শতবর্ষে কমরেড ইলা মিত্র
- 18 October, 2026
- লেখক: সুমনা সেনগুপ্ত
কমিউনিস্ট পার্টির শতবর্ষে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় চলছে নানা লেখালেখি। পার্টির ১০০ বছরের যাত্রা পথের সঙ্গে সঙ্গে আমরা যদি সমবয়সী কমরেড ইলা মিত্রর যাত্রাপথটাও একবার ফিরে না দেখি, তাহলে কিন্তু ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। ইলা মিত্র ১৯২৫ সালের ১৮ই অক্টোবর কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা নগেন্দ্রনাথ সেন ছিলেন ব্রিটিশ সরকারের অধীনে বাংলার অ্যাকাউন্টেন্ট জেনারেল। তাদের আদি বাড়ি ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের যশোরের ঝিনাইদহে। কিন্তু বাবার চাকরির সুবাদে তারা কলকাতাতেই থাকতেন। এই শহরেই তার জন্ম, বেড়ে ওঠা, লেখাপড়া সবকিছু। প্রথমে বেথুন স্কুল তারপর বেথুন কলেজ থেকে তিনি ১৯৪৪ সালে বিএ ডিগ্রী অর্জন করেন। তারপর 1958 সালের কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে এমএ পাস করেন। এই 1944 থেকে 1958 এই ১৪ বছর ছিল তার জীবনের মোর ঘোরানো পর্ব। পরবর্তীকালে কমরেড ইলা মিত্র যে জীবন্ত কিংবদন্তি তে পরিণত হন,, তার ভিত্তি ভূমি ছিল এই 14 বছর। অবশ্য তার আগেও বাংলায় তিনি পরিচিত ছিলেন। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তার নাম এবং ছবিও বেরত। কিন্তু সেটা একেবারেই অন্য কারণে। কৈশোরের তিনি খেলাধুলায় তুখোড় ছিলেন। ১৯৩৫ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন রাজ্য জুনিয়র অ্যাথলেটিক চ্যাম্পিয়ন। সাঁতার, বাস্কেটবলেও তিনি পারদর্শী ছিলেন। তিনিই প্রথম বাঙালি মেয়ে, যিনি ১৯৪০ সালে জাপানে অনুষ্ঠিত অলিম্পিকের জন্য নির্বাচিত হন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে তার অংশগ্রহণ করা হয়নি। এছাড়াও গান অভিনয়েসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও তার পারদর্শিতা ছিল। রাজনীতির আঙিনায় ইলা মিত্রের প্রবেশ তার ছাত্রী জীবনে নারী আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে। সময়টা 1943 সাল। ইলা সেন কলকাতা মহিলা সমিতির সদস্য হলেন। এই সমিতির কাজ করতে করতেই তার পরিচয় ঘটলো কমিউনিস্ট মতাদর্শের সঙ্গে। তিনি যুক্ত হন কমিউনিস্টদের পরিচালিত গার্লস স্টোর্স কমিটির সঙ্গে। নিজের উদ্যোগেই শুরু করেন মার্কসবাদ নিয়ে পড়াশোনা করা। ইলা মিত্র পরে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন "ওরা সমাজকে পাল্টাতে চায় এবং একই সঙ্গে করতে চায় মানুষের সেবাও। এই দুটো একসঙ্গে আমাকে দারুন আকর্ষণ করে।" এই সমিতিতে হিন্দু মুসলিম ভেদও ছিল না। ৪৩ এর মন্বন্তরের তিনি খাদ্য আন্দোলন, ভুখা মিছিল, লঙ্গরখানা পরিচালনা ইত্যাদি কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। পরবর্তীকালে এক সাক্ষাৎকারে তিনি তার এই সময়ের কথা উল্লেখ করেছেন। "৫০ লক্ষ লোক না খেয়ে মারা গেল। তখন সবাই দেখছি না খাওয়া। আমাদের সব বাড়িতে এসে লোকে বলতো মা একটু চাল দিন একটু ফ্যান দিন। আমি তখন আত্মরক্ষা সমিতির সাথে যোগ দিলাম। কলেজ, খেলাধুলা সব বাদ দিয়ে খিচুড়ি রান্না করে মানুষকে খাওয়াতে লাগলাম।" ওই ৪৩ সালেই কমলা মুখোপাধ্যায় এবং মনিকুন্তলা সেনের সুপারিশে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন। ১৯৪৫ সালে তার বিয়ে হয় পার্টির সংগঠক রমেন্দ্রনাথ মিত্রের সঙ্গে। ইলা মিত্রর আলোচনা প্রসঙ্গে তার সহ যোদ্ধা এবং জীবন সঙ্গী রমেন্দ্রনাথ মিত্রের আলোচনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রমেন্দ্রনাথ মিত্র উচ্চশিক্ষার জন্য কলকাতায় এসেছিলেন মালদা জেলার নবাবগঞ্জ থানার রামচন্দ্রপুর গ্রাম থেকে। তাঁর বাবার মৃত্যু হয় তার বয়স যখন মাত্র তিন। সংসার চালাতেন তার মা বিশ্বময়ী দেবী। তিনি ছিলেন তেজস্বী মহিলা। দেশভাগের পর হিন্দুরা যখন দলে দলে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে চলে যাচ্ছে তিনি রামচন্দ্রপুরে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। রমেন্দ্রনাথ মিত্রের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল কলকাতায় ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনকে কেন্দ্র করে কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই পার্টির নির্দেশে তাকে চলে যেতে হয় মালদা জেলার কৃষক ফ্রন্ট এ কাজ করার জন্য। বিয়ের পর ইলা মিত্র সেই প্রথম স্বামীর সঙ্গে সম্পূর্ণ অচেনা অজানা রামচন্দ্রপুরে পা রাখেন। কলকাতার আলোকিত জীবন ছেড়ে রামচন্দ্রপুরে এক রক্ষণশীল পরিবারের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হন। এই সময়ে কথা আমরা তার লেখায় পাই ---
"শাশুড়িমার কাছে নানা আজব কাহিনী শুনে শুনে আমি তাদের পরিবারে বধূ হবার উপযুক্ততা অর্জনের পাঠ নিচ্ছি। কোন এক কালে মা একবার স্টিমার কোম্পানির বাষ্পীয় জলযানে করে বাপের বাড়ি গিয়েছিলেন। আমার জ্যেষ্ঠা তো রেগে টং হয়ে গেলেন। তিনি আদেশ জারি করলেন আর কোনদিন ঘরের বউ যেন সাধারণ মানুষের পাইকারি যাতায়াতের স্টিমারে না উঠে।" ইলা মিত্র তার সাক্ষাৎকারে বলেছেন "এমনকি আমার শাশুড়ি গঙ্গাস্নানে যেতেন পালকী চড়ে এবং সেই পালকি গঙ্গায় ডুবিয়ে তাকে স্নান করানো হত।"
এই পরিবেশেও ইলা মিত্র থেমে থাকেননি। সংসার চালানোর সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক আলাপ-আলোচনা চলতে থাকে স্বামীর সহযোগীদের সঙ্গে। পরবর্তী কালে পরিবারের ঘনিষ্ঠ নিয়াজ বিশ্বাসের কাছ থেকে জানা যায় রামচন্দ্রপুরে ইলা মিত্রর জনপ্রিয়তার কথা। তিনি দারুণ মিশুকে ছিলেন। সমাজের সমস্ত স্তরের মানুষের সঙ্গে সমান ভাবে মিশতেন। হিন্দু মুসলিম কোন ভেদাভেদ ছিল না। সবাই তাকে অত্যন্ত পছন্দ করত যা তার পরবর্তীকালে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য অত্যন্ত সুবিধাজনক হয়েছিল। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ হওয়ার পরেও রমেন্দ্রনাথের মায়ের সিদ্ধান্তে তারা পূর্ববঙ্গেই থেকে যান। এই সময় কৃষ্ণগোবিন্দপুর এর জমিদার আলতাফ মিয়ার উৎসাহ ও পৃষ্ঠপোষকতায় গ্রামে একটি মেয়েদের স্কুল খোলা হল। প্রথমে দেখা গেল ছাত্রী সংখ্যা মাত্র তিনজন। ইলা মিত্র প্রধান শিক্ষিকা। শোনা যায় প্রথম যেদিন তিনি স্কুলে গিয়েছিলেন, মানসিক চাপে তার শাশুড়ি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু মাত্র তিন মাসের মধ্যে ওই স্কুলের ছাত্রীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় পঞ্চাশে। কিন্তু এই পর্বে অঞ্চলের রক্ষণশীল শক্তির সঙ্গে তাকে প্রবল সংঘাতে নামতে হয়। ১৯৪৬ সালের অক্টোবরে নোয়াখালীর দাঙ্গার পর অনেকেই ত্রাণ ও পুনর্বাসনের কাজে ওই জেলায় যান শ্বশুর বাড়ির বিধি নিষেধ উপেক্ষা করে ইলা মিত্র এই কাজের সামিল হন। ৪৬ সালে সারা বাংলা জুড়ে ওঠে তেভাগা আন্দোলনের ঢেউ এই আন্দোলনই ইলা মিত্র কে অবিসংবাদি নেত্রী হিসেবে পরিচিতি দান করে। স্বাধীনতার পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের মুসলিম লীগ সরকার কমিউনিস্টদের প্রতি কঠোর মনোভাব দেখাতে থাকে। খাতায়-কলমে পার্টিকে নিষিদ্ধ না করলেও উপরের সারির বহু নেতা ও কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। প্রকাশ্যে পার্টির কাজ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। কাজেই রামচন্দ্রপুর থেকে বহু পার্টিকর্মী পার্শ্ববর্তী জেলা নাচোলে চলে যেতে থাকেন। বাড়িতে থাকা নিরাপদ বিবেচনা না করে রমেন্দ্রনাথ ও ইলাও নাচোল যাত্রা করেন। রমেন্দ্রনাথের সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায় তিনি, মাতলা মাঝি, ফণি ভূষণ রায় হরেক মন্ডল শেখ আজহার হোসেন ইত্যাদিরা ৪৬ সাল থেকেই নাচোলে সাংগঠনিক কাজ করে চলেছিলেন। মাতলা মাঝির সাঁওতালি ভাষার বক্তৃতা আদিবাসীদের মধ্যে উন্মাদনা সৃষ্টি করত। বস্তুত তার কারণেই আদিবাসীদের কাছে কমিউনিস্টরা গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে এইসব সংগঠকদের সঙ্গে পরে যুক্ত হন বৃন্দাবন সাহা ইলা মিত্র প্রমূখ। ইলা মিত্র তার স্বভাবজাত দক্ষতায় একেবারে শুরু থেকেই আদিবাসী মেয়েদের মধ্যে দারুন জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। সাঁওতালরা ইলা মিত্রকে সম্বোধন করত রাণীমা বলে। ইলা মিত্র সঙ্গে নারী সংগঠন গড়তে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিলেন মাতলা মাঝির স্ত্রী ও। ইলা মিত্র কে বুঝতে হলে এই সময়ের তেভাগা আন্দোলনকেও বুঝে নিতে হবে। ১৯৪২ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে সমগ্র বাংলায় দেখা দেয় দুর্ভিক্ষ। যা পঞ্চাশের মন্বন্তর নামে পরিচিত এই দুর্ভিক্ষের সময়ে কৃষকদের ওপর শোষণের মাত্রা ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। এ সময়কার অর্থনৈতিক দুরবস্থা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার ফলে মরিয়া হয়ে ওঠে শোষিত কৃষকরা। তিন ভাগের দুই ভাগ ফসল কৃষকের এই দাবি নিয়ে জোরদার হয় তেভাগা আন্দোলন। ১৯৪৬-৪৬ সালে দিনাজপুরে কমরেড হাজী দানেশের প্রচেষ্টায় সূচিত হয় যুগান্তকারী তেভাগা আন্দোলন। কমিউনিস্ট পার্টি ও কৃষক সমিতি প্রান্তিক চাষীদের সংগঠিত করে আন্দোলনকে জোরদার করতে থাকে। এবং ইলা মিত্র স্বামীর সঙ্গে সরাসরি মাঠ পর্যায়ে কৃষক সংগঠনের সাথে যুক্ত হন। কৃষকদের দাবি ছিল দুটি। ফসলের সাত আরি জিন ও তেভাগা। ইলা মিত্র কে নিয়ে ওই এলাকায় পরে যে গান বাধা হয় তার লাইনগুলো ছিল এই রকম
ইলা মিত্র নারী
আইন করলো জারি
আধি জমি টিকুটি ভাগ
জিন হল সাত আরি রে ভাই
জিন হল ৭ আড়ি।
তেভাগা আন্দোলনের গতি ক্রমশ উত্তাল হয়ে ওঠে, আন্দোলনের পুরো ভাগে যারা আছেন তারা জোতদার দের বাড়ি আক্রমণ করেন। এবং পুলিশ ডাকার অপরাধে তাদের কাছ থেকে জরিমানার টাকা আদায় করেন। অনেক জোতদার তেভাগার দাবি মেনে নিতে রাজি হন। ১৯৪৯ সালের মে মাস থেকে পুলিশ উপদ্রুত গ্রাম গুলোতে যাওয়া আসা করে এবং নিরীহ গ্রামবাসীদের উপর অত্যাচার শুরু করে। এই সময় নাচোলে পুলিশ হত্যার ঘটনা আগুনে ঘৃতাহুতি দেয় ।ঘটনাটি ঘটে ১৯৫০ সালের ৫ই জানুয়ারি। এই পুলিশ হত্যার সম্পর্কে সঠিক কোন বিবৃতি পাওয়া যায় না। তবে এটুকু নিঃসন্দেহ যে পুলিশ আসার পিছনে ছিল স্থানীয় জোতদারদের মদত। এই ঘটনার খবর সরকারি মহলে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই সেনা তলব করা হয়। এবং এর পরেই সেনা এবং পুলিশ একজোট হয়ে নাচোলের কমিউনিস্ট প্রভাবিত গ্রাম গুলোতে হানা দেয়। গ্রামের পর গ্রামে প্রবেশ করে তারা এলোপাথাড়ি গুলি করে আদিবাসী, বৃদ্ধ শিশু, নারী সকলকেই হত্যা করতে থাকে। বহু নারী ধর্ষিতা হন। ঘরের আসবাবপত্র ,মজুত ফসল জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। বহু সাঁওতাল পুরুষকে গ্রেফতার করে নিয়ে আসা হয় নাচোল থানায়। নাচলের ঘটনা স্মরণীয় হয়ে আছে বিদ্রোহ পরবর্তী পুলিশের অমানুষিক বর্বরতা জন্য। পুলিশ প্রাণপণে চেষ্টা করতে থাকে আদিবাসী কৃষকদের কাছ থেকে বয়ান আদায় করার জন্য যে পুলিশ হত্যার ঘটনায় ইলা মিত্র এবং তার দলের প্ররোচনা ছিল ।তারা লোভ দেখিয়েছিল এই স্বীকারোক্তির পরেই তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে। কিন্তু ভালোবাসার কাছে লোভ পরাজিত হয়। এ প্রসঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে ইলামিত্র বলেছেন--
" সেই হিংস্র পশুর দল আঘাতের পর আঘাত করে চলেছে। রক্তে ওদের গা ভেসে যাচ্ছে কিন্তু কারো মুখে শব্দ নেই। কোন যন্ত্রণার কাতরক্তিও নয়। মনে মনে কামনা করছিলাম আমি যেন অজ্ঞান হয়ে যাই। একজন নয় দুজন নয় প্রতিটি মানুষ মুখ বুজে নিঃশব্দ হয়ে আছে। এত মার মেরেও তাদের মুখ খোলাতে পারছে না। এমন কি করে সম্ভব হল!"
এরপর শুরু হয় ইলা মিত্র সহ আরো কয়েকজন কমরেড এর ওপর অমানুষিক অত্যাচার। রাজশাহী জেলে তাকে একটি অন্ধকার সেলে একা রাখা হয়েছিল প্রচন্ড অসুস্থ অবস্থায় বিপর্যস্ত ইলা মিত্রকে সেবা শুশ্রূষা করে কিছুটা সুস্থ করেন বরিশালের মনোরমা বসু পুতুল দাশগুপ্ত খুলনার ভানুদেবী সিলেটের অপর্ণা পাল ঢাকার নাদিরা বানু ময়মনসিংহের ভদ্রমণি হাজং প্রমূখ। তাদেরই অনুরোধে তিনি আদালতে তার ওপর অত্যাচারের ঘটনার একটি জবানবন্দি দেন।
রাজশাহী আদালতে ইলা মিত্র ইংরেজিতে লিখিত যে জবানবন্দি দিয়েছিলেন তা থেকে তাঁর ওপর যে নির্মম অত্যাচার হয়েছিল সে বিষয়ে জানা যায়। তিনি তাঁর জবানবন্দিতে বলেন, “বিগত ০৭.০১.৫০ তারিখে আমি রোহনপুর থেকে গ্রেপ্তার হই এবং পরদিন আমাকে নাচোল থানা হেড কোয়ার্টারে পাঠানো হয়। কিন্তু পথে পাহারাদার পুলিশরা আমার ওপর অত্যাচার করে। নাচোলে ওরা আমাকে একটা সেলের মধ্যে রাখে। সেখানে একজন পুলিশের দারোগা আমাকে এ মর্মে ভীতি প্রদর্শন করে যে, আমি যদি হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে সম্পূর্ণ স্বীকারোক্তি না করি, তাহলে ওরা আমাকে উলঙ্গ করবে। আমার যেহেতু বলার মত কিছু ছিলো না, কাজেই তারা আমার পরনের সমস্ত কাপড় চোপড় খুলে নেয় এবং সম্পূর্ণ উলঙ্গ অবস্থায় সেলের মধ্যে আটকে রাখে। আমাকে কোনো খাবার দেয়া হয়নি। এমন কি এক বিন্দু জলও না। ঐ সন্ধ্যায় স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য এসআইএর উপস্থিতিতে সিপাইরা এসে বন্দুকের বাট দিয়ে আমার মাথায় আঘাত করতে শুরু করে। সে সময় আমার নাক দিয়ে প্রচুর রক্ত পড়তে থাকে। এরপর ওরা আমার পরনের কাপড় চোপড় ফেরত দেয়। রাত প্রায় বারোটার সময় আমাকে বের করে সম্ভবত এসআইএর কোয়ার্টারে নিয়ে যাওয়া হয়। অবশ্য এ ব্যাপারে আমি খুব বেশি নিশ্চিত ছিলাম না। আমাকে যে কামরায় নিয়ে যাওয়া হয় সেখানে আমার স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য ওরা নৃশংস ধরনের পন্থা অবলম্বন করে। আমার চারপাশে দাঁড়িয়ে ওরা আমার পা দুটোকে লাঠির মধ্যে রেখে ক্রমাগতভাবে চাপ দিতে শুরু করে। ওদের ভাষায় আমার বিরুদ্ধে ‘পাকিস্তানী ইনজেকশন’ পন্থায় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছিল। এ ধরনের অত্যাচার চলার সময় ওরা রুমাল দিয়ে আমার মুখ বেঁধে রেখেছিল এবং আমার চুল ধরেও টান দিচ্ছিল। কিন্তু আমাকে দিয়ে জোরপূর্বক কিছুই বলাতে সক্ষম হয়নি। এতসব অত্যাচারের দরুণ আমার পক্ষে আর হেঁটে যাওয়া সম্ভব ছিলো না। সিপাইরা আমাকে ধরাধরি করে সেলে নিয়ে গেলো। এবার পুলিশের সেই দারোগা সিপাহীদের ৪টা গরম ডিম আনার নির্দেশ দিয়ে বলল যে, এবার মেয়েটাকে কথা বলতেই হবে। তারপর শুরু হল নতুন ধরনের অত্যাচার। ৪/৫ জন সিপাহী মিলে জোর করে আমাকে চিৎ হয়ে শুতে বাধ্য করলো এবং ওদের একজন আমার গোপন অঙ্গ দিয়ে একটা ডিম ভেতরে ঢুকিয়ে দিল। সে এক ভয়াবহ জ্বালা। প্রতিটি মুহূর্ত অনুভব করলাম, আমার ভেভতরটা আগুনে পুড়ে যাচ্ছে। আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম। ১৯৫০ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি সকালে আমার জ্ঞান ফিরে এলো। একটু পরে জনাকয়েক পুলিশ সঙ্গে করে আবার সেই দারোগার আগমন ঘটে। সেলে ঢুকেই সে আমার তলপেটে বুট দিয়ে প্রচণ্ড জোরে লাথি মারে। আমি দারুণ ব্যথায় কুঁকড়ে গেলাম। এরপর ওরা জোর করে আমার ডান পায়ের গোঁড়ালি দিয়ে একটা লোহার পেরেক ঢুকিয়ে দিল। আমি তখন অর্ধ-চৈতন্য অবস্থায় মেঝেতে পড়ে রয়েছি। কোনো রকম স্বীকারোক্তি না পেয়ে দারোগা তখন রাগে অগ্নিশর্মা। যাওয়ার আগে বলে গেল, আমরা আবার রাতে আসব। তখন তুমি স্বীকারোক্তি না দিলে, একের পর এক সিপাহী তোমাকে ধর্ষণ করবে। গভীর রাতে দারোগা আর সিপাহীরা আবার এলো এবং আবারো হুমকি দিল স্বীকারোক্তি দেয়ার জন্য। কিন্তু আমি তখনও কিছু বলতে অস্বীকার করলাম। এবার দু’জন মিলে আমাকে মেঝেতে ফেলে ধরে রাখল এবং একজন সেপাহী আমাকে রীতিমত ধর্র্ষণ করতে শুরু করল। অল্পক্ষণের মধ্যেই আমি সংজ্ঞা হারিয়ে ফেললাম...।”
ইলা মিত্রর এই জবানবন্দি টি লীগ সরকার গোপন করার চেষ্টা করলেও পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি একটি ইশতেহারের আকারে ছাপিয়ে তা মানুষের মধ্যে প্রচার করে। রাজশাহী জেলে এত অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন যে তার বাঁচার আর কোন আশাই ছিল না। এদিকে ঢাকা হাইকোর্টে উপযুক্ত সাক্ষ্য প্রমাণের অভাবে এই মামলায় খারিজ হয়ে আসামিদের শাস্তি যাবজ্জীবন থেকে কমিয়ে ১০ বছর করা হয়। কিন্তু রাজশাহী এমনকি ঢাকা মেডিকেল কলেজেও তার শারীরিক অবস্থার কিছু মাত্র উন্নতি হয় না। এই পর্যায়ে তাকে নিয়ে আসা হয় কলকাতা মেডিকেল কলেজে। দীর্ঘ চিকিৎসার পর হাসপাতাল থেকে মুক্তি পেয়ে ইলা স্বামী- ও পুত্রের সঙ্গে বেহালার এক বস্তিতে থাকতে শুরু করেন। এরপর তার আইনজীবী কামিনী কুমার দত্তের পরামর্শে ভারতের নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করেন। তার স্বামী কাগজে-কলমে তখনও ভারতীয় নাগরিক ছিলেন উপরন্তু তার অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী জহরলাল নেহেরুর কাছেও নাগরিকত্ব দেওয়ার ব্যাপারে অনুরোধ করেন এবং তিনি নাগরিকত্ব পেয়েও যান আবার ফিরে আসেন ইউনিভার্সিটির চত্বরে। ১৯৫৭ সালে বাংলায় এমএ পাস করেন। সেই বছরই তিনি সিটি কলেজে অধ্যাপিকা হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। ততদিনে ইলা মিত্র এক জীবন্ত কিংবদন্তি তে পরিণত হয়েছেন। তাকে নিয়ে লেখা হচ্ছে একের পর এক গান কবিতা। ইলা মিত্র পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় ১৯৬২ ৬৭ ৬৯ ও ৭২ ৪ বার বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছিলেন ।এর পরবর্তী সময়ে তিনি কয়েকবার ঢাকা গিয়েছিলেন প্রত্যেকবারই তাকে অভূতপূর্ব সংবর্ধনা দেওয়া হয়। এমনকি তাকে বাংলাদেশে নাগরিকত্ব গ্রহণ করার জন্যেও অনুরোধ করেন মুজিবুর রহমান এবং পরবর্তীতে শেখ হাসিনাও। যদিও তিনি তা গ্রহণ করেননি। তিনি অধ্যাপনা থেকে অবসর নেন ১৯৮৯ সালে। এত ঝড়ঝঞ্ঝা মধ্যেও তার কলম থেমে থাকে নি। তিনি অনুবাদ করেছেন জেলখানার চিঠি, হিরোশিমার মেয়ে ,লেনিনের জীবনী ও রাশিয়ার ছোট গল্প। হিরোশিমা বইটির জন্য তিনি সোভিয়েত ল্যান্ড নেহেরু পুরস্কার লাভ করেন। তাকে নিয়ে বিখ্যাত সাহিত্যিক সেলিনা হোসেন লিখেছেন কাঁটাতারে প্রজাপতি নামক উপন্যাসটি ।বাংলাদেশ সরকার তাকে নিয়ে তৈরি করেছে তথ্যচিত্র "ইলা মিত্র"। ইলা মিত্রর মৃত্যু হয় এক আকস্মিক দুর্ঘটনায়, ২০০২ সালের ৯ই অক্টোবর। তার মৃত্যুতে শ্রেণী ধর্ম নির্বিশেষে দুই বাংলাতেই নেমে আসে শোকের ছায়া ইলা মিত্র এক স্পর্ধার নাম, যা মানুষের মধ্যে জাগিয়ে তোলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রেরণা। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় তাকে উদ্দেশ্য করে লেখেন
"শিয়রে জেগে সাতটি ভাই
মৃত্যুকে আজ তাড়ায়
ফুটিবে ফুল লক্ষ আশার-
জীবন হাত বাড়ায়
শিকলে বাঁধে স্পর্ধা কার?
পারুল বোন আমার।"
শতবর্ষে এই অগ্নিশিখা কে আভূমি কুর্ণিশ। লাল সেলাম কমরেড ইলা মিত্র।
ঋণ--
ইলা মিত্র ও নাচোলের কৃষক বিদ্রোহ। গৌতম রায় - মনীষা গ্রন্থালয় প্রাইভেট লিমিটেড
মুক্তিমঞ্চে নারী - ড. নিবেদিতা দাশ পুরকায়স্থ - প্রিপ ট্রাস্ট, ১৯৯৯, ঢাকা)।