আখ্যানপাঠ - বঙ্কিমচন্দ্রের চন্দ্রশেখর
- 07 February, 2026
- লেখক: সৌভিক ঘোষাল
‘বিষবৃক্ষ’ আর ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ – বঙ্কিমের দুই বিখ্যাত পারিবারিক সামাজিক উপন্যাসের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে চন্দ্রশেখর। অন্যদিকে আবার তার অবস্থান ইতিহাসপটকে ব্যবহার করে লেখা ‘দুর্গেশনন্দিনী’ ও ‘কপালকুণ্ডলা’র মতো নান্দনিক রোমান্স এবং ‘আনন্দমঠ’ ও ‘দেবী চৌধুরাণী’র মতো তত্ত্বধর্মী উপন্যাসের মাঝে। বঙ্কিম সাহিত্যে সমাজ ও ইতিহাসের নিগূঢ় সংযোগের অন্যতম প্রধান উদাহরণ হিসেবেও চন্দ্রশেখরের বিশিষ্টতা আছে। এর যে সামাজিক পারিবারিক আখ্যান, তার প্রধান চরিত্রপাত্র চন্দ্রশেখর, শৈবলিনী ও প্রতাপ। প্রেমের ত্রিকোণ বঙ্কিম বা বাংলা সাহিত্যে বারবার আসে, বিশ্বসাহিত্যেরও তা অন্যতম প্রধান থিম। বঙ্কিমের ক্ষেত্রে ত্রিকোণ নিয়ে একধরনের নিরীক্ষা চন্দ্রশেখরের আগেই আমরা দেখেছিলাম ‘বিষবৃক্ষ'তে। পরে আবার দেখব ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’এ। এই দুই আখ্যানেই মূল কাহিনীর কেন্দ্রে এক পুরুষ, তার দুই দিকে দুই নারীর টান। ‘বিষবৃক্ষ’তে নায়ক নগেন্দ্রর একদিকে সূর্যমুখী ও অন্যদিকে বাল্যবিধবা কুন্দনন্দিনী। ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ এ নায়ক গোবিন্দলালের একদিকে স্ত্রী ভ্রমর ও অন্যদিকে রোহিণী। ‘চন্দ্রশেখর’ উপন্যাসে ছকটা আলাদা। এখানে নায়িকা শৈবলিনীর একদিকে স্বামী ‘চন্দ্রশেখর’ ও অন্যদিকে বাল্যসখা ‘প্রতাপ’। নায়কের পরনারী গমন এবং তাকে দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে সংসারের ভেতরেই নিয়ে আসার ছাড়পত্র সে সময়ের সমাজে এবং আইনে ছিল। সে কারণে নগেন্দ্রর পক্ষে বিধবা কুন্দনন্দিনীকে দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে বিয়ে করা সম্ভব হয়েছিল। তাতে সংসার স্থিতি রক্ষা পায় নি সে আলাদা কথা। কিন্তু কী উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে, যে সময় ‘চন্দ্রশেখর’ লেখা বা তারও একশো বছর আগে অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগে, যে সময়টা চন্দ্রশেখর কাহিনীর ঘটনাকাল, নারীর দ্বিতীয় পুরুষ সংসর্গ ছিল অচিন্তনীয় ব্যাপার। স্বাভাবিক গ্রামীণ পারিবারিক আবহের শান্ত পটে এমন ঘটনার জাল বোনা আখ্যানকারের পক্ষে কঠিন ছিল, তা পাঠকের বিশ্বাসযোগ্যতাকে অতিক্রম করে যেত। একারণেই হয়ত বঙ্কিম ইতিহাসের এক উতরোল সময়ের প্রেক্ষাপটে শৈবলিনীর কাহিনী লিখেছেন এবং সেই উতরোলের ঘটনা ঘনঘটার সঙ্গে শৈবলিনীর আকাঙ্ক্ষার আখ্যানকে যুক্ত করে দিয়েছেন।
প্রতাপ আর শৈবলিনী বাল্যকালের বন্ধু ছিল। আটের বালিকা শৈবলিনী ষোলর বালক প্রতাপকে ভালোবাসল এবং মালা বদল করে নিল গোপনে, এটা আমাদের আজকের দিনকালে বেশ খানিকটা অদ্ভুত ঠেকলেও যে সময়্যটাই ছিল বাল্য বিবাহের সে সময়ে হয়ত তা এতটা আশ্চর্যের ব্যাপার ছিল না। সামাজিক বাধায় প্রতাপ শৈবলিনীর বিবাহ সম্ভব ছিল না বলে একদিন গঙ্গায় সাঁতার কাটতে কাটতে তারা ঠিক করে একসঙ্গে ডুবে মরবে। প্রতাপ ডুবল, শৈবলিনী পারল না। প্রতাপও অবশ্য সে যাত্রায় মরল না। নৌকো থেকে জলে ঝাঁপিয়ে তাকে উদ্ধার করলেন জনৈক ব্রাহ্মণ পণ্ডিত। পরে দেখা গেল তিনিই চন্দ্রশেখর। বছর বত্রিশের চন্দ্রশেখর তখনো দ্বার-পরিগ্রহ করেন নি, গ্রন্থকীট হিসেবে শাস্ত্র ও দর্শনের জগতে বিচরণ করে বেড়ানোই ছিল তার কাজ। নিমজ্জমান প্রতাপকে উদ্ধার করে ঘরে রেখে আসার সময় প্রতাপের জননী তাঁকে আতিথ্য স্বীকারে অনুরোধ করলেন। সে সময়েই প্রতাপের প্রতিবেশিনী শৈবলিনীকে চন্দ্রশেখর দেখলেন, মুগ্ধ হলেন ও বিবাহ করলেন।
কাহিনীর এই অংশটিকে উপক্রমণিকা অংশে রেখে মূল কাহিনীকে বঙ্কিম এগিয়ে এনেছেন আরো আট বছর। ততদিনে শৈবলিনী সদ্য যুবতী হয়েছে। কিন্তু তার যৌবন সাধ মেটে নি। স্বামী চন্দ্রশেখর সংসার উদাসীন এবং বউ এর বদলে বই নিয়েই সারাক্ষণ ব্যস্ত। শৈবলিনীর কোনও সন্তান হয় নি এবং বঙ্কিম সরাসরি না লিখলেও বোঝা যায় তার যৌবন তৃষ্ণা তথা যৌন তৃষ্ণা অপূরিত ছিল। অষ্টাদশ শতকের ষাটের দশকের ইংরেজ অধিকারের সেই প্রথম পর্বটিতে বেদগ্রামের মতো নানা গ্রাম গঞ্জেই তখন হঠাৎ হঠাৎ লালমুখো সাহেব সুবোদের দেখা মিলত। শৈবলিনী ও তার সখী সুন্দরী, যে আবার প্রতাপের শ্যালিকা, এমনই এক লালমুখো সাহেব লরেন্স ফস্টারকে এক সন্ধাকালে দেখে সন্তস্ত্র হয়। সুন্দরী পালায় কিন্তু শৈবলিনী তটস্থ হলেও নদীতট ছাড়ে না। লরেন্স ফস্টার শৈবলিনীকে দেখে মুগ্ধ হয়। চন্দ্রশেখর রাজকার্যে মুর্শিদাবাদ গেলে সে শৈবলিনীর গৃহে লোক লস্কর নিয়ে চড়াও হয় এবং তাকে অপহরণ করে। শৈবলিনীকে এক বজরায় চাপিয়ে নিজে এক দ্রুতগামী নৌকোয় চেপে সে নতুন ঠিকানার দিকে অগ্রসর হয়। শৈবলিনীর প্রতিবেশী তথা সখী সুন্দরী বুদ্ধিমত্তা ও সাহসের পরিচয় দিয়ে এক দ্রুতগ্রামী নৌকোয় স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে অপহৃতা শৈবলিনীর বজরার পশ্চাৎধাবন করে। নাপিতানির ছদ্মবেশে শৈবলিনীর বজরায় প্রবেশাধিকার জোগাড়েও সুন্দরীর সমস্যা হয় নি। শৈবলিনীর পলায়নের সহজ রাস্তা তৈরি হয়ে যাবার পরেও কিন্তু শৈবলিনী ফিরতে চাইল না। সে সুন্দরীকে এই বলে ফিরিয়ে দিল যে সে স্বামী সংসারে ফিরতে চায় না। স্বামী সংসারে তার সুখ মেলে না বলেই যে তার এই সিদ্ধান্ত, তাও সে গোপন করে নি। পরবর্তীকালে সে জানিয়েছিল তার ভাবনায় ছিল লরেন্স কর্তৃক অপহরণের মাধ্যমে স্বামী সংসার থেকে মুক্তি মিললে কোনও না কোনওভাবে প্রতাপের সঙ্গে তার সংযোগের পথ তৈরি হবে। পরবর্তীকালে আমরা এও দেখেছি প্রতাপকে দেহ মন সমর্পণ করে যৌবনজ্বালা মেটাতে, নতুন করে জীবন শুরু করতে শৈবলিনী উন্মুখ। যদিও বঙ্কিম সমালোচকেরা অনেকেই লরেন্স ফস্টারের অপহরণ ঘটনার মাধ্যমে প্রতাপ মিলনের পরিকল্পনাটিকে শুধু শৈবলিনীরই নয়, বঙ্কিমের আখ্যান ভাবনারই দুর্বলতা মনে করেছেন, আমাদের অন্যভাবেও ঘটনাটিকে দেখার সুযোগ আছে। জীবন যৌবন যৌনতার তীব্র প্রদাহ যেভাবে শৈবলিনীকে দগ্ধ করছিল প্রতি মুহূর্তে, যে কোনও সম্ভব অসম্ভব উপায়ে তা থেকে পরিত্রাণে শৈবলিনী ব্যগ্র হয়ে উঠেছিল। সেই তীব্রতাই এই ধরনের অসম্ভব চিন্তায় শৈবলিনীকে প্রাণিত করে থাকতে পারে। জীবন যৌবন যৌনতার মাদক টান থেকে কত সাহসী সিদ্ধান্ত নারী নিতে পারে বঙ্কিমের চন্দ্রশেখরের কাছাকাছি সময়ে লেখা বিশ্ব সাহিত্যের দুই ক্লাসিক - ফ্লবেয়রের 'মাদাম বোভারি' আর তলস্তয়ের 'আনা কারেনিনা'তে তা আমরা দেখেছি। ফ্লবেয়র ও তলস্তয়ের এই দুই নারী আবার শুধুই স্ত্রী ছিলেন না, ছিলেন শিশুর জননীও। ফলে দুই ধরনের পিছুটান ফেলে তাঁরা এগিয়েছিলেন। নিঃসন্তান শৈবলিনীর পিছুটান সেখানে কেবল সমাজ ও নীতির সংস্কার। স্বামী চন্দ্রশেখরের প্রতি ভালোবাসার মায়াবন্ধন তার ছিল না। তবে শৈবলিনী উনিশ শতকের ফ্রান্সের মাদাম বোভারি বা রাশিয়ার আনা নয়, অষ্টাদশ শতকের বাঙালি বধূ আর তার আখ্যানের পাঠক উনিশ শতকের বাঙালি সমাজ। সে সমাজ যেমন নৈতিকতার নিগঢ়ে বাধা, তার স্রষ্টা ঔপন্যাসিকও তেমনি নীতিপরায়ণ। ফলে ইতিহাসের এক ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ উতরোল পটকে শৈবলিনীর আংশিক স্বেচ্ছা সংসার ত্যাগের সঙ্গে জড়িয়ে রেখেই বঙ্কিম শৈবলিনীকে আখ্যানে আনলেন।
'চন্দ্রশেখর' উপন্যাসে যে ইতিহাস পটটি রয়েছে তা বাংলার ইংরেজ অধিকারের প্রথম পর্ব। ১৭৫৭ তে পলাশীর যুদ্ধে সিরাজ উদ দৌল্লার পতনের পরেই ইংরেজ সরাসরি বাংলার রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নেয় নি। মীরজাফরের মতো বশংবদ নবাবকে দিয়ে তারা শাসন চালানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সেনানায়ক মীরজাফর শাসন পরিচালনায় অপরাগ হওয়াতে তার জামাতা মীরকাসিমকে দিয়ে শাসন চালানোর চেষ্টা করে ইংরেজরা। মীরকাসিমের খানিক স্বাধীনচেতা মনোভাব ইংরেজদের সঙ্গে তার দ্বন্দ্বের কারণ হয়। বাংলার নবাব ও ইংরেজদের মধ্যে পলাশীর পর আবারও এক বড় যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে। ১৭৬৩ সালের যে সময়কালে এই উপন্যাসের মূল ঘটনাগুলি ঘটছে তার ঠিক পরের বছরেই ঘটেছিল এই বড় যুদ্ধটি, ১৭৬৪র যে যুদ্ধকে আমরা 'বক্সারের যুদ্ধ' হিসেবে জানি। এই যুদ্ধে মীরকাসিমের প্রধান সহায়ক ছিলেন গোলন্দাজ বাহিনীর প্রধান গুরগণ খাঁ। গুরগণ খাঁ ছিলেন স্পেনে জন্মানো এক আরমানী বস্ত্র বিক্রেতা। তার বোন দলনীকে তিনি ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন মীরকাসিমের অন্তঃপুরে। দলনী মীরকাসিমের প্রিয় ও ভরসাযোগ্য মহিষী হয়ে ওঠেন, যদিও তার গুরগণ খাঁ সংশ্লিষ্ট পরিচয়টি কেউ জানত না। কামানের গোলা বারুদ বিষয়ে দক্ষতার কারণে গুরগণ খাঁ মীরকাসিমের ভরসাস্থল ও প্রধান সেনাপতি হয়ে ওঠেন। গুরগণ খাঁ বৃত্তান্ত ‘সীয়ার উল মুকতাক্ষরীণ’ নামের বই থেকে অবিকৃতভাবেই গ্রহণ করেছেন বঙ্কিম। মীরকাসিমের চরিত্রের নানা দিক, যেমন তাঁর জ্যোতিষে আস্থা, ইংরেজের বিরুদ্ধে নিজ স্বার্থ ও অধিকার রক্ষার চেষ্টায় দৃঢ়তাও ইতিহাসের তথ্য ও সত্য নির্ভর। তবে তকি খাঁ চরিত্র নির্মাণে ইতিহাসের সত্যের প্রতি বঙ্কিম বিশ্বস্ত থাকেন নি। ইতিহাস বলছে তকি খাঁ শেষ অবধি মীরকাসিমের বিশ্বাসভাজন ছিলেন এবং যুদ্ধে নবাবের হয়ে যুদ্ধ করতে করতে তিনি আত্মাহূতি দেন। এখানে তকি খাঁকে বিশ্বাসঘাতক মিথ্যাবাদী দলনী বেগমের বিরুদ্ধে চক্রান্তকারী ও তার হত্যার ক্রীড়নক হিসেবে উপস্থাপণ করা হয়েছে, যা ইতিহাসের সত্যকে লঙ্ঘন করেছে ও তকি খাঁর ওপর অন্যায় অসত্য কালিমা লেপন লেপন করেছে। এই ধরনের আরো দু একটি ভ্রান্তি আপাতভাবে নিখুঁত চন্দ্রশেখর উপন্যাসে থেকে গেছে। যেমন প্রতাপ নিজের প্রসঙ্গে একবার বলছে স্বয়ং নবাব তাঁকে জানেন ও ভয় পান। পরে আমরা দেখছি মীরকাসিম প্রতাপ বিষয়ে কিছুই জানেন না।
প্রতাপ অবশ্য এক আধবারের এই ধরনের অহমিকা প্রকাশের বাইরে আগাগোড়া এক উজ্জ্বল চরিত্র। সেও শৈবলিনীকে ভালোবেসেছিল এবং আমরা বুঝি অতি দুর্বল মুহূর্তে কখনো কখনো সেই ভালোবাসার আবেগ সে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে নি। আট বছর পরে শৈবলিনীর সঙ্গে গঙ্গাবক্ষে আর এক সন্তরণ মুহূর্তে এই ধরনের এক দুর্বল মুহূর্ত তৈরি হবার পরেই সে নিজের স্থিতিশীলতায় ফিরে আসে এবং আবেগকে ন্যায় নীতির ঘেরাটোপে বন্দী করে ফেলে। শৈবলিনীকে সে স্বামী সংসর্গ থেকে চ্যুত দেখতে চায় না, সমাজ সংসার নীতি নৈতিকতা ভাঙতে চায় না। প্রতাপ বুঝেছিল সে বেঁচে থাকলে শৈবলিনী নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। তার অসম যুদ্ধে ধাবিত হওয়া প্রায় এক ধরনের আত্মাহূতিই।
শৈবলিনী এই উপন্যাসের সবচেয়ে প্রাণবন্ত চরিত্র। বঙ্কিমের মধ্যে শিল্পী বঙ্কিম ও নৈতিক বঙ্কিমের মধ্যে একটা দ্বন্দ্ব নানা সময়েই কাজ করে। সেই দ্বন্দ্বের প্রকাশ ‘বিষবৃক্ষ’, ‘চন্দ্রশেখর’, ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ – সর্বত্র দেখা যায়। নারীর জীবনতৃষ্ণা তথা জীবন যৌবনের প্রশ্নটিকে বঙ্কিম অস্বীকার করেন না বলেই কুন্দনন্দিনী, শৈবলিনী বা রোহিণীদের আমরা এত উজ্জ্বল ও জীবন্তভাবে পাই। এখানে শিল্পী বঙ্কিমের ছোঁয়া পায় আখ্যান। আবার নৈতিক বঙ্কিম সেই আখ্যানকে নিয়ন্ত্রণ না করেও থাকতে পারেন না। কুন্দনন্দিনী বিষ খায়, রোহিণী গোবিন্দলালের গুলিতে মারা যায়। শৈবলিনীকে অবশ্য জীবনে বাঁচিয়ে রেখেছেন আখ্যানকার, তবে তা তার নরক দর্শন ও প্রায়শ্চিত্ত পর্বর পরেই।
‘শৈবলিনী’র নামে এই উপন্যাসের নামকরণ করতে পারতেন বঙ্কিম, কারণ সেই এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র। তাকে ঘিরেই সব মূল ঘটনা আবর্তিত। কিন্তু ফ্লবেয়ার ‘মাদাম বোভারি’ বা তলস্তয় ‘আনা কারেনিনা’ নাম রাখতে পারলেও বঙ্কিম সেই পথে এগোন না। এমনকী আত্মোৎস্বর্গে প্রতাপের নামেও তিনি গ্রন্থনাম রাখেন নি। স্থির স্থিতধী আত্মানুসন্ধান ও জ্ঞানান্বেষণে নিমগ্ন চন্দ্রশেখরের নামেই এই উপন্যাসের নাম। চন্দ্রশেখর চরিত্রের মধ্যেও যে ক্ষত ও ক্ষতি আছে, সেটা বঙ্কিম পাঠককে বোঝাতে চান। শৈবলিনীকে যে অবহেলা করা রয়েছে, তার যৌবনস্পৃহাকে যে মর্যাদা দেওয়া হয় নি, নিজের অধ্যয়ন, জ্ঞানচর্চা ও সংসারযাত্রাকে সুগম করার যূপকাষ্ঠেই যে শৈবলিনীকে বলি দেওয়া হয়েছে সেটা উপলব্ধি করে চন্দ্রশেখর তীব্র অনুশোচনায় দগ্ধ হন। কিন্তু এই অনুশোচনা শেষেও তিনি নতুন করে সব শুরু করতে পারবেন না। শৈবলিনী জাত খোয়ায় নি, শারীরিক অর্থে সতীত্বও নষ্ট হয় নি তার, কিন্তু তার মনকে সে যে জীবন মরণের জন্য প্রতাপকে দিয়ে দিয়েছে, সেটা চন্দ্রশেখরের কাছে স্পষ্ট। স্ত্রীর সঙ্গে পরবর্তী দাম্পত্যে প্রতাপ বারেবারে হয়ত ছাপ ফেলে যাবে নিরুচ্চারে আর সেটাই এক চির ব্যবধান রেখে দেবে শৈবলিনী - চন্দ্রশেখরের মধ্যে।