জেন অস্টেনের সময়ে মেয়েদের উপন্যাস পাঠ : প্রসঙ্গ নর্দাঙ্গার অ্যাবি
- 07 March, 2026
- লেখক: দেবাঞ্জলি কুন্ডু
জেন অস্টেনের উপন্যাস ‘নর্দাঙ্গার অ্যাবি’কে প্রায়শই শ্রেষ্ঠ অ্যান্টি-গথিক উপন্যাস হিসাবে গণ্য করা হয়। আঠারো শতকের শেষের দিকে যখন সমসাময়িক লেখকরা গথিক উন্মাদনায় রক্তাক্ত ওড়না, জরাজীর্ণ দুর্গ এবং ভৌতিক আবহে বিচরণ করছিলেন, অস্টেন তখন তাঁর প্রখর বুদ্ধি ও রসবোধকে কাজে লাগিয়ে বাথ-এর মতো ঐতিহাসিক মনোরম পটভূমিকে বেছে নিয়েছিলেন এই উপন্যাসটির জন্য। এটি জনপ্রিয় চাঞ্চল্যকর গথিক কল্পকাহিনীর প্রতি একাধারে তাঁর ভালবাসা ও তীক্ষ্ণ সমালোচনা – উভয়ই প্রকাশ করে।
অস্টেনের এই উপন্যাসের সাথে সরাসরি যে গথিক রোমান্সের যোগ রয়েছে সেটি হলো গথিক ধারার ক্লাসিক উদাহরণ অ্যান র্যাডক্লিফের ১৭৯৪-তে প্রকাশিত উপন্যাস দ্য মিস্ট্রিস অফ উদোলফো (The Mysteries of Udolpho)। র্যাডক্লিফীয় উপন্যাসটির প্রতি অস্টেনের এই প্যারোডি বা বিদ্রূপ যাই বলি না কেন, তার উৎস বুঝতে হলে সেই সময়ের ‘গথিক’ ধারা সম্পর্কে বোঝা প্রয়োজন। এই ধারার প্রবর্তন হয় হোরেস ওয়ালপোলের ‘দ্য ক্যাসেল অফ ওট্র্যানটো’ (১৭৬৪) বইটির মাধ্যমে। ক্লাসিক গথিক উপন্যাসে দর্শন মেলে গুণবতী, সাধারণত অনাথ নির্যাতিতা তরুণী নায়িকার, অত্যাচারী খলনায়ক, থাকে ভয়ঙ্কর সুন্দর পরিবেশ, গোপন পথ বিশিষ্ট দূরান্তবর্তী ধ্বংসপ্রায় দুর্গ, অশুভ ভীতিপ্রদ শব্দ, টিমটিমে মোমবাতি এবং প্রাচীন রহস্য ও অলৌকিকতা মোড়া সাসপেন্স এবং বিষণ্ণতার প্রখর অনুভূতি। অর্থাৎ, গল্পের পরিবেশ নিজেই একটি খলনায়কের ভূমিকা পালন করে; রহস্য ও রোমাঞ্চ তৈরি হয় বাইরের জগতের অবাস্তবতা এবং অজানা ভীতি থেকে। অস্টেনের সমকালে প্রকাশিত র্যাডক্লিফের কলমে গথিক রোমান্স ‘দ্য মিস্ট্রিস অফ উদোলফো’ অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এটি একটি প্রত্যন্ত ইতালীয় দুর্গে নায়িকা এমিলি সেইন্ট অবার্টের অতিপ্রাকৃত ভয়াবহ অভিজ্ঞতা ও খলনায়ক সিনিওর মন্টোনির ষড়যন্ত্রের গল্প। এমিলি সেই উদোলফো দুর্গে বন্দীদশার থেকে পালিয়ে প্রেমিক ভ্যালানকোর্টের সাথে পুনর্মিলিত হয়, সমস্ত প্রতিকুলতা জয় করে সম্পত্তি পুনরুদ্ধার করে। এটিকে গথিক উপন্যাসের ধারায় একটি যুগান্তকারী কাজ বলা যায়; এতে অতিপ্রাকৃত ঘটনার আবহে মানুষের ভয় ও কল্পনার এক অনবদ্য মনস্তাত্ত্বিক চিত্র ফুটে উঠেছে।
অন্যদিকে, ‘নর্দাঙ্গার অ্যাবি’ এক তরুণীর বেড়ে ওঠার গল্প (coming-of-age story)। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল গথিক লেখকদের গতানুগতিক ছাঁচগুলোকে ভেঙ্গে ফেলা। অস্টেন পদ্ধতিগতভাবে কীভাবে এই ধারার বৈশিষ্ট্যগুলির দিকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন তাঁর একটি বিশ্লেষণ করা যাক।
‘নায়িকা-নয়’ এমন এক নায়িকা – আগেই বলেছি, ক্লাসিক গথিক উপন্যাসে নায়িকা সাধারণত অত্যন্ত মার্জিত, অপার্থিব সৌন্দর্য এবং বিষাদময় অতীতের অধিকারী হন। অস্টেন উপন্যাসের শুরুতেই এই ধারণায় আঘাত হেনেছেন। তাঁর নায়িকা ক্যাথরিন মোরল্যান্ড হয়ে ওঠে গথিক বৈপরীত্যের প্রতিরূপ। এই চরিত্রের অবতারণা করে অস্টেন এক অনন্য ব্যঙ্গাত্মক উপন্যাস রচনা করেছেন, যা কল্পকাহিনী ও বাস্তবতার মধ্যেকার অস্পষ্ট বিপজ্জনক সীমারেখাকে ফুটিয়ে তোলে। শুরুতেই অস্টেন বলছেন যে শৈশবে ক্যাথরিন মোরল্যান্ডকে যে দেখেছে সে কখনো ভাবেনি যে তার জন্ম, তার অদৃষ্ট নায়িকা হবার উপযুক্ত। ক্যাথরিন একেবারে সাধারণ এক মেয়ে। সে দশ ভাইবোনের একজন, ঘাসের ঢালু জমিতে গড়াগড়ি খেতে ভালবাসে এবং তাঁর মধ্যে সৌন্দর্যের অসাধারণত্ব, সাংগীতিক বা শৈল্পিক প্রতিভা নেই। গল্প এগোলে দেখা যায়, তার “খলনায়করা” কোনো অপহরণকারী নয়, বরং সামাজিক উচ্চাকাঙ্ক্ষী থর্প ভাই-বোন জন ও এলেনর; আর তার “বিপদ” কোনো অন্ধকার রহস্যময় কুঠুরি নয়, বরং নাচের আসরে করা একটি সামাজিক ভুল। অস্টেন এই চরিত্রের মাধ্যমে দেখাতে চেয়েছেন, কীভাবে অতিরিক্ত রোমাঞ্চকর উপন্যাস পড়ার ফলে সাধারণ মস্তিস্ক বিভ্রান্ত হতে পারে।
পটভূমি – গথিক উপন্যাসের প্রাণ এর পরিবেশ। জরাজীর্ণ মঠ, দুর্গ, গোপন সুরঙ্গ ও স্যাঁতস্যাঁতে অন্ধকার কুঠুরির রহস্যকে অস্টেন বিদ্রূপ (The Parody of Suspense) করেছেন। উপন্যাসের দ্বিতীয়ার্ধে ক্যাথরিন যখন নর্দ্যাঙ্গার অ্যাবিতে আমন্ত্রিত হয়, তখন এই তুলনামূলক ব্যঙ্গ চূড়ান্ত রূপ গ্রহণ করে। র্যাডক্লিফের উপন্যাসের মতো স্থাপত্যশৈলীগত রহস্য বা আতঙ্ক উদ্রেককারী পরিবেশ আশা করে ক্যাথরিন সেখানে গিয়ে নিরাশ হয়। তার প্রত্যাশা ছিল সেখানে “দীর্ঘ, স্যাঁতস্যাঁতে পথ” এবং “সরু অন্ধকার কক্ষ” থাকবে। বদলে সে পায় আধুনিক, সুসংরক্ষিত ও আরামদায়ক একটি বাড়ি। সেখানে “প্রাচীন” সিন্দুকে রক্তমাখা পাণ্ডুলিপির বদলে থাকে লন্ড্রির কাপড়ের রসিদ, আর “অন্ধকার করিডর”গুলো দিনের উজ্জ্বল আলো আর টাটকা বাতাসপূর্ণ। অস্টেন ক্যাথরিনের অতিকল্পনার মাধ্যমে গথিক বৈশিষ্ট্যগুলি একে একে ভেঙেছেন এবং এই বৈপরীত্য ব্যবহার করে পাঠকের (এবং ক্যাথরিনের) রোমাঞ্চকর অন্ধকারের আকাঙ্ক্ষাকে উপহাস করেছেন।
খলনায়কের বিনির্মাণ – উপন্যাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গথিক পরিপন্থী উপাদান হলো জেনারেল টিলনি চরিত্রটি। গথিক খলনায়কসুলভ বৈশিষ্ট্যগুলি অস্টেনের বাস্তবতাবোধের সাথে সম্মুখসমরে উপনীত হয়েছে। গথিক ভিলেন সাধারণত খুনি, রহস্যময় এবং সম্ভবত অতিপ্রাকৃতিক বা ঐন্দ্রজালিক ক্ষমতাসম্পন্ন হন। উপন্যাসে জেনারেল টিলনি চারিত্রিকভাবে খিটখিটে, বস্তুবাদী এবং সময়ের ব্যাপারে অতি সচেতন – তিনি গথিক উপন্যাসের খলনায়কের মতো অপরাধী, অপহরণকারী বা খুনী নন। ক্যাথরিন সন্দেহ করেছিল যে জেনারেল তাঁর স্ত্রীকে হত্যা করেছেন বা বন্দী করে রেখেছেন। উপন্যাসের মোড় ঘোরে যখন জেনারেলের মেজো ছেলে হেনরি টিলনি ক্যাথরিনকে গোয়েন্দাগিরি করতে গিয়ে হাতেনাতে ধরে ফেলেন। হেনরি তাকে কঠোরভাবে তিরস্কার করে এবং মনে করিয়ে দেয় যে তারা ইংল্যান্ডে আইন, প্রতিবেশী, রাস্তাঘাট এবং সংবাদপত্রের এক ‘সভ্য’ যুগে বাস করছে। এই তিরস্কারকে বলা যায় উপন্যাসটির আবেগীয় কেন্দ্রবিন্দু। এইখানেই অস্টেনের সমালোচনা সবচেয়ে জোরালো রূপ ধারণ করেছে। পরে আমরা দেখি, জেনারেল টিলনি স্ত্রীকে হত্যা করার জন্য দানব নন, বরং তিনি দানব কারণ তিনি ক্যাথরিনকে ধনী না হবার অপরাধে বাড়ি থেকে বের করে দেন।
প্রকৃত আতঙ্ক – তাঁর অন্যান্য উপন্যাসের মতোই সামাজিক বাস্তবতার দিকটি উন্মোচিত করতে অ্যান্টি-গথিক লেখক হিসেবেও অস্টেন পিছুপা হন নি। এখানে তাঁর মূল বক্তব্য হলো বাস্তব জীবন ভৌতিক ভয়াবহতা ছাড়াই যথেষ্ট ভীতিপ্রদ। তাই উপন্যাসের চূড়ান্ত মুহূর্ত কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়; বরং সেটি হল যখন জেনারেল টিলনি ক্যাথরিনকে তাঁর বাড়ি থেকে বিতাড়িত করেন, কারণ তিনি জানতে পারেন যে ক্যাথরিন ততটাও সম্পত্তির মালিক নয় যতটা তিনি ভেবেছিলেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ক্যাথরিন কোনোভাবেই তাঁর ছেলে হেনরির বাগদত্তা হতে পারেনা। অস্টেনের পৃথিবীতে কোনো কাল্পনিক ভূতের চেয়ে এই ‘সামাজিক মৃত্যু’ – অর্থাৎ একজন তরুণীর একা, নিঃস্ব ও ক্লান্ত অবস্থায় পথে পড়ে থাকা – নিঃসন্দেহে অনেক বেশি ভয়াবহ। প্রকৃতপক্ষে, এই উপন্যাস আঠারো শতকের গথিক রোম্যান্স এবং উনিশ শতকের সামাজিক পারিবারিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে সেতুবন্ধনের কাজ করে। ক্যাথরিনের কাল্পনিক আতঙ্ক এবং তার বাস্তব সামাজিক লড়াইয়ের তুলনা করে অস্টেন বুঝিয়েছেন যে, জীবনের প্রকৃত ট্র্যাজেডির জন্য কোনো কালকুঠুরির প্রয়োজন নেই, তা বৈঠকখানাতেই ঘটতে পারে। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে গথিক চশমা আমাদের বাস্তব জগতের বিপদগুলোকে ঝাপসা করে দেয়। অস্টেনের জগতে সত্যিকারের ‘গথিক’ আতঙ্ক হল সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং তৎকালীন বিয়ের বাজারের স্বার্থপর নিষ্ঠুরতা।
অস্টেনের উপন্যাসে র্যাডক্লিফের অনবদ্য প্যারোডি নিয়ে কয়েকটি কথা সবিস্তারে না বললেই নয়। উদোলফো উপন্যাসের এমিলি পুরনো প্রাসাদে একটি রহস্যময় সিন্দুক খুঁজে পায়। সেটি খোলার পর সেখানে একটি পুরনো পাণ্ডুলিপি বা ভয়ঙ্কর কোন গোপন রহস্য আবিষ্কারের আশা করে। এই দৃশ্যটি পাঠককে প্রচণ্ড সাসপেন্সের মধ্যে রাখে। ক্যাথরিনও ভেবেছিল তার ঘরের বিশাল প্রাচীন ‘ভয়ঙ্কর’ সিন্দুকটিতে নিশ্চয়ই কোনো করুণ ইতিহাস বা লুকনো প্রমাণ আছে। কিন্তু অনেক কসরত করে সেটি খোলার পর সে পায় একটি সাদা সুতির চাদর (bed-gown) ও লন্ড্রির জামাকাপড়ের তালিকা।
এমিলি প্রাসাদের এক নির্জন জায়গায় একটি কালো পর্দা (The Black Veil) ঝুলতে দেখে। সে ভাবে তার পেছনে কোন পচা গলা মৃতদেহ বা ভয়াবহ কঙ্কাল আছে। পর্দাটি তোলার পর সে ভয়ে মূর্ছা যায়। আসলে যেটিকে সে মৃতদেহ ভেবেছিল সেটি ছিল একটি মোমের তৈরি মূর্তি। এই দৃশ্যের প্যারোডিতে ক্যাথরিন একটি জাপানি কাজের কালো ক্যাবিনেট দেখে রোমাঞ্চিত হয়। সে এটি খোলার সময় ঠিক এমিলির মতো উত্তেজনা অনুভব করে। কিন্তু সেখানে সে পায় টাকা রাখার সাধারণ ড্রয়ার। এইভাবেই র্যাডক্লিফের অতিনাটকীয়তা অস্টিনের লেখায় হাস্যরসে পরিণত হয়েছে।
গথিক কাহিনীর দ্বারা প্রভাবিত ক্যাথরিন মনে করে জেনারেল টিলনি বুঝি তার স্ত্রীকে অন্ধকার কুঠুরিতে বছরের পর বছর বন্দী করে রেখেছেন। শেষ পর্যন্ত সে জানতে পারে যে মিসেস টিলনি একটি স্বাভাবিক অসুখে মারা গিয়েছেন ও জেনারেল টিলনি তাকে যথেষ্ট সম্মান করতেন।
এই সওয়াল করাই যায় যে প্যারোডি বা ব্যঙ্গ করা সত্ত্বেও অস্টেন কিন্তু গথিক ঘরানাটিকে ঘৃণা করতেন না। তাঁর বিখ্যাত ‘Only a Novel’ অনুচ্ছেদে অস্টেন সেই সমস্ত পাঠকদের বিরুদ্ধে উপন্যাসের পক্ষ নিয়ে কথা বলেছেন যারা এই গথিক ধারাকে নিচু নজরে দেখতেন। তিনি যুক্তি দিয়েছেন যে গথিক কাহিনীগুলি অদ্ভুত অবাস্তব হতে পারে, কিন্তু উপন্যাস নিজেই “প্রতিভা, বুদ্ধি এবং রুচির” এক নিদর্শন। তিনি মানুষকে গথিক রোমান্স পড়া বন্ধ করতে বলছেন না; বরং সমালোচনামূলক ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি রাখতে বলছেন। ‘নর্দাঙ্গার অ্যাবি’ উপন্যাস হিসাবে শিল্পের রূপ পেয়েছে অস্টেনের লেখনীতে, আবার তিনি পাঠকদের মাটিতে পা রেখে চলার পরামর্শও দিয়েছেন। তিনি এখানে গথিক উপন্যাস দ্বারা প্রচারিত চরম মানসিক সংবেদনশীলতাকে ব্যঙ্গ করেছেন মাত্র, ব্যাপক অর্থে যুক্তিবাদী ব্যবহারিক জগতের তুলনায় এই ধারার বিচ্ছিন্নতাকেই অস্টেন তুলে ধরেছেন।