এভারেস্ট বেস ক্যাম্প : সাগর মাথার পায়ের কাছে - চতুর্থ পর্ব

'ডরব না তার ভ্রুকুটিতে'

আজকে দুপুর দেড়টার মধ্যে লোবুচে পৌঁছে গেছি۔۔۔রাত আটটা পর্যন্ত সময় কাটানো হবে কী করে কে জানে!লাঞ্চে আমি আর নন্দিনীদি পিৎজা অর্ডার করলাম আর সুপ্রিয় পূরবী ভাত۔۔۔আমি যদিও ভাত নিতে বারণ করছিলাম কারণ খাওয়ার ইচ্ছা আমাদের সবার একেবারেই চলে গেছে۔۔۔ইতিমধ্যে প্রচুর বিদেশী ট্রেকার ডাইনিং দখল করে নিয়েছে۔۔۔যেহেতু সবাই গ্রূপের সাথে এসেছে তাই এবারে কারও সাথেই বিশেষ আলাপ জমেনি۔۔۔সবাই সবার গ্রূপের সাথেই ব্যস্ত۔۔۔আর লোকাল মানুষদের সাথেও সেই ভাবে আলাপচারিতা করা যায়নি কারণ তারা অতিথিদের নিয়ে ব্যস্ত۔۔۔আমরা আর কী করবো! ডাইনিংয়ে বসে সকলের কান্ডকীর্তি দেখতে লাগলাম۔۔۔এর মধ্যেই লাঞ্চ এসে গেলো۔۔۔পিৎজা খুবই ভালো ছিল আমরা চটপট খেয়ে ফেললাম۔۔۔বেচারা সুপ্রিয় আর পূরবীর তো ভাত মুখেই ঢুকছেনা۔۔۔খাওয়া দাওয়া করে একটু বাইরে ঘুরতে বেরোলাম এক্লাইমেটাইজেশন করার জন্য۔۔۔অনেকেই দেখলাম হোটেলের সামনের উঁচু ঢিবিটার ওপর উঠতে গেলো۔۔۔বাইরে বেশিক্ষন থাকা গেলোনা কারণ ততক্ষনে অসম্ভব ঝোড়ো হাওয়া দিতে শুরু করেছে এবং সাথে বৃষ্টি۔۔۔ওয়েদার অসম্ভব খারাপ۔۔۔আমরা আবার সুড়সুড় করে ডাইনিংয়ে সেঁধিয়ে গেলাম۔۔۔কিন্তু সেই বৃষ্টি যে পরে তুষারঝড়ে পরিণত হবে তখনও  আন্দাজ হচ্ছেনা۔۔۔

আবার সেই ডাইনিংয়ে বসে অনন্ত প্রতীক্ষা কখন ডিনার হবে আর শুতে যাবো۔۔۔খুব ঠান্ডা আজকে তাই সবাই আগুন পোহাচ্ছে۔۔۔থ্যংবোচের সেই একা ট্রেকারও আমাদের হোটেলে উঠেছেন۔۔۔উনি ওনার গাইডের সাথে তাস খেলছিলেন۔۔۔সুপ্রিয় গিয়ে ওখানে যোগ দিলো۔۔۔সাথে আরও একজন অন্য গ্রূপের গাইড۔۔۔ওদের তবু সময়টা কিছুটা কাটলো۔۔۔আমরা টুকটাক চা কফি অর্ডার দিয়ে যাচ্ছি۔۔۔যত দামই হোক লিকুইড ইনটেক করতে হবে۔۔۔আর নন্দিনীদি জল খাচ্ছে আর দৌড়োচ্ছে۔۔۔বাইরে বৃষ্টি ক্রমাগত বাড়ছে۔۔এইভাবে একসময়ে ডিনার এসে গেলো۔۔۔রাতে পিৎজা আর পটেটো ফ্রাই নেওয়া হয়েছিল۔۔কেওই ভালো করে খেতে পারলামনা۔۔রাতে শুতে গিয়ে দেখি এখন আর বৃষ্টি পড়ছেনা۔۔۔বাইরে স্নোফল হচ্ছে সাথে প্রচন্ড ঝোড়ো হাওয়া۔۔۔বুকে ঢিপঢিপানি নিয়ে শুতে গেলাম۔۔۔কালকের পরিণতি কী আছে কে জানে۔۔

রাতে ঘুম হলোনা۔۔۔আবার সেই ব্রিথিং ট্রাবেল সাথে চেস্ট পেন শুরু হয়েছে۔۔۔ যথারীতি দরজা খুলে শুলাম۔۔এখানে জানালা খোলা গেলোনা কারণ থুকলা থেকেই দেখছি সব জানালা সেলোটেপ দিয়ে আটকে রাখা আছে۔۔۔সকালে ঘুম ভেঙে দেখি চারিদিক সাদা হয়ে গেছে۔۔۔ওয়েদার অসম্ভব খারাপ এবং তখনও স্নোফল হচ্ছে এবং কালকের থেকেও বেশি হাওয়া দিচ্ছে۔۔এককথায় আজকে রেস্ট ডে হওয়া উচিত۔۔

সুপ্রিয় এসে জানালো ওর অসম্ভব মাথা যন্ত্রনা করছে এবং সাথে বমিভাব۔۔۔একিউট অল্টিটিউড সিনড্রোম۔۔আমার ব্রিথিং ট্রাবলও যথারীতি উপস্থিত۔۔সাথে নাকের ওপর দিকে অসহ যন্ত্রনা۔۔মনেহচ্ছে কেও বা নাকের ওপরটা আঙ্গুল দিয়ে চেপে ধরে রেখেছে۔۔۔

কী করা হবে কিছু বোঝা যাচ্ছেনা۔۔۔লিডার বললো এখনই বেরোনোর জন্য রেডি না হয়ে আমরা ব্রেকফাস্ট করে কিছুক্ষন ওয়েট করি۔۔۔যদি ওয়েদার ভালো হয়۔۔۔কিন্তু লক্ষণ দেখে ভালো হওয়ার কোনো আশা আছে বলে মনে হলোনা۔۔۔আজকের রাস্তা বেশিক্ষণের নয়۔۔۔কিন্তু গ্লেসিয়ার ক্রস করতে হবে۔۔۔অর্থাৎ পুরোটাই বোল্ডার জোনের ওপর দিয়ে যাওয়া۔۔۔এই ওয়েদারে সেটা খুবই রিস্কি۔۔۔সাথে আমাদের শরীর খারাপ۔۔۔এদিকে আমি মনে মনে ঠিক করে নিয়েছি যে এত দূর এসেছি যখন শেষ পর্যন্ত গিয়েই ছাড়বো۔۔۔আমাদের আর একটা ক্যাম্প বাকি۔۔۔কেওই আর এই ঠান্ডায় এক্সট্রা একটা দিন আমরা থাকতে চাইছিনা۔۔এমনিতেই আজকে নিয়ে আমরা দশদিন ধরে হাঁটছি۔۔۔এত লম্বা ট্রেক এর আগে কখনো করিনি۔۔তাই মনে মনে সবাই চাইছি মুভ করতে۔۔۔বুদ্ধিরাজদ্বয় তো খুবই চাইছে۔۔۔লোবুচে পৌঁছনোর পর থেকেই দুজন গন্ডগোল শুরু করেছে۔۔۔ওদের নাকি হাতে আর সময় নেই۔۔۔সতেরো তারিখ বুদ্ধিরাজ ওয়ানের গেস্ট আসবে লুকলায়۔۔۔তাই ওকে আগে ছেড়ে দিতে হবে۔۔۔আজকে এগারো তারিখ۔۔۔আজকে গোরকশেপ পৌঁছে কাল বেস ক্যাম্প ঘুরে ফেরা শুরু করলেও কম করে আরও চার থেকে পাঁচ দিন হাঁটা আছে۔۔۔আমরা ফেরার সময় লুকলা দিয়ে ফিরবো এরকমই ঠিক আছে۔۔সেই মতো যে এজেন্সি আমাদের গাইড দিয়েছিলো তাদের ফ্লাইটের টিকিট করতে বলা আছে۔۔۔ডেটটা শুধু নামচে নেমে কন্ফার্ম করলেই চলবে۔۔۔আমরা যেহেতু স্লো হাঁটি এবং বিশেষ তাড়াহুড়ো করিনা তাই ওরাও ঠিক আমাদের গতিবিধি মাপতে পারছেনা۔۔۔তাই আমাদের তাড়া দিচ্ছে۔۔۔

ব্রেকফাস্টে আজকে শুধু গার্লিক আর টমেটো সুপ্ আর ডিম্ সেদ্ধ۔۔۔আজ দুধ কর্নফ্লেক্স খাওয়ার কারও কোনো ইচ্ছা নেই۔۔ আমরা হালকা রেডি হতে শুরু করলাম۔۔ভাবটা এরকম যে স্নো স্টর্ম থামলেই আমরা বেরোবো۔۔۔কিন্তু বেলা সাড়ে নটা নাগাদ ওয়েদার ভালো হওয়ার কোনো লক্ষণ না দেখে এগিয়ে যাওয়াই সিদ্ধান্ত হলো۔۔۔সেই মতো সবাই খুব ভালো শীতের পোশাক পরে বেরোলাম۔۔۔হাতে গ্লাভস۔۔۔মাথায় মাংকি ক্যাপ۔۔۔অসম্ভব ঠান্ডা বাইরে۔۔পেঁজা তুলোর মতো স্নোফল হচ্ছে সাথে তীব্র বেগে হিমশীতল ঝোড়ো হাওয়া۔۔প্রথমে বোল্ডারপূর্ণ একটা সমতল রাস্তা দিয়ে বেশ কিছুক্ষন হাঁটা۔۔۔আমাদের রাস্তার পাশাপাশি সমান্তরালভাবে নিচের দিকে বয়ে চলেছে খুম্বু গ্লেসিয়ার۔۔۔এখনো সেইভাবে তার দেখা পাইনি۔۔۔এতো কষ্টের মধ্যেও মনে রোমাঞ্চ যে আজ তার দেখা পাবো۔۔۔শুরু হলো গ্লেসিয়ার ক্রস۔۔۔এখানে

চাংরি সার গ্লেসিয়ার বামদিক থেকে ডানদিকে এসে পারপেন্ডিকুলারলি,ভালো বাংলা পাচ্ছিনা তাই অংকের ভাষায় লিখে দিলাম)খুম্বুর সাথে মিশেছে۔۔শুরু হলো তাকে আড়াআড়ি পার করা۔۔۔একটা করে হাম্প পার হচ্ছি আর ওয়েদার যেন আরও খারাপ হচ্ছে۔۔۔ঠান্ডা ঝোড়ো হাওয়ার সাথে তুলোর মতো বরফ মুখে এসে ঝাপ্টা মারছে۔۔۔চারিদিক হোয়াইট আউট۔۔۔হাঁটতে খুবই অসুবিধা হচ্ছে এই অবস্থায়۔۔۔কিন্তু আমরা একটানা হেঁটে চলেছি۔۔۔দাঁড়াবার উপায়ও নেই۔۔۔পুরো বোল্ডারে ভর্তি রাস্তা۔۔۔মাঝে মাঝেই ওপর থেকে পাথর পড়ছে۔۔۔হাঁপিয়ে গিয়ে কোথায়ও দাঁড়িয়ে পড়লেই দুই বুদ্ধিরাজই তাড়া লাগাচ্ছে۔۔۔দাঁড়াতে বারণ করছে কারণ হয় পায়ের নিচের বোল্ডার সরে যাচ্ছে নয়তো সামনে মাথার ওপর দিকের বোল্ডার পড়ছে খসে۔۔۔তবে আজকে যারা গোরকশেপ থেকে নিচে নামছে তাদের বেশি কষ্ট হচ্ছে কারণ হাওয়া সেই দিক থেকে এসে মুখে ঝাপ্টা দিচ্ছে۔۔۔আমাদের হাঁটার উল্টো পিঠে আজকে হাওয়ার দিক۔۔۔এর মধ্যে দেখি ওপর থেকে একটি বিদেশী ছেলে নামছে দুই নাকে টিসু পেপার গোঁজা۔۔۔সে দুটি রক্তে ভেসে গেছে۔۔۔দেখে তো আমার মুখ শুকিয়ে এইটুকু হয়ে যাচ্ছে۔۔۔আমি চাইছি এই দৃশ্য যেন লিডার না দেখে۔۔۔দেখে ফেললেই যদি নিচে নামিয়ে দেয়!!

ইতিমধ্যেই আমরা দেখা পেয়েছি বহু আলোচিত সেই খুম্বু গ্লেসিয়ারের۔۔۔এর আগেও গ্লেসিয়ার দেখেছি বা ক্রস ও করেছি۔۔কিন্তু দূর থেকেই খুম্বুর যা ভয়ংকর রূপ দেখেছি তা চিরস্মরণীয়۔۔۔এই গ্লেসিয়ার ক্রস করেই এভারেস্ট সামিট করতে হয়۔۔۔কত শত অভিযাত্রী এর নিচে চিরতরে ঘুমিয়ে আছে তার হিসাব নেই۔۔۔মাঝে মাঝেই রয়েছে গ্লেসিয়ার লেক۔۔যার রং একদম সবুজ۔۔۔পরেরদিন নামার সময় যা পরিষ্কার বোঝা যাবে۔۔۔

একটা সময় পথ ভীষণ দুর্গম হয়ে এলো۔۔আমাদের ফটো তোলাও বন্ধ۔۔۔পায়ের নিচে অনেক বড় বড় বোল্ডার যা নড়ছে۔۔۔আমার চশমা ঠান্ডাতেও রং পাল্টে কালো হয়ে যায় বলে হাঁটতে অসুবিধা হচ্ছিলো۔۔۔বুদ্ধিরাজ টু এইসময়ে আমাকে খুব হেল্প করলো۔۔۔আমার হাত ধরে প্রায় দুশ মিটার এই বাজে রাস্তা পার করে দিলো۔۔۔সব রাতেরই দিন আছে۔۔۔তাই একসময়ে সেই ভয়ঙ্কর গ্লেসিয়ার রাস্তাও শেষ হলো۔۔۔শেষ হাম্পটা ওঠার পর দেখা পেলাম  গোরকশেপের۔۔۔ঘড়িতে সময় বেলা একটা। 

স্টেজ রিহার্সাল

সকলে বিদ্ধস্ত অবস্থায় তুষারঝড়ের মধ্যে দিয়ে গোরকশেপ পৌঁছে হোটেলে ঢুকলাম۔۔সবসময়েই বলেছি হোটেলে পৌঁছানোর পর  ঘরে না বসে ডাইনিং হলে বসে থাকাই নিয়ম۔۔ আর আজকে এতো ঠান্ডা যে কেও ঘরে ঢুকে ড্রেসও চেঞ্জ না করে ডাইনিংয়েই বসে রইলাম۔۔আমার শরীর ভালো নেই۔۔ব্রিথিং ট্রাবল চেস্ট পেন সাথে নাকের ওপর অসহ্য যন্ত্রনা۔۔সুপ্রিয়র খুব মাথা যন্ত্রনা বমি ভাব۔۔۔বাকি দুজন আপাতত ঠিক আছে۔۔বাইরে তুষারপাত বন্ধ হয়েছে۔۔۔আবহাওয়া একটু ভালোর দিকে যাচ্ছে۔۔আকাশ হালকা পরিষ্কার হতে শুরু করেছে۔۔পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যাচ্ছে বৃষ্টির পর যেরকম আকাশ পরিষ্কার হয় এতো তুষারপাত হয়ে গেছে যখন আবহাওয়া ক্লিয়ার হবেই۔۔পূরবী মাঝেমাঝেই বাইরে বেরিয়ে দেখে আসছে আকাশ ক্লিয়ার হলো কী না۔۔

ততক্ষনে লাঞ্চ চলে এসেছে۔۔খাওয়ার ইচ্ছা কারোরই নেই তাই পিৎজা আর পটেটো ফ্রাই বলা হয়েছিল۔۔গোরকশেপে নর্মাল ড্রিংকিং ওয়াটারও কিনে খেতে হচ্ছে۔۔এই রুটের একমাত্র এখানেই এই ব্যবস্থা۔۔বাকি জায়গায় গরম জল কিনে খেতে হয়েছিল কিন্তু নর্মাল জল ফ্রি ছিল۔۔আসলে আমরা প্রায় আঠেরো হাজার ফিট উঁচুতে রয়েছি۔۔এখানে সমস্ত জিনিসের দামই আকাশছোঁয়া۔۔এই উচ্চতায় এসব পাওয়া যাচ্ছে এটাই ভাগ্য۔۔দীর্ঘদিন নেপালে ট্রেক করার অভিজ্ঞতা থেকে জানি যে ট্রেক রুটের সমস্ত হোটেলেই এখানে একই নিয়ম এবং জিনিসের দামও একই۔۔এক এক হোটেলে একেকরকম দাম এরকম ব্যাপার এখানে নেই۔۔মনের দুঃখে প্রথমে এক লিটার জল একশো টাকায় কেনা হলো এবং কিনেই নিজেদের ভুল বুঝতে পারলাম۔۔তারপর ৫০০ টাকায় বড় একটা জগ নেওয়া হলো۔۔লাঞ্চ কেওই ভালোমতো করতে পারলামনা۔۔

লোবুচেতে আমাদের এক নেপালি ভদ্রলোকের সাথে আলাপ হয়েছিল যিনি ট্রেক করতে এসেছেন۔۔তার খুব পেট খারাপ হওয়ায় সকালে বের হননি۔۔তিনি অনেকটা বেলার দিকে রওনা হয়ে বিকেল নাগাদ পৌঁছলেন۔۔এদিকে একজন ভদ্রমহিলা মাথা ধরে বসে কাঁদছেন তার এতো শরীর খারাপ করছে۔۔চারিদিকে একটা খারাপ খারাপ আবহাওয়া۔۔আমাদেরও শরীর ভালো নেই۔۔সব মিলিয়ে আর ডাইনিং হলে ভালো লাগছিলোনা তাই আমরা ঠিক করলাম ঘরে বসে গল্প করবো۔۔পূরবী সিঙ্গেল খাটগুলো জুড়ে দিয়ে বড় বিছানা করে দিলো۔۔আমরা সব লেপ কম্বল মুড়ি দিয়ে বসে পড়লাম۔۔ঘরের জানালা দিয়ে শুধু বাইরের দিকে তাকাই আকাশ পরিষ্কার হলো কিনা দেখি۔۔এইভাবে বসে থাকতে থাকতে আমার কখন চোখ লেগে গেছে۔۔প্রায় তিনরাত ঘুম নেই۔۔ঘুমের কী দোষ!!কতক্ষন ঘুমিয়েছি জানিনা হঠাৎ করে পূরবীর তীব্র চিৎকার কানে এলো۔۔"তনু শিগ্গিরি বাইরে আয়"۔۔লিডার ডেকেছে আর আমি যাই কোথায়۔۔দেখি ঘরে আর কেও নেই۔۔যত শরীর খারাপই হোক পড়ি কী মরি করে জুতোজোড়া পায়ে গলিয়ে ডাইনিং পেরিয়ে বাইরের লনে গিয়ে দেখি চারিদিকে একি কান্ড!!আগামীকাল যে শো দেখবো আজকে তার স্টেজ রিহার্সাল শুরু হয়ে গেছে ততক্ষনে۔۔۔চারিদিক ৩৬০ ডিগ্রি জুড়ে পুরোটাই রঙ্গমঞ্চ۔۔ব্যাকগ্রাউন্ডে আকাশ একেবারে ঝকঝকে নীল۔۔মাঝে মাঝে সাদা সিরাস মেঘ পেঁজা তুলোর মতো ছড়িয়ে আছে۔۔۔নাটকের কুশীলবরা নিজেদেরকে তাদের সর্বশ্রেষ্ঠ রূপে সাজিয়ে নিয়েছে۔۔ হোটেলের সামনেই মাউন্ট পুমোরি পিরামিড আকৃতির চূড়া নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে۔۔বামদিকে হোটেলের পিছন দিকে মাউন্ট তেবচে লোবুচে এবং আরও নাম না জানা শৃঙ্গ۔۔তার পাশে মাউন্ট আমাদাবলাম۔۔আর তার পাশে হোটেলের ডানদিকে খুম্বু গ্লেসিয়ারের একদম পাশ থেকে সামনে উঠে গেছে মাউন্ট নুপৎসে۔۔তার বাম পাশে একে একে ওয়েস্ট সোল্ডার۔۔তার পাশে মাউন্ট লোৎসে খুম্বুৎসে۔۔আর মাঝখান দিয়ে উঁকি দিচ্ছেন তিনি যাকে দেখার জন্য এতো কষ্ট এতো পরিশ্রম এত দিনের স্বপ্ন۔۔আজকের নাটকের শ্রেষ্ঠ কুশীলব মাউন্ট এভারেস্ট۔۔তার সারা গায়ে তখন আলোর বিচ্ছুরণ۔۔ পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গটি তার সুউচ্চ সঙ্গীসাথীদের নিয়ে মেঘমুক্ত নীল আকাশের বুকে বিরাজমান۔۔আর কী তার অনির্বচনীয় মহিমা۔۔তার প্রহরীর ভূমিকায় রয়েছে মাউন্ট নুপৎসে۔۔তাকে সবসময় ঢেকে রেখেছে۔۔۔তার ম্যাসিফ রেঞ্জ নিয়ে বডিগার্ডের মতো সামনে দাঁড়িয়ে۔۔

আস্তে আস্তে সানসেট শুরু হলো۔۔আর শুরু হলো তাদের গায়ে রঙের খেলা۔۔হলুদ থেকে গোল্ডেন হয়ে একে একে রং হারালো সব্বাই۔۔কিন্তু সবার পিছনে মাউন্ট এভেরেস্টের গায়ে তখনও সূর্যের শেষ আলো۔۔

এক বিকেলে মাসাইমারাতে কেনিয়া-তানজানিয়ার বর্ডারে মারা নদীর ধার থেকে জঙ্গল সাফারি করে ফেরার পথে গাড়ী থেকে দেখা সানসেট অথবা কাশ্মীরে নিগিন লেকের ধারে হাউসবোটে কফি খেতে খেতে দেখা সানসেট বা গতবছর মার্দি হিমাল বেস ক্যাম্প এর রুটে বাদলদারা নামের একটি ক্যাম্পসাইট থেকে অন্নপূর্ণা মচ্ছপুছরের ওপর দেখা সানসেট۔۔۔  এগুলো ছিল জীবনের কিছু অভূতপূর্ব মুহূর্ত۔۔আজকের এই বিকেলটা জীবনের সেইসব সর্বশ্রেষ্ট কিছু মুহূর্তের তালিকায় অনায়াসে সবার ওপরে ঢুকে গেলো۔۔۔

সত্যি সত্যিই "শুধু বাঁচিয়া থাকাই এক সম্পদ۔۔۔"।