এভারেস্ট বেস ক্যাম্প : সাগর মাথার পায়ের কাছে - পঞ্চম পর্ব
- 07 November, 2026
- লেখক: তনুশ্রী গোস্বামী
প্রথম পর্বের লিংক
দ্বিতীয় পর্বের লিংক
পঞ্চম পর্ব
লেভেল আন্ডার সেভেন্টি
সন্ধ্যেবেলা বুদ্ধিরাজ ওয়ান কোথা থেকে একটা অক্সিমিটার জোগাড় করে নিয়ে এসে সবার অক্সিজেন স্যাচুরেশন মাপতে শুরু করে দিলো۔۔দেখা গেলো পূরবীর লেভেল পঁচাশি۔۔আর বাকিদের সবার সত্তরের এদিক ওদিক! ঐ লেভেল দেখে সবার মনেহয় আরও কিছুটা করে নেমে গেলো, এদিকে রাতের খাবারও চলে এসেছে۔۔সুপ্ পটেটো ফ্রাই পিৎজা۔۔কোনোমতে মুখে একটু করে খাবার গুঁজে শুতে গেলাম۔۔ঘুম তো এলোনা কারও۔۔একদিকে ভোরবেলা উঠে বেস ক্যাম্প যাওয়ার তাড়না অন্য দিকে অক্সিজেনের অভাবে ঘুম উধাও۔۔আমিতো আবারও বসে কাটালাম۔۔মাঝেমাঝে ঘর থেকে বেরিয়ে করিডোরে হাঁটছি নয়তো ডাইনিং পেরিয়ে হোটেলের লনে হেঁটে আসছি۔۔সারারাত আমাদের ঘরের দরজা খোলা ঐ ঠান্ডাতেও۔۔টেম্পারেচার দেখাচ্ছে মাইনাস সেভেন۔۔দরজা বন্ধ করলেই আরও সাফোকেশন হচ্ছে۔۔۔একমাত্র নন্দিনীদি ঘুমোচ্ছে۔۔۔
শুতে যাওয়ার আগে বুদ্ধিরাজ ওয়ান পইপই করে বলে দিয়েছিলো আগামীকাল ছটায় উঠে বেরোতে হবে۔۔কারণ আগামীকাল আমরা বেস ক্যাম্প ঘুরে এসে হোটেলে ফিরে ব্রেকফাস্ট করে নিচে নামা শুরু করবো এবং টার্গেট আছে ফেরিচে পর্যন্ত নেমে যাওয়ার۔۔۔থুকলার আগে যে গ্রামটা ওপর থেকে দেখা যাচ্ছিলো নদীর ধারে۔۔মানে অনেকটা রাস্তা এবং প্রায় সন্ধ্যে পর্যন্ত হাঁটার প্ল্যান۔۔۔সেই মতো আমরা সাড়ে পাঁচটায় উঠে রেডি হতে শুরু করে দিয়েছি۔۔প্যাকিং করে বেরোবো۔۔শুধু ন্যাপ স্যাক নিয়ে۔۔এদিকে হোটেলের কোনো লোক তখনও ওঠেনি۔۔আমরা যে একটু চা বা সুপ্ খেয়ে বেরোবো তার জন্যও কেও অর্ডার নেওয়ার লোক নেই۔۔আমাদের নিজেদের নিয়ে আসা খাবারও সব শেষ ۔۔লিডার কোথাও বেরোনোর আগে একেবারেই না খেয়ে বেরোনোর পক্ষপাতি নয়۔۔তাই ওদের ওঠার জন্য কিছুক্ষন অপেক্ষা করতে গিয়ে আমাদের বেরোতে বেরোতে সাতটা হয়ে গেলো۔۔
আগেই বলেছি লোবুচে থেকেই বুদ্ধিরাজরা ফেরত যাওয়ার জন্য বেগড়বাই শুরু করেছে۔۔আমাদের দেরি দেখে বুদ্ধিরাজ ওয়ান রাগ দেখিয়ে নিজেরা না গিয়ে আমাদের পাঠিয়ে দিল বেস ক্যাম্পের রাস্তায়۔۔জানালো ব্রেকফাস্ট করে ওরা পিছনে আসছে۔۔۔বিষয়টা সুবিধাজনক মনে না হওয়ায় আমি সুপ্রিয়কে বললাম আমরা এগোচ্ছি তুমি বুদ্ধিরাজদের নিয়ে এসো۔۔আমার মনে হচ্ছিলো ওরা হয়তো নাও আসতে পারে۔۔۔যেহেতু এই রাস্তায় পরিষ্কার কোনো ট্রেল নেই তাই হারানোর সম্ভাবনাও রয়েছে۔۔তাই ওদেরকে ছাড়া যাবেনা۔۔সেইমতো আমি পূরবী আর নন্দিনীদি এগোতে শুরু করলাম۔۔হোটেল থেকে বেরিয়ে সামনে একটু নেমেই একটা একদম ফ্ল্যাট জায়গা পেলাম।এতটা সমতল জায়গা পাহাড়ে হঠাৎ একটু অদ্ভুত লাগলো۔۔পূরবী ওর ভূগোলের জ্ঞান থেকে ধারণা করে বললো হয়তো ওইখানে কোটি কোটি বছর আগে গ্লেসিয়ার ছিল۔۔এখন তা রিট্রিট করায় ক্ষয়কার্যের ফলে জায়গাটা এইরকম চেহারা নিয়েছে۔۔আমি তো বাপু এই জন্যেই ভূগোল দিদিমনির সাথে ছাড়া বেড়াতে যাইনা এসব জানতাম কোথা থেকে!!

বড় বড় বোল্ডারের উপর দিয়ে আমরা এগিয়ে চলেছি সামনে এভারেস্ট রেঞ্জ সম্পূর্ণ উন্মুক্ত۔۔আকাশ অসম্ভব পরিষ্কার۔۔ বোল্ডার টপকে টপকে চলতে হচ্ছে তাই পরিশ্রম হচ্ছে বেশি তাই অক্সিজেনের অভাবও বেশি করে দেখা দিচ্ছে۔۔দূর থেকে বেস ক্যাম্প দেখা যাচ্ছে۔۔খুম্বু গ্লেসিয়ারের ওপর টাটকা বরফ পড়ে আছে۔۔দূর থেকে মনে হচ্ছে যেন সমুদ্রের ঢেউ হঠাৎ করে জমে বরফ হয়ে গেছে۔۔৩৬০ ডিগ্রি দৃশ্যপটে সমস্ত আটহাজারী শৃঙ্গরা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে۔۔যেন সত্যিই স্বর্গের পথে হেঁটে চলেছি আমরা۔۔۔পিছন থেকে সুপ্রিয় আর বুদ্ধিরাজরা অনেকক্ষন আমাদের জয়েন করে নিয়েছে۔۔সামনেই এভারেস্ট বেস ক্যাম্প লেখা বড় একটা পাথর রয়েছে۔۔আর অল্প কিছুক্ষনের মধ্যেই ওখানে পৌঁছে যাবো۔۔আমার অক্সিজেন লেভেল অসম্ভব কমে যাওয়ায় শ্বাস নিতে খুব কষ্ট হচ্ছিল۔۔বুকে ব্যথা করছিল۔۔মাঝেমাঝে চোখে অন্ধকার দেখছিলাম۔۔۔মনে হচ্ছিলো অজ্ঞান হয়ে যেতে পারি۔۔তখন আমাকে নিয়ে বিপদ বাড়বে۔۔۔তাই দূর থেকেই এভারেস্ট বেস ক্যাম্প লেখা পাথরটা দেখে আর না এগিয়ে ব্যাক করার সিদ্ধান্ত নিলাম۔۔লিডারও আমার কথায় সায় দিলো۔۔
পাথরটা না ছুঁয়ে ফেরার জন্য মনে মনে একটু কষ্ট হচ্ছিল۔۔কিন্তু পাথরটার পিছন দিকে আর এগোনোর কোন জায়গা নেই দেখে মনকে সান্ত্বনা দিয়ে ফিরতে শুরু করলাম۔۔এই রিজিয়ানের এইটুকুই সাধারণ পথযাত্রীদের জন্য শেষ সীমানা۔۔বুদ্ধিরাজ ওয়ান পূরবী নন্দিনীদি আর সুপ্রিয় কে নিয়ে এগিয়ে চলল۔۔۔ওরা ফটো টোটো তুলে আসছে বললো۔۔۔আমি বুদ্ধিরাজটুকে নিয়ে ফিরতে শুরু করলাম۔۔বুদ্ধিরাজ টুরও খুব শরীর খারাপ সকাল থেকেই۔۔ওরও খুব মাথা যন্ত্রণা করছে আর চেস্ট পেইন۔۔আমরা ঠিক করলাম লোবুচেতে গিয়ে ওদের জন্য অপেক্ষা করবো۔۔সেইমতো ওদেরও জানিয়ে দিয়েছিলাম۔۔
দুজন ফিরতে শুরু করলাম۔۔ আকাশ তখন ঝকঝকে সুলেখা কালীর মতো নীল রং ধারণ করেছে۔۔সারা রাস্তা বুদ্ধিরাজ টু আর আমি গল্প করতে করতে আধ ঘণ্টার মধ্যে গোরকশেপ পৌঁছে গেলাম۔۔আজকে ওয়েদার ভালো হওয়ায় প্রচুর কার্গো হেলিকপ্টার মালপত্র পৌঁছে দেওয়ার জন্য আসছে যাচ্ছে۔۔ গোরকশেপ পৌঁছে শুধুমাত্র এক কাপ চা খেয়ে লিডারকে একটা চিরকুট লিখে হোটেল মালিকের কাছে দিয়ে লোবুচের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম۔۔বুদ্ধিরাজ টু একটা বড় স্যাক নিয়ে নিল۔۔আর একটা ওয়ানের জন্য রেখে গেল۔۔۔আবার সেই চাংড়ি সার গ্লেসিয়ার আমাদের ক্রস করতে হবে۔۔ আমিতো পিছন ফিরে ফিরে থ্রি সিক্সটি ডিগ্রি ঘুরিয়ে খালি ভিডিও তুলে যাচ্ছি আর ছবি নিয়ে যাচ্ছি۔۔আর বুদ্ধিরাজ টু আমাকে সমানে সাবধান করছে 'ম্যাডাম ইধার ক্রিভার্স হ্যায় ইধার গির জায়েঙ্গে সাম্ভালকে'۔۔ এইটুকু রাস্তায় কত যে ভিডিও সেদিন তুলেছি তার কোন হিসেব নেই۔۔যাওয়ার সময় এই রাস্তায় অসম্ভব বাজে ওয়েদার পেয়েছিলাম۔۔তুষার ঝড়ের মধ্যে কখন হোটেল গিয়ে পৌঁছবো সেই চিন্তা ছিল۔۔আর আজকে প্রকৃতি যেন ছপ্পর ফাঁড়কে নিজেকে উজাড় করে দিয়েছে۔۔মন প্রান ভরে তাকে উপভোগ করতে করতে এগিয়ে চললাম۔۔বুদ্ধিরাজ টুর একটা কথা খুব মনে আছে۔۔ও গল্প করতে করতে বলছিলো ম্যাডাম প্রথমবার যখন এখানে এসেছিলাম তখন চারিদিক দেখে শুধু এটাই মনে হয়েছিল এত সুন্দর কিছুও পৃথিবীতে আছে۔۔এত বিস্মিত হয়েছিল ও সেটাই বোঝাতে চাইছিলো۔۔আর আমি মনে মনে গুনগুন করছিলাম۔۔۔ মহারাজ, একি সাজে এলে হৃদয়পুরমাঝে!/চরণতলে কোটি শশী সূর্য মরে লাজে ॥/গর্ব সব টুটিয়া মূর্ছি পড়ে লুটিয়া,/সকল মম দেহ মন বীণাসম বাজে۔۔۔
একটু বেশিই আবেগতাড়িত হয়ে পড়েছিলাম۔۔যাইহোক এক ঘণ্টার মধ্যে লোবুচে পৌঁছে গেলাম۔۔ঘড়িতে সাড়ে এগারোটা۔۔ওখানে এক কাপ কফি উইথ হট চকলেট আর ফ্রেঞ্চ টোস্ট অর্ডার দিলাম লাঞ্চের জন্য ۔কিন্তু কফিটা ছাড়া কিচ্ছু মুখে ঢোকাতে পারলাম না۔۔অসম্ভব মাথা যন্ত্রণা এবং গা গুলানো শুরু হয়েছে۔۔মাথা নিচু করে হোটেলের বাইরে টেবিলের সামনে ওদের ফেরার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম۔۔কোন খেয়ালই নেই কখন আমি ঘুমিয়ে পড়েছি۔۔বুদ্ধিরাজ টুর গলাতে ঘুম ভাঙলো۔۔কোথা থেকে একটা অক্সিমিটার জোগাড় করে নিয়ে এসে অক্সিজেন লেভেল মেপে দেখে ৬৭۔۔কোথা থেকে একজন মেডিকেল স্টাফকেও ধরে এনেছে۔۔ওরা আমাকে ঘুমাতে বারণ করল۔۔কিন্তু আমার অজান্তেই আমি ঘুমিয়ে পড়ছিলাম۔۔এই অবস্থা দেখে বুদ্ধিরাজ টু ওদের জন্য আর অপেক্ষা না করে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল۔۔এবং অত্যন্ত বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছিলো সেটা পরে বোঝা যাবে۔۔۔ অগত্যা আমিও লিডারের নামে একটা চিরকুট লিখে থুকলার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম۔۔۔
হাঁটতে শুরু করতে শরীর আসতে আসতে ভালো হতে শুরু করলো۔۔চেস্ট পেন হালকা রয়েছে কিন্তু ব্রিথিং ট্রাবেল আর মাথা যন্ত্রনা কমতে শুরু করলো۔۔চল্লিশ মিনিটের মধ্যে থুকলা পাস চলে এলাম۔۔এখানে এতো সুন্দর লাগছিলো চারিদিক আমি আর বুদ্ধিরাজ অনেকক্ষন সেই সব মহান মানুষদের স্মৃতি স্তম্ভের মাঝে বসে রইলাম۔۔নিচে হোটেল তিনটে দেখা যাচ্ছে۔۔একজন বিদেশী ভদ্রমহিলা আমাদের বিস্কুট খেতে দিলেন۔۔আবার নামা শুরু করে কুড়ি মিনিটের মধ্যে হোটেল পৌঁছে গেলাম۔۔ঘড়িতে তখন দেড়টা۔۔ঠিক হোলো আমরা ওদের জন্য ওয়েট করবো۔۔ওরা এলে একসাথে ফেরিচের উদ্দ্যেশে বেরোবো۔۔۔আমি ডিম্ সেদ্ধ আর সুপ্ খেলাম۔۔۔অনেকক্ষন ওয়েট করেও ওরা নামছেনা দেখে একটু টেনশন হচ্ছিলো۔۔এদিকে টু তাড়া দিচ্ছে বেরোনোর জন্য۔۔কিন্তু আমি আর এগোতে চাইছিলামনা۔۔টিমের কন্ডিশন না দেখে আর এগোনো ঠিক হবেনা۔۔বসে বসে আমার একটু ঘুম পেয়ে গেছিলো۔۔۔প্রায় চাররাত ঘুম নেই۔۔টেবিলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছি۔۔হঠাৎ টু খবর দিল ওরা নামছে۔۔ঘড়িতে টাইম চারটে۔۔সুপ্রিয় সবার আগে হোটেলে ঢুকে জানালো লিডারের খুব শরীর খারাপ ۔۔
এই এত আলো এত আকাশ
ধড়ফড় করে ঘুম থেকে উঠে বাইরে বেরিয়ে দেখি লিডার নামছে۔۔লোবুচে পৌঁছে নাকি হোটেলে ঢুকতেই পারিনি বেচারা۔۔রাস্তার ওপরেই বসে পড়ে বমি করে ফেলেছে۔۔সাথে অসম্ভব মাথা যন্ত্রনা۔۔অক্সিজেন দিয়ে নামিয়ে আনতে হয়েছে۔۔আমরা মেডিকেল কলেজের ওখান থেকে তিনটে ছোট ছোট অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে গেছিলাম۔۔এর আগে আমি আর সুপ্রিয় সেগুলো ব্যবহার করেছি۔۔যাইহোক লিডার এসে জানালো শরীর পারমিট করছেনা۔۔তাই আজকে আর এগোনো হবেনা ঠিক হলো۔۔নন্দিনীদি তারও প্রায় আধঘন্টা পরে পৌঁছলো۔۔যেহেতু থুকলা পাস থেকে অনেকটা স্টিপ ডিসেন্ড তাই খুব সাবধানে নেমেছে۔۔
বুদ্ধিরাজরা আজকে আর ফেরিচে যাওয়া হবেনা শুনে খুবই রাগান্বিত হয়ে চুপ করে রইলো۔۔কিন্তু আমরা পাত্তা দিলামনা۔۔আগে শরীর তারপর সব কিছু۔۔۔ডিম্ সেদ্ধ আর সুপ্ খাইয়ে সবাইকে চাঙ্গা করলাম۔হোটেলের মালকিন আমাদের পপকর্ন খেতে দিলো সফল ট্রেক করে ফেরার ট্রিট হিসেবে۔۔۔সেদিন রাতে খুব হাসি ঠাট্টা গল্পের মধ্যে সন্ধ্যেটা কেটে গেলো۔۔বুদ্ধিরাজরাও তখন আমাদের সাথে হাসিগল্পে মেতে গেছিলো আর ট্রেক সম্পূর্ণ করে ফেরার পথে একটা মানসিক শান্তিও থাকে۔۔তাই আমরা খুবই বিন্দাস মেজাজে ছিলাম۔۔সকালবেলায় বুদ্ধিরাজ ওয়ানের ব্যবহারও ক্ষমা করে দিয়েছিলাম۔۔
পরদিন খুব তাড়াতাড়ি বেরোতে হবে ঠিক করে যে যার মতো শুতে চলে গেলাম۔۔বুদ্ধিরাজ ওয়ান টার্গেট দিলো আগামীকাল নামচেবাজার পৌঁছতেই হবে۔۔তাহলে পরেরদিন লুকলা۔۔আজকে তেরো তারিখ۔۔আগামীকাল নামচে পৌঁছলে হিসাবমতো পরদিন লুকলা তাহলে ষোলোতে আমরা কাঠমান্ডু ব্যাক করতে পারবো۔۔সতেরো তারিখ বুদ্ধিরাজ ওয়ানের গেস্ট আসবে লুকলাতে۔۔
অনেক সকালে উঠে আলুর পরোটা ডিম্ সেদ্ধ দিয়ে ব্রেকফাস্ট করে রওনা দিলাম۔۔ভীষণ ভাল ওয়েদার۔۔মনেও খুব আনন্দ۔۔নিচে নামছি ঠান্ডাও কমছে۔۔নদী ক্রস করে বামদিকে ওপরে ডিঙবোচের রাস্তা চলে গেছে,আমরা ডানদিক দিয়ে নিচে নামা শুরু করলাম۔۔ফেরিচে গ্রামটা সোলা খোলার সাথে এক লেভেলে۔۔এখানে নেপাল গভর্নমেন্টের একটা রেস্কিউ ক্যাম্প আছে۔۔এভারেস্ট থেকে যেসমস্ত অভিযাত্রী বা পদযাত্রীরা অসুস্থ হয়ে ফেরেন তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা করা হয় এখানে۔۔এত সুন্দর গ্রাম খুবই কম দেখেছি۔۔চারিদিকে পিক۔۔আমরা প্রচুর ফটো তুলতে তুলতে এগিয়ে চলেছি۔۔ঘন্টা দেড়েকের মধ্যে গ্রামটা পেরিয়ে এগিয়ে গেলাম۔۔ আবার নদী ক্রস করে অনেকটা ওপরে উঠে আপার প্যাংবোচের রাস্তায় পৌঁছলাম۔۔কী সুন্দর যে গ্রামগুলো۔۔যাওয়ার সময় মেঘলা ওয়েদার থাকায় ভালো করে উপভোগ করতে পারিনি۔۔এখন তার শোধ তুলে নিচ্ছি۔۔খালি পিছন ফিরে তাকাচ্ছি আর ছবি তুলছি۔۔পাহাড়ের মাথায় একটা চোর্তেন ক্রস করে নামা শুরু হলো۔۔লোয়ার প্যাংবোচে গ্রামে পৌঁছে গেলাম۔۔গ্রামের মানুষ তাদের নিত্তনৈমিত্তিক কাজকর্মে ব্যস্ত۔۔বাচ্চা বাচ্চা মেয়েরা কাপড় কাচছে۔۔ফেরিওয়ালা নামচেবাজার থেকে ফেরি এনে বিক্রি করছে۔۔এসব দেখতে দেখতে চলেছি۔۔۔দুপুর বারোটা মতো বাজে۔۔মানে প্রায় সাড়ে চার ঘন্টা হাঁটছি আমরা۔۔আলুর পরোটা কখন হজম হয়ে গেছে۔۔সুপ্রিয় আর দুই বুদ্ধিরাজ অনেক আগে এগিয়ে গেছে۔۔সেই ফেরিচেতে শেষ দেখা হয়েছিল۔۔তখনই কথা হয়েছিল থ্যাংবোচেতে আমরা চিকেন ভাত লাঞ্চ করবো۔۔সেইমতো ওরা আগে পৌঁছে অর্ডার দেবে۔۔আমরা ফটো তুলতে তুলতে এগোবো۔۔কিন্তু প্যাংবোচেতে আমরা খিদে চাপতে না পেরে একটা হোটেলে পিৎজা আর ভেজ ওমলেট অর্ডার করলাম۔۔ঘন্টাখানেক সময় নষ্ট করে জঘন্য খাবার খেয়ে আবার রওনা দিয়ে সেই পরিচিত রাস্তায় প্যাংবোচে ঢোকার মুখের তোরণ অতিক্রম করে নদী পার করে দেবচে গ্রামের দিকে রওনা দিলাম۔۔তখন প্রায় দেড়টা বাজে۔۔
দেবচে গ্রাম পেরিয়ে একটা হোটেলের লনে দেখি সুপ্রিয় গোমড়া মুখ করে বসে আছে۔۔আমরা আসছিনা দেখে ওরা ওখানে অপেক্ষা করা শুরু করে۔۔বুদ্ধিরাজদ্বয় খেতে গেছে۔۔আর বেচারা সুপ্রিয় কথার দাম রাখার জন্য না খেয়ে মুখ চুন করে বসে আছে۔۔এদিকে আমরা খেয়ে নিয়েছি শুনে তো আরও বিমর্ষ হয়ে পড়লো۔۔যাহোক করে সিচুয়েশন হ্যান্ডল করে আবার হাঁটা শুরু হলো۔۔এবার সেই থ্যাংবোচে ওঠার চড়াই۔۔তখন আর শরীর দিচ্ছেনা۔۔প্রায় চারটে বাজতে চলেছে۔۔থ্যাংবোচে পৌঁছে দেখা গেলো নামচেবাজার থেকে আজকে এতো মানুষ এসেছে যে কোথায় কোনো হোটেল ফাঁকা নেই۔۔যাওয়ার সময় যে মহিলার হোটেলে ছিলাম সেই হোটেলও ভর্তি۔۔আর যেহেতু মনাস্ট্রি এলাকা তাই বেশি হোটেলও নেই۔۔কোনো হোটেল না পেয়ে আমরা হতোদ্যম হয়ে বসে রইলাম۔۔সকাল থেকে প্রায় আট ঘন্টা হেঁটে আমাদের আর ক্ষমতাও নেই এই অবস্থায় আরও হাঁটার۔۔আর নামচে পৌঁছতে গেলে কমপক্ষে আরও তিনঘন্টা হাঁটতে হবে۔۔বুদ্ধিরাজরা প্রচন্ড রেগে গেছে۔۔۔ওরা হোটেল খোঁজার ব্যাপারে কোনো হেল্প করছেনা۔۔۔আজকে বোধহয় সারারাত না খেয়ে ঘুমিয়ে আকাশের নিচে কাটাতে হবে۔۔
পূরবী কোথা থেকে একটা ঘর জোগাড় করে ফিরে এল! আমরা তখনও মনাস্ট্রির মাঠে বসে আছি। থাকতে পারব কি না, সেই অনিশ্চয়তার মধ্যে অন্তত একটা ঘর পাওয়া গেছে এই অনেক!আর দেরি না করে আমরা দৌড়ে দৌড়ে হোটেলে পৌঁছে গেলাম। থ্যাংবোচেতে এটাই দ্বিতীয় হোটেল, যেখানে আমরা উঠলাম। এর আগে ছিলাম দিদির হোটেলে। এখানে সব মিলিয়ে এই দুটোই হোটেল।
এদিকে বুদ্ধিরাজদের কোনও পাত্তাই নেই, বেপাত্তা! আমরাও ভাবলাম, ওদের পাত্তা দিয়ে লাভ কী! নিজেদের মতো ফ্রেশ হয়ে সোজা ডাইনিংয়ে গিয়ে বসলাম। বহুদিন পর বাড়িতে ফোন করে আমাদের সফল অভিযানের খবর জানালাম। ওপাশে নিশ্চয়ই স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়ল! তারপর পেটপুরে ডিনার করে সটান বিছানায়। পরদিন কী হয়, তা পরদিনই দেখা যাবে। আপাতত পাহাড়ের কোলে নিশ্চিন্ত ঘুম!
কুছ পরোয়া নেহি
পরদিন সকালেই বুদ্ধিরা জানিয়ে দিল ওদের পাওনা মিটিয়ে দিতে হবে। ওরা আজই লুকলা পৌঁছে যাবে, আর আমাদের সঙ্গে আর যাবে না। আমরাও কোনও পরোয়া না করে ওদের পাওনা মিটিয়ে দিলাম। পূরবী আর সুপ্রিয় আমাকে ওদের সঙ্গে ডিল করার জন্য সামনে ঠেলে দিয়ে নিজেরা দিব্যি পালিয়ে বাঁচল! আমিও যথাসম্ভব গম্ভীর মুখ করে ওদের সঙ্গে কথাবার্তা সেরে নিলাম। এরপর শুরু হল নতুন পোর্টার খোঁজার পালা। এদিকে নন্দিনীদি তখন হেলিকপ্টারে লুকলা ফিরে যাওয়ার প্ল্যান করছে। আমরাও বেশ উৎসাহ দিচ্ছিলাম, যাক, অন্তত একজন তো আকাশপথে আরামে ফিরে যাবে! কিন্তু হেলিকপ্টারের ভাড়া শুনে ৩৩,০০০ টাকা! আমাদের উৎসাহে সঙ্গে সঙ্গে ভাঁটা পড়ল। সবাই মিলে একবাক্যে ভাঙচি দিয়ে দিলাম।
সকাল সাড়ে সাতটার মধ্যেই আজকের হাঁটা শুরু হয়ে গেল। আজও দীর্ঘ পথ। গন্তব্য আমাদের প্রিয় নামচে বাজার। এদিকে সন্দেহবাতিকগ্রস্ত সুপ্রিয় নতুন পোর্টারদের খোঁজে তাদের পিছু ধাওয়া করে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। আর আমরা? আমরা যথারীতি নিজেদের ছন্দে হেলতে দুলতে, থেমে থেমে, ছবি তুলতে তুলতে এগিয়ে চলেছি। শেষমেশ নামচে বাজারে পৌঁছলাম। সেখানে বহুদিন পর ভালো করে স্নান করে শরীর-মন দুটোই যেন জুড়িয়ে গেল। তারপর সেই ধর্মপ্রাণ বৌদ্ধ মহিলার হাতে তৈরি চিকেন দিয়ে পেটপুজো। খাওয়া শেষ হতেই আর কিছু মনে নেই। সটান ঘুম! এতদিনের হাঁটাহাঁটির পর নামচের বিছানাটা যেন স্বর্গের বিছানা!

জোরসালের জোড়া শিঙাড়া
আজ আমাদের শেষ হাঁটার দিন। নামচে বাজার থেকেই ফোন করে গাইড এজেন্সিকে বলে রেখেছি লুকলা থেকে রামেছাপের ফ্লাইটের টিকিটের ব্যবস্থা যেন করে রাখে। তাই মনটা বেশ ফুরফুরে। অভিযান প্রায় শেষ, এবার বাড়ি ফেরার পালা! কিন্তু আনন্দের মাঝেই একটা ছোট্ট সমস্যা আজ আমাদের হাঁটতে হবে প্রায় ২০ কিলোমিটার! ফলে স্বাভাবিকভাবেই আমাদের কারও আর হাঁটতে ইচ্ছা করছে না। জোরসালে পৌঁছে হঠাৎ চোখ আটকে গেল একটা শোকেসে। সেখানে সাজানো রয়েছে সদ্য ভাজা, একেবারে গরমাগরম শিঙাড়া! সুপ্রিয় অত্যন্ত স্বাস্থ্যসচেতন। তাই সে শিঙাড়ার দিকে তাকিয়েও দেখল না। আর আমরা বাকি তিনজন? আমাদের কাছে তখন স্বাস্থ্য, ডায়েট এসব শব্দের কোনও অস্তিত্বই নেই। দিব্যি দুটো করে শিঙাড়া দিয়ে ব্রেকফাস্ট সেরে আবার হাঁটা শুরু করলাম।
আজ রাস্তায় আমরা কতবার যে ব্রেক নিয়েছি, তার হিসেব রাখাই মুশকিল। দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে, অথচ পথ তখনও অনেক বাকি। লাঞ্চও বেশ কিছুক্ষণ আগেই সেরে নিয়েছি। এবার শুরু হল চায়ের তেষ্টা। অতএব আবার একটা জায়গায় বিরতি। বিকেল হয়ে এল। আমি প্রায় ঘোষণা করেই দিলাম আর হাঁটব না! পূরবী তখন আমাকে নিয়ে পড়েছে। আমাকে চিপস, বাদাম এইসব কিনে দিয়ে একেবারে ছেলে ভোলানোর মতো করে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। “এই নে , খা আর হাঁট!” যেন খুঁড়র কল!
এদিকে সুপ্রিয় সম্ভবত পোর্টারদের পিছনে ছুটতে ছুটতে আমাদের অনেক আগেই লুকলা পৌঁছে গেছে! আমরা নিজেদের স্বাভাবিক ধীরগতিতে এগোতে এগোতে দেখলাম সন্ধে নেমে আসছে। তখন পূরবী অন্য কোথাও থাকার ব্যবস্থা করার কথা ভাবতে শুরু করেছে। কিন্তু পরদিন সকাল ৮:৩০-এর ফ্লাইট। তার আগে আবার প্রায় এক ঘণ্টার ট্রেক করে এয়ারপোর্টে পৌঁছনো ভাবতেই আমাদের গায়ে কাঁটা দিচ্ছে! অগত্যা আর উপায় নেই। হেড টর্চ জ্বেলে আবার হাঁটা শুরু করলাম। চৌরিখরকার পর থেকেই রাস্তা বেশ আপহিল। এতক্ষণে পায়ে আর একটুও জোর নেই। হাঁটছি ঠিকই, কিন্তু মনে হচ্ছে পা দুটো যেন আমাদের কথা শুনতেই চাইছে না।
পথে গ্রামের মানুষজনও আমাদের দেখে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছিলেন। কেউ রাস্তা দেখিয়ে দিচ্ছেন, কেউ পথের দিক বুঝিয়ে দিচ্ছেন। সেই অন্ধকারে তাঁদের সাহায্য যেন আমাদের শেষ পথটুকুর ভরসা হয়ে উঠেছিল। অবশেষে একসময় লুকলার প্রবেশপথে পৌঁছলাম। আর সেখানে গিয়ে দেখি সুপ্রিয় বেচারা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে! এতক্ষণে বোধহয় আমাদের নিয়ে ওরও বেশ দুশ্চিন্তা শুরু হয়ে গিয়েছিল।
শেষমেশ সবাই একসঙ্গে হোটেলে পৌঁছলাম। হোটেলটা একেবারে এয়ারপোর্টের পাশেই। ঘরে ঢুকেই মনে হল হ্যাঁ, এবার সত্যিই অভিযান শেষ! তারপর আর কী! তন্দুরি চিকেন দিয়ে আমাদের সফল অভিযান উদযাপন হল। দীর্ঘ পথ, ক্লান্তি, ঠান্ডা, উচ্চতা, হাসি-কান্না, ঝগড়া, পোর্টার-খোঁজা, হারিয়ে যাওয়ার ভয়সবকিছুর শেষে সে ই তন্দুরি চিকেন যেন আমাদের বিজয়ভোজ! পরদিন সকালে লুকলা থেকে ফ্লাইট ধরার আগে শেষবারের মতো পিছন ফিরে তাকালাম। বিদায়, আমার প্রিয় এভারেস্ট। বিদায়, আমার প্রিয় খুম্বু উপত্যকা। এই পাহাড় আমাদের শুধু একটা ট্রেক দেয়নি। দিয়েছে অসংখ্য গল্প, অগণিত হাসির মুহূর্ত, কিছু কঠিন পরীক্ষা, আর এমন কিছু স্মৃতি যেগুলো জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সঙ্গে থাকবে। এই অভিযান আমার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ কিছু মুহূর্তের তালিকায় নয় বরং সেই তালিকার একেবারে শীর্ষে, সারাজীবন থেকে যাবে।