কল্পনা দত্ত : দ্রোহ আর অন্বেষণ
- 07 March, 2026
- লেখক: শতাব্দী দাশ
স্বাধীনতা সংগ্রামে নারীর ভূমিকার আখ্যান খুঁজে পাওয়া বড় সহজ নয়। স্কুলের পাঠ্যবইতে পতাকা হাতে মাতঙ্গিনী আর ঘোড়ার আসীন ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাঈ ছাড়া কোনো নারী স্বাধীনতা সংগ্রামীর ছবি দেখা যায় না। বড়জোর প্রথম নারী শহিদ প্রীতিলতা ওয়েদ্দেদার জায়গা পান, যিনি কল্পনা দত্তের প্রিয়তম বন্ধু। কল্পনা নিজে আলোচিত হন কেবল বাম বৃত্তে, কারণ জেল-উত্তর জীবনে তিনি কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়েছিলেন। আর বীণা, কল্যাণী, শান্তি, সুনীতিরা আলোচনাতেই আসেন না। আসলে নারীকে আন্দোলনের ডামাডোলে ঠিক কোন জায়গা দেওয়া যায়, তা নিয়ে দ্বন্দ্ব চিরন্তন। অনেকেই চান তার 'সহযোগী' 'অনুপ্রেরণাদাত্রী' ভূমিকা। আবার অনেকে তাকে ঘরেই দেখতে চান। পার্থ চ্যাটার্জী তাঁর 'ন্যাশনালিস্ট রেজোলিউশন অব উইমেনস কোয়েশ্চেন' বইতে বলেছেন, ঊনবিংশ শতকে আধুনিকীকরণের ফলে ভারতীয় পুরুষ পশ্চিমি জ্ঞান-বিজ্ঞানকে গ্রহণ করেছিল বটে, তবে একই সঙ্গে কীভাবে ভারতের ঐতিহ্য বজায় রাখা যায়, সেই বিষয়ে গভীর উদ্বেগের মুখোমুখি হয়েছিল সে। উদ্বেগ-তাড়িত মধ্যবিত্ত পুরুষ তাই নারীকে ঘরের পরিসরে সীমাবদ্ধ করে, নারীর মধ্যেই দেখতে চেয়েছে সনাতনকে। গান্ধিজি নিজেও ছিলেন দোলাচলে। কখনও বলেছেন, মেয়েরা গৃহে থেকেই দেশের সেবা করতে সক্ষম। কখনও আবার সত্যাগ্রহ অভিযানে মেয়েদের চেয়েছেন।
কিন্তু কিছু একটা ভূমিকা নির্ধারণ করে দিলেই তো হল না। নারীদের নিজেদেরও আছে আদিম লড়াকু প্রবণতা, আছে আপোষহীনতা, অন্যায়ের বোধ। অতএব বঙ্গ পাঞ্জাব মহারাষ্ট্র জুড়ে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে তাঁরাও প্রত্যক্ষ অংশ নিয়েছিলেন। দুর্ভাগ্য, তাঁরা শূন্য স্বীকৃতি নিয়েই বিস্মৃত হয়েছেন। এই দিক থেকেও কল্পনা এক অনন্য কাজ করে গেছেন। লিখে গেছেন এক স্মৃতিকথা, রেখে গেছেন এক নারী-কৃত ডকুমেন্টেশন, বিকল্প ইতিহাস খুঁজতে যার মূল্য অপরিসীম।
গোড়ার কথায় আসা যাক। শতাধিক বছর আগে এক ২৭ শে জুলাই চট্টগ্রাম জেলার শ্রীপুর অঞ্চলের বোয়ালখালি গ্রামে কল্পনা দত্ত জন্মেছিলেন সমৃদ্ধ পরিবারে। ঠাকুর্দা ডাক্তার। পরিবার সরকারি নেকনজরে। তবে ছোট থেকে কল্পনার মাথাটি খানিক খেয়েছিলেন স্বাধীনতা-কামী ছোটকাকা। বারো বছর বয়সে লুকিয়ে 'পথের দাবি' শেষ করেছিলেন কল্পনা। খাস্তগীর বালিকা বিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে প্রীতিলতার সঙ্গে প্রথম আলাপ। মাত্র এক ক্লাস উঁচুতে পড়তেন প্রীতি। দুজনই বে-টাইমে ব্যাডমিন্টন খেলতে যেতেন বলে আলাপ জমেছিল। দুই কিশোরী বড় হয়ে 'কী হব কী হব' ভাবতে ভাবতে ঠিক করেন, বিপ্লবী হবেন। তারপর দুজন ম্যাট্রিকের পর দু জায়গায়। কল্পনা ১৯২৯ সালে ম্যাট্রিকে র্যাংক করে কলকাতায় এলেন বেথুন কলেজে পড়তে। প্রীতি পড়তে গেলেন ঢাকায়। কল্পনা বিজ্ঞান নিয়ে আইএ প্রথম বর্ষে পড়া শুরু করলেন বটে, কিন্তু জড়িয়ে পড়লেন বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে। কলেজেই কল্যাণী দাশ 'ছাত্রী সংঘ' নামে এক দল চালাতেন। এই কল্যাণী দাশ হলেন বীণা দাশের দিদি, সেই বীণা দাশ যিনি পরবর্তীকালে গভর্নর জেনারেলের উদ্দেশ্যে গুলি চালিয়েছিলেন। কল্পনা এই দলে যোগ দিলেন। বীণাদের সঙ্গে আলাপ হল। এই দল নানা ইস্যুতে হরতাল পালন করত, মিছিল করত। কল্পনাও জড়িয়ে পড়তে লাগলেন।
কল্পনা শুনলেন, শারীরিক ভাবে শক্তিশালী হওয়া বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের জন্য জরুরি। তাই সিমলা ব্যায়াম সমিতিতে হানা দিলেন। স্কলারশিপের টাকায় সাইকেল কিনে ভোরবেলায় কারও ঘুম ভাঙার আগে বেথুন কলেজের কম্পাউন্ডে সাইকেল চালাতেন। প্রতি রবিবার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের ঝিলে নৌকা বাওয়া অভ্যাস করতেন। এই সময়ে বিপ্লবী সূর্য সেনের অনুরাগী পুর্ণেন্দু দস্তিদার, মনোরঞ্জন রায়দের সঙ্গে আলাপ হয়ে গেল। তাঁদের মাধ্যমে মাস্টারদার সঙ্গে যোগাযোগ হল। মাস্টারদা প্রতিষ্ঠিত ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি, চট্টগ্রাম শাখায় খাতায় কলমে যোগদান করলেন।
১৯৩০ সালের এপ্রিলে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার অভিযান হল। তার কদিন পর জালালাবাদের যুদ্ধ। মারা পড়লেন বারো জন। মে মাসে গরমের ছুটিতে কল্পনা কলকাতা থেকে চট্টগ্রামে দেশের বাড়িতে সেই যে গেলেন, আর ফিরলেন না। ট্রান্সফার নিয়ে ভর্তি হয়ে গেলেন চাটগাঁর কলেজে। বছরখানেক পর, ১৯৩১ সালের জুনে তাঁর সঙ্গে বিপ্লবী সূর্য সেনের প্রথম দেখা হয়। তখন বন্দি গণেশ ঘোষ, অনন্ত সিং সহ অন্য বিপ্লবীদের জেলে ভেঙে মুক্ত করার পরিকল্পনা হচ্ছে। কল্পনা ছদ্মবেশে জেলবন্দি বিপ্লবীদের সঙ্গে দেখা করতে যেতেন। তাঁর মাধ্যমেই জেলের বাইরে থাকা মাষ্টারদারা অনন্ত সিং-দের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। মানে তখনও তিনি ছিলেন 'সহকারী' ভূমিকায়। তবে সায়েন্সের ছাত্রী মেয়েটি কলকাতায় থাকার সময়ই বোমার জন্য গান কটন তৈরি করে দিতেন। চাটগাঁয়ে এসে বোমা বাঁধতেও শিখেছিলেন ক্রমে 'ফুটুদা' ওরফে তারকেশ্বর দস্তিদারের কাছে।
বলা বাহুল্য, গেরিলা দলে যোগ দেওয়ার উপযুক্ত মনে করা হত না নারীদের। নেতারা মনে করতেন, একেই কোমলমতি মেয়েরা বিপ্লবী কাজের অনুপযুক্ত, তদুপরি ছেলে ও মেয়ে পাশাপাশি থাকলে ছেলেদের নৈতিক আদর্শের স্খলন ঘটতে পারে। কল্পনা দত্ত লিখেছিলেন, 'It was an iron rule for the revolutionaries that they should keep aloof from women.' সে নিয়ম ভাঙলেন প্রীতিলতা-কল্পনারা। কল্পনা স্মৃতিকথায় এক জায়গায় বলেছেন, তাঁকে আর প্রীতিলতাকে দেখে অনন্ত সিং স্বীকার করেছিলেন যে মেয়েদের বৈপ্লবিক ক্ষমতা সম্পর্কে তাঁর ধারণা সঠিক ছিল না; অতএব মেয়েরা যেন তাঁকে ক্ষমা করে।
১৯৩০ সালে ডিনামাইট কাণ্ড শুরু হল। জেল সহ শহরের এমন নানা জায়গায় ডিনামাইট রেখে দেওয়া হবে, যেখানে সাদা চামড়ার প্রশাসনিক কর্তাদের আনাগোনা। এরকমই ছিল পরিকল্পনা। অবশ্য পুলিশ সেই ছক ধরে ফেলে। ১৯৩১ সালে ‘ডিনামাইট ষড়যন্ত্র’ মামলায় সন্দেহভাজন হিসাবে পুলিশ কল্পনাকে গৃহবন্দি করল। কলেজে বিএসসি পড়তে যাওয়া আর বাড়ি ফেরা — এ ছাড়া চলাচলের অনুমতি ছিল না। কিন্তু পুলিশের চোখে ফাঁকি দিয়ে কল্পনা রাতের অন্ধকারে পুরুষের বেশে সূর্য সেন, নির্মল সেনদের সঙ্গে দেখা করতে তাঁদের আশ্রয়স্থলে চলে যেতেন। মাস্টারদার সঙ্গে গ্রামে গ্রামে ঘুরতেন। ফুটুদা ওরফে তারকেশ্বর দস্তিদারের কাছে শিখতেন বন্দুক চালানো। যেহেতু গৃহবন্দি, তাই তাঁকে বাড়ি ফিরতেই হত মাঝেমাঝে। প্রীতি বাড়ি ছেড়ে একেবারেই থেকে গিয়েছিলেন ছেলেদের দলে।
এই সময় এক রাতে, ১৯৩২ সালের ১৭ ই সেপ্টেম্বর, পাহাড়তলিতে প্রথমবার গ্রেপ্তার হন কল্পনা। অথচ তার এক সপ্তাহ পরেই প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার আর কল্পনা দত্তের পরিচালনায় পাহাড়তলির ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণের কথা। কল্পনা অভিযানের উত্তেজনায় ফুটছিলেন৷ অগত্যা জেলে বসেই ইউরোপিয়ান ক্লাব হামলার খবর শুনলেন কল্পনা, যে ক্লাবের গেটে লেখা ছিল 'কুকুর ও ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ'। সেই সঙ্গে পেলেন এগারো জন ছেলেকে নিরাপদে বের করে দিয়ে, নিজে পটাসিয়াম সায়ানাইড খেয়ে প্রিয় বন্ধু প্রীতিলতার আত্মহত্যার খবর।
মাস দুয়েক পর জামিনে মুক্ত হন কল্পনা, কারণ পুরুষের ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়ানো ছাড়া আর কিছুই প্রমাণ করা যায়নি। কল্পনা স্মৃতিকথায় বলেছেন, সহবিপ্লবীরা হাসাহাসি করতেন তিনি 'ভবঘুরে' ধারায় (তৎকালীন ১০৯ ধারায়) জেল খেটেছেন বলে। মাষ্টারদা সহ পুরো বিপ্লবী দলই তখন আত্মগোপন করে ছিল। কল্পনাও তাঁদের সঙ্গেই লুকিয়ে ও পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন৷ ১৯৩৩ সালের ১৬ ই ফেব্রুয়ারি। সমুদ্র তীরবর্তী গৈরালা গ্রামে ইংরেজ ফৌজের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে মাস্টারদা ও তারকেশ্বর দস্তিদারের সঙ্গী সেদিন কল্পনাও। পরে মাস্টারদা ও ব্রজেন সেন পুলিশের হাতে ধরা পড়লেও কল্পনা দত্ত, তারকেশ্বর দস্তিদাররা পালিয়ে গেলেন। তিন মাস পর, ১৮ বা ১৯ শে মে, বঙ্গোপসাগরের তীরে গহিরা গ্রামের পূর্ণ তালুকদার, প্রসন্ন তালুকদারদের বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার হলেন কল্পনা দত্ত, তারকেশ্বর দস্তিদাররা৷
১৪ ই আগস্ট বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিপ্লবীদের বিচার শুরু হল। মামলার নাম ছিল ‘চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন সেকেন্ড সাপ্লিমেন্টারি কেস’। অভিযোগে ছিল রাজদ্রোহ, ষড়যন্ত্র, বিস্ফোরক ব্যবহার, অস্ত্র রাখা ও ব্যবহার, হত্যা প্রভৃতির। আসামী ছিলেন সূর্য সেন, তারকেশ্বর দস্তিদার এবং কল্পনা দত্ত। দিনের পর দিন এক কাঠগড়ায় দাঁড়াতেন তাঁরা। এইসময় ফুটুদা তাঁকে নিরীহ ভালবাসার কথা জানিয়েছিলেন, অপেক্ষা করতে বলেছিলেন, সে কথাও কল্পনা বলেছেন। বলেছেন 'আমার মৌনতায় হয়ত সম্মতি ছিল'। মামলার রায়ে সূর্য সেন ও তারকেশ্বর দস্তিদারের ফাঁসির আদেশ হয়। কল্পনা দত্তের যাবজ্জীবন দ্বীপান্তরের রায় হল। স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল জজ বলেন, ‘মেয়ে বলে এবং বয়স কম বলেই কল্পনা দত্তকে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করা হল না।’ হিজলি স্পেশাল জেলের ডিভিশন দুই-এ কল্পনাকে নিয়ে যাওয়া হল।
এ সময় জায়াড, কোল, বার্নাড শ-এর লেখা সোস্যালিজম, কমিউনিজম সম্বন্ধে কিছু কিছু বই তাঁর হাতে এল। কল্পনা বলছেন, জেলে মন ভাল রাখতেই বই পড়তে শুরু করেছিলেন। পড়তে গিয়ে এক নতুন সম্ভাবনা আবিষ্কার করলেন। এতদিন পড়া বিপ্লবী-সাহিত্য ভাবের উন্মাদনা জাগিয়েছিল, মরণকে তুচ্ছ করতে শিখিয়েছিল। সমাজবাদ ও সাম্যবাদ তাঁকে অন্যরকম মুক্তির কথা ভাবাল — যা শুধু ব্যক্তির আত্মোৎসর্গে তার নিজস্ব মুক্তি নয়, যা সমগ্র জাতির মুক্তি, পীড়িত মানুষের মুক্তি। রম্যাঁ রল্যাঁর ‘আই উইল নট রেস্ট’ পড়লেন। রাশিয়ার বিপ্লব তাঁকে উদ্বুদ্ধ করল।
সেখানেই একদিন ফাঁসিতে সূর্য সেন আর তারকেশ্বর দত্তের মৃত্যুর খবর পেলেন, যদিও পরে জেনেছিলেন প্রবল অত্যাচার করে মেরে ফেলে মৃতদেহকে ফাঁসিতে লটকানো হয়েছিল। তারপর লাশগুলো ফেলে দেওয়া হয়েছিল বঙ্গোপসাগরে।
১৯৩৭ সালে নানা প্রদেশে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠিত হলো। বিনা বিচারে রাজবন্দিদের ছেড়ে দেওয়া, রাজনৈতিক বন্দিদের আন্দামান থেকে নিয়ে আসা এবং তাদের মুক্তি দেওয়ার দাবিতে বাইরে তুমুল আন্দোলন শুরু হল। কিছু বন্দিকে আন্দামান থেকে বাংলার জেলে ফিরিয়ে আনা হল। গান্ধিজি কল্পনার সঙ্গে জেলে দেখা করেছিলেন। জানিয়েছিলেন, যদিও গৃহমন্ত্রী নাজিমুদ্দিন চট্টগ্রামের বিপ্লবীদের পছন্দ করেন না, তবু তিনি কল্পনার শাস্তি কমানোর তদ্বির করবেন। চেষ্টা করেছিলেন স্যার অ্যান্ড্রুজও। ১৯৩৭ সালের নভেম্বর মাসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজে গভর্নরের সঙ্গে দেখা করে কল্পনার মুক্তির আর্জি জানিয়েছিলেন। কল্পনার বাবাকে লিখেছিলেন, 'তোমার কন্যার জন্যে যা আমার সাধ্য তা করছি, তার শেষ ফল জানবার সময় এখনও হয়নি; আশা করি, চেষ্টা ব্যর্থ হবে না।' কল্পনার মুক্তির জন্য ছাত্রযুব আন্দোলনও শুরু হল। দ্বীপান্তরের আদেশ বাতিল হয়েছিল আগেই, সাজার মেয়াদও কমল। রাজশাহী আর হিজলির জেলে ছ’বছর কাটিয়ে ১৯৩৯ সালের ১ লা মে মুক্তি পেলেন কল্পনা।
জেলের দিনগুলির কথা যখন কল্পনা বলেন স্মৃতিকথায়, তখন মনে হয় না যে জেলে কোনো কষ্ট ছিল। 'পরিচিত কতজনের সঙ্গে দেখা হল'; 'হঠাৎ দেখি পুটুদি' — এসব বর্ণনাতেই ভরা। বীণা দাশকেও খুঁজে পেলেন অনেক দিন পর। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে ধন্যবাদ জানিয়ে রবীন্দ্রনাথকে যে চিঠি লিখেছিলেন কল্পনা, তার উত্তরে রবীন্দ্রনাথ লেখেন: 'তোমার চিঠিখানি পেয়ে খুশি হলুম। অনেকদিন পরে মুক্তিলাভ করেছ — এখন দিনে দিনে শান্তি ও শক্তিলাভ করো, এই কামনা করি। দেশে অনেক কাজ আছে, যা অচঞ্চল ও সমাহিত চিত্তে সাধন করবার যোগ্য । দুঃখভোগের অভিজ্ঞতা তোমার জীবনে পূর্ণতা দান করুক, এই আমি আশীর্বাদ করি।' ১৯৩৯ সালের ২৪ শে জুনে লেখা এই চিঠি।
কারাবাস থেকে মুক্ত হবার পর কানাঘুষোয় নানা গুজব শুনলেন। কেউ বলে, অনন্ত, গনেশ সহ বেঁচে থাকা চট্টগ্রাম বিপ্লবীরা কমিউনিস্ট হয়ে গেছেন। কেউ বলে, কমিউনিস্টদের অনন্তরা দেখতে পারেন না৷ গান্ধার লেনে কমিউনিস্টদের আখড়াতেও ঘুরে এলেন কল্পনা একবার। পুটুদি ওরফে সুহাসিনী দেবী বললেন, কল্পনার তুতোভাই ঝুমকুও আজকাল কমিউনিস্ট হয়েছে, সে-ই কমিউনিস্টদের ব্যাপারে ভাল বলতে পারবে। ঝুমকু কিছু চাপিয়ে দিতে চাইলেন না। বললেন, কাজ করতে করতে কল্পনা নিজেই বুঝবেন কমিউনিজম ও কমিউনিস্টদের। ভাল-মন্দ নিজেই বিচার করতে পারবেন।
হপ্তাখানেক পর কল্পনা এলেন চাটগাঁয়ে। দেখলেন, পুরোনো রাজনৈতিক সহকর্মীদের মধ্যে যারা এখনও সক্রিয়, তারা কমিউনিস্ট হয়ে গেছে। তারা কখনও রেল-কর্মীদের মধ্যে, কখনও বন্দর-কর্মীদের মধ্যে লেবার ইউনিয়ন তৈরির চেষ্টা করছে। কল্পনাও জুটে গেলেন। সাঁওতাল পাড়ায় গিয়ে কুলিদের পড়াতেন। মালিপাড়া, ধোপাপাড়ায় গিয়ে গোপন সভা করতেন। তাঁর নতুন উপলব্ধি হল: 'কমিউনিজমই আসল দেশপ্রেম'। প্রকৃত দেশপ্রেম মানে শুধুই ইংরেজ তাড়ানো নয়, বরং জনগণের মনে আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলা, তাদের দারিদ্র্য ও শোষণ থেকে মুক্ত করা।
অথচ কল্পনা সমালোচনা করতেও ছাড়ছেন না৷ বড়লোকের বাবু ছেলেরা খেয়ালের বশে কমিউনিস্ট হতে আসত আর গরীব কমরেডদের সামনে টাকা ওড়াত চায়ের দোকানের আড্ডায় — সে কথাও বলছেন। বলছেন, কমিউনিজমের নামে যৌন স্বাধীনতা আর যৌন স্বাধীনতার নামে যৌন ব্যাভিচার অভ্যাস করাও কারও কারও উদ্দেশ্য ছিল। এসব ডকুমেন্টেশন কিন্তু আমরা পেলাম, কারণ কল্পনা দেখছিলেন লিঙ্গ-প্রান্তিকের চোখ দিয়ে। কোনো পুরুষের বয়ানে এসব পাই না৷
স্নাতক হয়ে এলেন কলকাতায় ১৯৪০ সালে। স্নাতোকত্তরে ভর্তি হলেন। একই সঙ্গে চলল পার্টির কিষাণ সভার কাজ, ট্রাম কর্মী ইউনিয়নের কাজ। পার্টি তখন নিষিদ্ধ। জেলফেরতা কল্পনাকে ১৯৪০ সালের নভেম্বর থেকে ১৯৪১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নজরদারিতে রেখেছিল ব্রিটিশ পুলিশ। কিন্তু পুলিস ভাবতে পারেনি, ইতোমধ্যে সন্ত্রাসবাদী হিসেবে জেল খেটে আসা মেয়ে এখন আরেক নিষিদ্ধ দলে যোগদান করেছে। আর পুলিশ ভাবতে পারেনি বলেই, নিষিদ্ধ পার্টির জিনিসপত্র পাচারের জন্য কল্পনাই ছিলেন সবার পছন্দের।
১৯৪১ সালে জাপানি হানার আশঙ্কা শুরু হল। কল্পনা গ্রামে ফিরলেন জাপান-বিরোধী প্রচার করতে। অবশ্য বোম্বেতে পার্টি স্কুলে গিয়ে বুঝলেন, এভাবে হবে না। যতই জাপান বিরোধী প্রচার হোক, বিশ্বযুদ্ধের ফল ব্রিটিশ উপনিবেশ হিসেবে ভারতকেও ভুগতে হবে। বরং প্রবল অর্থনৈতিক সঙ্কটও আসতে চলেছে। হলও তাই। ১৯৪২-৪৩ সালে শুরু হল ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। সারা বাংলায় ৫০ লক্ষ ও চট্টগ্রামে ২ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। কল্পনার নেতৃত্বে মহিলা সমিতি ত্রাণের কাজে ঘুরে বেড়াত চট্টগ্রামের সর্বত্র। কল্পনা পার্টির পত্রিকা ‘পিপলস্ ওয়ার’-এ দুর্ভিক্ষের রিপোর্ট লেখা শুরু করলেন।
১৯৪৩ সালে কমিউনিস্ট পার্টির পূর্ণসময়ের সদস্যপদ লাভ করেন তিনি। বম্বেতে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির তৎকালীন সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক পূরণ চাঁদ জোশির সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। পরে ভালবাসা ও বিয়ে। জোশিকে বলেছিলেন, তিনি ফুটুদার বাগদত্তা। প্রথমে বিয়েতে রাজি হননি৷ কল্পনা দত্ত স্মৃতিকথায় জানিয়েছেন — ‘দুর্ভিক্ষ্যের পরে বোম্বেতে একটা কনফারেন্স হয়েছিল। সালটা সম্ভবত ১৯৪৩। আমি চট্টগ্রামের প্রতিনিধি হিসেবে সেই কনফারেন্সে যোগ দিয়েছিলাম। সেখানেই জোশি আমাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। আমি বললাম আই হ্যাভ প্রমিসড্ তারকেশ্বর দস্তিদার। জোশি বলল, তুমি জানো না ওর ফাঁসি হয়ে গেছে। ও তো আর কোনদিন আসবে না। …তাও আমি দোনামোনা করছিলাম। বিটি (বিটি রণদিভে), ডক (ড: গঙ্গাধর অধিকারী) এরা ইনসিস্ট করাতে বিয়ে করলাম।’ বরপক্ষের হয়ে সই করেন বি টি রণদিভে আর কন্যাপক্ষের হয়ে মুজফফর আহমেদ। বিয়ের সময় শ্বশুরবাড়ির পাঠানো লাল শাড়ি পরেননি কল্পনা। পরে সকলে মিলে সেই শাড়ি কেটে পার্টি ফ্ল্যাগ তৈরি করেছিলেন অনেকগুলো। বিয়ের পর তিনি চট্টগ্রামে ফিরে গিয়ে আবার কাজ শুরু করেন।
১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার আগে, উচ্ছৃঙ্খল সেনাদল হঠাৎ চট্টগ্রামের হাটহাজারি থানার কাছাড়পাড়া গ্রাম আক্রমণ করে, অত্যাচার চালায়। কল্পনা পার্টির জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সাহায্যে কংগ্রেস, মুসলিম লিগ, বিভিন্ন বামপন্থী দল ও বিশিষ্ট নাগরিকদের নিয়ে এক ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি গ্রহণ করেন। সাতদিন হরতাল পালন করা হয়। অবশেষে ব্রিটিশ সরকার ও সেনাদল পিছু হটে।
১৯৪৫ সালের অক্টোবরে ইংরেজিতে প্রকাশিত হয় কল্পনা দত্তের স্মৃতিকথা ‘Chittagong Armoury Raiders: Reminiscences’ (Bombay: People’s Publishing House) এবং পরের বছর জানুয়ারিতে বাংলায় প্রকাশিত হয় ‘চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার আক্রমণকারীদের স্মৃতিকথা’ (কলকাতা: বঙ্গীয় প্রাদেশিক কমিটি, ভারতের কমিউনিষ্ট পার্টি, ১৯৪৬)। এই ১৯৪৬ সালেই বঙ্গীয় প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে চট্টগ্রামের মহিলা আসনে কল্পনা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী হয়ে, কংগ্রেস প্রার্থী দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহনের স্ত্রী নেলী সেনগুপ্তার বিরুদ্ধে। নির্বাচনে কল্পনা জয়লাভ করতে পারেনি। নিম্নবর্গের মানুষদের ভোটাধিকার সে সময় ছিল না। সে বছরেই কল্পনা পাকাপাকিভাবে দিল্লি চলে যান। রুশ ও চিনা ভাষায় দক্ষ ছিলেন কল্পনা, তাই পরে দিল্লিতে 'অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব রাশিয়ান ল্যাঙ্গুয়েজ'-এর সম্পাদক ও শিক্ষিকা হন। সক্রিয় ছিলেন পঞ্চাশের দশকে স্থাপিত 'ইন্দো-সোভিয়েত কালচারাল সোসাইটি' ও 'ন্যাশনাল ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান উইমেন'-এর কার্যকলাপে। পরে সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে থাকলেও যাপনে ও বিশ্বাসে আজীবন থেকে গিয়েছেন কমিউনিস্ট।
১৯৯০ সালে ‘চট্টগ্রাম অভ্যুত্থান’ নামে ভারত সরকারের উদ্যোগে কল্পনার আর একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হওয়ার কথা শুনেছি। কল্পনা কাজ নিয়েছিলেন ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিকাল ইনস্টিটিউটে। ১৯৯১ সালে সবিস্তারে চট্টগ্রামে যুব আন্দোলনের ইতিহাস লিখতে শুরু করেছিলেন কল্পনা। শেষ করতে পারেননি। তিন হাজার পৃষ্ঠার পাণ্ডুলিপি হারিয়ে ফেলেছিলেন। সেই কষ্ট নিয়ে ১৯৯৫ সালের ৮ ই ফেব্রুয়ারি কল্পনা দত্ত মারা যান।
তিন হাজার পাতার দলিল হারিয়ে ফেলেছিলেন কল্পনা। শুনেছি লিঙ্গ-রাজনীতি নিয়ে কখনও কোনো কথা তাঁর মুখে শোনা যায়নি, অন্তত কল্পনা ও পি.সি জোশির নাতনি মেঘা জোশির বক্তব্য তেমনই ছিল। প্রীতিলতারও নারী আন্দোলনে তেমন আগ্রহ ছিল না৷ এঁরা কাজে, আন্দোলনে, যাপনে হতে চেয়েছিলেন ‘পুরুষের সমকক্ষ।’ নারীবাদী আন্দোলন রাজনীতিতে নারীর ভূমিকা সম্পর্কে তার চেয়ে ভিন্ন মত পোষণ করে। কিন্তু কল্পনার অজ্ঞাতেই লিঙ্গ-রাজনীতির চর্চায় অমূল্য হতে পারত সেই হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিকথা। যেটুকু ডকুমেন্টেশন পাওয়া গেছে, তাও অমূল্য। কল্পনা দত্তের লেখা যে বইটি পাওয়া যায়, 'Chittagong Armoury Raiders: Reminisces' (1945), সেটি সম্ভবত ছাপা হয়েছিল কল্পনার নির্বাচনে দাঁড়ানোর প্রাক্কালে। প্রথমে তিনি বাংলাতেই লিখেছিলেন, নিখিল চক্রবর্তী ও অরুণ ঘোষ তা ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। মুখবন্ধে পি সি জোশি লিখছেন, কল্পনা আজও চট্টগ্রামের ঘরে ঘরে মেয়ের মতো সমাদৃত। মেয়ে তার অভিভাবকদের রায় মাথা পেতে নিতে চলেছে নির্বাচনে।
কল্পনা নির্বাচনে হেরেছিলেন। কিন্তু একশত কুড়ি/পঁচিশ পাতার বইটি অমূল্য ডকুমেন্টেশন হিসেবে রয়ে গেছে। এ ডকুমেন্টেশন শুধু এ কারণে জরুরি নয় যে তা মাস্টারদা, অনন্ত সিং, গণেশ ঘোষ বা প্রীতিলতার সঙ্গে আন্তরিক ভাবে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেয়। এ ডকুমেন্টেশন গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে আমরা কল্পনার দৃষ্টিভঙ্গি পাই। একজন নারীর দৃষ্টিভঙ্গি, যিনি আশ্রয়দাত্রী 'মাসিমা' সাবিত্রীদেবীর কথা পুঙখানুপুঙখ বলতে ভোলেন না। তিনি লেখেন সেইসব নারীদের কথা, যাঁরা আশ্রয় দান করে চার বছরের কারাদণ্ড পেয়েছিলেন, যাঁরা জেলে নির্যাতিত হয়েও মুখ খোলেননি। তিনি সুহাসিনী দেবী বা পুটুদিকে নিয়ে একটা গোটা চ্যাপ্টার লেখেন। সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের সন্দর্ভে যারা পার্শ্বচরিত্র, তাদের সামনে নিয়ে আসেন। বিনা দাশ, কমলা দাশগুপ্তরাও ঘুরে ফিরে তাঁর কথায় এসে পড়ে। কই, পুরুষদের স্মৃতিকথায় তো আসেন না তাঁরা?
আর প্রীতিলতা — তিনি তো প্রাণের সহচরী। কল্পনার ভারি আফসোস, প্রীতির পরিবার কত আলাদা তাঁর পরিবারের চেয়ে! ওরা খাদি পরে, কল্পনার বাড়িতে তখনও বিদেশি কাপড়। প্রীতির সঙ্গে রাগ-অনুরাগ-বাদানুবাদ, তাঁর মৃত্যুশোক...এসব বড় ব্যক্তিগত, তবু জরুরি। দুর্ভিক্ষর ত্রাণে অংশ নিয়ে প্রীতির দরিদ্র বাবা-মার উক্তি- 'মেয়েটা বেঁচে থাকলে সে তো এই কাজই করত', এসব মনে হয় আমরা জানতে পারতাম না কল্পনার মরমী চোখ আর লেখনী না থাকলে। একদিকে, কল্পনা নিখুঁত বর্ণনা করে গেছেন নিজের গেরিলা প্রশিক্ষণ, অজ্ঞাতবাস বা বন্দিত্বকালীন অভিজ্ঞতা। অন্যদিকে, লিখেছেন টেগরার প্রতি তাঁর স্নেহ (টেগরা জালালাবাদ যুদ্ধের প্রথম শহিদ, বয়স চোদ্দ), 'অধ্যাপক' মানে মণি দত্তর সঙ্গে জলের তলায় লুকিয়ে থাকার উত্তেজনা, ফুটুদার অনুরাগ, প্রীতির প্রতি ভালবাসার কথা। ব্যক্তিগত রাজনৈতিক হয়ে উঠেছে। একদিকে, কল্পনা বিপ্লবী হিসেবে শুধু 'সহকারী' ভূমিকায় আটকে থাকেননি। অন্যদিকে, নিজের ইতিহাস আক্ষরিক অর্থে নিজে লিখে গেছেন, যা পরম পাওয়া৷ প্রতিটি বর্ণনায় আছে একজন নারী সশস্ত্র সংগ্রামীর নিজস্ব সাক্ষর।
দ্রোহ আর ভালবাসা আসলে একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। দেশ ভাগ হওয়ার পরেও চট্টগ্রামের শ্রমজীবী মানুষদের জন্য নিরন্তর কাজ করে গেছেন কল্পনা। তাহলে কি জাতীয়তাবাদ বা ন্যাশনালিজমের মাপকাঠিতে মাপা যায় তাঁকে? তাঁর লেখায় 'বর্ণবাদ' কথাটা উচ্চারিত না হলেও আসে কুলি, তেলি, ধোপাদের কথা, তাদের ছেলেমেয়েদের কথা। কল্পনা অন্ত্যজকে ভালবেসেছিলেন। বুঝেছিলেন, রাজনৈতিক স্বাধীনতা পাওয়ার পরও গরীব মানুষের অন্ন কেড়ে খাওয়া হবে৷ তাই স্বাধীনতার পরেও তাঁর লড়াই থামেনি।