সিপিয়া টোনের ছবি
- 07 November, 2026
- লেখক: অয়ন সেন
আমি যত দূরেই যাই/আমার সঙ্গে যায়/ঢেউয়ের মালা-গাঁথা/এক নদীর নাম-/আমি যত দূরেই যাই।/আমার চোখের পাতায় লেগে থাকে/নিকোনো উঠোনে/সারি সারি লক্ষ্ণীর পা/আমি যত দূরেই যাই। - সুভাষ মুখোপাধ্যায়
কতটা মুক্ত হলে লেখা যায়, ‘আমার এই পথ চলাতেই আনন্দ’! ক্লেদরক্তপূতিগন্ধময় জীবনের সম্পূর্ণ বিপ্রতীপে প্রতিনিয়ত দাঁড়াতে হয় বুঝি, নইলে এই অনুভূতি আসে না মনের গহীনে। আত্মজিজ্ঞাসু মানুষ তার নানাবিধ সমস্যার প্রতিকার করার মধ্যেই হয়তো খুঁজে নেয় আলোআঁধারি কোনো পথ, ‘The Road less Traveled’, সে পথে সে স্বেচ্ছায় একা চলতে চায়, নিজেই সে হাত ধরে নিজের, তার যাত্রা শুরু হয় নিজেকেই খুঁজে বার করার, এই পথ চলতে চলতেই সে সম্মুখীন হয় নানা অভিজ্ঞতার, অনেক সময় ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অনুভূতিও সংবেদনশীল মানুষের মধ্যে সৃষ্টি করতে পারে ইন্দ্রিয়াতীত অবাঙমানসগোচর জগৎ, যা বিচারের অতীত, অপ্রকাশ্য। তা আলোর বিচ্ছুরণের মতো যেন, যার বিবরণ ভাষায় প্রকাশ করতে যাওয়া অসম্ভব, অনেকটা পথ অতিক্রম করে এসে পিছন ফিরে তাকালে শুধু দেখা যায় ধূসর অ্যালবামে রাখা ভুলে-যাওয়া আখ্যান-উপাখ্যানের স্মৃতিবাহী কিছু সিপিয়া টোনের ছবি, যার উপর পড়ন্ত বিকেলের আলো এসে মায়াময় করে তুলেছে সব কিছু!
১
দেখি একদিন আমার থেকে শব্দরা ছুটি নেয়। এত দিন নানা রঙের মেলায় যারা ছিল আমার সর্বক্ষণের সাথী। মনে পড়ে কত ঝড়ের রাতে কলমের মুখে মনের কথারা উপচে পড়তো, স্রোতের মতো বহে যেত শব্দরা, কত নিদ্রাবিহীন রাতে পাশে এসে বসে থাকতো তারা নিশ্চুপে, আহত বা অপমানিত মুহূর্তে হাত রাখতো পিঠে, আমি সহজ হযে যেতাম ওদের স্পর্শে। এখন সব অলীক মনে হয়। কিন্তু এভাবেই হয়তো শুরু হয় নতুন অধ্যায়। নিজের মুখোমুখি হওয়া, যা সবচেয়ে কঠিন। দেখতে দেখতে চলে যায় কিছুটা সময়, কালপ্রবাহে তা হয়তো সামান্যই, তবু যথারীতি ক্ষত সুগভীর। আমি দেখে যাই শুধু, বলি নিজেকেই, আর কি কি তির আছে ওগো নিয়তি তোমার তূণীরে? দেখি পরমুহূর্তেই সন্ধ্যার আকাশে অস্তরাগেও ফুটে ওঠে অনুরাগের রঙ, তারারা জ্বলে ওঠে আকাশে, মোমবাতির শিখায় দগ্ধ হাত নিয়ে উন্মাদ শিল্পী এঁকে চলেন অসংখ্য সূর্যমুখী, সারাদিন নিজের তাপেই দগ্ধ হওয়া সূর্য মাথা রাখে নদীর বুকে। শব্দরা অর্থহীন এখন, অথবা যা কিছু বলা হয়েছিল চরম আবেগে, কোনো অর্থই ছিল না তার কখনও। এখন ঘরের কোণে বসে দিন গোনা শুধু সেই বন্ধুর জন্য, যে হাত ধরে নিয়ে যাবে আমায়। তার আগে আরেকটু দেখে নেওয়া, বুক ভরে ঘ্রাণ নেওয়া, ছুঁয়ে থাকা শব্দের শরীর...
২
ভোরবেলা বারান্দায় এসে দাঁড়ালে দুটি বুলবুলি পাখিকে রোজ দেখতে পাই। তারা টবে রাখা টগর গাছের ডালে এসে বসে, পরমুহূর্তেই উড়ে যায় ইলেকট্রিকের তারে, ইতিউতি দেখে আবার ফিরে আসে, এ খেলা ওদের চলতেই থাকে আমার নীরব উপস্থিতি গ্রাহ্য না করে।
বাঁশগাছের ঝাড়ে উত্তুরে হাওয়া বয় সরসর শব্দে, কিরকির শব্দ ওঠে নিঝুম দুপুরে, বাঁশের কচি পাতার সবুজ রঙ, বাতাসে তাদের কাঁপন – শীতের মিঠে রোদে চাইনিজ ক্যালিগ্রাফির প্রশান্তি নিয়ে আসে, চুপ করে বসে থাকতে ইচ্ছে করে, মুহূর্ত প্রিয় হয় নিমেষে।
একদিন সন্ধ্যাবেলা বাড়ি ফিরতেই মেয়ে ছুটে এসে হাত ধরে টেনে নিয়ে যায় বারান্দায়, দেখি সেখানে রাখা পরিত্যক্ত টবে একটা ঘুঘু পাখি ডিমে তা’ দিচ্ছে, মনে পড়ে ছোটবেলায় আমাদের বাড়ির প্লাস্টারহীন ইঁটের গাঁথনির দেওয়ালের ঘুলঘুলির বাইরের কুঠুরিতে শালিখ পাখির ডিম দেখতে গিয়ে মা-শালিখের কাছ থেকে ঠোক্কর খাওয়ার কথা। ঘুঘুপাখিটির ঘুমন্ত চোখ যত না দেখি, তার চেয়েও ভালো লাগে মেয়ের চোখের সীমাহীন বিস্ময়।
পাইন বনের পাশ দিয়ে পাহাড়ি পথ বাঁক নিয়েছে সামনে। হঠাৎ কানে আসে নাম-না-জানা পাখির শিস্ – কখনও কাছে, কখনও একটু দূরে। আর এগোনো হয়ে ওঠে না আমার, পাখিটাকে খোঁজার ইচ্ছেও হয় না, শুধু সেই অলীক সুর কান পেতে শুনি, হিমেল হাওয়া এসে জড়িয়ে যায় শরীরে, ফিরতে হবে-এই দুঃখ অন্তত কিছুক্ষণের জন্য ভুলে থাকতে চেয়েছিলাম তখন, এমন কত দুঃখই না ভুলতে চাই আমরা – আমৃত্যু।
লেকের ধারে বসেছিলাম একা। স্থির জলে গাছ, নীল আকাশের অবিচল প্রতিবিম্ব জলছবি যেন। সহসা কেঁপে ওঠে জলের ক্যানভাস, বিস্রস্ত হয়ে যায় সমস্ত ছবি। দিশেহারা হয়ে যাই সাময়িক, তবু বসে থাকি সেখানেই, কোনো এক সময় সব কিছু শান্ত হয়ে যাবে, জেনে। অপেক্ষাটুকু থাক না হয়।
আলো ঝলমলে পার্ক স্ট্রিটের ফুটপাথ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে দেখেছি ধুলোময়লামাখা বাচ্চা ছেলে হাতে এক গুচ্ছ বেলুন নিয়ে বসে থাকে ক্রেতার অপেক্ষায়, রেস্তোরার দামি কাচে তার ছায়া পড়ে, কিন্তু চোখের কোণে শুকিয়ে যাওয়া জলের দাগ ঢাকা পড়ে যায় উজ্জ্বল আলোয়। রেস্তোরার ভিতরের বাতাস তখন ভারী হয়ে উঠেছে কালো কফির সুঘ্রাণে। অনুভূতির সত্য প্রকাশ, কঠিন বাস্তব থেকে কখন যেন মুখ ফিরিয়ে নিই পেলব পরাবাস্তবের স্বপ্নালু কল্পনায়।
৩
মুরাকামির উপন্যাসের চরিত্ররা সকালে ঘুম থেকে উঠে কফি করে, রেকর্ডে জ্যাজ শোনে, নুডলস বানায়, বই পড়ে, হাঁটতে বেড়োয়, অজানা মানুষের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে, বাস্তবিক নির্লিপ্ত জীবনের একটি ছন্দের স্বাদ পেতে থাকি আমরা, তারপরই বাস্তব মিশে যেতে থাকে পরাবাস্তবতায়, কেউ হারিয়ে যায় জীবন থেকে, স্মৃতিরা জেগে ওঠে অবচেতনের গহ্বর থেকে, আর বিড়াল প্রায়ই হয়ে ওঠে বাস্তব ও পরাবাস্তব জগতের মধ্যে এক রহস্যময় সেতু। মুরাকামির এমনই একটি চরিত্র একটি জার্মান গল্প পড়ে যেখানে কোনো এক পথিক একটি শান্ত, মনোরম রেল স্টেশনে এসে পৌছোয়, যেখানে অচিরেই সে আবিস্কার করে যে কোনো মানুষ নেই সেখানে, আছে দৈত্যাকার কিছু বিড়াল যারা তাকে বহিরাগত শত্রু হিসেবেই গণ্য করে! সে উপলব্ধি করে যে, অসংখ্য ট্রেন সেখান দিয়ে গেলেও কোনো ট্রেন সেই স্টেশনে থামে না, যার ফলে পালাবার পথ নেই তার, এই শহরেই তাকে হারিয়ে যেতে হবে চিরকালের জন্য! পড়তে পড়তে কতভাবে যে গল্পের চরিত্র হয়ে উঠি আমি, কারণ আমারও পালাবার পথ নেই কোনো, “This is the way the world ends/Not with a bang but a whimper.”
৪
একটি না-লেখা উপন্যাসের জনৈক চরিত্র যে কিনা অসংখ্য মানুষের ভীড় নয়, শুধু হৃদয়ের ছোঁয়াটুকু তুমুল ঝড়ের রাতেও আগলে রাখতে চেয়েছিল, তার কাছে অস্তিত্বের ভীতিপ্রদ দিক ছিল প্রতিদিন একই মুখ দেখা, একই কাজ করে যাওয়া, একই কথা বলা ও একই পথে ঘুরেফিরে একই হতাশার সম্মুখীন হওয়া। গাছের ডালপালার ফাঁক দিয়ে এসে-পড়া বিকেলের নিঝুম আলোয় পথ চলতে চলতেই একদিন সে বুঝতে পেরেছিল সকলের জন্য যে পথ, সে পথে নিশ্চিন্ত চলাচল তার জন্য নির্ধারিত নয়, নিজেকেই বারবার নিরুচ্চার প্রশ্ন করেছিল সে, তবে কোন পথে যাবে সে? উত্তর মেলে নি যথারীতি। শেষে পথের হদিশ না জেনেই আবার অজানা পথেই নেমেছিল সে, রক্তাক্ত হয়েছিল পা, তবু চলা থামে নি তার।
এইরকমই উপন্যাস-গল্পের অসংখ্য চরিত্র আচ্ছন্ন করে রাখে আমায়, আমি তাদের সাথে কথা বলি, তাদের কাছে নিজের ক্ষোভযন্ত্রণা উগড়ে দিই রাত্রির অন্তিম প্রহরে, তারা আগলে রাখে আমায়, ঝড় থেমে যাওয়ার আশ্বাস দেয় আর আমার এভাবেই মনে পড়ে যায় আর একটি গল্প: কোনো এক যুবক তার নিজের স্বরূপ সন্ধানে পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছিল, কিন্তু তার অনুসন্ধিৎসু প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর নতুন প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছিল তার মনে, অবশেষে একদিন সে খোঁজ পেল এক কারিগরের যে নাকি বিশেষ কোনো আয়না তৈরী করতে পারতো! নিঝুম এক পাহাড় অতিক্রম করার পর যুবক তার সন্ধান পেল। সেই কারিগর তার প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে তার হাতে তুলে দিল একটি আয়না। যুবকটি আয়নাটি হাতে নিয়ে সেদিকে তাকাতেই অবাক হয়ে গেল, আয়নার তার কোনো প্রতিফলন তৈরীই হয়নি, আদপে কিছুই দেখা যাচ্ছে না তাতে! যুবকটি বিব্রত হয়ে কারিগরকে জিজ্ঞাসা করল, আয়নাটি কি ভাঙা? নয়তো কিছুই দেখা যাচ্ছে না কেন? কারিগর মৃদু হেসে জবাব দিল, এটা তা-ই দেখাচ্ছে, যা থেকে যাবে, যখন তোমার নিজেকে খোঁজা শেষ হবে।
৫
এরপর যে কোনো শব্দই বাহুল্য মনে হয় আমার, চোখ বন্ধ করতেই দেখতে পাই, শঁপ্যার নকটার্নের মূর্ছনার সাথে তাল মিলিয়ে কোবাল্ট ব্লু আর আলট্রামেরিন রঙে তাঁর ক্যানভাস রাঙিয়ে নিচ্ছেন চন্দ্রাহত এক শিল্পী, তাঁর মুখে ভেঙেচুরে যাচ্ছে অজস্র যন্ত্রণার মানচিত্ররেখা, তুলির টানে এক এক করে ফুটে উঠছে তারা, ঠিক যেভাবে কোনো এক দিন তাঁর হাতের তালুতে জ্বলন্ত মোমবাতির শিখার স্পর্শে ফুটে উঠেছিল দগদগে ক্ষত.... তারপর আজীবন যন্ত্রণার মহাকাব্য শুধু!
“I would leave everything here: the valleys, the hills, the paths, and the jaybirds from the gardens, I would leave here the petcocks and the padres, heaven and earth, spring and fall, I would leave here the exit routes, the evenings in the kitchen, the last amorous gaze, and all of the city-bound directions that make you shudder, I would leave here the thick twilight falling upon the land, gravity, hope, enchantment, and tranquillity, I would leave here those beloved and those close to me, everything that touched me, everything that shocked me, fascinated and uplifted me, I would leave here the noble, the benevolent, the pleasant, and the demonically beautiful, I would leave here the budding sprout, every birth and existence, I would leave here incantation, enigma, distances, inexhaustibility, and the intoxication of eternity; for here I would leave this earth and these stars, because I would take nothing with me from here, because I've looked into what's coming, and I don't need anything from here.”
― László Krasznahorkai