আখ্যানপাঠ - বঙ্কিমচন্দ্রের 'রজনী'

‘ইন্দিরা’, ‘রাধারাণী’ এবং ‘চন্দ্রশেখর’-এর পর বঙ্কিম লিখলেন রজনী। প্রথম প্রকাশ বঙ্গদর্শন পত্রিকায় ১৮৭৪-৭৫ এ। পুস্তকাকারে প্রথম সংস্করণ বেরোল ১৮৮৪ তে, পরিবর্তিত তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হল ১৮৮৭ তে।

বঙ্গদর্শনের পাতায় এটি যে চেহারা ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে প্রকাশিত হয়েছিল গ্রন্থাকারে প্রকাশের সময় তাতে এল আমূল বদল। সেই রূপান্তরের কথায় যাবার আগে বঙ্কিমের পূর্ববর্তী তিন উপন্যাসের ধারায় একে দেখে নেওয়া দরকার।

ইন্দিরা উপন্যাসে সর্বগ ও সর্বজ্ঞ কথকের বদলে চরিত্র পাত্রের মুখ দিয়ে আখ্যান বলার রীতিটি নিয়েছিলেন বঙ্কিম। রজনী উপন্যাসে সেখান থেকে  আরো একটু এগোলেন। এখানেও চরিত্রের মুখেই বলা হল গোটা আখ্যানটি, তবে কোনও একটি চরিত্র নয়, উপন্যাসের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র পাত্ররা প্রায় সকলেই মিলিয়ে মিশিয়ে জানাল আখ্যানটি। এই রীতি কিছু অতিরিক্ত আকর্ষণ তৈরি করলেও কিছু জটিলতা ও সীমাবদ্ধতা থেকে গেল। অনেক সময়েই এক গল্পকথক জানিয়েছে এই অংশটি সে নয়, অন্য কেউ বলবে। সমস্যা হল আখ্যানের ন্যায় সূত্র অনুযায়ী কোনও চরিত্রের জানার কথা নয় আখ্যানটি আর কে কীভাবে বলছে। এছাড়াও আখ্যানের চরিত্ররা অনেক সময়ে একই ভাষা ও ভঙ্গীতে কাহিনী বলেছে। চরিত্রদের শিক্ষা ও রুচি প্রকৃতির পার্থক্য অনুযায়ী এখানে কিছু পার্থক্য থাকা দরকার ছিল। অমরনাথের মতো উচ্চশিক্ষিত ও দেশ দুনিয়া পর্যটনকারীর সঙ্গে শিক্ষা ও স্থানান্তর গমনের সুযোগ বঞ্চিত রজনীর বয়ানের ভাষাভঙ্গীর পার্থক্য থাকলে তা বাস্তবোচিত হত।

এই উপন্যাসের দুর্বল দিকের মধ্যে আর আছে শচীন্দ্র চরিত্রের উপস্থাপণ। সে অন্য তিন প্রধান চরিত্র – লবঙ্গলতা, রজনী এবং অমরনাথের সক্রিয়তা ও বর্ণময়তার বিপরীতে অনেকটাই নিষ্প্রভ। সম্পত্তি হাতছাড়া হচ্ছে দেখেও বিবাহকে সে সম্পত্তি রক্ষার উপায় হিসেবে ব্যবহার করতে অসম্মতি জানিয়েছে, এটাই তার চরিত্রের উজ্জ্বলতম মুহূর্ত। বাকী সময়কালে সে অনেকটাই নিস্তরঙ্গ।

উপন্যাসের দুই নারী চরিত্রের মধ্যে রজনী অনেকটাই একমাত্রিক। রাধারাণী উপন্যাসে যে রূপকথার প্যাটার্নটি ছিল, রজনী উপন্যাসের মূল কাহিনীতেও তা রয়েছে। রাধারাণীর মতো রজনীও দরিদ্র, রাধারাণীর মতো তারও সামান্য উপার্জন হয় ফুলের মালা গেঁথে বিক্রি করে। রজনীও রাধারাণীর মতো তীব্র দরিদ্র জীবন কাটানোর কয়েক বছর পরে আইনী ঘটনাপর্ব পেরিয়ে বিপুল সম্পত্তির অধিকারিণী হয়েছে। রাধারাণীর মতো রজনীও শেষপর্যন্ত মনের গোপনে লুকিয়ে রাখা ভালোবাসার মানুষটিকে বর হিসেবে পেয়েছে এবং বিবাহের মধ্যে দিয়ে সুখি দাম্পত্য জীবনে অবতীর্ণ হয়েছে।

‘রজনী’ উপন্যাসকে ‘রাধারাণী’র সরল ছকটি থেকে আলাদা করেছে অমরনাথ লবঙ্গলতা আখ্যানটি। এই দুই চরিত্র শচীন্দ্র বা রজনীর চেয়ে বর্ণময় এবং বহুস্তরিক। নায়ক নায়িকাকে ছেড়ে সহ চরিত্র পাত্ররা বেশি উজ্জ্বল ও বর্ণময়, এরকমটা খুব বেশি দেখা যায় না, কিন্তু রজনী উপন্যাসের ক্ষেত্রে এটাই ঘটেছে। উপন্যাসের প্রাথমিক পরিকল্পনা ঠিক এরকমই ছিল কীনা আমরা জানি না, কিন্তু শিল্পী বঙ্কিম বঙ্গদর্শনে উপন্যাস রচনা শেষ করার পর যে এদিকেই উপন্যাসের শৈল্পিক গতি নির্ধারিত হয়ে গেছে, তা বুঝতে পেরেছিলেন। আর এটা বুঝেই পত্রিকাপাঠকে সচেতনভাবে অনেক সংযোজন, বর্জন, পরিমার্জনের মধ্যে দিয়ে অনেকখানি নতুন চেহারা চরিত্র দিলেন।

পত্রিকা সংস্করণ থেকে গ্রন্থ সংস্করণের রূপান্তরে ঘটনাধারার বিন্যাসে অল্পস্বল্প কিছু বদল এসেছে। কিছুটা বদলেছে লবঙ্গলতার সংলাপ ও দৃষ্টিকোণও। কিন্তু সবচাইতে মৌলিক ও গভীর বদল ঘটেছে অমরনাথ চরিত্র রূপায়ণে। বঙ্গদর্শন পত্রিকা সংস্করণে অমরনাথ শচীন্দ্রের সঙ্গে সাক্ষাতের পর রজনীকে বিয়ে করতে চেয়েছে। শচীন্দ্র অমরনাথের প্রকৃত পরিচয় গোপনে অনুসন্ধানের জন্য লোক পাঠিয়েছে। অমরনাথের এই অনুসন্ধান যে ভালো লাগে নি, পত্রিকা সংস্করণে সেটা সে চিঠি লিখে শচীন্দ্রকে জানিয়েছে। গ্রন্থ সংস্করণে এই অংশটি বঙ্কিম বর্জন করেছেন। রজনীর বিষয় সম্পত্তি লাভের দিকটিও উভয় সংস্করণে আলাদা। পত্রিকা সংস্করণে শচীন্দ্র অনেক যাচাইয়ের পর রজনীকে সম্পত্তি দিয়েছে। তার আগে রজনীর সঙ্গে অম্লমধুর বাক্য বিনিময়ও হয়েছে। গ্রন্থ সংস্করণে এসে রজনীর সম্পত্তিলাভ অনেক মসৃণভাবে হয়েছে, শচীন্দ্রর তরফেও কোনও বীতরাগ প্রকাশ পায় নি। বঙ্গদর্শন সংস্করণে অমরনাথের আগ্রহেই রজনী বিষয় উদ্ধারে জোরকদমে নেমেছে। অমরনাথের প্রতি কৃতজ্ঞতা বশত তাকে বিবাহে সম্মত হয়েছে এবং বিয়ের আগে আমরনাথের স্ত্রী পরিচয়ে অমরনাথের বাড়িতে থাকতে অসম্মত হয় নি। অমরনাথ শুধু স্ত্রী হিসেবেই রজনীকে পেতে এখানে আগ্রহী নয়, বিষয় সম্পত্তি বিষয়েও আগ্রহী। পত্রিকা থেকে গ্রন্থ সংস্করণে বদল এক্ষেত্রে অনেকখানি।

বঙ্গদর্শন সংস্করণে রজনী অমরনাথকে বলেছিল, “যে বিষয় বিভব আপনার উদ্দেশ্য তাহা আমি আপনাকে লিখিয়া দিয়াছি। এক্ষণে আমাতে আপনার আর প্রয়োজন নেই। আমাকে ত্যাগ করুন। … আপনার অনুরোধে অত্যন্ত গর্হিত কার্য করিয়াছি। যাহারা বাল্যাবধি আমাকে প্রতিপালন করিয়াছে, তাহাদিগের সর্বস্ব কাড়িয়া লইয়াছি। যাহারা রাজা ছিল, আমার চক্রে তাহারা পথের কাঙাল হইয়াছে। আপনার ঋণ পরিশোধের জন্য এ সকলও আমার কর্তব্য হইয়াছিল – আপনার কথায় তাহা করিয়াছি।”

গ্রন্থ সংস্করণে রজনীর বিষয় সম্পত্তি ভোগের কোনও রকম আকাঙ্ক্ষা অমরনাথের নেই। এখানে শচীন্দ্র বিষয় সম্পত্তি ছেড়ে দেবার পর রজনী যেমন তার দখল নিতে উদ্যোগী হয় নি, তেমনি অমরনাথও এ বিহশয়ে তাকে প্রণোদিত করে নি। কলকাতায় ফিরে রজনী রাজচন্দ্রের বাড়িতেই থেকেছে, পত্রিকা সংস্করণের মতো অমরনাথের বাড়িতে তার স্ত্রী হিসেবে আশ্রয় নেয় নি। এখানে অমরনাথের রজনীকে বিবাহ প্রস্তাব দেবারও প্রয়োজন হয় নি। অমরনাথের প্রতি অসীম কৃতজ্ঞতার প্রতিদানস্বরূপ রজনীই এই বিবাহ করতে চেয়েছে। গ্রন্থ সংস্করণে রজনী অমরনাথের থেকে যে সহৃদয় আচরণ পেয়েছে, তাতে তাকে সে দেবতাজ্ঞানে শ্রদ্ধা করেছে। রজনী লবঙ্গকে বিষয় গ্রহণের অনু্রোধ করায় অমরনাথ আন্তরিকভাবে প্রীত হয়েছে এবং রজনীর ঔদার্যে মুগ্ধ হয়েছে। এই বদল অমরনাথের চরিত্র কল্পনার গোটা ভিত্তিভূমিটাকেই পত্রিকা সংস্করণ থেকে গ্রন্থ সংস্করণে বদলে দিয়েছে।

অমরনাথ লবঙ্গলতা সম্পর্ক বিশেষ করে গ্রন্থ সংস্করণে এক বিশেষ রসায়নকে প্রতিফলিত করেছে। অমরনাথ যৌবনে লবঙ্গকে ভালোবেসেছিল। চোরের মতো তার ঘরে প্রবেশ করতে গিয়ে ধরা পড়ে শাস্তিও ভোগ করেছিল। অমরনাথের ভালোবাসা মরে নি, যদিও বাসনা ও আকাঙ্ক্ষার সেই উত্তাপ উচ্ছ্বলতা বয়েসকালে অন্তর্হিত হয়েছে। পত্রিকা সংস্করণে অমরনাথের প্রতি লবঙ্গ অনেক বেশি বিদ্বিষ্ট ও রূঢ়। সেখানে সে অমরনাথকে অদ্বিতীয় পাষণ্ড বলেছিল। গ্রন্থ সংস্করণে এসে এইসব কথা সম্পূর্ণ অন্তর্হিত হয়েছে। পত্রিকাপাঠের “তুমি অদ্বিতীয় পাষণ্ড” গ্রন্থ সংস্করণে বদলে হয়েছে “তুমি অদ্বিতীয়। আমাকে ক্ষমা করিও; আমি তোমার গুণ জানিতাম না।” চিরদুঃখী অমরনাথ এখানে স্ব মহিমায় ভাস্বর। এ জন্মে সে লবঙ্গর কেউ নয়, কিন্তু জন্মান্তর বলে যদি কিছু থাকে সেখানে কোন রসায়ন তাদের জন্য যে অপেক্ষা করে আছে তা কে জানে, এই ইঙ্গিৎ রেখে আসলে লবঙ্গ তো এটাই বোঝাল বাস্তবের সমাজ সংসারে সে সংস্কার নীতি নৈতিকতা থেকে সরছে না। কিন্তু অবচেতন মনের এক কোণে যে অমরনাথ নেই, এমনটা হয়ত নয়। পত্রিকা সংস্করণের লোভী লোলুপ অমরনাথ গ্রন্থ সংস্করণে ত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল। লবঙ্গলতায় চির অনুরক্ত এই অমরনাথের মুখে যেন নন্দিনীকে বলা রক্তকরবীর বিশু পাগলের সেই সংলাপটাই যেন বাঙ্ময় হয়ে উঠতে চায়, “কিছু-না-দেওয়া আমি ললাটে পরে চলে যাব।”

‘রজনী’ উপন্যাসের গ্রন্থভূমিকায় বঙ্কিমচন্দ্র জানিয়েছিলেন লিটনের ‘দ্য লাস্ট ডেজ অব পম্পেই’ নামের এক ইংরাজি উপন্যাস অবলম্বনে এই বাংলা উপন্যাসটি লেখার কথা। তবে তুলনামূলক আলোচনা করলে বোঝা যায় এই মিল সামান্য ও কেবলই বহিরঙ্গের। লিটনের উপন্যাসের কেন্দ্রেও আছে একটি অন্ধ ফুলবিক্রেতা আর রজনীতেও তাই। এর বাইরে কাহিনী, চরিত্রায়ণ বা অন্য কিছুতেই এই দুই উপন্যাসের কোনও মিল নেই। তাই রজনীকে অনুধাবনের জন্য লিটনের উপন্যাসের বিশ্লেষণ বা এই দুই এর তুলনামূলক আলোচনার গুরুত্ব তেমন নেই।

রজনী উপন্যাসটি যখন বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ থেকে প্রকাশিত হয় তখন পরিষৎ সংস্করণের সম্পাদক ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় রজনীকে বাংলা উপন্যাসের প্রথম বিশিষ্ট মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস বলেছিলেন। কিন্তু ব্রজেন্দ্রনাথের এই মতটি সকলে মানতে পারেন নি। অধ্যাপক ক্ষেত্র গুপ্ত আমাদের সঠিক ভাবেই মনে করিয়ে দিয়েছেন যে ‘রজনী’র আগে ‘বিষবৃক্ষ’তেই মনস্তত্ত্বের কথা আসতে শুরু করে দিয়েছিল এবং ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’এ তা ব্যাপকভাবেই এসেছে। পরে ‘আঁতের কথা’ বলায় রবীন্দ্রনাতের চোখের বালি এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছবে। তবে বিষবৃক্ষ থেকে শুরু করে ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ হয়ে ‘চোখের বালি’র দিকে যাবার পথে মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের নিরিখে ‘রজনী’কে বিশেষ কোনও মর্যাদা দেবার ব্রজেন্দ্রনাথকৃত দাবিটি কতদূর সঙ্গত তার পুনর্বিচার করে দেখা যেতে পারে।

‘রজনী’ উপন্যাস প্রসঙ্গে বঙ্কিমের পূর্ববর্তী মেজর নভেল ‘চন্দ্রশেখর’ এর সঙ্গে এর কিছু প্রতিতুলনা চলতে পারে। চন্দ্রশেখর উপন্যাসে এর কেন্দ্রীয় চরিত্র শৈবলিনীকে দুই পুরুষের মধ্যে রাখা হয়েছিল। ‘রজনী’ উপন্যাসেও নায়িকা রজনীর একদিকে রয়েছে শচীন্দ্র, অন্যদিকে অমরনাথ। শৈবলিনীর সমস্যা ও অবস্থান অনেক বেশি নীতি নৈতিকতা দ্বারা বিচার্য হয়েছে কারণ সে চন্দ্রশেখরের স্ত্রী। জীবন ও যৌনতাকে ঘিরে তার যতই অতৃপ্তি থাক, বাল্যপ্রেমিক প্রতাপের প্রতি তার আকর্ষণকে বঙ্কিমের নীতিবাদী অবস্থান সহ্য করতে পারে নি। বঙ্কিমের কাছাকাছি সময়ের ফ্লবেয়র তাঁর ‘মাদাম বোভারি’তে বা তলস্তয় তাঁর ‘আনা কারেনিনা’তে নারীর জীবন যৌবনের আকাঙ্ক্ষাকে মর্যাদা ও গুরুত্ব দিয়ে যেভাবে আখ্যানকে বিন্যস্ত করেন, বঙ্কিম নায়্যিকার যন্ত্রণাকে ততটা খোলা মনে দেখতে প্রস্তুত নন। অবশ্য তলস্তয়ের আনাও শেষমেষ জীবনে ভ্রনস্কির সঙ্গে সুখি জীবন গড়তে পারে নি, অপরাধবোধ থেকে রেলের তলায় আত্মহত্যা করেছে। তবু উপন্যাস জুড়ে আনার অবদমিত আকাঙ্ক্ষা, সমাজ নীতিজাত নৈতিকতার সঙ্গে লড়াই এবং শেষমেষ আত্মসমর্পণের ধাপগুলি বিস্তারিতভাবে চিত্রিত। বঙ্কিম চন্দ্রশেখরে শৈবলিনীর আকাঙ্ক্ষাকে তত সহানুভূতির সঙ্গে দেখতে প্রস্তুত নন। শৈবলিনীর পরপুরুষাসক্তি তার কাছে পাপই। প্রতাপের আকর্ষণ পেরনো আত্মত্যাগকে উজ্জ্বল করে তুলতেই বঙ্কিম আগ্রহী। ‘রজনী’ উপন্যাসেও বঙ্গদর্শন সংস্করণ থেকে প্রচুর অদল বদল করে গ্রন্থ সংস্করণে বঙ্কিম ‘রজনী’ উপন্যাসের অমরনাথকে উজ্জ্বল করে তোলেন। রজনীর সমস্যাটি অবশ্য সরলরৈখিক। এক তো সে বিবাহিতা নয়, কুমারী। দ্বিতীয়ত তার মনের টান সব সময়েই শচীন্দ্রের প্রতি। অমরনাথের সঙ্গে তার বিয়ের যে কথাবার্তা হয়, তার ভিত্তি কোনও শরীর মনের রসায়ন নয়, এক গভীর কৃতজ্ঞতাবোধ। বঙ্গদর্শন সংস্করণে অমরনাথের দিক থেকে বিবাহ বা সম্পত্তি বিষয়ক যে জোর জুলুম ছিল, গ্রন্থ সংস্করণে তা পুরোপুরি বদলে গিয়ে অমরনাথকে এক সম্পূর্ণ অন্যরকম ত্যাগী পুরুষে পরিণত করেছে। রজনীর পক্ষেও কোনও দ্বিধা দ্বন্দ্ব অনুতাপ ছাড়াই অমরনাথের বদলে শচীন্দ্রের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া সহজ হয়েছে। রজনী উপন্যাসে যে চরিত্রটির মধ্যে খানিক দোলাচলতার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, সে রজনী নয়, লবঙ্গলতা।

পঞ্চম খণ্ডের তৃতীয় পরিচ্ছেদটি এই প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। এখানে বিধৃত অমরনাথ – লবঙ্গলতার উক্তি প্রত্যুক্তিগুলো খেয়াল করা যাক। -

পরদিন আবার মিত্রদিগের আলয়ে গিয়া দেখা দিলাম। লবঙ্গলতাকে বলিয়া পাঠাইলাম যে, আমি কলিকাতা ত্যাগ করিয়া যাইব। এক্ষণে সম্প্রতি প্রত্যাগমন করিব না-তিনি আমার শিষ্যা, আমি তাঁহাকে আশীর্বাদ করিব।

লবঙ্গলতা আমার সহিত পুনশ্চ সাক্ষাৎ করিল। আমি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, “আমি কালি যাহা শচীন্দ্রকে বলিয়া গিয়াছি, তাহা শুনিয়াছ কি?”

ল। শুনিয়াছি। তুমি অদ্বিতীয়। আমাকে ক্ষমা করিও; আমি তোমার গুণ জানিতাম না।

আমি নীরব হইয়া রহিলাম। তখন অবসর পাইয়া লবঙ্গলতা জিজ্ঞাসা করিল, “তুমি আমার সঙ্গে সাক্ষাতের ইচ্ছা করিয়াছ কেন? তুমি নাকি কলিকাতা হইতে উঠিয়া যাইতেছ?”

আমি । যাইব।

ল। কেন?

আমি । যাইব না কেন? আমাকে যাইতে বারণ করিবার ত কেহ নাই।

ল। যদি আমি বারণ করি?

আমি । আমি তোমার কে যে, বারণ করিবে?

ল। তুমি আমার কে? তা ত জানি না। এ পৃথিবীতে তুমি আমার কেহ নও। কিন্তু যদি লোকান্তর থাকে-

লবঙ্গলতা আর কিছু বলিল না। আমি ক্ষণেক অপেক্ষা করিয়া বলিলাম, “যদি লোকান্তর থাকে, তবে?”

লবঙ্গলতা বলিল, “আমি স্ত্রীলোক-সহজে দুর্বলা। আমার কত বল, দেখিয়া তোমার কি হইবে? আমি ইহাই বলিতে পারি, আমি তোমার পরম মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী।”

আমি বড় বিচলিত হইলাম, বলিলাম, “আমি সে কথায় বিশ্বাস করি। কিন্তু একটি কথা আমি কখন বুঝিতে পারিলাম না। তুমি যদি মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী, তবে আমার গায়ে চিরদিনের জন্য এ কলঙ্ক লিখিয়া দিলে কেন? এ যে মুছিলে যায় না-কখন মুছিলে যাইবে না।

লবঙ্গ অধোবদনে রহিল। ক্ষণেক ভাবিল। বলিল, “তুমি কুকাজ করিয়াছিলে, আমিও বালিকাবুদ্ধিতেই কুকাজ করিয়াছিলাম। যাহার যে দণ্ড, বিধাতা তাহার বিচার করিবেন,-আমি বিচারের কে? এখন সে অনুতাপ আমার-কিন্তু সে সকল কথা না বলাই ভাল। তুমি আমার সে অপরাধ ক্ষমা করিবে?”

আমি। তুমি না বলিতেই আমি ক্ষমা করিয়াছি। ক্ষমাই বা কি? উচিত দণ্ড করিয়াছিলে- তোমার অপরাধ নাই। আমি আর আসিব না-আর কখন তোমার সঙ্গে সাক্ষাৎ হইবে না। কিন্তু যদি তুমি কখন ইহার পরে শোন যে, অমরনাথ কুচরিত্র নহে, তবে তুমি আমার প্রতি একটু-অণুমাত্র-স্নেহ করিবে?

ল। তোমাকে স্নেহ করিলে আমি ধর্মে পতিত হইব।

আমি। না, আমি সে স্নেহের ভিখারী আর নহি। তোমার এই সমুদ্রতুল্য হৃদয়ে কি আমার জন্য এতটুকু স্থান নাই?

ল। না-যে আমার স্বামী না হইয়া একবার আমার প্রণয়াকাঙ্ক্ষী হইয়াছিল, তিনি স্বয়ং মহাদেব হইলেও তাঁহার জন্য আমার হৃদয়ে এতটুকু স্থান নাই। লোকে পাখী পুষিলে যে স্নেহ করে, ইহলোকে তোমার প্রতি সে স্নেহ কখন হইবে না।

 

আবার “ইহলোক।” যাক-আমি লবঙ্গের কথা বুঝিলাম কি না, বলিতে পারি না; কিন্তু লবঙ্গ আমার কথা বুঝিল না। কিন্তু দেখিলাম, লবঙ্গ ঈষৎ কাঁদিতেছে।

রজনী উপন্যাসের একেবারে প্রথম দিকে, দ্বিতীয় পরিচ্ছেদেই আমরা জেনে গিয়েছিলাম এই তথ্য - ‘রামসদয় বাবু প্রাচীন, বয়:ক্রম ৬৩ বৎসর। ললিতলবঙ্গলতা নবীনা, বয়স ১৯ বৎসর, দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী-আদরের আদরিণী, গৌরবের গৌরবিণী, মানের মানিনী, নয়নের মণি, ষোলআনা গৃহিণী। তিনি রামসদয়ের সিন্দুকের চাবি, বিছানার চাদর, পানের চূণ, গেলাসের জল। তিনি রামসদয়ের জ্বরে কুইনাইন, কাসিতে ইপিকা, বাতে ফ্লানেল এবং আরোগ্যে সুরুয়া।’ তেষট্টির রামসদয় আর সদ্যযৌবনা লবঙ্গলতার মধ্যে শরীর মনের বিনিময় কতটা অনায়াস ছিল, কেন অমরনাথের প্রতি কোনও বিশেষ টান লবঙ্গলতার দিক থেকে ব্যক্ত হল না, তার বিশ্লেষণে বঙ্কিম যান নি। বঙ্কিমের দিক থেকে এটা আদর্শ ও নীতি নৈতিকতার স্বাভাবিক বর্ম, যা সব আদর্শ নারীরই মেনে চলা উচিত। এই আদর্শের লঙ্ঘন যেখানে ঘতে তা বঙ্কিমের দিক থেকে অন্যায় অপরাধ এবং শাস্তিযোগ্য। বঙ্কিমের সধবা নায়িকা যৌনতৃষ্ণাকাতর শৈবলিনীর এই আদর্শ লঙ্ঘনের জন্য নরক দর্শন ও প্রায়শ্চিত্তপর্ব আসে আর বিধবা রোহিণীকে গুলিতে মরতে হয়। লবঙ্গলতাকে এমন কোনও সীমা লঙ্ঘনের দিকে নিয়েই যান না বঙ্কিম। “কিন্তু যদি লোকান্তর থাকে …” এই অপূর্ণ বাক্যের সামান্য ইঙ্গিতে একবারের জন্য লবঙ্গর মুখের কপাট হয়ত লহমার খুলেছিল, কিন্তু তারপরেই আবার তা নেমে আসে ঔচিত্যের সীমারেখায় এবং সে জানায় স্বামী ছাড়া অন্য পুরুষকে ভালোবাসা বা স্নেহর কথা সে ভাবতেই পারে না –

“ল। তোমাকে স্নেহ করিলে আমি ধর্মে পতিত হইব।

আমি। না, আমি সে স্নেহের ভিখারী আর নহি। তোমার এই সমুদ্রতুল্য হৃদয়ে কি আমার জন্য এতটুকু স্থান নাই?

ল। না-যে আমার স্বামী না হইয়া একবার আমার প্রণয়াকাঙ্ক্ষী হইয়াছিল, তিনি স্বয়ং মহাদেব হইলেও তাঁহার জন্য আমার হৃদয়ে এতটুকু স্থান নাই। লোকে পাখী পুষিলে যে স্নেহ করে, ইহলোকে তোমার প্রতি সে স্নেহ কখন হইবে না।”

উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হল এখানেও ইহলোক শব্দটিকে লবঙ্গ আবার উল্লেখ করেছে। লোকোত্তরের অন্যতর সম্ভাবনাটুকু এইভাবে খানিকটা দুলিয়ে রাখা ছাড়া বঙ্কিম ও তার এই নায়িকা কঠিন কঠোর নীতিনৈতিকতার জালে আবদ্ধ থাকাকেই শ্রেয় বলে মনে করেন।