল এলাকায় নির্বাচনী প্রচারের। এখানকার আসনে দাঁড়ালেন বঙ্কিম মুখোপাধ্যায়।অনেক আগে থেকেই মণিকুন্তলা বজবজ এলাকায় চটকল শ্রমিকদের সঙ্গে কাজ করছেন। শ্রমিক মেয়েদের মধ্যে শুধু মহিলার সমিতি করাই তাঁর কাজ ছিল না, বরং শ্রমিক হিসেবে তাদের যে নিজস্ব দাবি সেগুলোও তিনি একইভাবে তুলে ধরতেন। এই দাবিগুলো ছিল সমান কাজে সমান মজুরি প্রসূতি ভাতা ক্রেশ ও শিশু বিদ্যালয় কর্মক্ষেত্রে মেয়েদের অধিকার নিয়ে সংগ্ৰামী মনোভাব গড়ে তুলতে দীর্ঘ সময় লেগেছে। ট্রেড ইউনিয়নের মঞ্চে এ দাবি শেষ পর্যন্ত সংযুক্ত হল।
দাবির সমর্থনে দাঁড়ালো মহিলা সমিতি গুলি। আজ যারা কর্ম ক্ষেত্রে এইসব সুযোগ-সুবিধে পেয়ে থাকেন তাদের স্মরণে রাখতে হবে এইসব পূর্ব নারীদের কঠোর সংগ্রামের কথা। এই নির্বাচনী প্রচারে কমিউনিস্ট পার্টি কংগ্রেসের ব্যাপক আক্রমণ ও রিগিংএর শিকার হল। নির্বাচনে বঙ্কিম বাবু ও সোমনাথ লাহিড়ী হারলেন, জিতলেন জ্যোতি বসু, রতন লাল ব্রাহ্মণ ও দিনাজপুরের রূপনারায়ণ রায়
আইন সভায় জ্যোতি বাবু এই প্রথম প্রবেশ করলেন। কংগ্রেসের এই ব্যাপক সন্ত্রাসের কথা সরোজিনী নাইডুর কানে গেলে তিনি অত্যন্ত ক্ষিপ্ত হলেন এবং তীব্র ভাষায় তাদের সমালোচনা করলেন এরপর থেকে সমিতির কাজ আর বিশেষ বাধার সম্মুখীন হয়নি।।
স্বাধীনতার প্রাক্কালে কমিউনিস্টদের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য আন্দোলন তেভাগা আন্দোলন। সমস্ত শক্তি দিয়ে এই আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল কমিউনিস্ট পার্টি ।মহিলারা অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। যাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মণিকুন্তলা সেন। কৃষকদের এই সর্বাত্মক লড়াইয়ের ওপর চলল মর্মান্তিক দমন পীড়ন। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাদের দমানো গেলো না । শেষ পর্যন্ত সুরাবর্দি সাহেব, কৃষক নেতাদের সঙ্গে মীমাংসায় বসতে রাজি হলেন। এই আন্দোলন কমিউনিস্টদের একটা বড় সাফল্য ছিল।
ক্ষমতা হস্তান্তর, ভারতকে স্বাধীনতা প্রদান ইত্যাদি নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই আলোচনা চলছিল। এবারে মোটামুটি পরিষ্কার বোঝা গেল দেশভাগ হওয়া ছাড়া আর কোন গত্যন্তর নেই। এই দ্বিজাতিতত্ত্বে মণিকুন্তলার একেবারে ই সমর্থন ছিল না। সব থেকে বেশি দুঃখ পেলেন, যখন জানতে পারলেন তার পার্টি ও এই তত্ত্বের ভিত্তিতে দেশভাগে সায়ে দিয়েছে। এরপরেই সেই ভয়ংকর কালো দিন। 46 এর 16ই আগস্ট সারা কলকাতায় জ্বললো দাঙ্গার আগুন। তিন চার দিন ধরে কলকাতায় নিরীহ মানুষ খুন হল শান্তিপ্রিয় মানুষদের বস্তি পুড়লো। এই ভ্রাতৃহত্যায় হারিয়ে গেল মানুষের প্রতি মানুষের বিশ্বাস, ভালোবাসা, দায়বোধ। দাঙ্গায় সবচেয়ে মুশকিল হয় কমিউনিস্ট পার্টির। বহু যত্নে গড়া শ্রমিক ঐক্য জনতার ঐক্য ভেঙে যায়। তবুও সেই অন্ধকারে
আলোর রুপোলি রেখা জ্বালিয়ে রেখেছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীরা এবং বেশ কিছু সংখ্যক শুভ বুদ্ধি সম্পন্ন হিন্দু-মুসলমান পরিবার। অবশেষে দেশভাগের মধ্যে দিয়ে স্বাধীনতা এলো আর এরই সঙ্গে নামলে উদ্বাস্তুদের দল "আমরা কারা বাস্তুহারা" এই স্লোগানে আকাশ বাতাস মুখরিত হলো। বিদেশি ইংরেজ সরকারের পরিবর্তে স্বাধীন ভারতীয় সরকার এদের ওপর নামিয়ে আনলো অকথ্য অত্যাচার দমন পীড়ন এই অগণিত মানুষের চাহিদাকে সংগঠিত রূপ দেবার জন্যেই কমিউনিস্ট পার্টি তাদের পাশে দাঁড়ালো। সংগঠন তৈরি করা হলো, সরকারের কাছে দাবী দেওয়াও পেশ করা হলো। বিভিন্ন জায়গায় গড়ে উঠল উদ্বাস্তু কলোনি। সেই কলোনি গুলো সরকারি স্বীকৃতি পেল। এদের মধ্যে মহিলা সমিতি গড়ে তোলার জন্য উদ্যোগ নিলেন মণিকুন্তলারা।
দেশ স্বাধীন হওয়ার অল্প কিছুদিন পরে ৪৭ সালের শেষের দিকে পার্টি লাইনে আবার পরিবর্তন এল। তৎকালীন কমিউনিস্ট দেশগুলির সম্মিলিত মঞ্চ কমিনফর্মের সভায় সোভিয়েট নেতা কমরেড নবের একটি বক্তৃতায় বলা হলো ধনতন্ত্রী দেশ গুলিতে শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে সংগ্রামী আন্দোলন চালাতে হবে। এরই ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় নেতা কমরেড রণদীভে আমাদের দেশেও এই নীতি প্রয়োগ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। বলা হল কংগ্রেস সরকার পুরোপুরি স্বাধীন নয়। এ সরকার একদিকে সাম্রাজ্যবাদ অপরদিকে সামন্ততন্ত্ৰ একচেটিয়া পুঁজিপতিদের সঙ্গে জোট বেধে আছে। এই জোট থেকে মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত এ আজাদী ঝুটা হ্যায়। ঠিক এই সময়েই তেলেঙ্গানার কৃষক বিদ্রোহ কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে এক চূড়ান্ত রূপ ধারণ করে কমিউনিস্টদের এই আধিপত্য স্বভাবত কংগ্রেস যেনে নিতে পারে না এবং তাদের ওপর চরম অত্যাচার নামিয়ে আনে। পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেসে ১৯৪৮ এর ফেব্রুয়ারিতে তেলেঙ্গানা ওয়ে ইজ আওয়ার ওয়ে এই স্লোগানের সঙ্গে সঙ্গে এই রণনীতি গৃহীত হলো। নানা জায়গায় ট্রেড ইউনিয়ন গুলি ধর্মঘট চালাতে লাগলো। এরকমই 1949 এর ধর্মঘটে মণিকুন্তলা গ্রেফতার হলেন সঙ্গে জ্যোতি বসু, মোজাফফর আহমেদ, গীতা মুখার্জি আরো অনেকে। অনিকুন্তলা এবং গীতা মুখার্জিকে রাখা হলো প্রেসিডেন্সি জেলের ফিমেল
ওয়ার্ডে। সেখানেও সাধারণ বন্দিদের জন্য তাদেরকে সংগঠিত করে বিভিন্ন দাবি-দাওয়া আদায়ের আন্দোলন চালিয়ে যেতে লাগলেন। এই যাত্রায় ছাড়া পেলেন তিন মাস পরে।
জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর তাকে পাঠানো হলো খড়্গপুরে রেল ধর্মঘটে সহায়তা করতে। সেখান থেকে আবার গ্রেফতার হলেন। এবারে প্রথমে যেদিনীপুর জেল এবং তারপর গেলেন প্রেসিডেন্সি জেলে, তবে সেখানে তিনি নিজের পরিচয় গোপন রেখে নাম নিয়েছিলেন বীনা দাস। যদিও এই গোপনীয়তা বেশিদিন রক্ষা করা যায়নি। প্রচন্ড পরিশ্রমে এবং নানা রকম উৎকণ্ঠায় শরীর গেল ভেঙে। যেদিনীপুর জেলেই প্রচন্ড অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। যেদিনীপুর জেলে বসেই খবর পেলেন, বন্দী মুক্তির দাবিতে মেয়েদের যিছিল করতে গিয়ে শহীদ হয়েছেন কমরেড লতিকা প্রতিভা ও গীতা। ২৮ তারিখ থেকে এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে জেলে বসেই অনশন শুরু হল কিন্তু মনিকুন্তালর শারীরিক অবস্থার এতটাই অবনতি হল, যে প্রায় মৃত্যু মুখে চলে গেলেন। অনশনের ২৩ দিনের যাথায় খবর এলো ধর্মঘট তুলে নেওয়া হয়েছে।
এবারের পর্ব প্রেসিডেন্সি জেল। আবার পার্টির সঙ্গে নানা ব্যাপারে মতাদর্শগত সংঘাত হতে শুরু করল তাকে সংশোধনবাদী বলে চিহ্নিত করা হলো। তিনিও আর সেক্রেটারি থাকতে চাইলেন না কিন্তু তা সত্বেও তাঁকেই সেক্রেটারি হিসেবে রেখে দেওয়া হল। এই পরিস্থিতিতে বাইরে থেকে নির্দেশ এল বাইরের আন্দোলনকে জোরদার করতে হলে জেলের ভেতরেও দ্বিতীয় ফ্রন্ট খুলতে হবে এবং সে আন্দোলনটা শুধু অনশন আন্দোলন হবে না । সোজা কথায় জেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সোজাসুজি সংঘর্ষে আসতে হবে। প্রাথমিক কিছু মারামারির পর আবার শুরু হলো ৫৩ দিনের অনশন। এবার সরকার অত্যন্ত কঠোর মনোভাব নিল এবং জোর করে নল দিয়ে খাওয়ানোর চেষ্টা করা হতে লাগলো। অনশনের শেষ দিকে আবার পার্টি লাইনে বদল এলো। এ সম্পর্কে মণিকুন্তলা তাঁর সেদিনের কথা নামক আত্মজীবনীতে লিখছেন, "হঠাৎ দৈনিক কাগজে দেখলাম ফর লাস্টিং পিস এন্ড ডেমোক্রেসির একটা উদ্ধৃতি। লাস্টিং পিস বেরুতো বুখারেস্ট থেকে। ওই কাগজকে আমরা
আন্তর্জাতিক পার্টির মুখপত্র বলে জানতাম। ওই কাগজে লেখা হয়েছে ভারতের গণতান্ত্রিক আন্দোলন হবে জাতীয় বুর্জোয়া দল শ্রমিক শ্ৰেণী এবং ধনী চাষী আর গরিব চাষী সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে। কি কান্ড আমরা তো তখন শ্রেণী সংগ্ৰাম করছিলাম। সঙ্গী ছিল শ্রমিক, মধ্যবিত্ত চাষী ও খেতমজুর। বাকি সবাই শত্রুপক্ষ। কিন্তু ওই পত্রিকায় বর্ণিত গোষ্ঠী নিয়েই যদি আবার মিত্রতা করতে হয় তবে এতদিন করছিলাম টা কি? জেলেই বা এলাম কেন আর উপোস করেই বা মরছি কেন? গোটা লাইনই যখন পাল্টাতে হবে, তখন অন্তত উপোসের এই ক্ষুদ্র সংগ্রামী লাইনটাও তুচ্ছ হয়ে যাবে।" হলও তাই। এর ১০-১২ দিন পরে বিনা শর্তে ৫৩ দিনের অনশন ভঙ্গ করা হলো। তবে এত সহজে জেল থেকে বেরোনো গেল না। অনেক কাঠ খড় পুড়িয়ে জেল যুক্তি ঘটলো প্রায় দু'বছর পরে, ১৯৫২ সালের এপ্রিল মাসে।
জেল থেকে বেরিয়ে আসার পর পার্টির অভ্যন্তরে নতুন কর্মসূচি ও কৌশলগত প্ৰশ্ন নিয়ে আলোচনা শুরু হলো এই পর্যায়ে সংগ্রামের যে নতুন নীতি ঠিক হলো তার নাম দেওয়া হল পিপলস ডেমোক্র্যাটিক রেভলিউশন। একথাও বলা হতে থাকলো যে এর নেতৃত্ব থাকবে শ্রমিক শ্রেণীর হাতে। এই সময়েই মণিকুন্তলা লক্ষ্য করেছিলেন ১৯৪৮ থেকে ৫১ পর্যন্ত যারা কখনকার উগ্রনীতির নেতৃত্বে ছিলেন তাদের সঙ্গে পরবর্তী নেতৃত্বের আন্তরিক সম্পর্কের কিছুটা যেন অভাব ঘটেছিল। ইতিমধ্যেই এসে গেল ১৯৫২ সালে ফেব্রুয়ারিতে স্বাধীন ভারতবর্ষের প্রথম নির্বাচন। ঠিক হলো মোট ১০০ টা আসনে লড়া হবে এবং ১০০টা সিটে মণিকুন্তলাই মেয়েদের মধ্যে একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচনে লড়বেন। এতে মণিকুন্তলা তীব্র আপত্তি করলেন কিন্তু পার্টি তাঁর সঙ্গে সহমত হলেন না। শেষ পর্যন্ত কালীঘাট আসন থেকে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেন। নির্বাচনে লড়তে গিয়ে তিনি শুধু নিজেকে কালীঘাটে আটকে রাখেন নি, সারা পশ্চিমবাংলায় জুড়েই নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছিলেন। এবং এই সময়ে তার অসাধারণ কিছু অভিজ্ঞতা হয়েছিল তার একটা দুটো উল্লেখ করলে প্রকৃতপক্ষে বাস্তব অবস্থাটা কি ছিল সেটা
কিছুটা অনুধাবন করা সম্ভব হবে, কারণ অবস্থাটা যে এই 2025 এ ও সাংঘাতিক কিছু বদলে গেছে এমনও নয়। নির্বাচনী প্রচারে গেছেন হাওড়ার এক সংখ্যালঘু অধ্যুষিত অঞ্চলে। সেখানে গিয়ে মেয়েদের মধ্যে কোনরকম আগ্রহই দেখছেন না এমনকি তারা কথাও বলতে চাইছে না। অনেকক্ষণ চেষ্টা চালানোর পর একজন মহিলা বলেই ফেললেন, "তোমাদের ভোট দেবো কি করে? তোমরা ধর্ম যাননা। আল্লাহর চাঁদ, আযাদের ঈদের চাঁদ সেখানে তোমরা কুকুর পাঠিয়ে দিয়েছো। এমন পাপ কেউ করে?" সেই সময় বিরোধী পক্ষ এরকম ভাবেই ওখানে বুঝিয়ে গিয়েছিল। গিয়েছেন জলপাইগুড়ির একটা গ্রামের, অতি দরিদ্র কৃষক এলাকায়। অসহনীয় সেই দারিদ্র দেখে ভাবলেন এইখানে বোধ হয় ফল হবে। এটা ছিল রাজবংশী অঞ্চল। ওদের এই দুর্দশার জন্য কারা দায়ী সমস্ত রকম ভাবে ওদের বোঝানোর চেষ্টা করার পর ওরা বলল আমরা পূর্বজন্মের কর্মফল ভোগ করছি। জমিদার কি করবে তাছাড়া "রানীযারে এট্টা ভোট দিবার লাগে"।
অবশেষে নির্বাচন হয়ে গেল কমিউনিস্ট পার্টি 28 টি সিট পেল, ভোটের পার্সেন্ট ছিল ১০.৭৬। প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আইনসভায় জায়গা করে নিলেন জ্যোতি বসু হলেন বিরোধী দলের নেতা।
পরপর দুবার নির্বাচনে জয়ী হয়ে টানা ১০ বছর তিনি বিধানসভার সদস্য ছিলেন। আইনসভার সদস্য হিসেবে যনি কুন্তলা যেভাবে তার নিজের মূল্যায়ন করেছেন এরকম মোহমুক্ত হয়ে নিজের বিচার করতে খুব কম মানুষই পারেন। মণিকুন্তলা অনেকগুলি গণসংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, এছাড়াও ছিল মহিলা সমিতি। ফলে আইনসভায় বা তার নিজের কালীঘাট এলাকায় তিনি তেমনভাবে সময় দিতে পারেননি। শেষে তার উপলব্ধি হয়েছে, "গণসংগঠনের কোন লোক আইন সভায় না গেলেই ভালো, অন্তত আমার না গেলেই ভালো হতো। কারণ আমি এলাকা, আইনসভা ও গণসংগঠন কারো প্রতি সুবিচার করতে পারিনি"। কিন্তু মঞ্জু চট্টোপাধ্যায়ের বিধানসভায় মণিকুন্তলা সেন নামক লেখায় আমরা কিন্তু এর উল্টো চিত্রটাই পাই। তিনি লিখছেন দুবার পর পর নির্বাচনে জিতে মণিকুন্তলা ১০ বছর একটানা বিধানসভায় বিরোধীদলের অন্যতম সক্রিয় নেত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৭ জুলাই ১৯৫২ বাজেট বিতর্কে অংশগ্রহণ করে তিনি জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসা বিষয়ে বাজেটে যাত্র ছয় লাইনের উল্লেখের সমালোচনা করে দেখান যে, ১৯৪৫ সালে গঠিত ভোর কমিটির অন্যতম সদস্য ডঃ বিধান চন্দ্র রায় মুখ্যমন্ত্রী পদে আসীন হয়ে, সেই কমিটির সুপারিশকে অগ্রাহ্য করে চলেছেন। ১৯৫৮ দশই জুলাই বাজেট বরাদ্দের বিতর্কে শ্রী প্রফুল্ল চন্দ্র সেন এর বক্তৃতার জবাবে মণিকুন্তলা সেন আরো একবার উদ্বাস্তু আন্দোলনে তার প্রত্যক্ষ যোগদানে আহরিত অভিজ্ঞতা ও তথ্যের ভিত্তিতে এক একটি উদ্বাস্তু শিবিরের পরিস্থিতি তার ভাষণে মুর্ত করে তোলেন। তিনি তাঁর ভাষণ শেষে বলেন, "প্ৰফুল্ল বাবু খাদ্যমন্ত্রী থেকে দুর্ভিক্ষ যন্ত্রী এবং পুনর্বাসন যন্ত্রীতে পরিণত হয়েছেন। উনি যেন মনে রাখেন এই টাকাও যেমন গৌরী সেনের টাকা নয়, কারো পৈত্রিক সম্পত্তি নয়, তেমনি উদ্বাস্তুরাও কারো ভিটে বাড়ির প্রজা নয়, যে তাদের নিয়ে যা খুশি করতে পারেন যেখানে খুশি পাঠাতে পারেন"। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে নারী এবং শিশুদের কল্যাণের ব্যাপারে তিনি যথেষ্ট সোচ্চার ছিলেন।
আবার পূর্ব প্রসঙ্গে ফিরে আসি। এই সময় বার্লিনে গঠিত হলো বিশ্ব গণতান্ত্রিক নারী সংঘ তাদের কাছে ডাক এলো এই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার। তৈরি হল ভারতীয় গণতান্ত্ৰিক মহিলা ফেডারেশন। মণিকুন্তলা সহ পুষ্পময়ী বসু, অরুণা মুন্সি, শান্তা দেব, অঞ্জলি মুখার্জি এরা সবাই যুক্ত হলেন। প্রথম কাজ হল একটি সারা ভারত সম্মেলন ডাকা। ১৯৫২ সালে কলকাতাতেই এই প্রথম সম্মেলনটি ডাকা হল। এবারে মণিকুন্তলা এই কাজে নিজেকে নিয়োজিত করলেন। প্রত্যেক দিন নতুন নতুন এলাকায় চলতে থাকলো স্বাক্ষর সংগ্রহের কাজ। একই সঙ্গে এই সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা সাধারণ মহিলাদের বোঝানো। কলকাতায় অনুষ্ঠিত এই সম্মেলন প্রবলভাবে সফল হয়েছিল যদিও সরকারের কমিউনিস্ট বিদ্বেষের কারণে কোনরকম সরকারি সহায়তা পাওয়া যায়নি কিন্তু সাধারণ মানুষের অভূতপূর্ব অংশগ্রহণ এবং সহযোগিতা মিলল।। এরমধ্যেই মণিকুন্তলার ব্যক্তিগত জীবনেও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটলো। 1953 সালে তাঁর সঙ্গে বিবাহ হল কমরেড জলি কলের। সাক্ষী ছিলেন কমরেড মোজাফফর আহমেদ সুহাসিনী গাঙ্গুলী ও গীতা মল্লিক৷
এরপর মণিকুন্তলার অন্যতম উল্লেখযোগ্য আন্দোলন হিন্দু কোড বিল সংক্রান্ত। মেয়েদের বিয়ের বয়স সীমা বাড়ানো, পৈত্রিক সম্পত্তিতে সমান অংশীদারিত্ব, বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকার, অসম বর্ণবিবাহকে মর্যাদা দেওয়া,শিশু বিবাহ ও বহুবিবাহ বন্ধ করা এইসব দাবি নিয়ে পার্লামেন্টে উঠলো হিন্দু কোড বিল। সরকার পক্ষ থেকে বিলটিকে সমর্থনের জন্য সমস্ত রাজ্যের আইনসভায় পাঠানো হলো। এই বিল সহজেই পাশ হবে কিন্তু তাও মেয়েদের মধ্যে কিছুটা সচেতনতা বাড়ানোর জন্য তাঁরা প্রচারের সিদ্ধান্ত নিলেন। এবং এই প্রচারের কাজে গিয়েই তাদের জ্ঞানচক্ষু উন্মীলিত হলো। সমাজের সেই সময়কার রথী মহারথীরা এই বিলের বিরোধিতা করতে নেমে পড়লেন। এদের মধ্যে ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের, রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, অনুরূপা দেবী প্রমূখ। অবশ্য মণিকুন্তলারাও ছেড়ে দিলেন না । তাঁরাও গেলেন প্রখ্যাত আইনজীবী অতুল গুপ্তর কাছে। এবং আইনগত লড়াইয়ের সঙ্গে সঙ্গে চালাতে লাগলেন বিভিন্ন জায়গায় বক্তৃতা এবং ঘরোয়া সভা। চলতে লাগলো স্বাক্ষর সংগ্রহ অভিযান। শ্যামাপ্রসাদ প্রমুখের তীব্র নক্যার জনক বিরোধিতা সত্ত্বেও পার্লামেন্টে আইনটি পাস হলো। শ্যামাপ্রসাদ এর যত মানুষের বিরুদ্ধে কথা বলায় অনেকেই মণিকুন্তলার উপর ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। তিনি স্পষ্টই জবাব দিয়েছিলেন আপনাদের ইচ্ছে না হলে আমাকে ভোট দেবেন না তাতে আমার কিছু বলার নেই কিন্তু সাম্প্রদায়িকতা ও সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে নীতিগতভাবে আমাকে বলতেই হবে। এতটাই দৃঢ় ছিল সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে তার অবস্থান সুইজারল্যান্ড এর লোজান শহরে যে বিশ্ব মাতৃ সম্মেলন এর আয়োজন হয় সেখানে ভারত থেকে একটি প্রতিনিধি দল গিয়েছিল। সেই দলের অন্যতম ছিলেন মণিকুন্তলা সেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন অরুনা মুন্সি, মৈত্রীয়ী দেবী, সুষমা সেনগুপ্ত প্রমূখ আরো ২০-২৫ জন। সুইজারল্যান্ড এর সফর সেরে তাঁরা গেলেন সোভিয়েত রাশিয়া। তখনকার সোভিয়েত রাশিয়া তাকে মুগ্ধ করেছিল। জুলিয়াস ফুচিতের স্ত্রীকে দেখে তিনি অত্যন্ত আবেগ তাড়িত হয়েছিলেন। সোভিয়েত রাশিয়ায় তাঁদের গাইড ছিলেন নাদিরা বলে একটি মেয়ে। ঠিক বিদায় মুহূর্তে সোভিয়েত রাশিয়া সম্পর্কে তাঁর তার আবেগঘন অনুভূতি ব্যক্ত করাতে নাদিরা বলেছিল "অল ইজ নট ওয়েল হিয়ার" ।
এর মধ্যেই প্রকাশিত হলো নেহেরু সরকারের দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা। এই পরিকল্পনার মধ্যে এমন কিছু বিষয় ছিল যা কমিউনিস্ট পার্টি সমর্থন করেছিল। যদিও যথেষ্ট বিতর্কও ছিল। একটা অংশের যত ছিল, কংগ্রেসের মধ্যে যে অংশের নেতৃত্ব করেন পন্ডিত নেহেরু, সেই অংশের সঙ্গে সহযোগিতা করতে হবে। এছাড়াও জাতীয় বুর্জোয়া শ্রমিক মধ্যবিত্ত কৃষক এরা অবশ্যই সহযোগী হিসেবে থাকবে। এই অংশ তাদের পরিকল্পিত নতুন সহযোগী নিয়ে গঠিত ফ্রন্টের নাম দিলেন ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট। অপরংশের যত ছিল নেহেরু সরকার দেশের বৃহৎ পুঁজিপতি ও একচেটিয়া মালিক গোষ্ঠীর প্রতিভূ, কাজেই পরিকল্পনায় প্রগতিশীল কর্মসূচি থাকলেও সরকারের শ্রেণী চরিত্র বিবেচনায় এর কোন অংশের সঙ্গেই সার্বিক সহযোগিতা অসম্ভব ব্যাপার। এইসব তর্ক-বিতর্কে মণিকুন্তলা ক্রমশই বিরক্ত হচ্ছিলেন এবং উপলব্ধি করছিলেন এর সবটাই বিশুদ্ধ তাত্ত্বিক ব্যাপার নয়। নেতৃত্বের মধ্যে শুরু হয়েছে ব্যক্তিগত রেষারেষি ও প্রতিক্রিয়া। এর ই জেরে ছোট ছোট কিছু ঘটনায় মণিকুন্তলা বুঝতে পারলেন, পার্টিতে তিনি আর সংখ্যাগরিষ্ঠের খুব কাছের মানুষ নন। আগে আইনসভার প্রতিটি অধিবেশনে তাঁর নাম বক্তার তালিকায় থাকতো। তিনি কিছু বললে কাগজগুলো অল্প হলেও তা উল্লেখ করত কিন্তু ১৯৬০ ৬১ সালের একটা বছরে তিনি যাত্র ৭ মিনিট বক্তৃতা করেছিলেন।
এইরকম যখন মানসিক অবস্থা ঠিক সেই সময়েই কমিউনিস্ট পার্টির ভাগ্যাকাশে আবার দুর্যোগের মেঘ ঘনিয়ে এলো শুরু হল ভারত চীন যুদ্ধ। কমিউনিস্ট পার্টি চীনের পক্ষ নিল। মনি কুন্তলার নিজের যুক্তি বুদ্ধি অনুযায়ী মনে হয়েছিল
এই যুদ্ধে ভারতকেই সমর্থন করা উচিত। কিন্তু পার্টি নেতৃত্ব তার কথা যানেননি। পার্টির এখনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে তিনিও পার্টির নির্দেশ অনুসারে প্রচারে বেরোলেন। আবার জেলায় জেলায় ঘুরে বোঝাতে শুরু করলেন। অন্যায়টা চিনেন নয় ভারতের। ভারত চীন যুদ্ধের ঘটনার অভিঘাতে কমিউনিস্ট পার্টির ভেতরে আবার বড়সড়ো একটা ফাটল ধরল।
পার্টির এই অন্তর্দ্বন্দ্বের মধ্যেই আবার দেশজুড়ে শুরু হল দুর্ভিক্ষ। সে বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগে শস্য নষ্ট হয়েছিল ঠিকই কিন্তু যা শস্য ছিল তাই দিয়েও দুর্ভিক্ষের মোকাবিলা করা সম্ভব হতো। দূর্ভাগ্যক্রমে সব শস্যই চলে গেল কালো বাজারে এবং সরকার নিঃশব্দে সেটা দেখলেন। স্বভাবতই কমিউনিস্ট পার্টি এর বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগঠিত করল এই সময় মণিকুন্তলা অত্যন্ত জোড়ালো ভূমিকা পালন করেছিলেন। ময়দানে বিরাট এক সভায় বক্তা হিসেবে তাকেই পাঠানো হয়েছিল। অন্য নেতারা প্রকাশ্যে ছিলেন না তাঁর ওপর নির্দেশ ছিল বক্তৃতা করেই সবার অলক্ষে সভা ছেড়ে বেরিয়ে আসার। সেই সভায়
বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন "আমরা রাজ্য জয় করতে আসিনি, শুধু দু মুঠো অন্ন চাইতে এসেছি। আমরা কাউকে রক্ত চক্ষু দেখাতেও আসিনি, দেখতেও চাই না"। এই সভার শেষে একটা মিছিল রাইটার্সের দিকে পা বাড়াতেই পুলিশ তাদের পেটাতে শুরু করল। নারী-পুরুষ মিলে প্রায় ৮০ জনকে খুন করল কংগ্রেসী সরকারের পুলিশ বাহিনী।
পার্টির আভ্যন্তরীণ গোলমাল এর মধ্যেই এসে গেল ১৯৬২ এর মার্চে তৃতীয় সাধারণ নির্বাচন। এই নির্বাচনে মণিকুন্তলা কোনভাবেই আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাননি। কারণ তিনি উপলব্ধি করেছিলেন তাঁর এলাকায় পার্টির কর্মীরা মূলত চীনপন্থী। আর মণিকুন্তলা তা নন। তাই তাঁকে প্রার্থী হিসেবে মেনে নিতে তাদের অসুবিধে ছিল। এছাড়া তিনি নিজেই বুঝেছিলেন তাঁর নির্বাচনী এলাকায় যতটা সময় দেওয়া উচিত ছিল, তিনি ততটা দিতে পারেননি। কিন্তু জ্যোতি বসু প্ৰায় জোর করেই তাঁকে কালীঘাটে দাঁড় করালেন। নির্বাচনের পার্টির আসন ৪৬ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৫০ হল বাম দলের মিলিত আসন ৬১ থেকে ৭২ কিন্তু মণিকুন্তলা হেরে গেলেন নির্বাচনে। এটাই ছিল তার শেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
চীন ভারত প্রশ্ন পার্টি যখন পরিষ্কার দুই ভাগ হয়ে গেল তখন যেটুকু বাকি ছিল ভারত সরকার নিজেই তা করে দিল। এক রাত্রে কমিউনিস্ট পার্টিকে বেআইনি ঘোষণা না করেও পুলিশ তার একাংশ কে গ্রেফতার করতে শুরু করল। মণিকুন্তলা এবং তার স্বামী ও সহ যোদ্ধা জলি কল প্রস্তুত ছিলেন যে পুলিশ আসবে এবং গ্রেফতার করবে। কিন্তু পুলিশ এসেও গ্রেপ্তার না করে চলে গেল। জলি কল নিশ্চিতভাবে বুঝতে পেরেছিলেন এটা পার্টি ভেঙে দেওয়ার একটা চক্রান্ত। হলোও তাই। যাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল পুলিশ তাদের প্রথমে জিজ্ঞেস করল তারা চীনপন্থী কিনা, তারা জবাব না দিলে পুলিশ বলল আপনারা না বললে কি হবে? জলি-কল আযাদের কাছে যে লিস্ট দিয়েছে তাতে আপনাদের নাম আছে। জলি কল তখন ছিলেন পার্টির জেলা সেক্রেটারি। মণিকুন্তলারা দুজনেই এইসব ছেলেদের বোঝাবার চেষ্টা করেছিলেন যে এটা একটা পুলিশি অপকৌশল। কিন্তু ছেলেদের মধ্যে আর সেই বিশ্বাস ফিরে এল না। এই ঘটনার পর পার্টি পুরোপুরি ভেঙে গেল। এই সময়ের মানসিক অবস্থার কথা মণিকুন্তলা লিখেছেন তাঁর সেদিনের কথা বইটিতে "এবার আমাকে যেতে হবে। এ পার্টির কোন অংশের সঙ্গেই আমি আর আমার স্থান করে নিতে পারব না। প্ৰায় 25 30 বছরের পার্টি জীবন আমার। আমার ধমনীতে এদেশে সোশ্যালিজম প্রতিষ্ঠা করার জন্য উষ্ণ রক্ত অপেক্ষা করছিল। এজন্য আমি আমার ক্ষুদ্র জীবন বলি দেবার পরীক্ষাতেও দাঁড়াতে প্রস্তুত ছিলাম। এই পার্টিতে এসে আমার জীবনে যে জনসংযোগ ঘটেছে তারই রন্ধে রন্ধ্রে আমার মনের শিকড় প্রবিষ্ট হয়ে গেছে। সেই বন্ধন ছিন্ন করা কি সম্ভব?
কিন্তু তবুও এই পার্টিকে ছেড়ে যেতে হবে। তাতে যত কষ্টই হোক। যে আদর্শ নিয়ে একদা পার্টিতে এসেছিলাম। সেই আদর্শ এই টুকরো হওয়া পার্টিতে আমি আর খুঁজে পাবো না" ।
পার্টির কমরেডদের মধ্যে তার এবং
জলি কলের সম্পর্কে যে বিরূপতা তৈরি হলো, সেটা তাঁদের আলাপ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে
দিল। কলকাতা ছেড়ে তারা দিল্লি চলে গেলেন। এই ভাবেই শেষ হয়ে গেল মণিকুন্তলার পার্টি জীবন।
তবে পার্টি ছাড়লেও মার্কসবাদে
চিরকাল তার অটুট বিশ্বাস ছিল এবং তিনি আশা করেছিলেন একদিন না একদিন ভাগ হওয়া পার্টি আবার কাছে আসবে, হয়তোবা মিলেও যাবে কোন কালে। ১৯৮৭ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর করেয়ার বাসভবনে দুরারোগ্য ক্যান্সার রোগে তাঁর মৃত্যু হয় ।মৃত্যুর কিছুদিন আগে তাঁর হারানো দিনের ধর্মীয় আবেগ আবার ফিরে আসে। এবং তিনি রামকৃষ্ণ মঠের উপাধ্যক্ষ স্বামী ভূতেশ্বরো নন্দের কাছে দীক্ষা গ্রহণ করেন।
১৯৮২ সালে মণিকুন্তলা সেন তার
আত্মজীবনী "সেদিনের কথা "বইটি লেখেন। এই বইটি ছাড়া আমাদের দেশের কমিউনিস্ট পার্টির পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস লেখা অসম্ভব ব্যাপার। যারা নেতৃত্বের আসনে থাকেন তাঁদের কথা আমরা জানতে পারি বিভিন্ন লেখায়। কিন্তু পাদপ্রদীপের
তলায় যারা থাকেন, শুধু সলতে পাকানোর কাজটুকু যারা করেন, তাদের নাম থেকে যায়
আড়ালে। মণিকুন্তলা তাঁর বইয়ে এইরকম কত যে মানুষ বিশেষ করে মহিলা কর্মীদের নাম উল্লেখ
করেছেন তা গুনে শেষ করা যায় না। এরা প্রত্যেকেই কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি ছিলেন নিবেদিত প্রাণ, এবং কমিউনিস্ট পার্টির মূল মেরুদন্ড। কিন্তু এরা কেউই প্রচারের আলো গায়ে যাখতে চাননি, তাই মণিকুন্তলার লেখাতেই হয়তো তাদের উল্লেখ টুকু থেকে গেল।
মণিকুন্তলা সক্রিয় রাজনৈতিক জীবন খুব বেশি দিনের নয় কিন্তু তার মধ্যেই নিজের নিষ্ঠা শ্রম এবং যোগ্যতা বলে তিনি যে শুধু নেত্রী হয়ে উঠেছিলেন তাই নয় পেয়েছিলেন কমরেডদের অকুণ্ঠশ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। একনিষ্ঠ সৈনিকের যত পালন করে গেছেন পার্টির নির্দেশ। অনেক সময় মতান্তর হয়েছে। মন থেকে যেনে নিতে পারেননি। কিন্তু তাও কাজে অবহেলা করেননি। এইরকম একজন নিবেদিত প্রাণ কর্মীকে হারানো কমিউনিস্ট পার্টির যথেষ্ট ক্ষতি করেছিল। মণিকুন্তলা বেঁচে থাকবেন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির ইতিহাসের পাতায় পাতায় আর অসংখ্য মানুষের ভালোবাসা ভরা হৃদয়ে, লাল সেলাম কমরেড মণিকুন্তলা সেন।